তথাকথিত চন্দ্র দ্বিখণ্ডনের ফটোগ্রাফিক জালিয়াতি

পৃথিবীর বহু দেশের শিক্ষাবঞ্চিত এবং সভ্যতার আলো বঞ্চিত কোটি কোটি মুসলমানের মধ্যে যেই মিথ্যাচার প্রচার করা হয়, তাদের সাথে যেই জালিয়াতি করা হয়, তাদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে তাদের সাথে যেই প্রতারণা করা হয়, তার বিরুদ্ধে আমরা অবস্থান নিই যুক্তির সাহায্যে, শিক্ষা, বিজ্ঞান এবং মানবতার স্বার্থে। এই নিবন্ধটিতে মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত এপোলোজেটিক দাবিকে বিশ্লেষণ এবং ভুল প্রমাণ করা হয়েছে তা হচ্ছে, “নবী মুহাম্মদের চন্দ্র বা চাঁদ দ্বিখণ্ডন করার স্বপক্ষে ফটোগ্রাফিক প্রমান আছে।” কারণ মাঝে মাঝেই এরকম কিছু ভুয়া সংবাদ বাঙলাদেশের পত্রিপত্রিকা এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে দেখতে পাওয়া যায়। মনে রাখতে হবে, সাধারণ মুসলমান বা ধর্মবিশ্বাসীদের মধ্যে যুক্তি এবং জ্ঞানের চর্চা ঘটানোই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।

এপোলোজেটিক দাবি

অনেক মুসলমান বিশ্বাস করে যে, মুহাম্মদ যখন মক্কায় ছিলেন, আল্লাহ্‌ তালাহ মুজেজা হিসাবে মক্কাবাসীদের সামনে চন্দ্র বা চাঁদ দ্বিখণ্ডিত করেছিলেন মোহাম্মদের জন্য। মুসলিমদের ধর্মগ্রন্থ কোরআন এবং মুহাম্মদের হাদিস দুই জায়গাতেই এর পরিষ্কার উল্লেখ রয়েছে। খুব পরিষ্কারভাবে এটিও বলা আছে, চাঁদ দুইভাগে ভাগ হয়ে পাহাড়ের দুইপাশে খণ্ড হিসেবে পতিত হয়েছিল।

কেয়ামত আসন্ন, চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে।
কুরআন ৫৪ঃ১
গ্রন্থের নামঃ সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
হাদিস নম্বরঃ [6819] অধ্যায়ঃ ৫৩/ কিয়ামত, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন‏
পরিচ্ছদঃ ৯. চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার বিবরণ
৬৮১৯। মুহাম্মদ ইবনু মুসান্না ও ইবনু বাশশার (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হল। তবে আবূ দাঊদ (রহঃ) এর হাদীসে রয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সময় (চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়েছে)।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
গ্রন্থের নামঃ সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
হাদিস নম্বরঃ [6818] অধ্যায়ঃ ৫৩/ কিয়ামত, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন‏
পরিচ্ছদঃ ৯. চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার বিবরণ
৬৮১৮। যুহায়র ইবনু হারব ও আবদ ইবনু হুমায়দ (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কাবাসী লোকেরা নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট তাদের একটি নিদর্শন (মু’জিযা) দেখানোর দাবী করল। তিনি তাদের (দু’বার) চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হওয়ার নিদর্শন দেখালেন।
মুহাম্মাদ ইবনু রাফি (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে শায়বানের অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
গ্রন্থের নামঃ সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
হাদিস নম্বরঃ [6815] অধ্যায়ঃ ৫৩/ কিয়ামত, জান্নাত ও জাহান্নামের বিবরণ
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন‏
পরিচ্ছদঃ ৯. চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়ার বিবরণ
৬৮১৫। আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা, আবূ কুরায়ব ইসহাক ইবনু ইবরাহীম, উমার ইবনু হাফস ইবনু গিয়াস, ও মিনজাব ইবনু হারিছ তামিমী (রহঃ) … আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মিনায় আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে ছিলাম। এমতাবস্থায় (হঠাৎ করে) চন্দ্র বিদীর্ন হয়ে দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। এক খন্ড পাহাড়ের এ পাশে পড়ল এবং অপর খন্ড পড়ল পাহাড়ের ওপাশে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমরা সাক্ষী থাক।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
গ্রন্থের নামঃ সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
হাদিস নম্বরঃ [3377] অধ্যায়ঃ ৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ২০৭৭. মুশরিকরা মুজিযা দেখানোর জন্য নবী করীম (সাঃ) এর নিকট আহবান জানালে তিনি চাঁদ দু’টুকরা করে দেখালেন
৩৩৭৭। খালাফ ইবনু খালিদ আল-কুরায়শী (রহঃ) … ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যামানায় চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

অতীত থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বহু মুসলমানরা তাঁদের বিশ্বাসের পক্ষে দাবী তোলেন যে, চাঁদ আসলেই দুইভাগ হয়েছিল। প্রজন্মের পরে প্রজন্ম তারা এই বিশ্বাস করে এসেছে। অনেকে এই আধুনিক সময়ে এমনটাও দাবী করেন যে, তাদের কাছে ফটোগ্রাফিক প্রমাণ আছে। তাঁদের দাবীর স্বপক্ষে অধিকাংশ সময়ে চাঁদের কাছ থেকে তোলা দৃশ্যের এই ছবি গুলো ব্যবহার করা হয়ঃ

চন্দ্র
চন্দ্র

দাবীর উৎস

২০০৭ সালে, Dr. Zaghloul El Najjar এই ছবি গুলো ব্যবহার করে এই দাবিটি প্রচার করেছিলেন যে, নাসা চাঁদের দ্বিখন্ডনের প্রমাণ করেছে। [১] অদ্ভুত দাবীটি এরপর ছড়িয়েছিল জাফারিয়া নিউজ এর মত কিছু সংবাদ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। [২] খুব অদ্ভুতভাবেই, লক্ষ লক্ষ আধুনিক শিক্ষাবঞ্চিত মুসলমান নিউজগুলো বিশ্বাস করেছিল, এবং ভক্তি সহকারে প্রচার করেছিল।

বিশ্লেষণ

লোনার রিল

[রিল মানে পৃষ্ঠতলের উপর যেকোনো ধরনের উপত্যকা বা পরিখা আর লোনার রিল মানে চাঁদের পৃষ্ঠতলের উপর যেকোনো ধরনের উপত্যকা বা পরিখা।]

চাঁদের উপর যে দাগ দেখেন তা আর কিছু না এই লোনার রিল। রিল দীর্ঘ হয় এবং গভীর গিরিসংকট অনুরুপ খাদ থাকে। একটি রিল সাধারণত কয়েক কিলোমিটার প্রশস্ত এবং দৈর্ঘ্য শত শত কিলোমিটার। সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহতে বিশেষ করে মঙ্গল, শুক্র এবং বেশ কয়েকটি চাঁদে (উপগ্রহ) একই রকম গঠনের রিল পাওয়া যায়।

কিভাবে এসব রিল গঠিত হয়েছে তা প্রতিটি ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে এখনো জানা যায়নি। আলোচ্য বিষয়ে যেসব তত্ত্ব আছে তা কোনো একসময়ে সৌরপিন্ডের কিছু ভাঙ্গা অংশের ইতিহাস, ধ্বংসপ্রাপ্ত লাভা টিউব (আগ্নেয়গিরির লাভা বয়ে যাওয়া খাল বিশেষ) এবং গঠনমূলক ক্রিয়াকলাপ/চাপের ক্ষয়ক্ষতি অন্তর্ভুক্ত। বিজ্ঞানীগণ তাদের প্রাপ্ত তথ্য প্রমাণ যাচাই করে দেখছেন। তবে তার কোনটিই অতীতে চাঁদের দুইভাগ হওয়ার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা দেখাতে পারে নি।

রিল এর প্রকারভেদ

চন্দ্র পৃষ্ঠে তিন ধরনের রিল রয়েছে :

১। সর্পিলাকার রিল, যেসব রিল নদীর মত বাঁকানো এবং সাধারণত ভাঙ্গা লাভা টিউব বা বিলুপ্ত লাভা প্রবাহের অবশিষ্টাংশ বলে মনে করা হয়। এসকল রিল সাধারণত একটি বিলুপ্ত আগ্নেয়গিরি হতে শুরু হয়, তারপর একেবেঁকে চলে কখনও কখনও বিভক্ত হয়ে পৃষ্ঠতলের উপর প্রভাবিত হয়ে যায়।

২। ধনুকাকৃতির রিল, মসৃণ বক্রাকার এবং লাভাপ্রবাহ সৃষ্ট সমতল রিল যা চন্দ্রের অন্ধকার অঞ্চলের কাছাকাছি পাওয়া যায়। ধারনা করা হয় যে এসব তৈরি হয়েছিল লাভা প্রবাহের শীতল, সংকুচিত অববাহিকা হতে।

৩। সরলাকৃতি দীর্ঘ রিল, রৈখিক পথ অনুসরণ করে এবং সমতল খাদের মত মনে করা হয়। অর্থাৎ, দুটি সমান্তরাল ফাটলের মধ্যকার নিমজ্জিত ভূত্বক। এসব সহজেই পাওয়া যায় আগ্নেয়গিরির মুখ হতে বা সরলরেখায় অবস্থিত পাহাড় বেষ্টিত স্থানে।

রিল সমূহ চন্দ্রপৃষ্ঠের উপর সব স্থানেই পাওয়া যায় এবং তারা বলয় গঠন করেনা। অতএব, “চাঁদ পুরোপুরি দুইভাগে বিভক্ত হয়েছে” এমন রূপকথার প্রমাণ রূপকথার জগতেই আছে।

রিল সমূহের ছবি

রিল সমূহ চাঁদের পৃষ্ঠকে কিভাবে দাগাঙ্কিত করে তা বোঝার জন্য, আমাদের আরও উপর থেকে তোলা চাঁদের ছবি সমূহের দিকে তাকাতে হবে। এসব খাদ দেখে কি মনে হয় যে এসব খাদ চাঁদকে দুইভাগে বিভক্ত করে আছে?

Martian rilles
Martian rilles
Venetian rilles
Venetian rilles
Europa
This is Europa, one of Jupiter’s moons
চন্দ্র
চন্দ্র
চন্দ্র
চন্দ্র
চন্দ্র
চন্দ্র
চন্দ্র
চন্দ্র
চন্দ্র
চন্দ্র
European rilles
European rilles

রিমা আরিয়াডিয়াস

মুসলমানদের ব্যবহৃত ছবি সমূহ হল অ্যাপোলো মিশন থেকে প্রাপ্ত রিমা আরিয়াডিয়াস নামে একটি রিলের ফটোগ্রাফ। এটি চাঁদের উপর ৬.৪° উত্তর ১৪.০° পূর্বে ( ভৌগোলিক অবস্থান) পাওয়া গেছে, এবং এটি আরিয়াডিয়াস গর্তের নামে নামকরন করা হয়েছে, যা চাঁদের পূর্ব দিকের শেষসীমা চিহ্নিত করে। এটি ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রৈখিক রিল মাত্র যা চাঁদের পরিধির মাত্র শতকরা ৩ ভাগ জুড়ে অবস্থিত।

বিজ্ঞানীরা মুসলিমদের তামাশার বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন

নাসার বিজ্ঞানীরা বলেছেন যে, চাঁদ দুই বা ততোধিক অংশে বিভক্ত হয়েছে এমন দাবির স্বপক্ষে কোন প্রমাণ অতীতে নেই। ২০১০ সালে, নাসা বিজ্ঞানী ব্র্যাড বেইলি মন্তব্য করেন, “আমার অনুরোধ, আপনি ইন্টারনেটে যা পড়ছেন তাই বিশ্বাস করবেন না। পিয়ার-রিভিউ কাগজপত্র সমূহ কেবল বৈজ্ঞানিকভাবে বৈধ তথ্যের উৎস। এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই যা বলে, অতীতে চাঁদ দুই (বা আরো) অংশে বিভক্ত হয়েছে পরে পুনরায় কোনো একসময়ে একত্রিত হয়েছে।” [৩]

তথ্যসূত্র সমূহ

১। Dr. Zaghloul El-Naggar, “The Moon Cleft Asunder”, Elnaggarzr.com, Archive.org capture dated October 26, 2007 (archived).
২। Mohamed Ali, “Crack on moon confirms Prophet Muhammad (S) had split it”, Jafariya News, March 22, 2008 (archived).
৩। Brad Bailey, “Evidence of the moon having been split in two”, NASA Lunar Science Institute, June 21, 2010 (archived).

অনুবাদক – মাহমুদুল হাসান
উইকি ইসলাম এর একটি লেখার ভাবানুবাদ

প্রাসঙ্গিক লেখা –
মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত কিছু মিথ এবং মিথ্যাচার
সুনিতা উইলিয়ামসকে নিয়ে মুসলিমদের জালিয়াতি

2 thoughts on “তথাকথিত চন্দ্র দ্বিখণ্ডনের ফটোগ্রাফিক জালিয়াতি

  • January 31, 2020 at 3:15 PM
    Permalink

    আসিফ ভাই,
    লেখাটা পড়ার থেকেও ভালো লাগে “আজকের ধর্ম বানী” ও “নিধার্মিকের ধর্মকথা” এই উদ্ধৃতিটুকু পরতে।
    ধন্যবাদ ভাই

    Reply
  • August 7, 2020 at 8:34 PM
    Permalink

    Apni Kuno Islamic Schoolar Der Sathe Debate Korun Like Sir Dr. Zarik Nayek, Br.Rahul, M.R. Azhari Tokhon Buja Jabe Apnar Dhowr Koto Dhur.Tader Sathe Face to Face Kotha Bolun Full World Ke Apnar Schoolar Dekhan.

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *