বৌদ্ধধর্ম- নাস্তিকতা নাকি আস্তিকতা? -২

বৌদ্ধধর্ম- নাস্তিকতা নাকি আস্তিকতা? শিরোনামে বৌদ্ধ ধর্মে সৃষ্টিকর্তা বিষয়ে ত্রিপিটকের আলোকে বিস্তারিত আলাপ করার চেষ্টা করেছি। বিভিন্ন দিক বিবেচনা পূর্বক বৌদ্ধ ধর্মের প্রবক্তা গৌতম বুদ্ধের একেশ্বরবাদ, বিভিন্ন দেবতা সর্ম্পকে আলোচনা করার চেষ্টা করেছি। দ্বিতীয় পর্ব লেখার উদ্দেশ্য না থাকলেও পরবর্তীতে লিখতে বাধ্য হলাম। এমতাবস্থায় অনেক বৌদ্ধ দাবি করেন যে, গৌতম বুদ্ধ সরাসরি কিছু বলেননি তার কারণ অনেক লেখক এই মত প্রকাশ করেন যে, গৌতম বুদ্ধ সৃষ্টিকর্তা বিষয়ে মৌন ছিলেন। ফলে অনেক তারা না জেনে বা যেকোন উদ্দেশ্যে বৌদ্ধ ধর্মকে সৃষ্টিকর্তা অমিমাংসিত বিষয় বলে দাবি করেন। আমার অনেক সমমনা বন্ধুও এ বিষয়ে জানতে আগ্রহী। কারণ বন্ধুগণ এত ব্যস্ততার মধ্যে আর কত লেখাপড়া করতে পারেন! প্রথম পর্বে ত্রিপিটক থেকে এত তথ্য দেওয়ার পরে অনেকে আমাকে মহাব্রহ্মাকে বুদ্ধের বন্ধু বা সেবক ইত্যাদি বলে পূর্বের মত দাবি করেন। আগের অবস্থানে তারা অটুট। সেটি যদি হয় তারা আসলে ত্রিপিটককে মানতে চাচ্ছেন না। কারণ বুদ্ধ নিজ মুখেই মহাব্রহ্মার পক্ষ থেকে সৃষ্টিকর্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আবারও ত্রিপিটক থেকে কিছু তথ্য দেয়ার পূর্বে কিছু বিষয় নিয়ে আগে আমাদের স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। সৃষ্টিঃ রচনা, নির্মাণ, উৎপাদন, উৎপত্তি, উৎপন্ন বস্তু, বিশ্ব, জগত ইত্যাদি। দেবতাঃ ঈশ্বর নিরাকার হলেও তিনি যেকোন রূপ ধারণ করতে পারেন। সীমাহীন তার গুণ। ঈশ্বর যখন নিজের গুণ বা ক্ষমতাকে আকার দান করেন তখন তাকে দেবতা বলে। বিভিন্ন নামে ব্যক্ত হলেও দেবতারা এক অব্যক্ত অদৃশ্য পরম ব্রহ্ম বা ঈশ্বরের ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ। সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে ত্রিপিটকে সরাসরি বুদ্ধ কিছু বলেছেন কি না তা লক্ষ্য করিঃ সঙ্গারব সূত্রে (১) এক প্রশ্নে সঙ্গারব মানব ভগবান বুদ্ধকে বললেন, “অহো! নিশ্চয় ভবৎ গৌতমের অস্তিত্ব প্রধান (অনন্যসাধারণ উদ্যম) ছিল। অহো! নিশ্চয় ভবৎ গৌতমের সৎপুরুষ প্রধান ছিল; যেরূপ অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধের থাকা সম্ভব। কেমন ভো গৌতম “উৎপত্তি দেবতা আছেন কি?”Buddhist Scripture(এখানে ভো শব্দের অর্থ হে, ওহে এবং ভবৎ শব্দের অর্থ প্রার্থণা ভিক্ষা) তাহলে এখানে সঙ্গারব বুদ্ধকে প্রার্থণা করে জিজ্ঞেস করলেন গৌতমের কোন সৎপুরুষ প্রধান ছিল কি না। উত্তরে গৌতম বুদ্ধ বললেন, “অবশ্যই ভারদ্বাজ! তাহা আমার বিদিত যে অধিদেব আছেন।” (বিদিত শব্দের অর্থ যা জানা গিয়েছে এমন, অবগত, জ্ঞান ইত্যাদি।) অর্থাৎ গৌতম বুদ্ধ এই বিষয়ে অবগত আছেন। তার পরে ভারদ্বাজ বললেন “কেমন ভো গৌতম! (উৎপত্তি) দেবতা আছেন কি? আবার গৌতম বুদ্ধ উত্তরে বললেন, অবশ্যই ইহা আমার বিদিত যে অধিদেব আছেন। পুণঃরায় ভারদ্বাজ বললেন, এরূপ অজ্ঞাত হলে ভো গৌতম! (আপনার কথন) কেন তুচ্ছ ও মিথ্যা হবে না?

গৌতম বুদ্ধ ভারদ্বাজকে প্রশ্নের মাধ্যম উত্তর দিলেন, দেবতা আছেন কী? এরূপ জিজ্ঞাসিত হয়ে দেবতা আছেন বলে যিনি বলেন, আর অবশ্যই বিদিত হয়ে ‘আমার বিদিত আছে ‍যিনি এরূপ বলেন; অতঃপর বিজ্ঞপুরুষের এক্ষেত্রে একান্তই নিষ্ঠাবান হওয়া উচিত যে, ‘দেবতা আছেন’।”
এক্ষেত্রে গৌতম স্বীকার করে নিলেন? কিন্তু পাঠকের প্রশ্ন কোন দেবতা? সেটি পরবর্তীতে গৌতম বুদ্ধ একদম স্পষ্ট করেন।
গৌতম বুদ্ধের উত্তরে ভারদ্বাজ বললেন “কেন, ভবৎ গৌতম! আপনি আমাকে প্রথমেই বর্ণনা করেন নাই?”
পুণঃরায় গৌতম বুদ্ধ বললেন, “ভারদ্বাজ! ইহা জগতে সুপ্রসিদ্ধ ও সর্বজন সম্মত যে “উৎপত্তি দেবতা আছেন।”
Buddhist Scripture
তাহলে এই সূত্রে ভগবান বুদ্ধ স্পষ্ট করে দিলেন উৎপত্তি দেবতা আছেন। উপরের দেবতার সংজ্ঞানুযায়ী উৎপত্তি দেবতাই হল সৃষ্টিকর্তা। এ বিষয়টি বৌদ্ধরা অস্বীকার করলে তা কি ত্রিপিটক বা বুদ্ধের অবমাননা নয়? যেখানে গৌতম বুদ্ধ সরাসরি স্পষ্ট করেছেন সৃষ্টিকর্তা বা উৎপত্তি দেবতা যা মহাব্রহ্মা নামে প্রথম পর্বে উপস্থাপন করেছি। তাহলে কীভাবে বৌদ্ধ ধর্ম নাস্তিক্য হতে পারে তার বিচার পাঠকেরাই করবেন।

রেফারেন্সঃ
(১) ত্রিপিটক, সূত্ত পিটকে মধ্যম নিকায়(২য় খন্ড) অনুবাদক পন্ডিত শ্রীমৎ ধর্ম্মাধার মহাস্থবির, মহাসঙ্গারব সূ্ত্র (৪৮৫ নং, পৃষ্ঠা নং ৩৪১)

লিখেছেনঃ Sina Ali

3 thoughts on “বৌদ্ধধর্ম- নাস্তিকতা নাকি আস্তিকতা? -২

  • June 14, 2020 at 7:43 PM
    Permalink

    আমার প্রশ্ন, গৌতম বুদ্ধই এই কথাগুলো বলেছেন তার প্রমাণ কী?? ত্রিপিটকে থাকলেই হয়ে গেল প্রমাণ??
    ,
    আরে ভাই যেখানে ত্রিপিটকই বহুবার পরিবর্তন হয়েছে সেখানে ত্রিপিটককে প্রমাণ হিসেবে কীভাবে নিতে পারেন আপনি??
    ,
    গৌতম বুদ্ধ নিজেও বলেছেন কোনো গ্রন্থকে অযৌক্তিকভাবে স্বতঃপ্রমাণিত স্বীকার না করতে।
    ,
    ত্রিপিটকে লেখা অযৌক্তিক অংশগুলো সংশোধন করা অসম্ভব কিছু নয়। কারণ এটাতো বুদ্ধেরই লেখা নয়।
    ,
    স্পষ্ট কথা, মহামতি গৌতম বুদ্ধ বলেছেন- গুরু বলেছে বলেই বিশ্বাস করতে হবে এমন কোন কথা নেই, জাতি বলেছে বলেই বিশ্বাস করতে হবে তাও নয়, শাস্ত্রে আছে বলেই মেনে নিতে হবে এমন নয়, আগে বোধগম্য কিনা দেখো, পরীক্ষণ চালাও, গ্রহণীয় হলে গ্রহণ করো যেটা বাস্তবিক কল্যাণকর ও শ্রদ্ধার।
    ,
    আপনি নিশ্চয়ই এ কথাটা এখানে বিস্তারিত দেখেছেন,কেসমুত্তিসুত্ত,অঙ্গুত্তর শিখায়, সূত্র পিটক।
    ,
    এজন্য আমরা এসব হালকা যুক্তি গ্রহণ করিনা।আমিও যুক্তিতে বিশ্বাস করি।
    ,
    বৌদ্ধ মতবাদ নিয়ে ব্লগে লিখতে কমপক্ষে পঞ্চাশ টা বই পড়ুন এবং আরো গভীর ভাবে গবেষণা করুন। আমার পছন্দের লেখক রাহুল সংকৃত্যায়ন।

    Reply
  • August 28, 2020 at 1:49 AM
    Permalink

    বৌদ্ধ ধর্ম আস্তিক নয় নাস্তিকও নয়, ঠিক তার মাঝামাঝি। বৌদ্ধ ধর্মে অন্ধ বিশ্বাস করা মুল্যহীন। বৌদ্ধ ধর্মে দেবতা আছে বলা হয়েছে, বৌদ্ধ ধর্মে পুনঃ জন্ম আছে বিশ্বাস করে। বুদ্ধের অতীত জীবনের জাতক গুলোই তার সাক্ষী। আধুনিক বিজ্ঞান পূণঃ জন্ম নিয়ে গবেষনা করছে। তার কিছু ডকুমেন্টও আমরা পায়, যেমন- https://www.youtube.com/watch?v=6Ics8sRNwKI বা reflections-on-life-after-life ইত্যাদি।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *