বনু কুরাইজার গণহত্যা

ভূমিকা

মানব ইতিহাসে সবচাইতে ভয়াবহ অভিশাপ হচ্ছে যুদ্ধ, গণহত্যা, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতা এবং বিধর্মী বা অন্য জাতির মানুষকে দাসে পরিণত করে তাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেয়ার ভয়াবহ অমানবিক প্রথা। যুগে যুগে কোটি কোটি মানুষকে এই নির্মম গণহত্যার শিকার হতে হয়েছে। ধর্ষিত হওয়া কিংবা কারো দাস হিসেবে বেঁচে থাকা যে কী ভয়াবহ ব্যাপার, তা হয়তো আমরা আধুনিক সভ্য সমাজে বসবাস করে অনেকেই অনুধাবন করতে পারবো না। কিন্তু নির্মম সত্য হচ্ছে, মানব সভ্যতার ইতিহাস তৈরি হয়েছে এগুলোর ওপর ভিত্তি করেই। মন্দের ভাল ব্যাপার হচ্ছে, আমরা সেগুলো অনেকটাই পেছনে ফেলে এসেছি। এখন আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য শান্তিপূর্ণ একটি পৃথিবী কামনা করি। তাই আধুনিক মানবিক মানুষ মাত্রই যুদ্ধ বিরোধী, গণহত্যা কিংবা যুদ্ধবন্দীদের দাস বানানো, ধর্ষণ কিংবা যেকোন ধরণের যুদ্ধাপরাধের বিরোধী। আমাদের এখন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ রয়েছে, জেনেভা কনভেনশন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক চুক্তি দ্বারা আমরা যুদ্ধের সময় যেন যুদ্ধরত পক্ষগুলো বিপক্ষের মানুষের সাথে মানবিক আচরণ করে, তার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পারি। সবসময় যে তা সম্ভব হয় তা নয়, এখনো অনেক দেশেই যুদ্ধে পরাজিত সৈন্য এবং জনগণকে নির্যাতন করা হয়। কিন্তু আমরা সেগুলো বন্ধ করার জন্য এবং নির্যাতনকারী গোষ্ঠীগুলোকে বিচারের সম্মুখীন করার জন্য আন্দোলন করতে পারি। যে কারণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের আমরা বিচার করতে পেরেছি, বাঙলাদেশে পাক আর্মি এবং রাজাকার আলবদরদেরও আমরা বিচারের সম্মুখীন করতে পেরেছি। তারপরেও অনেক সময় আমরা অপরাধীদের বিচারের সম্মুখীন করতে পারি নি, কিন্তু সেটি কোন অবস্থাতেই অন্য কোন অপরাধের জাস্টিফিকেশন হতে পারে না। আমরা এভাবে বলতে পারি না যে, অমুক দেশে যুদ্ধবন্দীদের রেইপ করা হয়েছে, গণহত্যা চালানো হয়েছে, তাই আরেকটি যুদ্ধে যুদ্ধবন্দীদের রেইপ করা বা গণহত্যা চালানো জাস্টিফায়েড!

সেই যুদ্ধ যদি ধর্মীয় কারণে হয়, তাহলে সেটির ভয়াবহতা আরো বৃদ্ধি পায়। কারণ স্বাভাবিকভাবেই কাউকে হত্যা করলে মানুষের ভেতরে অপরাধবোধের সৃষ্টি হয়। কিন্তু ধর্মীয় কারণে মানুষ হত্যা করলে কারো মনে সেই অনুশোচনাটি সৃষ্টি হয় না, বরঞ্চ সেই কাজের জন্য সে গর্বিত হয়। বিধর্মীর গলা কাটলে আমার ঈশ্বর খুশি হবে, আমার ঈশ্বর আমার কাছে চাইছে যে, আমি যেন বিধর্মীকে জবাই করি, এর বিনিময়ে আমাকে স্বর্গ দেবে, স্বর্গে উঁচু স্তন্যের হুর দেবে, গেলমান আর মদ দেবে, এগুলো মানুষকে বিধর্মী হত্যার অনুপ্রেরণা দেয়, তাদের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে এবং মানুষে মানুষে ভেদাভেদ বৃদ্ধি করে। ধর্মীয় অনুপ্রেরণা মানুষ হত্যার নৈতিক ভিত্তি তৈরি করলে মানুষকে আর সে কাজটি করতে বাধা দেয়া যায় না। সে মনে করে, এই কাজটিই ভাল, যেহেতু এটিই ঈশ্বরের নির্দেশ।

বাঙলাদেশের মুক্তমনা নাস্তিক, সংশয়বাদী, অজ্ঞেয়বাদীদের একটি অভিযোগ বরাবরই শোনা যায়, সেটি হচ্ছে, ইহুদী গোত্রগুলোর ওপর নবী মুহাম্মদের বেশ কয়েকটি ভয়াবহ গণহত্যা, এথনিক ক্লিনজিং, আত্মসমর্পন করা গোত্রগুলোর অপ্রাপ্তবয়ষ্ক শিশুদের ক্রিতদাসে পরিণত করা, তাদের ক্রিতদাস হিসেবে বাজারে বিক্রি করা, নারীদের গনিমতের মাল হিসেবে তাদের ধর্ষণ করা, যৌনদাসীতে পরিণত করা, তাদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা, জমিজমা দখল করা ইত্যাদি। নবী মুহাম্মদের মদিনার প্রাথমিক সময়ে ইহুদিদের সাথে সুসম্পর্ক থাকলেও পরবর্তীতে নবী মুহাম্মদের সাথে তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। নবী মুহাম্মদ মদিনায় হিজরতের সময় বেশ আশা নিয়েই ছিলেন যে, ইহুদিরা তার নতুন ধর্মকে গ্রহণ করবে এবং দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করবে। ইহুদিদের কাছ থেকে আশানরুপ সাড়া না পাওয়ায় তিনি ইহুদিদের প্রতি ক্ষুব্ধ হওয়া শুরু করেন, যার ফলশ্রুতিতে এই সমস্যাগুলোর উদ্ভব ঘটে। এইসব কারণে বর্তমান সময় পর্যন্ত ইসলামের ভেতর ইহুদিদের প্রতি বিদ্বেষের একটি মনোভাব পরিলক্ষিত হয়। কিছু হলেই বলতে শোনা যায়, এগুলো ইহুদিদের ষড়যন্ত্র। বর্তমান সময়ের মুসলিম জনগোষ্ঠী সবকিছুতেই ইহুদিদের ষড়যন্ত্র খুঁজে পায়, যা তাদের এক মানসিক বিকারে পরিণত হয়েছে। নিজেদের অক্ষমতা ঢাকতে কিছু হলেই ইহুদিদের ওপর দায় চাপিয়ে দেয়ার এই মানসিকতা অত্যন্ত লজ্জাজনক।

তবে সেই সাথে এটি স্বীকার করাও জরুরি যে, ইসলামি খিলাফতের সময় ইহুদিরা মুসলিমদের সাথে মুসলিমদের শাসনে অপেক্ষাকৃত স্বাধীন এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনই পেয়েছে, যা খ্রিষ্টান শাসনের সময় ইহুদিরা পায় নি। খ্রিষ্টানদের দ্বারা ইহুদিরা যুগে যুগে আরো অনেক বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছে, সেই সবের তুলনায় ইসলামি শাসনামল ইহুদিদের জন্য অপেক্ষাকৃত ভাল ছিল। সেই নিয়ে আরেকদিন আলোচনা করা যাবে। আজকের আলোচনা শুধুমাত্র নবী মুহাম্মদের শাসনামল নিয়ে।

গণহত্যা ও জাতিগত নির্মূল

যুদ্ধ

যুদ্ধ কাকে বলে? যুদ্ধ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় বা অরাষ্ট্রীয় পক্ষগুলোর মধ্যে সুসংগঠিত এবং কখনও কখনও দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংঘর্ষ। কোন পক্ষ একতরফাভাবে সশস্ত্র আক্রমণাত্মক কার্যকলাপ চালিয়ে গেলে এবং তার প্রত্যুত্তরে অপর পক্ষ কোন পদক্ষেপ না নিলে তাকে যুদ্ধ বলা যায় না। সেই হিসেবে, বনু কুরাইজা গোত্রের ওপর নবী মুহাম্মদের সেনাবাহিনীর অবরোধ এবং আত্মসমর্পনে বাধ্য করা সরাসরি যুদ্ধ নামে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। বরঞ্চ, আক্রমন হিসেবেই সংজ্ঞায়িত করা যায়।

জেনোসাইড বা গণহত্যা

গণহত্যা বলতে নির্দিষ্ট একটি ভূখণ্ডে বা ভৌগোলিক অংশে কোন জাতি, বর্ণ, নাগরিকত্ব বা ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে একযোগে বা অপেক্ষাকৃত অল্প সময়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ হত্যা করাকে বোঝায়। এফবিআই এর মতে গণহত্যা হল সেই হত্যাকান্ড যখন কোন একটা ঘটনায় চার বা তার অধিক সংখ্যক মানুষ মারা যায় এবং হত্যাকান্ডের মাঝে কোন বিরতি থাকে না। গণহত্যা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট স্থানে ঘটে, যেখানে এক বা একাধিক মানুষ অধিকাংশ সময় উপরে বর্ণিত কারণ বশত অন্যদের মেরে ফেলে।

Genocide is intentional action to destroy a people (usually defined as an ethnic, national, racial, or religious group) in whole or in part.

The United Nations Genocide Convention, which was established in 1948, defines genocide as “acts committed with intent to destroy, in whole or in part, a national, ethnic, racial or religious group, as such” including the killing of its members, causing serious bodily or mental harm to members of the group, deliberately imposing living conditions that seek to “bring about its physical destruction in whole or in part”, preventing births, or forcibly transferring children out of the group to another group. [1] [2] [3]

কোন কোন ক্ষেত্রে গণহত্যাটি হয় সেনাপ্রধানের নির্দেশে, কোন কোন ক্ষেত্রে বিচারের নামে প্রহসন করে কোন গোত্র বা জনগোষ্ঠীর সবাইকে ঢালাওভাবে কোন শাস্তি দিয়ে হত্যা করা হয়, কোন কোন ক্ষেত্রে আবার কোন ধরণের দোষারোপ করে তাদের গণহারে মেরে ফেলা হয়। আবার কখনো কখনো জবরদস্তিমূলক ধর্মান্তকরণের চেষ্টা করা হয়, সেটি করা না গেলে তাদের হত্যা করে ফেলা হয়। এগুলো সবই বিভিন্ন গণহত্যার উদাহরণ।

জাতিগত নিধন বা ‘এথনিক ক্লিনজিং’

ধর্মীয় বা জাতিগত কারণে কোনো অঞ্চলে একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী বা জাতি অন্য একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী বা জাতিকে অযাচিত মনে করতে পারে। এক ধর্ম বা জাতির মানুষ মনে করতে পারে, এই ভূমির ওপর শুধুমাত্র এবং কেবলমাত্র তাদেরই অধিকার (প্রায়শই সেই অধিকার ইশ্বরের দেয়া বলে দাবী করা হয়ে থাকে) , এবং বহু বছর ধরে বসবাস করা অন্যান্য ধর্ম বা জাতিগোষ্ঠীকে তারা উচ্ছেদ করতে পারে কিংবা তাদের ওপর নিধনযজ্ঞ চালাতে পারে। ধর্ম বা জাতিগত পার্থক্যের জন্য একটি জনগোষ্ঠী বা গোত্রকে সম্পূর্ণরূপে উচ্ছেদ করাকে জাতিগত নিধন বা ‘এথনিক ক্লিনজিং’ বলা হয়।

Ethnic cleansing is the systematic forced removal of ethnic, racial and/or religious groups from a given territory by a more powerful ethnic group, often with the intent of making it ethnically homogeneous. [4] The forces which may be applied may be various forms of forced migration (deportation, population transfer), intimidation, as well as genocide and genocidal rape.

যুদ্ধাপরাধ

এবারে যুদ্ধাপরাধ কাকে বলে তা আমাদের জেনে নিতে হবে। যুদ্ধাপরাধ হচ্ছে, কোন যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাত চলাকালীন সময়ে কোন ব্যক্তি কর্তৃক বেসরকারী জনগণের বিরুদ্ধে সংগঠিত, সমর্থিত নির্দিষ্ট সংজ্ঞায়িত অপরাধমূলক কর্মকান্ডসমূহ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুসারে যুদ্ধকালিন সংঘাতের সময় বেসরকারী জনগণকে খুন, তাদের ওপর লুন্ঠন, ধর্ষণ, কারাগারে অন্তরীন ব্যক্তিকে হত্যা, এগুলো সবই যুদ্ধাপরাধের অন্তর্ভূক্ত। সেই সাথে হাসপাতাল, উপাসনালয় ইত্যাদিকে ধ্বংস করাকেও যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়।

যুদ্ধাপরাধকে জায়েজ করার জন্য যুদ্ধাপরাধীগণ প্রায়শই কিছু কৌশলী কথাবার্তা বলে থাকেন। যেমন, যুদ্ধাপরাধী গোষ্ঠী বেসামরিক শিশু কিশোরদের হত্যাকে জায়েজ করার জন্য বলে থাকে যে, শিশুকিশোরদের হত্যা না করলে বড় হয়ে তারা যুদ্ধ করতো, বা সন্ত্রাসী হতো। অথবা, নির্যাতিত গোষ্ঠীকে তারা সন্ত্রাসী বা জঙ্গি হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করে। অনেক সময় নারীদের হত্যা করার কারণ হিসেবে তারা বলে, এই নারীদের হত্যা না করলে এই নারীরা পরবর্তীতে জঙ্গি সন্তান জন্ম দিতো, এই ধরণের নানা নোংরা এবং বাজে কথা। সাধারণত যুদ্ধাপরাধকে জায়েজ করতে তারা এসব অত্যন্ত বর্বর এবং অমানবিক কথা বলে থাকে। কিছু উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

১) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান নাৎসি বাহিনী ইহুদীদের ওপর ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে নৃশংস নির্যাতন এবং গণহত্যা চালায়। ইতিহাসে এই গণহত্যাকে হলোকাস্ট বলে। ইহুদিদেরকে ঐসময় নানাভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, তাদের ওপর অনেক কিছুর দায় চাপানো হয়। এমনও বলা হয় যে, শিশু ইহুদিরা বড় হয়ে বিশ্বাসঘাতক হবে, তাই তাদের মেরে ফেলাই উত্তম।
২) ১ম বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯১৫ সালে রুশ ককেসাস সেনাবাহিনী পূর্ব আনাতোলিয়ায় অগ্রসর অব্যাহত রাখলে, তুরস্কের তৎকালীন উসমানীয় সরকার স্থানীয় জাতিগত আর্মেনীয়দের স্থানান্তর এবং উচ্ছেদ শুরু করে। ফলশ্রুতিতে প্রায় ১৫ লক্ষের মত আর্মেনীয় মৃত্যুবরণ করেছিল যা আর্মেনীয় গণহত্যা বলে পরিচিত। সে সময় তারা নারী, শিশু ও বয়স্ক লোকজনদেরকে পাঠিয়ে দেয় মরুভূমিতে, যেখানে তারা পরে মারা যান।
৩) ১৯৭১ এ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমানে বাংলাদেশে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাথে গাদ্দারির অভিযোগে অভিযুক্ত করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নৃশংস গণহত্যা চালায়। ধারণা করা হয়, এই গণহত্যায় প্রায় ৩০ লক্ষ বাঙালি হত্যা করা হয়েছিল।

উপরের যেই তিনটি উদাহরণ দিলাম, এই তিনটি ইতিহাসে অন্যতম বড় তিনটি গণহত্যা। এর সাথে আরও বড় গণহত্যার লিস্ট করা যেতে পারে, যেমন ইউরোপীয়দের আমেরিকা যাওয়ার পরে সেখানে কোটি কোটি নেটিভ আমেরিকানদের ওপর শত শত বছর ধরে চলা নৃশংস গণহত্যা এবং উচ্ছেদ। বা এখনকার মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর চলা নৃশংস গণহত্যা। লক্ষ্য করার বিষয় হচ্ছে, প্রতিটি গণহত্যার সময়ই গণহত্যাকারীরা নানাধরণের প্রেক্ষাপট, পরিপ্রেক্ষিত, ইতিহাস বিকৃতি এবং মিথ্যাচারের অভিযোগ আনে।

পরিপ্রেক্ষিত

আশাকরি কাকে গণহত্যা বলে, কাকে যুদ্ধাপরাধ বলে, কাকে যুদ্ধ বলে সেই বিষয়গুলো এখন পরিষ্কার।

জেনেভা কনভেনশন কাকে বলে

১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা নগরীতে একটি সভা বসে। এরপর ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ৪টি সভা হয়। বর্তমানে জেনেভা কনভেনশন বলতে বুঝায় এই চারটি সভায় গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহের সম্মিলিত রূপ। অবাক বিষয় হচ্ছে, মহাবিশ্বের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী এবং অসীম দয়ালু আল্লাহ পাক এবং তার নবী দুইজন মিলেও, মানবিক মানুষের তৈরি করা এই জেনেভা কনভেনশনের খুব সাধারণ শর্তগুলো পূরণ করতে সক্ষম হন নি। তাহলে, আধুনিক মানবিক মানুষের মানবিক বোধ তো আল্লাহর চাইতেও বেশি বলেই মেনে নিতে হয়। অনেকেই বলতে পারেন, সেই সময়ে এরকমই পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু আল্লাহ পাক তো সময় বা স্থান দ্বারা সীমাবদ্ধ নন। উনি সময় ও স্থান কালের উর্ধ্বে। হয়তো সেই সময়ের আরবের বর্বর মানুষ মানবিকতার কিছুই জানতো না, সেই কারণে তারা অনেক আজেবাজে কাজই করেছে। কিন্তু আল্লাহ পাকের তো সেই সীমাবদ্ধতা ছিল না। তিনিও কেন এগুলো তার নবীকে করতে বললেন? পাঠকগণ জেনেভা কনভেনশনের কিছু ধারা পড়ে দেখুন-

  • প্রথম জেনেভা কনভেনশন, ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দ। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত, যুদ্ধবন্দী, রোগাক্রান্ত সৈন্যদের জীবনের নিরাপত্তা এবং শারীরিক অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে প্রথম জেনেভা কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়।
  • দ্বিতীয় জেনেভা কনভেনশন, ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দ। সমুদ্রস্থ যুদ্ধক্ষেত্রে আহত, রোগাক্রান্ত সৈন্যদের জীবনের নিরাপত্তা এবং শারীরিক অবস্থার উন্নতির লক্ষ্যে ২য় জেনেভা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
  • তৃতীয় জেনেভা কনভেনশন, ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দ। যুদ্ধবন্দীদের চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে ৩য় জেনেভা কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন ১৯৪৯ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ১২ আগষ্ট।
  • চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনে যুদ্ধকালীন বেসামরিক জনগণকে রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনক্রমে ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে জেনেভা কনভেনশন কার্যকর হয়। এ কনভেনশন পূর্ববর্তী তিনটি কনভেনশনের সংশোধিত রূপ।

জেনেভা কনভেনশনের উল্লেখযোগ্য দিকসমূহ হচ্ছে,

পার্ট-১ : জেনারেল প্রোভিশান্স

  1. প্রথম অংশে জেনেভা কনভেনশনের সামগ্রিক গঠনপ্রণালী তথা আওতা বর্ণনা করা হয়েছে।
  2. ধারা ২ এ ধারায় বলা হয়েছে, স্বাক্ষরভূক্ত দেশ সমূহ এ কনভেনশন দ্বারা বাধ্য হয়েছে যে যুদ্ধকালীন এবং অস্ত্র সংঘাতের সময় যেখানে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, এমনকি অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অবস্থান কালীন সময় জেনেভা কনভেনশনকে মেনে নেবে।
  3. ধারা ৩ বলা হয়েছে, যখন কোনো সংঘর্ষ আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে স্বীকৃত হবে না, তখন প্রত্যেকটি দলের ন্যূনতম নিরাপত্তার অধিকার থাকবে। যেমন :- বেসামরিক ব্যক্তি বা যারা যোদ্ধা নয়, অস্ত্র পরিত্যাগকারী সৈন্য এবং ঐ সমস্ত সৈন্য যারা আহত বা রোগাক্রান্তের কারণে যুদ্ধ হতে বিরত।

এছাড়া অন্যান্য কারণে যুদ্ধবন্দীদের প্রতি মানবীয় আচরণ প্রদর্শন করতে হবে। এবং নিম্ন বর্নিত বিষয় সমূহ হতে মুক্ত রাখতে হবে-

  • (ক) ব্যক্তি এবং জীবনের প্রতি সহিংসতামূলক আচরণ: বিশেষ ধরনেরসহ সকল ধরনের হত্যা, শারীরিক নির্যাতন, অমানবিক চিকিৎসা পদ্ধতি এবং নির্যাতন।
  • (খ) জিম্মি করে রাখা
  • (গ) ব্যক্তি মর্যাদার ওপর অমানবিক আচরণ, অমানবিক চিকিৎসা প্রদান।
  • (ঘ) মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা এবং বিচার বহির্ভূত অবস্থায় শাস্তি কার্যকর করা।

পার্ট-২ : বিশেষ যুদ্ধকালীন অবস্থায় সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা বা রক্ষণ।

ধারা ১৩ কনভেনশনের দ্বিতীয় অংশে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে একটি দেশের সমগ্র জনগণের নিরাপত্তা সংরক্ষণের উপর গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো জাতি, বর্ণ, ধর্ম, গোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাবে না।

পার্ট-৩ : নিরাপত্তা প্রদানকৃত ব্যক্তিদের মর্যাদা ও চিকিৎসা

  1. ধারা ৩২ : নিরাপত্তা সহকারে আশ্রিত বা নিরাপত্তা প্রদানকৃত কোনো ব্যক্তি/ ব্যক্তিদেরকে শারীরিক নির্যাতন, গণহত্যা, হত্যা, শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি প্রভৃতি ধরনের অমানবিক নির্যাতন থেকে মুক্ত রাখতে হবে। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় হত্যা, নির্যাতন, দৈহিক শাস্তি, শারীরিক অপব্যবহার, শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি বা বিনাশ সাধনও করা যাবে না।
  2. ধারা ৩৩ : সমন্বিত শাস্তি ১৯৪৯ সালের জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী সমন্বিত শাস্তি একটি যুদ্ধাপরাধ। এ কনভেনশনে বলা হয়েছে- “কোন আশ্রিত ব্যক্তিকে সামষ্ঠিক অপরাধ এমনকি ব্যক্তিগত অপরাধের জন্যও শাস্তি প্রদান করা যাবে না। সমন্বিত শাস্তি, এবং এর মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি ও সন্ত্রাসীমূলক আচরণ তাদের সাথে করা যাবেনা। লুটতরাজ নিষিদ্ধ এবং জীবন ও সম্পত্তির বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক আচরণ করা যাবে না।”
  3. ধারা ৩৯ : ফিরে পাবার অধিকার ”যুদ্ধকালীন সময়ে যে সমস্ত জনগণ তাদের বাস্তু, দেশ ও সম্পদ ত্যাগ করে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছে, অস্ত্র বিরতি বা স্থিতিশীলতার পরিবেশ সৃষ্টির পর তাদেরকে তাদের স্ব-অবস্থানে ফেরত নেয়া তাদের অধিকার।”

পার্ট-৪ : কনভেনশনের বাস্তবায়ন

এ অংশে আন্তর্জাতিক মানবহিতৈষী আইনের প্রাতিষ্ঠানিক বা কূটনীতিক অধ্যায়ের সংযোজন রয়েছে, সেই সাথে পারমানবিক, রাসায়নিক ও জৈব অস্ত্রের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞার কথাও বলা হয়েছে।

জাতিবিদ্বেষ এবং বর্ণবাদ

একটি বিষয় সম্পর্কে আমাদের সকলেরই একমত হতে হবে যে, কোন জনগোষ্ঠীর কয়েকজন মানুষের কর্মকাণ্ডের জন্য গোটা সম্প্রদায়কে অভিযুক্ত করা বা শাস্তি দিতে চাওয়া কিংবা হত্যা করা অন্যায়। ধরুন, কাল ইউরোপে কোন বাঙালি একটি বোমা বিস্ফোরণের সাথে জড়িত ছিল বলে জানা গেল। এর প্রতিশোধ নিতে ইউরোপে যদি এখন বলা শুরু হয়, যেখানেই বাঙালি পাও হত্যা করো, তাহলে ব্যাপারটা হবে ভয়াবহ অপরাধ। কারণ অপরাধ যদি করেও থাকে, করেছে একজন বা কয়েকজন মাত্র বাঙালি। তার জন্য সমস্ত বাঙালি, সেই সাথে নারী শিশু বৃদ্ধা প্রতিবন্ধী সমস্ত বাঙালিকে দোষারোপ করা যায় না। যদি কেউ তা করে, তাকে আমরা জাতিবিদ্বেষ বা বর্ণবাদ বলতে পারি।

কোন বাঙালি যদি অপরাধ করেও থাকে, আইন অনুসারে সেই অপরাধীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়ে শাস্তি দেয়া যেতে পারে। কিন্তু একজনার অপরাধে পুরো বাঙালি জাতি ধরে কেউ হত্যা ধর্ষণ বা আক্রমণের হুমকি বা নির্দেশ দিতে পারে না। যদি বলা হয়, শেখ হাসিনা চুক্তি ভঙ্গ করেছে সেই কারণে বাঙালি পুরুষদের হত্যা করে তাদের স্ত্রী কন্যাদের গনিমতের মাল বানাও, তা হবে মানবতার চরম অবমাননা। একই কথা প্রযোজ্য সব ক্ষেত্রেই। কোন মুসলমান যদি জঙ্গি হয়, তার জন্য ঢালাও ভাবে সকল মুসলমানকে কেউ হত্যা করতে বলতে পারে না। কোন রোহিঙ্গা যদি ইয়াবা ব্যবসায়ী হয়, তার জন্য জাতি ধরে কেউ বলতে পারে না, “রোহিঙ্গারা সবাই ইয়াবা ব্যবসায়ী! তাদেরকে হত্যা করা উচিত!” – বললে তা হবে বর্ণবাদী আচরণ। এবং তা হবে খুবই ভয়াবহ অপরাধ।

সেই সাথে, কেউ ইহুদী বা বৌদ্ধ বা হিন্দু বা খ্রিস্টান বা শিখ বা আহমদিয়া বা শিয়া বা সুন্নি বা নাস্তিক বা আস্তিক বা সমকামী বা বিষমকামী বা নারী বা পুরুষ কাউকেই হত্যা করতে বলতে পারে না। ধরুন আমার এক খ্রিস্টান বন্ধু আমার টাকা ধার নিয়ে ফেরত দিচ্ছে না। আমি এই অবস্থায় বলতে পারি না, খ্রিস্টানরা খারাপ, তাদের হত্যা করো। যদি বলি, তা হবে চরম সাম্প্রদায়িক বক্তব্য। যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং ঘৃণিত। কোন বা কিছু ব্যক্তির অপরাধের কারণে ধর্ম বর্ণ গোত্র সম্প্রদায় ধরে ঐ ধর্ম বর্ণ গোত্র সম্প্রদায়ের সকলের বিরুদ্ধে উস্কানি দেয়া, হত্যা করতে চাওয়া, নারী শিশুদের গনিমতের মাল বানাবার চেষ্টা করা অবশ্যই বর্ণবাদী এবং সাম্প্রদায়িক আচরণ। এটি সকলের ক্ষেত্রে সত্য। ধর্মের ওপর ভিত্তি করে কোন জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে কোন অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত করা, তাদের নিচু বা অপবিত্র ভাবা, নির্যাতন বা তাদের উচ্ছেদ করা, এগুলো সবই জাতিবিদ্বেষের উদাহরণ।

নবী মুহাম্মদের পরিকল্পনা

ধর্মের ভিত্তিতে কোন জনগোষ্ঠীকে ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা, বিতাড়িত করা, এগুলো যুগে যুগে অসংখ্যবার হয়েছে। এই বর্তমান সময়েও মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ, ফিলিস্তিনীদের উচ্ছেদ, কাশ্মীরীদের উচ্ছেদ, এই ঘটনাগুলোর কথা আমরা সকলেই জানি, এবং ধর্মের ভিত্তিতে অস্ত্র-সামরিক বাহিনী দিয়ে ভয় দেখিয়ে-জোরপূর্বক কোন জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করার এই প্রক্রিয়া মানব ইতিহাসে সবচাইতে হৃদয় বিদারক এবং ভয়াবহ ঘটনা বলেই বিবেচিত হয়। এই বাঙলাদেশ থেকেও ১৯৪৭ সালে এবং ১৯৭১ সালে অসংখ্য হিন্দুদের দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়, এরপরেও অসংখ্য হিন্দুদের এই দেশ থেকে ভারতে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। এই সাম্প্রদায়িকতা, এই ধর্মান্ধতা মানব সভ্যতার অন্যতম প্রধান শত্রু। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এগুলো কী নবী মুহাম্মদেরও শিক্ষা?

নবী মুহাম্মদ মক্কায় যখন প্রথম ধর্ম প্রচার শুরু করেন, তখন শুধুমাত্র কয়েকজনকে তার ধর্মে আনতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন। সেই সময়ে তার না ছিল দলবল, না ছিল যুদ্ধ করার সামর্থ্য। মদিনায় হিজরত করেই নবীর ভাগ্যের পরিবর্তন হতে শুরু করলো। তিনি নিয়মিত বানিজ্য কাফেলা আক্রমণ করে বানিজ্য কাফেলার মালামাল লুট করতে শুরু করলেন, যা তার শক্তিসামর্থ্য বৃদ্ধি করছিল। মদিনায় ইহুদিদের কাছে সাহায্য সহযোগিতা পেয়ে নবীও ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে উঠছিলেন। এরপরে তিনি ধীরে ধীরে ইহুদি গোত্রগুলোকে আক্রমণ করতে শুরু করেন।

খুব দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, ইসলাম ধর্মের নবী মুহাম্মদ খুব পরিষ্কারভাবেই ঘোষণা দিয়েই বলেছিলেন, তিনি আরবের সমস্ত ইহুদি, খ্রিস্টান, পৌত্তলিক, সবাইকে আরব উপদ্বীপ থেকে বিতাড়িত করবেন। অর্থাৎ তার মূল লক্ষ্যই ছিল, আরব উপদ্বীপের সবাইকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা, নতুবা তাদের উচ্ছেদ করা। এই বিষয়ে তিনি কখনো কোন রাখঢাকও করেন নি। সহি হাদিসে এই সম্পর্কে অসংখ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। [5] [6]

সুনানে ইবনে মাজাহ
ভূমিকা পর্ব
পরিচ্ছেদঃ ৯. ঈমানের বিবরণ
১৪/৭১। আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি লোকেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য প্রদান করে যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নাই, নিশ্চয়ই আমি আল্লাহ্‌র রাসূল এবং তারা সালাত কায়িম করে এবং যাকাত দেয়।
তাখরীজ কুতুবুত সিত্তাহ: বুখারী ১৪০০, ২৯৪৬, ৬৯২৪, ৭২৮৫; মুসলিম ২০, ২১/১-৩; তিরমিযী ২৬০৬-৭, নাসায়ী ২৪৪৩, ৩০৯০-৯৩, ৩০৯৫, ৩৯৭০-৭৮; আবূ দাঊদ ২৬৪০, আহমাদ ৬৮, ১১৮, ৩৩৭, ২৭৩৮০, ৮৩৩৯, ৮৬৮৭, ৯১৯০, ২৭২১৪, ৯৮০২, ২৭২৮৪, ১০১৪০, ১০৪৪১, ১০৪৫৯।
তাহক্বীক্ব আলবানী: সহীহ মুতাওয়াত্বির। তাখরীজ আলবানী: সহীহাহ ৪০৭। উক্ত হাদিসের রাবী আবু জা’ফার সম্পর্কে ইয়াহইয়া বিন মাঈন বলেন, মুগীরাহ থেকে হাদিস বর্ণনায় সংমিশ্রণ করেছেন। আহমাদ বিন হাম্বল বলেন, হাদিস বর্ণনায় নির্ভরযোগ্য নন। বু হাতিম আর-রাযী ও আলী ইবনুল মাদীনী এবং ইয়াহইয়া বিন মাঈন বলেন, তিনি সিকাহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ হুরায়রা (রাঃ)

সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)
১। ঈমান [বিশ্বাস]
পরিচ্ছেদঃ ৮. লোকেদের বিরুদ্ধে জিহাদের নির্দেশ যতক্ষণ না তারা স্বীকার করে যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল এবং সালাত কায়িম করে, যাকাত দেয়, নাবী যে শারীআতের বিধান এনেছেন তার প্রতি ঈমান আনে, যে ব্যক্তি এসব করবে সে তার জান মালের নিরাপত্তা লাভ করবে; তবে শারীআত সম্মত কারণ ব্যতীত, তার অন্তরের খবর আল্লাহর কাছে; যে ব্যক্তি যাকাত দিতে ও ইসলামের অন্যান্য বিধান পালন করতে অস্বীকার করে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার এবং ইসলামের বৈশিষ্ট্যসমূহ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ইমামের গুরুত্বারোপ করার নির্দেশ।
৩৭-(৩৭/২৩) সুওয়াইদ ইবনু সাঈদ আবূ উমর (রহঃ) ….. আবূ মালিক তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোন ইলাহ নেই, এ কথা স্বীকার করে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য উপাস্যকে অস্বীকার করে, তার জান-মাল নিরাপদ? আর তার হিসাব নিকাশ আল্লাহর নিকট। (ইসলামিক ফাউন্ডেশনঃ ৩৭, ইসলামিক সেন্টারঃ ৩৮)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আবূ মালিক আল আশ্‘আরী (রাঃ)

উপরের সহিহ হাদিসগুলো থেকে স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়, নবী মুহাম্মদ এই পৃথিবীতে জন্মই নিয়েছিলেন কাফেররা যতক্ষণ পর্যন্ত না ইসলাম কবুল করে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। কাফেররা হয় ইসলাম গ্রহণ করবে, নতুবা অপমানিত অবস্থায় জিজিয়া কর দিবে, এই হচ্ছে ইসলামের সরাসরি বিধান [7] [8] । এবারে আসুন, আরো কয়েকটি হাদিস পড়ি, যেখান থেকে জানা যায়, নবী মুহাম্মদের লক্ষ্যই ছিল ইহুদি নাসারা পৌত্তলিক সকলকে আরব উপদ্বীপ থেকে বিতাড়িত করে সেখানে ইসলামের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করা। [9] [10] [11]

গ্রন্থের নামঃ সহীহ মুসলিম (ইফাঃ)
হাদিস নম্বরঃ [4442] অধ্যায়ঃ ৩৩/ জিহাদ ও এর নীতিমালা
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ২১. ইয়াহুদী ও নাসারাদের আরব উপ-দ্বীপ থেকে বহিস্কার
৪৪৪২। যুহায়র ইবনু হারব ও মুহাম্মাদ ইবনু রাফি (রহঃ) … জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) বলেন, আমার কাছে উমর ইবনু খাত্তাব (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেন যে, নিশ্চয়ই আমি ইয়াহুদী ও খ্রীষ্টান সম্প্রদায়কে আরব উপ-দ্বীপ থেকে বহিস্কার করবো। পরিশেষে মুসলমান ব্যতীত অন্য কাউকে এখানে থাকতে দেবো না।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

গ্রন্থের নামঃ সহীহ মুসলিম (হাঃ একাডেমী)
হাদিস নম্বরঃ [4486] অধ্যায়ঃ ৩৩। জিহাদ ও সফর
পাবলিশারঃ হাদিস একাডেমি
পরিচ্ছদঃ ২১. ইয়াহুদী ও নাসারাদের আরব উপ-দ্বীপ থেকে বের করে দেয়া
৪৪৮৬-(৬৩/১৭৬৭) যুহায়র ইবনু হারব ও মুহাম্মাদ ইবনু রাফি’ (রহঃ) ….. জাবির ইবনু ‘আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, আমার কাছে উমর ইবনু খাত্তাব (রাযিঃ) বর্ণনা করেন যে, তিনি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছেন যে, নিশ্চয়ই আমি ইয়াহুদী ও খ্ৰীষ্টান সম্প্রদায়কে আরব উপ-দ্বীপ থেকে বের করে দেবো। তারপর মুসলিম ব্যতীত অন্য কাউকে এখানে থাকতে দেবো না। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৪৪২, ইসলামিক সেন্টার ৪৪৪৪)
যুহায়র ইবনু হারব ও সালামাহ্ ইবনু শাবীব (রহঃ) ….. উভয়েই আবূ যুবায়র (রহঃ) থেকে এ সানাদে অনুরূপ বর্ণনা করেন। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪৪৪২, ইসলামিক সেন্টার ৪৪৪৫)
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

গ্রন্থের নামঃ সূনান আত তিরমিজী [তাহকীককৃত]
হাদিস নম্বরঃ [1607] অধ্যায়ঃ ১৯/ যুদ্ধাভিযান
পাবলিশারঃ হুসাইন আল-মাদানী‏
পরিচ্ছদঃ ৪৩. আরব উপদ্বীপ হতে ইয়াহুদী-নাসারাদের বের করে দেওয়া প্রসঙ্গে
১৬০৭। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেনঃ আমি ইহুদী ও নাসারাদের আরব উপদ্বীপ হতে অবশ্যই বহিষ্কার করব। মুসলমান ব্যতীত অন্য কাউকে সেখানে বসবাস করতে দিব না।
সহীহ, সহীহা (১১৩৪), সহীহ আবূ দাউদ, মুসলিম
এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

অর্থাৎ, এই কথাটি খুব পরিষ্কারভাবেই বোঝা যায়, আরব উপদ্বীপের ইহুদি খ্রিষ্টান কিংবা পৌত্তলিক যারাই সেই সময়ে ছিলেন, তাদের কোন না কোন সময়ে অবশ্যই উচ্ছেদ করা হতো। যার পরিকল্পনাই থাকবে এমন যে, সেই অঞ্চল থেকে মুসলিম ছাড়া অন্য সবাইকে উচ্ছেদ করবে, তিনি ছলে বলে কৌশলে নানা অজুহাতে এই চেষ্টাই করবেন যে, কোনভাবে তাদের ওপর কোন অভিযোগ আরোপ করে তাদের যেন হত্যা কিংবা উচ্ছেদ করা যায়। কারণ নবী মুহাম্মদের সবসময়ই এই সুপ্ত ইচ্ছাটিই ছিল যে, তিনি মুসলিম ছাড়া অন্য সবাইকেই সেখান থেকে তাড়িয়ে দেবেন।

বনু কায়নুকার ঘটনা

নবী মুহাম্মদ বনু কুরাইজা গোত্রে আক্রমণের আগে বেশ কিছুদিন ধরেই অজুহাত খুঁজছিলেন, একটি বড় ধরণের গণহত্যা চালাবার, যাতে তিনি ঐ অঞ্চলে ত্রাস সৃষ্টি করতে পারেন এবং সমস্ত আরব উপদ্বীপে যেন তার নাম আতঙ্ক হয়ে ছড়িয়ে যায়। তার অংশ হিসেবেই তিনি বেশ কয়েকটি ইহুদি গোত্রকে আক্রমণ করেন, উচ্ছেদ এবং বিতাড়িত করেন। এই ইহুদি গোত্রগুলোর একটি হচ্ছে বনু কায়নুকা গোত্র। এই বিষয়ে আলোচনার আগে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই সম্পর্কে বলে নেয়া জরুরি। উবাই ছিলেন বনু খাজরাজ গোত্রের প্রধান এবং মদিনার একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, যিনি গোত্রে গোত্রে শত্রুতা মেটানোর জন্য তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। কিন্তু নবী মুহাম্মদের মদিনায় আগমনে আবারো গোত্রে গোত্রে শত্রুতা বৃদ্ধি পায়। ইসলামের ইতিহাসেতাকে একজন মুনাফিক (ভণ্ড, প্রতারক) এবং মুনাফিকদের সর্দার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

ইহুদিদের বনু কাইনুকা গোত্র ছিল পেশায় কর্মকার, স্বর্ণকার ও তৈজসপত্র নির্মাতা। বদর যুদ্ধের কিছুদিন পর তাদের বাজারে এক মুসলিম মেয়ে এক ইহুদি স্বর্ণের দোকানে একটি কাজে গিয়েছিল। ঐ মুসলিম মহিলা যখন ঐ দোকানে গিয়েছিলেন তখন ঐ ইহুদি কর্মচারী মুসলিম মহিলাটির মুখ খুলতে বলে। কিন্তু মহিলাটি তার মুখ খুলতে রাজি না হওয়ায় মহিলাটি যখন স্বর্ণের দোকানের একটি চেয়ারে বসে, তখন ইহুদি কর্মচারীটি ওই মহিলার পোশাকে পেরেক মেরে চেয়ারের সাথে আটকে দেয়, ফলে উঠতে গিয়ে ঐ মহিলার জামা ছিঁড়ে সারা শরীর অনাবৃত হয়ে যায়। মুসলিম মহিলার আর্তনাদ শুনে এক মুসলিম পথচারী এটা দেখে খেপে গিয়ে ঐ ইহুদি কর্মচারীকে হত্যা করেন, এরপর ইহুদি কর্মচারীর পক্ষের কয়েকজন ইহুদি মিলে ঐ মুসলমানকে হত্যা করে ফেলে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নবী মুহাম্মদ বনু কায়নুকা গোত্র আক্রমণ করেন। তার ইচ্ছে ছিল, এই অজুহাতে সমস্ত বনু কায়নুকা গোত্রকেই নিশ্চিহ্ন করে ফেলবেন। কিন্তু ঐ অপরাধটি যারা করেছে, তারা ছাড়া অন্যদের ওপর এই অপরাধের দায় চাপানো কতটা মানবিক ও যৌক্তিক, নাকি নৃশংসা এক যুদ্ধনেতার গণহত্যা চালাবার অজুহাত, তা পাঠকই সিদ্ধান্ত নেবেন। কিন্তু একজন মানবিক মানুষ মাত্রই বুঝবেন, কোন অপরাধ ঘটে থাকলে সেই অপরাধীদের চিহ্নিত করা, তাদের যথাযোগ্য শাস্তি দেয়া যেতে পারে। কিন্তু কিছু মানুষের অপরাধে গোটা গোত্রের ওপর নিধনযজ্ঞ, নারী শিশুদের গনিমতের মাল বানানো, সম্পত্তি সব দখল করা, এগুলো বড় ধরনের অন্যায় এবং অন্যায্য কাজ।

৬২৪ খ্রিস্টাব্দে নবী মুহাম্মদ ইহুদি গোত্র বানী কাইনুকার উপরে ১৫ দিন ব্যাপী একটি অবরোধ চালিয়েছিলেন। উপায় না দেখে বনু কাইনুকা গোত্রটি নিঃশর্তভাবে মুহাম্মদের বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। মুহাম্মদ সেই গোত্রের সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের শিরশ্ছেদ করে তাদের নারী ও শিশুদের দাস বানাতে চেয়েছিলেন, যেন সমস্ত আরব উপদ্বীপে ত্রাস সৃষ্টি করা যায়। বনু কায়নূকার ঘটনার সময় মদিনার শক্তিশালী স্থানীয় নেতা ছিলেন খাজরাজ বংশের প্রধান আবদুল্লাহ বিন উবাই। তিনি ছিলেন অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদার অধিকারী এবং মুহাম্মদের হিজরতের সময় মদিনার নেতা। মুহম্মদের উত্থানের সাথে তার প্রভাব ধীরে ধীরে হ্রাস পেতে থাকে। বনু কায়নুকার অবরোধের সময় আবদুল্লাহ বিন উবাই মুহাম্মদের গণহত্যার ইচ্ছেটি বুঝতে পারেন, এবং রক্তপিপাসু এই নবীকে জামার কলার ধরে এই গণহত্যা থেকে নিবৃত করেন। মুহাম্মদ রেগেমেগে প্রায় কালো হয়ে যান, কিন্তু আবদুল্লাহ বিন উবাই প্রায় জোর করেই মুহাম্মদকে বাধ্য করেন, যেন বনু কায়নুকাকে মুহাম্মদ নৃশংসভাবে জবাই করতে না পারে। এর থেকে বোঝা যায়, নবী মুহাম্মদের ইচ্ছে ছিল, বনু কায়নুকার সমস্ত পুরুষকে হত্যা করা এবং মেয়ে ও শিশুদের গনিমতের মাল বানানো। যার প্রমাণ পাওয়া যায় ইবনে হিশামের সীরাত গ্রন্থ থেকেই [12] [13]

গণহত্যা

গণহত্যা

সিরাতে ইবনে হিশাম [14] গ্রন্থে এই বর্ণনাটি একটি ভিন্নভাবে পাওয়া যায়

গণহত্যা

উপরের আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, নবী মুহাম্মদ আসলে বনু কায়নুকা গোত্রের সকল পুরুষকে হত্যা করে তাদের জায়গাজমি দখল, নারী ও শিশুদের দাস বানাবার পরিকল্পনাই করেছিল। কিন্তু আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের কারণে মুহাম্মদের এই ইচ্ছাটি অপূর্ণই থেকে যায়। কিন্তু বনু কুরাইজা গোত্রের সময় তিনি আর ভুল করেন নি। তিনি দায়িত্ব এমন একজনকেই দিয়েছিলেন, যিনি আগে থেকেই বনু কুরাইজার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতেন। যার প্রমাণ আমরা কিছুক্ষণ পরেই পাবো।

বনু কুরাইজার বিশ্বাসঘাতকতা?

১৯৭১ সালে বাঙলাদেশে যখন পাক আর্মী গণহত্যা চালায়, তখন তারা এই গণহত্যাকে এই বলে জায়েজ করার চেষ্টা করেছিল যে, বাঙালি তাদের দ্বিজাতিতত্ত্বের ওপরে গঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তারা পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ভারতীয় চক্রান্তে কাজ করছে। সেই সময়ে পাক আর্মী যখন বাঙালি নিধনে যেতো, তাদের প্রিয় গালিই ছিল গাদ্দার বাঙালি! কিংবা গাদ্দার মুজিব! গণহত্যাকে জাস্টিফাই করার জন্য বেশিরভাগ সময়ই আসলে গণহত্যার শিকার জনগোষ্ঠী বা গোত্রটিকে জঙ্গি বা বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা হয়। লক্ষ্য করলে দেখবেন, প্যালেস্টাইনে কিংবা কাশ্মীরে কিংবা মিয়ানমারেও যখন গণহত্যা চালানো হয়, সেখানেও ক্ষমতাসীনরা অন্যদের গাদ্দার বা বিশ্বাসঘাতক বলে, কিংবা জঙ্গি বা টেরোরিস্ট নাম দিয়ে হত্যা শুরু করে।

মুসলিম এপোলোজিস্টরাও সেই শুরু থেকেই, বনু কুরাইজা গণহত্যাকে জায়েজ করতে ঠিক একই কৌশল অবলম্বন করে গেছে। বনু কুরাইজা গোত্রকে গাদ্দার, বিশ্বাসঘাতক, জঙ্গি, রাষ্ট্রবিরোধী ইত্যাদি নানা অভিযোগে অভিযুক্ত করে গণহত্যাকে জাস্টিফাই করতে চেষ্টা করেছে। অথচ, প্যালেস্টাইনের নাগরিকদেরও কিন্তু ইসরাইল আর্মী ঠিক একই অভিযোগে অভিযুক্ত করে তাদের ভূমি দখল করে, তাদের হত্যা করে, সেই সময়ে মুসলিমরা তার ঠিকই প্রতিবাদ করে।

সবচাইতে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, বনু কুরাইজা আসলে কী এমন বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল যে, তাদের সমূলে উচ্ছেদ করতে হলো, নারী এবং শিশুদের ক্রিতদাস বানাতে হলো, সেই বিশ্বাসঘাতকতাটি কী, এর দ্বারা মুসলিমরা কতখানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কতজন মুসলিম তাদের জঙ্গি হামলায় নিহত বা আহত হয়েছে, এর ঠিক কোন সদুত্তর তারা দিতে পারে না।

উল্টোদিকে দেখা যায়, মুহাম্মদের বিরোধী গ্রুপের নেতা আবু সুফিয়ান বনু কুরাইজা গোত্রে মুহাম্মদের আক্রমণের কিছুদিন আগেই বনু কুরাইজার কাছে সাহায্যের কামনা করেছিল, এবং বনু কুরাইজা আবু সুফিয়ানের বাহিনীকে সাহায্য করতে চায় নি। বনু কুরাইজা যদি মুহাম্মদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতাই করে থাকবে, তাহলে তাদের তো উচিৎ ছিল, আবু সুফিয়ানকে সাহায্য করা। নিচের রেফারেন্সটি ইবনে ইসহাকের গ্রন্থ থেকে নেয়া [15]

গণহত্যা

সেইসাথে, বনু কুরাইজা গোত্র কীভাবে কুরাইশদের সাহায্য করেছিল সেটিও এক বিরাট প্রশ্ন। নিচের মানচিত্রটি দেখুন। খন্দকের যুদ্ধের সময় যেই পরিখা খনন হয়, তা ভেদ করে বনু কুরাইজা গোত্র কুরাইশদের কীভাবে সাহায্য করলো? আবার সাথে সাথেই, নিজ দুর্গে ফিরেও গেল? যেখানে নবী মুহাম্মদ যুদ্ধ থেকে ফিরেই, কোন বিরতি না দিয়েই বনু কুরাইজা আক্রমণ করে? ছবিঃ উইকিপিডিয়া

গণহত্যা

চুক্তি ভঙ্গ কী গণহত্যাকে জায়েজ করে?

বাঙলায় একটি প্রবাদ আছে যে, দুষ্টের ছলের অভাব হয় না। ইসলামিক এপোলোজিস্টরা বনু কুরাইজা গোত্রের ওপর যেই গণহত্যা চালায়, তাকে জায়েজ করতে বনু কুরাইজা গোত্রের চুক্তি ভঙ্গের কথা বারবার ব্যবহার করেন। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই, বনু কুরাইজা চুক্তি ভঙ্গ করেছিল, কিন্তু সেটিও কী একটি গোটা গোত্রের সকল সাবালক পুরুষকে হত্যা, নারী ও শিশুদের যৌনদাসী এবং ক্রীতদাস বানানোকে জায়েজ করতে পারে?

কাশ্মীরে যখন ভারতীয় সেনাবাহিনী হত্যাকাণ্ড চালায়, ভারতীয় সংবিধান লঙ্ঘন কিংবা চুক্তি ভঙ্গের নাম দিয়ে, সেটিও তো তাহলে জায়েজ হয়ে যায়। কিংবা ধরুন, ততকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা আধুনিক বাঙলাদেশে পাক আর্মি যখন গণহত্যা চালায়, দেশের স্বার্বোভৌমত্ব রক্ষার নাম দিয়ে, কিংবা পাকিস্তানের সাথে আমাদের চুক্তি ভঙ্গের নাম দিয়ে, তাহলে তো সেটিও জায়েজ হয়ে যায়। সত্য হচ্ছে, এগুলো খুবই সস্তা এবং খোড়া অজুহাত, যা একইসাথে অমানবিকও বটে। এই ধরণের অজুহাত কোন অবস্থাতেই এই ধরণের কাজকে জায়েজ করতে পারে না।

নারী ও শিশুদের হাহাকার

বনু কুরাইজা গোত্রের সাথে সাথে নবী মুহাম্মদের কী করার পরিকল্পনা, সেটি নবী মুহাম্মদেরই এক অনুসারী আবূ লূবাবা ফাঁস করে দিয়েছিলেন। বনু কুরাইজা গোত্রকে ২৫ দিন অবরোধ করে রাখার পরে আবূ লূবাবাকে তিনি পাঠিয়েছিলেন বনু কুরাইজার দূর্গে। সেখানে ঢোকার পরেই বুকফাটা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। তারা আবূ লূবাবার কাছে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা জানাতে থাকে। নবী মুহাম্মদের অনুসারী হওয়ার পরেও নারী শিশুদের সেই কান্না দেখে মন গলে যায় আবূ লূবাবার। তিনি ইঙ্গিতে তাদের জানিয়ে দেন, আত্মসমর্পন করলে তাদের হত্যা করা হবে। নবী মুহাম্মদ সেই পরিকল্পনা করেই এসেছেন। [16] [17]

যখন আবূ লুবাবা সেখানে উপস্থিত হল তখন পুরুষগণ তাকে দেখে দৌঁড়ে তার নিকট এল এবং শিশু ও মহিলাগণ করুন কণ্ঠে ক্রন্দন শুরু করল। এ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে আবূ লুবাবার অন্তরে ভাবাবেগের সৃষ্টি হল। ইহুদীগণ বলল, ‘আবূ লুবাবা! আপনি কি যুক্তিযুক্ত মনে করেছেন যে, বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আমরা মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর নিকট অস্ত্রশস্ত্র সমর্পণ করি?’
বলল, ‘হ্যাঁ’, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে হাত দ্বারা কণ্ঠনালির দিকে ইঙ্গিত করল, যার অর্থ ছিল হত্যা। 

গণহত্যা

সা’দ ইবনু মুআয কে ছিলেন?

মুসলিমদের মধ্যে অনেকেই দাবী করেন, সা’দ ইবনু মুআয তো ইহুদিদেরই লোক ছিল! এই কথাটি সম্পুর্ণভাবেই মিথ্যা কথা। কে ছিলেন এই সা’দ? সা’দ ইবনু মুআয ছিলেন ইহুদি থেকে ধর্মান্তরিত একজন মুসলিম। তিনি কী ইহুদি গোত্র বনু কুরাইজার প্রতি সহানুভূতুশীল ছিলেন? নাকি শত্রুভাবাপন্ন ছিলেন? মুহাম্মদ তাকে এই কাজের দায়িত্ব কী জেনে বুঝে দিয়েছিলেন যে, একে দায়িত্ব দিলেই সা’দ সর্বোচ্চ নৃশংসতা দেখাবে? আসুন নিচের হাদিসগুলো পড়িঃ

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
১৯/ যুদ্ধাভিযান
পরিচ্ছেদঃ ২৯. সালিশ মেনে আত্মসমর্পণ
১৫৮২। জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, সা’দ ইবনু মুআয (রাঃ) আহযাব যুদ্ধের দিন তীরবিদ্ধ হয়ে আহত হন। এতে তার বাহুর মাঝখানের রগ কেটে যায়। তার ক্ষতস্থানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগুনের সেক দিয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করেন। তারপর তার হাত ফুলে যায়। আগুনের সেঁক দেওয়া বন্ধ করলে আবার রক্তক্ষরণ হতে থাকে। আবার তিনি তার ক্ষতস্থানে আগুনের সেঁক দেন। তার হাত পুনরায় ফুলে উঠে। তিনি (সাদ) নিজের এ অবস্থা দেখে বলেন, ‘হে আল্লাহ। আমার জীবনকে কেড়ে নিও না বানু কুরাইযার চরম পরিণতি দেখে আমার চোখ না জুড়ানো পর্যন্ত।” তার জখম হতে সাথে সাথে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে গেল। এরপর আর একটি ফোটাও বের হয়নি।
সা’দ ইবনু মুআয (রাঃ)-কে তারা (বানু কুরাইযা) সালিশ মানতে রাজী হয়। তিনি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার (সাদের) নিকট লোক পাঠালেন (সমাধানের জন্য)। তিনি সমাধান দিলেন যে, বানু কুরাইযা গোত্রের পুরুষদেরকে মেরে ফেলা হবে এবং মহিলাদেরকে বাচিয়ে রাখা হবে। মুসলমানগণ তাদের দ্বারা বিভিন্ন রকম কাজ আদায় করতে পারবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাদের ব্যাপারে তোমার মত সম্পূর্ণ আল্লাহ্ তা’আলার মতের অনুরূপ হয়েছে। তারা (পুরুষগণ) সংখ্যায় ছিল চার শত। লোকেরা তাদেরকে মেরে ফেলা সমাপ্ত করলে, তার ক্ষতস্থান হতে আবার রক্ত পড়া আরম্ভ হল এবং তিনি মৃত্যু বরণ করলেন।
সহীহ, ইরওয়া (৫/৩৮-৩৯)
আবূ সাঈদ ও আতিয়া আল-কুরায়ী (রাঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)

এখানে আরেকটি প্রশ্ন আসতে পারে যে, এই ঘটনার বিচারক কে নির্ধারণ করেছিলেন? বনু কুরাইজা গোত্র স্বেচ্ছায় তাকে বিচারক নির্বাচিত করেছিল, নাকি নবী মুহাম্মদ নিজেই বিচারক নির্ধারণ করেছেন? ইহুদি গোত্র বনু কুরাইজার কী মুহাম্মদ কর্তৃক নির্ধারিত এই বিচারককে মেনে নেয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিল?

আল-লুলু ওয়াল মারজান
৩২/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ৩২/২২. চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গকারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এবং ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তির মধ্যস্থতায় দূর্গের লোকদের আত্মসমর্পণ করানো জায়িয।
১১৫৬. ‘আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, খন্দকের যুদ্ধে সা’দ (রাঃ) আহত হয়েছিলেন। কুরাইশ গোত্রের হিব্বান ইবনু ইরকা নামক এক ব্যক্তি তার উভয় বাহুর মধ্যবর্তী রগে তীর বিদ্ধ করেছিল। নিকট থেকে তার সেবা করার জন্য নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে নববীতে একটি তাঁবু তৈরি করেছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খন্দকের যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে যখন হাতিয়ার রেখে গোসল শেষ করলেন তখন জিহ্বীল (আঃ) তার মাথার ধূলাবালি ঝাড়তে ঝাড়তে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে হাজির হলেন এবং বললেন, আপনি হাতিয়ার রেখে দিয়েছেন, কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি এখনো তা রেখে দেইনি। চলুন তাদের প্রতি। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন কোথায়? তিনি বানী কুরাইযা গোত্রের প্রতি ইশারা করলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু কুরাইযার মহল্লায় এলেন। অবশেষে তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ফয়সালা মান্য করে দুর্গ থেকে নিচে নেমে এল। কিন্তু তিনি ফয়সালার ভার সা’দ (রাঃ)-এর উপর ন্যস্ত করলেন। তখন সা’দ (রাঃ) বললেন, তাদের ব্যাপারে আমি এই ফায়সালা দিচ্ছি যে, তাদের যোদ্ধাদেরকে হত্যা করা হবে, নারী ও সন্তানদেরকে বন্দী করা হবে এবং তাদের ধন-সম্পদ বণ্টন করা হবে।
সহীহুল বুখারী, পৰ্ব ৬৪ : মাগাযী, অধ্যায় ৩০, হাঃ ৪১২২; মুসলিম, পর্ব ৩২ ; জিহাদ, অধ্যায় ২২, হাঃ ১৭৬৯
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)

বিচারের নামে প্রহসন

ইবনে হিশামের প্রখ্যাত সীরাত গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বনু কুরাইজার সাথে কী করা হবে তা ছিল পূর্ব নির্ধারিত। বিচার আগেই ঠিক করা হয়েছিল, কোন তথ্য প্রমাণ যাচাই বাছাই ছাড়াই। ৬০০-৯০০ মানুষের বিচার, চুলচেরা বিশ্লেষণ, কে অপরাধী কে নিরাপরাধ, এগুলো একই দিনে বিচার করে ফেলা অসম্ভব ব্যাপার। বিচার যেভাবে হয়, তা হচ্ছে, একপক্ষ থাকে অভিযোগকারী, আরেকপক্ষ অভিযুক্ত। অভিযোগকারী অভিযোগ করে, অভিযুক্ত তা খণ্ডন করে। এরপরে প্রাপ্ত তথ্য প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে বিচারক সমস্ত তথ্যপ্রমাণের আলোকে বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অথচ, এই ক্ষেত্রে বিচার আগে থেকেই নির্ধারিত হয়েছিল। কোন তথ্য প্রমাণ সাক্ষ্য যাচাই বাছাই ছাড়াই। আবু লুবাবার বক্তব্য থেকে যা একদমই পরিষ্কার। [17]

গণহত্যা

প্রহসনের বিচারের রায়

একটি বিচার প্রক্রিয়ায় সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, অভিযুক্ত গোষ্ঠী আত্মপক্ষ সমর্থনের যথেষ্ট সুযোগ পাচ্ছে কিনা, এবং বিচারের সিদ্ধান্ত সাক্ষ্য ও তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন- সেগুলো যাচাই বাছাই করে তার ওপর ভিত্তি করে নেয়া নাকি সিদ্ধান্ত আগেই নিয়ে ফেলা! যদি এমন হয় যে, সিদ্ধান্ত আগেই নিয়ে তারপরে বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়, তাহলে এই ধরণের বিচারকে প্রহসনের বিচারই বলতে হবে। একে কোন অবস্থাতেই সুবিচার বলা সম্ভব নয়। বনু কুরাইজা গোত্রের যেই বিচারের নামে প্রহসন হয়, তাতে বিচারের সিদ্ধান্ত আগেই নিয়ে নেয়া হয়েছিল। তাই একে কোনভাবেই বিচার বলা যায় না, বরঞ্চ সিদ্ধান্ত বলা যেতে পারে। নবী মুহাম্মদ এবং সা’দ ইবনু মুআয সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, গোপনাঙ্গে যাদের চুল উঠেছে, সেই সকল পুরুষকে হত্যা করা হবে। এবং তাদের জায়গা জমি দখল করা হবে, তাদের নারী ও শিশুদের গনিমতের মাল হিসেবে ভাগাভাগি করে নেয়া হবে।

অর্থাৎ, বিচারের নামে যা হয়েছিল, সিদ্ধান্তটি এমন হয় নি যে, যারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত আছে, তাদের শাস্তি দেয়া হবে! বরঞ্চ এটি হয়েছিল যে, গণহারে সকলকেই হত্যা করা হবে, এবং তা নির্ধারিত হবে কার গোপনাঙ্গে চুল উঠেছে তার ওপর ভিত্তি করে। যেই বাচ্চা ছেলেটির গোপনাঙ্গে মাত্র চুল ওঠা শুরু করেছে, সে কীভাবে এমন কোন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকতে পারে? ইসলামিক এপোলোজিস্টরা প্রায়শই বলেন, এই বাচ্চারা বড় হলে মুসলিমদের সাথে হয়তো শত্রুতা করতো। তাই তাদের হত্যা করা জায়েজ বলেই তারা দাবী করেন। কিন্তু এক ধরণের কথা কতটা বর্বর এবং অসভ্য, তা নিশ্চয়ই বলে বোঝাতে হবে না। ইসরাইলের এক রাজনিতিবিদ একসময়ে বলেছিলেন, “প্যালেস্টাইনের সমস্ত মাকে হত্যা করা উচিৎ, যেন সেই মায়েরা টেরোরিস্ট জন্ম দিতে না পারে।” তার মানে, ঐ রাজনীতিবিদ ধরেই নিয়েছেন, প্যালেস্টাইনের মায়েরা বাচ্চা জন্ম দিলেই বাচ্চাগুলো বড় হয়ে জঙ্গি হবে! এবং সেই কারণে তাদের জন্মের আগেই মেরে ফেলতে হবে! কী ভয়াবহ অমানবিক কথা! [18] [19]

“They should die and their houses must be destroyed so that they do not give birth to terrorists.”

একজন মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত সরাসরি কোন অপরাধ না করে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের শাস্তি দেয়া যায় না। এটি সকল স্থান কাল প্রেক্ষাপটে সরাসরি মানবতা বিরোধী। কোন শিশু বড় হলে অপরাধ করতে পারে, এরকম চিন্তা করে তাদের শাস্তি দেয়ার মত অমানবিক চিন্তা আর কিছু সম্ভবত নেই। কিন্তু এই কথাগুলো কেন যেন ধর্মীয় চিন্তার মানূষদের মাথায় ঢোকে না!

ইসরাইলের এই রাজনীতিবিদ Ayelat Shaked সেই সাথে বলেছিলেন, প্যালেস্টাইনের মায়েরা ছোট ছোট সাপের বাচ্চা জন্ম দিচ্ছে! তিনি সেই সাথে প্যালেস্টাইনের শিশুদেরও ছোট সাপ বলেও আখ্যায়িত করেছিলেন! এই কথাগুলো বলার পরে আমরা এই ধরণের বর্বর কথার তীব্র বিরোধীতা করেছিলাম। সেই সাথে মুসলিম বিশ্বও এই কথার প্রতিবাদ জানিয়েছিল। আসলেই, এই ধরনের কথা অত্যন্ত বর্বর, বর্বরতার সকল সীমা অতিক্রম করে ফেলা। কিন্তু এই একই ধরণের যুক্তি কিন্তু মুসলিম এপোলোজিস্টরাও দেন, তাদের গণহত্যাকে জায়েজ করতে! বলুন তো, প্যালেস্টাইনের শিশুরা ছোট ছোট বিষাক্ত সাপের মত, প্যালেস্টাইনের মায়েরা জঙ্গি জন্ম দেয়, তাই প্যালেস্টাইনের শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের মেরে ফেলা উচিৎ, এই কথার সাথে, বনু কুরাইজা গোত্রের শিশুরা বড় হলে মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করবে, তাই গোপনাঙ্গে চুল গজানো সকল শিশু কিশোরকে হত্যা করতে হবে, এই কথা দুইটির মধ্যে পার্থক্য কী?

আসুন নিচের হাদিসগুলো পড়ি-

সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৩৩/ শাস্তির বিধান
পরিচ্ছেদঃ ১৭. নাবালেগ ছেলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করলে।
৪৩৫২. মুহাম্মদ ইবন কাছীর (রহঃ)….আতিয়া কুরাযী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি কুরায়যা গোত্রের বন্দীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম, (যাদের হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল). সে সময় লোকেরা তদন্ত করে দেখছিল এবং যাদের নাভীর নীচে চুল উঠেছিল, তাদের হত্যা করা হচ্ছিল। আর আমি তাদের দলভুক্ত ছিলাম, যাদের তখনো নাভীর নীচে পশম উঠেনি। ফলে আমাকে হত্যা করা হয় নি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আতিয়্যা কুরাযী (রাঃ)

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
১৯/ যুদ্ধাভিযান
পরিচ্ছেদঃ ২৯. সালিশ মেনে আত্মসমর্পণ
১৫৮৪। আতিয়া আল-কুরায়ী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমাদেরকে বানূ কুরাইযার যুদ্ধের দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আনা হল। যাদের লজ্জাস্থানের লোম উঠেছে (বালেগদের) তাদেরকে হত্যা করা হল, আর যাদের তা উঠেনি (নাবালেগদের) তাদেরকে মুক্ত করে দেওয়া হল। আমার লজ্জাস্থানে তখনও লোম উঠেনি। একারণে আমাকে মুক্ত করে দেওয়া হল।
সহীহ, ইবনু মা-জাহ (২৫৪১)
এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন। এ হাদীস মোতাবিক একদল অভিজ্ঞ আলিম আমল করেছেন। তাদের মতে, যে লোকের বয়স এবং বীর্যপাতের ব্যাপারে সঠিকভাবে অনুমান করা না যাবে- তার নাভির নীচের লোম উঠাই বয়ঃপ্রাপ্তির লক্ষণ বলে গণ্য হবে। এই অভিমত দিয়েছেন ইমাম আহমাদ এবং ইসহাকও।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আতিয়্যা কুরাযী (রাঃ)

সুনানে ইবনে মাজাহ১৪/ হদ্দ (দন্ড)পরিচ্ছেদঃ ১৪/৪. যার উপর হদ্দ কার্যকর করা আবশ্যিক নয়
১/২৫৪১। আতিয়্যা আল-কুরাজী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, বনূ কুরায়জাকে হত্যার দিন আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে উপস্থিত করা হলো। যার (লজ্জাস্থানের) লোম গজিয়েছিল, তাকে হত্যা করা হলো এবং যার লোম গজায়নি তাকে রেহাই দেয়া হলো। আমি ছিলাম লোম না গজানোদের অন্তর্ভুক্ত, তাই আমাকে রেহাই দেয়া হয়।
হাদিসটি ইমাম ইবনু মাজাহ এককভাবে বর্ণনা করেছেন। বায়হাকী ফিস সুনান ৭/২৩৯, আল-হাকিম ফিল মুসতাদরাক ৪/৩৬৫, মিশকাত ৩৯৭৪। 
তাহকীক আলবানীঃ সহীহ।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ আতিয়্যা কুরাযী (রাঃ)

রায়ে নবী ও আল্লাহর প্রতিক্রিয়া

এই রায়ে আসলে নবী মুহাম্মদ এবং আল্লাহর সম্পূর্ণ সায় ছিল। এই রায়কে আল্লাহ বা নবী কেউই অমানবিক বলে মনে করেন নি, বরঞ্চ সমর্থন দিয়েছেন। আমরা ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন ইসলামিক বক্তার মুখে নবীর দয়া এবং করুনার যেসমস্ত কাল্পনিক গল্প শুনি, তার সাথে এই ঘটনার একেবারেই কোন মিল পাওয়া যায় না। বরঞ্চ এতবড় একটি গণহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়ায় আল্লাহ এবং তার নবী খুবই খুশী ছিলেন।

সূনান আত তিরমিজী (তাহকীককৃত)
১৯/ যুদ্ধাভিযান
পরিচ্ছেদঃ ২৯. সালিশ মেনে আত্মসমর্পণ
১৫৮২। জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, সা’দ ইবনু মুআয (রাঃ) আহযাব যুদ্ধের দিন তীরবিদ্ধ হয়ে আহত হন। এতে তার বাহুর মাঝখানের রগ কেটে যায়। তার ক্ষতস্থানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগুনের সেক দিয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করেন। তারপর তার হাত ফুলে যায়। আগুনের সেঁক দেওয়া বন্ধ করলে আবার রক্তক্ষরণ হতে থাকে। আবার তিনি তার ক্ষতস্থানে আগুনের সেঁক দেন। তার হাত পুনরায় ফুলে উঠে। তিনি (সাদ) নিজের এ অবস্থা দেখে বলেন, ‘হে আল্লাহ। আমার জীবনকে কেড়ে নিও না বানু কুরাইযার চরম পরিণতি দেখে আমার চোখ না জুড়ানো পর্যন্ত।” তার জখম হতে সাথে সাথে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে গেল। এরপর আর একটি ফোটাও বের হয়নি।
সা’দ ইবনু মুআয (রাঃ)-কে তারা (বানু কুরাইযা) সালিশ মানতে রাজী হয়। তিনি (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার (সাদের) নিকট লোক পাঠালেন (সমাধানের জন্য)। তিনি সমাধান দিলেন যে, বানু কুরাইযা গোত্রের পুরুষদেরকে মেরে ফেলা হবে এবং মহিলাদেরকে বাচিয়ে রাখা হবে। মুসলমানগণ তাদের দ্বারা বিভিন্ন রকম কাজ আদায় করতে পারবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তাদের ব্যাপারে তোমার মত সম্পূর্ণ আল্লাহ্ তা’আলার মতের অনুরূপ হয়েছে। তারা (পুরুষগণ) সংখ্যায় ছিল চার শত। লোকেরা তাদেরকে মেরে ফেলা সমাপ্ত করলে, তার ক্ষতস্থান হতে আবার রক্ত পড়া আরম্ভ হল এবং তিনি মৃত্যু বরণ করলেন।
সহীহ, ইরওয়া (৫/৩৮-৩৯)
আবূ সাঈদ ও আতিয়া আল-কুরায়ী (রাঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)
বর্ণনাকারীঃ জাবির ইবনু আবদুল্লাহ আনসারী (রাঃ)

সা’দ ইবনু মু’আয এই গণহত্যার রায় দেয়ায় আল্লাহ ও নবীর এতটাই প্রিয় হয়ে গিয়েছিলেন যে, তার মৃত্যুতে সেই কারণে আল্লাহর আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠেছিল!

গ্রন্থের নামঃ সহীহ বুখারী (ইফাঃ)
হাদিস নম্বরঃ [3531]
অধ্যায়ঃ ৫০/ আম্বিয়া কিরাম (আঃ)
পাবলিশারঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন
পরিচ্ছদঃ ২১২২. স্বাদ ইবন মু’আয (রাঃ) এর মর্যাদা
৩৫৩১। মুহাম্মদ ইবনু মূসান্না (রহঃ) … জাবির (রাঃ) বলেন, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি সা’দ ইবনু মু’আয (রাঃ) এর মৃত্যুতে আল্লাহ্ ত’আলার আরশ কেঁপে উঠে ছিল। আমাশ (রহঃ) … নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যাক্তি জাবির (রাঃ) কে বলল, বারা ইবনু আযিব (রাঃ) তো বলেন, জানাযার খাট নড়েছিল। তদুত্তরে জাবির (রাঃ) বললেন, সা’দ ও বারা (রাঃ) এর গোত্রদ্বয়ের মধ্যে কিছুটা বিরোধ ছিল, (কিন্তু এটা ঠিক নয়) কেননা, আমি নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে عَرْشُ الرَّحْمَنِ অর্থাৎ আল্লাহর আরশ সা’দ ইবনু মু’আযের (মৃত্যুতে) কেঁপে উঠল বলতে শুনেছি।
হাদিসের মানঃ সহিহ (Sahih)

সা’দ ইবনু মুআয এর মৃত্যুতে মুহাম্মদ এটিও বলেন যে, [20]

‘আল্লাহর ফিরিশতাগণ তাঁর লাশ উত্তোলন করেছিলেন’

গনিমতের মাল বণ্টন

নবী মুহাম্মদের পরোক্ষ নির্দেশেই বনু কুরাইজা গোত্রের সকল সাবালক পুরুষকে হত্যা এবং নারী ও শিশুদের দাস বানাবার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু সেইসব দাসদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল? তাদের কিছু অংশ নবী মুহাম্মদের নির্দেশেই বিক্রি করে সেই মূল্য দিয়ে অস্ত্র এবং ঘোড়া কিনেছিলেন নবী মুহাম্মদের অনুসারীরা।

গণহত্যা

রায়হানার গল্প

রায়হানা বিনতে শামউন বিন যায়িদ ছিলেন ইহুদি সম্প্রদায়ভূক্ত একজন নারী। তিনি পিতার দিক থেকে বনু নাদ্বীর গোত্রের এবং স্বামীর দিক থেকে বনু কুরায়জা গোত্রের মহিলা ছিলেন। বনু কুরায়জা গোত্রের আল-হাকাম ছিল উনার স্বামী। নবী মুহাম্মদ উনার পরিবারকে হত্যার পরে উনাকে দেখে মুগ্ধ হন এবং যথারীতি বিবাহের প্রস্তাব দেন। রায়হানা অত্যন্ত আত্মমর্যাদা সম্পন্ন নারী ছিলেন, তিনি উক্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বন্দীদশাকেই স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেন বলেই জানা যায়। পরবর্তীতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করে মুহাম্মদকে বিবাহ করেন বলেও কিছু কিছু সূত্র থেকে জানা যায়। তবে তিনি মুহাম্মদের যৌনদাসী বা রক্ষিতা হিসেবে ছিলেন বলেই অধিকাংশ আথেনটিক তথ্যসূত্র নিশ্চিত করে।

গণহত্যা
গণহত্যা

স্বজনশোকে পাগল এক নারীর গল্প

মুহাম্মদ যখন বাজারে শত শত মানুষকে লাইন ধরে দাড় করিয়ে জবাই করছিলেন, সেই সময়ে একজন নারী সম্ভবত, স্বজন হারাবার বেদনাতেই, পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিলেন আর নবীকে গালি দিচ্ছিল। সে জানতো, এই কারণে তাকেও হত্যা করা হবে, কিন্তু হাসতে হাসতেই তিনি মৃত্যুকে বেছে নিয়েছিলেন। যা দেখে আয়িশা নিতান্তই অবাক হয়ে যায়।

সুনান আবূ দাউদ (তাহকিককৃত)
৯/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ১২১. নারী হত্যা সম্পর্কে
২৬৭১। ‘আয়িশাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, বনী কুরাইযার কোনো মহিলাকে হত্যা করা হয়নি। তবে এক মহিলাকে হত্যা করা হয়। সে আমার পাশে বসে কথা বলছিল এবং অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিলো। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজারে তাদের পুরুষদেরকে হত্যা করছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি তার নাম ধরে ডেকে বললো, অমুক মহিলাটি কোথায়? সে বললো, আমি। আমি (‘আয়িশাহ) বললাম, তোমরা কি হলো, (ডাকছো কেন)? সে বললো, আমি যা ঘটিয়েছি সেজন্য (সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অশ্লীল ভাষায় গালি দিয়েছিলো)। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, তাকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হরো। আমি ঘটনাটি আজও ভুলতে পারিনি। আমি তার আচরণে অবাক হয়েছিলাম যে, তাকে হত্যা করা হবে একথা জেনেও সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিলো।[1]
[1]. হাসান।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)

সূনান আবু দাউদ (ইসলামিক ফাউন্ডেশন)
৯/ জিহাদ
পরিচ্ছেদঃ ১৫. মহিলাদের হত্যা সম্পর্কে।
২৬৬২. ‘আবদুল্লাহ্ ইবন মুহাম্মদ নুফায়লী (রহঃ) ….. আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, বনূ কুরাইযার মহিলাদের থেকে কোন মহিলাকে হত্যা করা হয়নি, কিন্তু একজন মহিলাকে (হত্যা করা হয়), যে আমার পাশে বসে কথা বলছিল এবং অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিল। এ সময় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের পুরুষদের এক বাজারে হত্যা করেছিলেন। তখন জনৈক আহবানকারী সে মহিলার নাম ধরে ডাকে যে, অমুক মহিলা কোথায়? তখন সে বলে, এই তো আমি। আমি (আয়িশা) তাকে জিজ্ঞাসা করিঃ তোমার ব্যাপার কি? তখন সে বলেঃ আমি একটা ঘটনা ঘটিয়েছি, (অর্থাৎ সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালি দেয়)। আয়িশাহ (রাঃ) বলেনঃ তখন সে (আহবানকারী) তাকে নিয়ে যায় এবং তার শিরচ্ছেদ করে। তিনি বলেনঃ আমি সেই ঘটনাটি এখনো ভুলতে পারিনি। কেননা তার আচরণে তাজ্জবের ব্যাপার এই ছিল যে, সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিল, অথচ সে জানত যে, তাকে হত্যা করা হবে।
হাদিসের মানঃ হাসান (Hasan)
বর্ণনাকারীঃ আয়িশা (রাঃ)

উপসংহার

উপরের আলোচনা থেকে এটি মোটামুটি পরিষ্কার যে, বনু কায়নুকা গোত্রের কিছু মানুষের অপরাধের কারণে নবী মুহাম্মদ তাদের গোত্রের সকল সাবালক পুরুষকে হত্যা করতেই চেয়েছিলেন। কিন্তু আবদুল্লাহ বিন উবাইয়ের কারণেই নবী এই কাজটি করতে সক্ষম হন নি। তাই নবী মুহাম্মদের পরিকল্পনা, যা ছিল আরব উপদ্বীপ থেকে মুসলিম বাদে সবাইকে উচ্ছেদ করা, নিশ্চিহ্ন করার প্রকল্পের অংশ হিসেবে তারা বনু কুরাইজা গোত্রকে আক্রমণ করে, এবং আগে থেকেই তাদের কী শাস্তি দেয়া হবে সেটি ঠিক করে রাখে। এরপরে বিচারের নামে যা হয়েছে তা নিয়ে উপরে সবকিছুই বর্ণনা করা হলো। পাঠক পুরো বিষয়টি বিচার বিবেচনা এবং বিশ্লেষণ করে বুঝবেন, এই গণহত্যা এবং এথনিক ক্লিনজিং কতটা মানবিক এবং কতটা নৈতিক। আল্লাহ এবং তার প্রেরিত নবীর পক্ষে এই ধরনের কাজ করা কতটা সঠিক ছিল, এবং এখন পর্যন্ত মুসলিমদের এই রকম কাজকে অনুসরণ, অনুকরণ করা কতটা সভ্য আচরণ!

তথ্যসূত্রঃ
  1. “Legal definition of genocide” (PDF). United Nations. Retrieved 22 February 2017 []
  2. News, VOA. “What Is Genocide?”. Voice of America. Retrieved 22 October 2017 []
  3. Convention on the Prevention and Punishment of the Crime of Genocide art. 2, 78 U.N.T.S. 277, 9 December 1948 []
  4. Rubenstein, James M. (2008). The Cultural Landscape: An Introduction to Human Geography. Pearson. ISBN 9780131346819 []
  5. সুনানে ইবনে মাজাহ, ১৪/৭১ []
  6. সহীহ মুসলিম, হাদীস একাডেমী, হাদিস নম্বর- ৩৭-(৩৭/২৩) []
  7. অপদস্থতার নিদর্শন জিযিয়া | তাফসীরে মাযহারী []
  8. লাঞ্ছিত অবস্থায় জিযিয়া |তাফসীরে ইবনে কাসীর []
  9. সহীহ মুসলিম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হাদিস নম্বরঃ ৪৪৪২ []
  10. সহীহ মুসলিম, (হাদিস একাডেমী, হাদিস নম্বরঃ ৪৪৮৬ []
  11. সূনান আত তিরমিজী [তাহকীককৃত], হুসাইন আল-মাদানী‏ পাবলিকেশন্স, হাদিস নম্বরঃ ১৬০৭ []
  12. সিরাতে রাসুলাল্লাহ (সাঃ)- ইবনে ইসহাক, অনুবাদঃ শহীদ আখন্দ, প্রথমা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৪০১ []
  13. Ibn Ishaq, The Life of Muhammad, Oxford University Press, 2007, p. 363 []
  14. সিরাতে ইবনে হিশাম, অনুবাদঃ আকরাম ফারুক []
  15. সিরাতে রাসুলাল্লাহ (সাঃ)- ইবনে ইসহাক, অনুবাদঃ শহীদ আখন্দ, প্রথমা প্রকাশনী, পৃষ্ঠা ৫০০ []
  16. আর-রাহীকুল মাখতূম, আল্লামা সফিউর রহমান মোবারকপুরী []
  17. সীরাতুন নবী (সা.)- ইবনে হিশাম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৩৩ [][]
  18. Mothers of all Palestinians should also be killed,’ says Israeli politician []
  19. Israeli MP says mothers of all Palestinians should be killed []
  20. জামে তিরমিযী, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ২২৫ []

3 thoughts on “বনু কুরাইজার গণহত্যা

  • October 7, 2020 at 5:44 PM
    Permalink

    চমৎকার লেখা। অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও ঝরঝরে ভাষায় অমানবিক এই ঘটনার বিরুদ্ধে একটি অকাট্য দলিল। পুরো ঘটনার খুঁটিনাটি হাদীস ও সীরাত গ্রন্থ দ্বারা প্রমাণিত সত্য অবলম্বনে লেখা হয়েছে। লেখাটি পড়ে বনু কুরাইজার সেইসব হতভাগ্য মানুষদের কথা ভাবলাম। তাদের স্ত্রীদের কথা ভাবলাম। এই নিষ্ঠুরতার কোন ক্ষমা ইতিহাস অন্তঃত করবে না, সেই প্রত্যাশা রাখি।

    Reply
  • October 10, 2020 at 6:07 AM
    Permalink

    এরকম সব ঘটনা গুলো সম্পর্কে লিখবেন আশা করি

    Reply
  • October 20, 2020 at 1:04 AM
    Permalink

    (১) কোরআন এবং হাদিসে থাকা অজস্র ভুল এবং
    অসংগতির কথা এখানে বলা হয়। আরো বলা হয় নবীর অমানবিক সব কর্মকাণ্ডের কথা। প্রশ্ন হল, লক্ষ লক্ষ মুসলিম দার্শনিক, মুফাসসিরে কোরআন-যারা কোরআন এবং হাদিস নিয়ে কাজ করেছেন, তাদের কাছে কেন এই অসংগতি গুলো ধরা পড়লো না? যদি ধরা পড়ে ও থাকে, কিসের আশায় তারা এগুলো তুলে ধরলেন না? আর যদি তুলে ধরে থাকেন, সেরকম কোন প্রখ্যাত মুফাসসিরে কোরআনের লেখার রেফারেন্স দেওয়া যাবে?
    (২) আমাদের দেশে করোনার পিক টাইমে ধর্মকে অনেকটাই কোনঠাসা অবস্থায় দেখতে পেয়েছিলাম। অনেককেই প্রকাশ্যে ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলতে দেখা গিয়েছিল, জনমনেও ধর্ম নিয়ে কিছুটা সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু, এখন খেয়াল করছি, ধর্ম নিয়ে বাংলাদেশে অন্যরকম একটা উন্মাদনার সৃস্টি হয়েছে। ফ্রান্সের ঘটনায় ৯৯℅ মানুষকে দেখছি কতলকারির সমর্থক হিসেবে, ধর্ষণের জন্য সরাসরি দায়ী করা হচ্ছে পোষাককে, ধর্ষণ প্রতিরোধে শরিয়া আইন প্রনয়নের দাবি জানানো হচ্ছে। হুজুররা করলে ঠিক ছিল, সাধারণ পাবলিকের ও দেখি একই দাবী! আপনাদের কাছে কি মনে হয়, এই দেশের জনগন হঠাৎ করেই কেন এত ধর্মপ্রাণ হয়ে উঠলো?

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *