নাস্তিকের লাশের সৎকার কীভাবে হবে?

ভূমিকা

নাস্তিকের মৃত্যুর পরে তার লাশ নিয়ে কি করা হবে তা নিয়ে মুমিনগনের চিন্তার শেষ নেই। একজন প্রশ্ন করলো, “ভাই, ধর্ম মানেন না ঠিক আছে, মৃত্যু তো মানেন। মানে মরবেন তো, নাকি? কোরআনে তো মৃত্যুর কথা বলা আছে, তাইলে নাস্তিকরা মরে ক্যান?”

-হ্যা ভাই, ‘নাস্তিকরা’ও মারা যায়। কথা শুনে মনে হচ্ছে, অন্যান্য সকল বিষয়ের মত মৃত্যুও মুমিন ধার্মিকগনের বাপদাদার আবিষ্কৃত বিষয়।

এই প্রশ্নের জবাবে আপনাদের সদয় অবগতির জন্য জানাচ্ছি যে, ইসলাম বা কোরান নাজিল হবার বহু পুর্বেও মানুষ মারা যেত, এবং দুনিয়াতে কোরান বা ইসলামের নামগন্ধ না থাকলেও মানুষ মারা যাবে।এমন নয় যে কোরানে ব্যাপারটা আল্লাপাক বলার পরেই মানুষ টপাটপ মরতে শুরু করলো, এর আগে সব মানুষ বেশ বেঁচে বর্তে খেয়ে দেয়ে আমোদফুর্তি করে যাচ্ছিল।

এমনকি মানুষ আসার আগেও প্রানীকুল মারা যেত, আবার নতুন প্রানের জন্ম হতো। মৃত্যু কোরআন বা ইসলামের আবিষ্কার নয়, অন্য কোন ধর্মেরও আবিষ্কার নয়। এটা অন্যান্য প্রাকৃতিক সুত্রের মতই বৈজ্ঞানিক সত্য। মানুষ মারা যাবে, প্রকৃতির ছেলে প্রকৃতির কাছে ফিরে যাবে। তাই মৃত্যু ঘটা মানে কোরআনের বানী সত্য হওয়া বলে ধরে নেয়া যাবে না। বরঞ্চ কোরআনই প্রকৃতির সুত্রকে মেনে নিয়েছে। বহুযুগ ধরে মানুষ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জেনেছে, জীবের মৃত্যু ঘটে। সেই কথাটিই কোরআনে এসেছে। কোরআন নতুন কিছু বলে নি, যা আগে মানুষ জানতো না। এপর্যন্ত কোন নবী রাসুল পয়গম্বর আল্লার বান্দা আল্লার তেলেসমাতি কুদরতে প্রকৃতির এই সুত্রকে কলা দেখিয়ে বেঁচে নেই। আল্লাহ যদি এরকম ঘটিয়ে দেখাতো, তাহলে বোঝা যেতো, আল্লাহ প্রাকৃতিক সূত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। উলতে দিতে পারে। মানে, আল্লাহ প্রকৃতির চাইতেও ক্ষমতাবান। কিন্তু তা তো দেখানো হয় নি। আগেই মানুষ যা জানতো, সেই কথাটিই বলে ক্রেডিট নেয়ার চেষ্টা করেছে।

ধরুন, আমি যদি বলি, তুমি ঘুমালে চোখে দেখবে না। এই কথাটি এমন কোন নতুন কথা নয় যে, আগে মানুষ জানতো না, আমি বলার পরেই সবাই জানলো! যদি আমি এমন কাউকে দেখাতে পারতাম, যিনি ঘুমিয়েও চোখে দেখেন, সেটি হতো অস্বাভাবিক দাবী।

লাশ কবর দেয়া কি ইসলামের আবিষ্কার?

লাশ কবর দেয়া ইসলামের আবিষ্কার নয়। কারণ মুহাম্মদের কাছে ইসলাম আসার বহু আগে থেকেই লাশ কবরে দেয়ার প্রথা প্রচলিত ছিল। সেই প্রাচীন কাল থেকেই লাশ কবরে দেয়া, পানিতে ভাসিয়ে দেয়া কিংবা আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার প্রথাগুলো সমাজে মানুষ করে এসেছে। সেই সাথে, প্রিয়জনের লাশের কাছে মৃত ব্যক্তির প্রিয় কোন পোশাক, প্রিয় কোন খাবার, বা গয়না, বা অস্ত্র, এগুলো প্রাচীন কাল থেকেই মানুষ রেখে আসতো। Taforalt হচ্ছে সবচাইতে প্রাচীনতম কবরস্থান। সেই গুহাযুগের মানুষও মৃতদেহ দূরে কোথাও রেখে আসতো। এছাড়াও অনেক প্রানীর মধ্যেও এই ধরণের প্রথা লক্ষ্য করা যায়। তারা তাদের বন্ধু, আত্মীয় স্বজন বা প্রিয়জনের মৃত্যুতে শোক পালন করে, এবং লাশটিকে বিদায় জানায়। আফ্রিকান হাতিদের মধ্যে এটি স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। [1]

রোনাল্ড কে. সিগল লিখেছেন: “যখন মৃত হাতিদের সৎকারের বিষয়টি আসে, হাতিরা প্রায়ই তাদেরকে কাঁদা, মাটি ও পাতা দিয়ে সমাধিস্থ করে। হাতিরা হাতি ছাড়াও গণ্ডার, মহিষ, গরু, বাছুর এবং এমনকি মানুষকেও এভাবে সমাধিস্থ করে। হাতিদেরকে প্রচুর পরিমাণে ফল, ফুল এবং রঙ্গিন পাতা দিয়েও মৃতদেহকে সৎকার করতে দেখা গেছে।”[2]

শিম্পাঞ্জীদের মধ্যেও নিজেদের দলের কোন সদস্যের মৃত্যুতে প্রথাগত আচরণ করতে দেখা যায়। এই আচরণগুলো শুরু হয় দলের বা কোন সদস্যের নীরবতার মধ্য দিয়ে। তারা চুপ করে থেকে মৃতকে শ্রদ্ধা জানায়। আবার কিছু হাতি নির্দিষ্ট কিছু শব্দ উচ্চারণ করে। এরপর এরা মৃতদেহকে সজ্জিত করে, এরপর একে একে পবিত্রতার সহিত মৃতদেহকে দেখতে আসে, এবং মৃতদেহের দিকে তাকায়। এরা মৃতের প্রতি শোক প্রদর্শন করে, এবং এদের মধ্যে দুঃখের গোঙ্গানির স্বর শোনা যায়। [3]

হাতি ও শিম্পাঞ্জি ছাড়াও ডলফিনদেরকেও মৃতের প্রতি আলাদাভাবে মনোযোগী হতে দেখা গিয়েছে। ডলফিনকে কয়েকদিন যাবৎ মৃত সদস্যের সাথে থাকতে দেখা যায়, আর ডুবুরীদের কাছাকাছি আসতে তারা বাধা দেয়। [4]

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলাম আবির্ভাবের পূর্বে মুহাম্মদের পিতামাতার লাশ দিয়ে কী করা হয়েছিল? মুহাম্মদের নিজেরই হাদিস রয়েছে যে, তার পিতামাতা হচ্ছে জাহান্নামী। হাদিস থেকে জানা যায়ঃ

গ্রন্থের নামঃ সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
হাদিস নম্বরঃ [394]
অধ্যায়ঃ ১/ কিতাবুল ঈমান
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ৮২. কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী জাহান্নামী; সে কোন শাফায়াত পাবে না এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী বান্দার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্কও তার উপকারে আসবে না
৩৯৪। আবূ বকর ইবনু আবূ শায়বা (রহঃ) … আনাস (রাঃ) থেকে বর্নিত। জনৈক ব্যাক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসুল! আমার পিতা কোথায় আছেন (জান্নাতে না জাহান্নামে)? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ জাহান্নামে। বর্ণনাকারী বলেন, লোকটি যখন পিছনে ফিরে যাচ্ছিল, তখন তিনি ডাকলেন এবং বললেনঃ আমার পিতা এবং তোমার পিতা জাহান্নামে।”
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

গ্রন্থের নামঃ সুনানে ইবনে মাজাহ
হাদিস নম্বরঃ [1572]
অধ্যায়ঃ ৬/ জানাযা
পাবলিশারঃ তাওহীদ পাবলিকেশন
পরিচ্ছদঃ ৬/৪৮. মুশরিকদের কবর যিয়ারত।
১/১৫৭২। আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করেন। তিনি কান্নাকাটি করেন এবং তাঁর সাথের লোকেদেরও কাঁদান। অতঃপর তিনি বলেন : আমি আমার রবের নিকট তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অনুমতি দেননি। আমি আমার রবের নিকট তার কবর যিয়ারতের অনুমতি চাইলে তিনি আমাকে অনুমতি দেন। অতএব তোমরা কবর যিয়ারত করো। কেননা তা তোমাদের মৃত্যু স্মরণ করিয়ে দেয়।
মুসলিম ৯৭৬ ;নাসায়ী ২০৩৪; আবূ দাউদ ৩২৩৪; আহমাদ ৯৩৯৫ ইরওয়াহ ৭৭২। তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

গ্রন্থঃ সূনান নাসাঈ (ইফাঃ)
অধ্যায়ঃ ২১/ জানাজা
হাদিস নম্বরঃ [2038]
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ১০১/ মুশরিকের কবর যিয়ারত করা
২০৩৮। কুতায়বা (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্নিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার মাতার কবর যিয়ারত করার সময় ক্রন্দন করলেন, তার আশ পাশের সবাইও ক্রন্দন করলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি আম্মার মাগাফিরাতের অনুমতি চাইলাম কিন্তু আমাকে তার অনুমতি প্রদান করা হল না। অতঃপর তার কবর যিয়ারতের অনুমতি চাইলে তার অনুমতি দেওয়া হয়। তাই তোমরা কবর যিয়ারত কর, কেননা তা তোমাদের মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
[সহীহ। ইবন মাজাহ ১৫৭২, ইরউয়াউল গালীল ৭৭২]
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বেও পৌত্তলিকদের লাশ কবর দেয়া হতো। মুহাম্মদের মায়ের কবরও ছিল। তার মানে, কবর দেয়া কণ ইসলামের আবিষ্কৃত প্রথা নয়। সেই সময়ের আরবে যা প্রচলিত ছিল, মুহাম্মদ সেই প্রথাকেই নিজ ধর্মে গ্রহণ করেছেন।

কিন্তু নাস্তিকের লাশ নিয়ে কি করা যেতে পারে?

মহাজ্ঞানী ডায়োজিনিসের কাছে একবার কিছু লোক গেল, গিয়ে বললো, “বেটা অপদার্থ, মূর্খ, তুই তো দেব দেবী মানিস না। তো মৃত্যুর পরে তোর লাশ তো শিয়াল শকুনে ছিড়ে খাবে।কেউ তো তোর লাশ পোড়াবেও না, মাটিও দেবে না।”

ডায়োজিনিস বললেন, “তো এক কাজ করো। মারা যাবার সময় আমার লাশের পাশে একটা লাঠি রেখে যেও। লাঠি দিয়ে শিয়াল শকুন তাড়ানো যাবে।”

লোকজন বললো, “আরে বেটা নাস্তিক আহাম্মক, অবিশ্বাসী উল্লুক, মারা যাবার পরে কি তোর হুশ থাকবে? তুই শিয়াল শকুন তাড়াবি ক্যামনে?”

ডায়োজিনিস বললেন, “যদি হুশই না থাকে, চেতনাই না থাকে, তাহলে শিয়ালে খাইলে কি আর শকুনে খাইলেই কিরে বেটা? পোড়াইলেই কি আর মাটি চাপা দিলেই কি? যেহেতু টেরই পামু না, এসবে কি আসে যায়?”

হ্যা, নাস্তিকের লাশ নিয়ে মুমিনগন যতটা চিন্তিত, স্বয়ং নাস্তিকগনও এতটা চিন্তিত নয়।

কি আসে যায়?

এই মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাবার সাথে সাথেই আর কিছু নাই। সমস্ত স্মৃতি, এই জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতা সেখানেই শেষ। আর মস্তিষ্কে পচন ধরার সাথে সাথেই পুনরায় বেঁচে ওঠার সমস্ত আকাংখারও সমাপ্তি। কষ্টকর হলেও সত্য মেনে নেয়াটাই সাহসী মানুষের কাজ।

তবে হ্যা, ব্যাক্তিগতভাবে ইচ্ছাপোষন করি, মৃত্যুর পরে এই শরীরটা কাজে লাগুক। লাশটা আমি দান করে যাবো মেডিকেল কলেজে। সেখানে ছাত্রছাত্রীরা আমার লাশ কেটে অভিজ্ঞ হবে, নিখুঁতভাবে অস্ত্রপাচারের কৌশল শিখবে।

শুধু লাশই না, এই চোখ, এবং শরীরের যাবতীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, যাই কাজে লাগে, অন্য মানুষের উপকার হয়, দান করে যাবো। শরীরটা নিয়ে কবরে গিয়ে হুর ছোহবতের অশ্লীল স্বপ্নের চাইতে এটা অবশ্যই ভাল মনে করি। হয়তো চোখ ছাড়া কবরে বা স্বর্গে হুরগনের অপরুপ সৌন্দর্য্য, উন্নতবক্ষ আর নিখুঁত নিতম্ব দেখতে পাবো না, বেহেশতেও ঢুকতে পারবো না, কিন্তু সেই চোখ দিয়ে কেউ না কেউ এই পৃথিবী দেখবে, এর চাইতে আনন্দের মৃত্যু আর কি হতে পারে?

আপনিও যদি আপনার শরীরকে দান করতে চান, আপনার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ কাউকে দিয়ে যেতে চান, মৃত্যুর মধ্য দিয়ে অমরত্ব পেতে চান, এই লেখাটি পড়ুন

তথ্যসূত্রঃ
  1. Bekoff M (2009). “Grief in Animals” Psychology Today, October []
  2. Siegel RK (1980). “The Psychology of Life After Death” American Psychologist, Vol. 35(10), October pp.911-931 []
  3. Harrod, James B. (২০১৪)। “The Case for Chimpanzee Religion”। Journal for the Study of Religion, Natural and Culture8 (1): 16–25। []
  4. Ritter F (2007). “Behaviour Responses of Rough-toothed Dolphins to a Dead Newborn Calf” Marine Mammal Science April pp.429-433 []

One thought on “নাস্তিকের লাশের সৎকার কীভাবে হবে?

  • June 11, 2020 at 12:47 AM
    Permalink

    আপনার বেশ কয়েকটা লেখা পড়লাম। আপনার লেখাগুলো পড়ে একটা প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করতেছে। ইসলাম কি মুহাম্মদ(সঃ) এর আবির্ভাব থেকে শুরু হয়েছে নাকি রাসুল (সঃ) এর আবির্ভাবের অনেক আগে থেকেই ইসলামের এক্সাত্রা শুরু?
    মানুষকে বোকা বানানোর জন্য আর কত মিস-ইনফরনেশন দেবেন, বলতে পারেন?
    পৃথিবীতে আসছেন। পারলে ভালো কিছু করেন, আর না পারলে খারাপ করেন কেন??

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *