প্রাচীন ভারতে নারী ও সমাজ

বৈদিক যুগে নারী

‘বৈদিক যুগ’ বলতে যদি আমরা ঋগ্বেদ ও বেদাঙ্গসূত্র-এর মধ্যবর্তী সময়কাল বুঝি, এবং যথাযথ বৈদিক যুগের সময়সীমা যদি সেটাই হয় তাহলে তার ব্যাপ্তি সতেরো থেকে আঠারোটি শতক।(১) অবশ্যই এই সময়ে নারীর অবস্থান আগাগোড়া এক ছিল না। ঋগ্বেদ-এর প্রাচীন অংশে আমরা দেখি, গ্রামকেন্দ্ৰিক যাযাবর পিতৃতান্ত্রিক সমাজে যতটুকু প্ৰত্যাশা করা যায়, নারী সেই মাত্রাতেই স্বাধীনতা ভোগ করছে।‘(২) নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নানা চিত্রকল্পের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে পড়ে। ঊষস অর্থাৎ ভোর এক রূপসী, সুসজ্জিত রমণী; তাকে সম্পূর্ণ বাধাহীন ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে: ‘শুচি ও সুন্দর ঊষস, রক্তবস্ত্ৰে সজ্জিতা যেন সদ্যস্নাত, মায়ের হাতে স্নেহভরে প্রসাধিতা এক কন্যা।’(৩) ‘হাস্যমুখী বধু যেমন স্বামীর সামনে নিজের রূপ উন্মোচিত করে তেমনি ঊষা তার রূপ উন্মোচিত করেন।‘(৪) এ ছাড়া তাকে নির্লজ্জাও বলা হয়েছে।(৫)এর থেকেই নারীর স্বাধীন বিচরণ বিষয়ে সমাজের বিরূপ মনোভাব প্রকাশ পায়। কিন্তু এই অংশটি ঋগ্বেদ রচনার অর্বাচীন সময়কার। ‘অগ্নি মানুষের স্তুতি তেমন ভাবেই উপভোগ করেন, যেমন ভাবে প্রেমিক পতি স্ত্রীকে উপভোগ করেন।’(৬) ‘আমাদের স্তুতি তোমাকে তেমনি ভাবে স্পর্শ করুক, যেমন ভাবে স্বামীর স্পর্শে স্ত্রীর কামনা জেগে ওঠে।’(৭) ‘অগ্নি স্বামীর দ্বারা সম্মানিত স্ত্রীর মতোই পবিত্র।’(৮) লক্ষ্য করা যেতে পারে, দেবতার পবিত্রতা মর্ত্য নারীর পবিত্রতার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। একের পর এক চিত্রকল্পে নারীর প্রতি প্রেম নিবেদনকারী পুরুষের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে ভক্তের ইষ্টদেবতার প্রতি আবেদনের।(৯) সূর্য উষার পিছনে পিছনে যান, যেমন পুরুষ যায় নারীর পিছনে। এমনকী পুরুষের প্রতি নারীর কামনাকেও খোলাখুলি ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।’(১০) সূর্য উষার উপপতি; ‘জারোন’–বারে বারে ব্যবহৃত এই অংশটির মধ্যে অবৈধ প্ৰণয়ের চিত্র বহুবার পাওয়া গেছে। পিতা ও কন্যার মধ্যে অবৈধ সম্পর্ক নাভানেদিষ্ঠ সূক্তের বিষয়।(১১) ভাইবোনের মধ্যে এই সম্পর্ক বিখ্যাত যম-যমী সংবাদ সূক্তের বিষয়।(১২) ‘নদীগুলি বিশ্বামিত্রের দিকে যায়, যেমন নারী নত হয় চুম্বনোদ্যত পুরুষের দিকে।’(১৩) ‘যেমন প্রিয়া পত্নী প্রেমিক স্বামীর মধ্যে আনন্দ পায়, হে ভক্ত, তুমিও যেন আমার মধ্যে সেই আনন্দ পাও।’(১৪) আবার ভক্ত ও ইষ্ট দেবতার তুলনা করা হচ্ছে মনুষ্যমিথুনের সঙ্গে। ঘৃতের ধারা সোমের দিকে যায়, যেমন সুসজ্জিতা সুন্দরী তরুণী যায় স্বামীর কাছে।’(১৫) অবিবাহিতা নারী তার স্বামী বেছে নিতে পারে।(১৬) গৃহে তার কী কর্তব্য সে সম্বন্ধে প্রাচীন সাহিত্যে স্পষ্ট ভাবে কিছু বলা নেই, শুধু বলা হয়েছে সে জল আনত এবং ক্ষেতের দেখাশোনা করত।(১৭) শতপথ ব্ৰাহ্মণ-এ বলা হয়েছে, সে পশম পাকাত (এবং হয়তো বুনতও)।(১৮) অবশ্যই বাড়িতে আরও অনেক কাজ তাকে করতে হত। ঋগ্বেদ-এ নারীদের যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করারও সাক্ষ্য আছে। তাই আমরা শুনি, মুদ্‌-গলিনীর যুদ্ধ জয়ের বৃত্তান্ত।(১৯) বিশ্‌পলা যুদ্ধে একটি পা এবং বধ্রিমতী একটি হাত হারান। বধ্রিমতী এবং শশীয়সী তাঁদের বীরত্বের জন্যও উল্লিখিত হয়েছেন। এর থেকে প্রাচীন বৈদিক যুগে নারীর কিছুটা সাম্য ভোগ করার সাক্ষ্য মেলে। দেবগণ ও পিতৃগণকে দৈনন্দিন জল দেওয়ার প্রসঙ্গে এমন তিন নারীর নাম পাই যাদের উদ্দেশ্যেও জল দেওয়া হত। তাঁরা হলেন গার্গী বাচক্লবী, বাড়বা আত্ৰেয়ী এবং সুলভ মৈত্ৰেয়ী।(২০) তাছাড়া বেদের ছয় অধ্যয়নের অন্তে উৎসর্গ দিবসে একটি অনুষ্ঠান হত; অন্যান্য শ্রদ্ধার্হদের মধ্যে বিশিষ্ঠপত্নী অরুন্ধতীকে আসন দেওয়া হত।

বিবাহের সময়ে বধূর মধ্যে পাঁচটি আকাঙ্ক্ষিত গুণ ছিল: বিত্ত, রূপ, শিক্ষা, বুদ্ধি এবং সদ্বংশ।(২১) কিন্তু মেয়েদের শিক্ষার অধিকার এক বিতর্কিত বিষয়। বহু অর্বাচীন একটি গ্রন্থে বলা হয়েছে, প্ৰাচীন কালে নারীর যজ্ঞোপবীত দিয়ে দীক্ষা হত; তার বাবা, কাকা বা দাদা র্তাকে বেদাধ্যাপনা করাতেন; তিনি গৃহেই আনুষ্ঠানিক ভিক্ষা করতেন এবং মৃগাজিন, বল্কল বা জটা ধারণ করতেন না।(২২) কিন্তু এই গ্ৰন্থ অনেক পরবর্তীকালের, এবং অনুমান হয় দ্বিতীয় প্রকারের নারী অর্থাৎ ব্ৰহ্মবাদিনীদের জন্য যমসংহিতা-র নিয়মের উপর ভিত্তি করে রচিত। অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য ধারণা বলে যা মনে হয়, তা হল, আৰ্য বসবাসের প্রথম কয়েকটি দশকে নারী তার উপনয়ন ও স্বাধ্যায়ের অধিকার হারায়নি, কিন্তু আর্যরা যখন অনার্য পত্নী গ্রহণ করতে শুরু করল, তখন সমাজ নারীর উপনয়ন ও স্বাধ্যায়ের অধিকার কেড়ে নিল। অতএব সাধারণ ভাবে নারী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হল। তবে এর ব্যতিক্রম অবশ্যই ছিল: দয়াল পিতারা বালবিধবা কন্যাদের শিক্ষা দিতেন; বিবাহের পূর্ব পর্যন্ত কুমারীদেরও শিক্ষা দিতেন। এই ব্যতিক্রমগুলির কথাই আমরা মাঝে মাঝে শুনি; তাদের মধ্যে আছেন বিশ্বব্যারা, ঘোষা, গোধা, অপালা। যাজ্ঞবল্ক্য বিদুষী কন্যা লাভের জন্যও একটি অনুষ্ঠানের নিয়ম বলেছেন।(২৩) ঋগ্বেদ একাধিক ঋষিকার বিষয়ে অবহিত; আমরা অস্তুণের কন্যা বাক-এর কথা জানি, যিনি বিখ্যাত ‘সোহহম’ তত্ত্বের ঋত্রি, যে তত্ত্ব উপনিষদেব শিক্ষা ও বেদান্তের বীজ। গার্গী এবং মৈত্রেয়ীও এর নিদর্শন। কিন্তু যে নারী যুক্তিসঙ্গত ভাবে তর্ক করতে পারে ও লব্ধপ্রতিষ্ঠ ঋষিকে তর্কে কোণঠাসা করে ফেলতে পারে, তার বিষয়ে সমাজের রক্ষণশীলতা প্রতিফলিত হয়। গার্গীর প্রতি যাজ্ঞবল্ক্যের অযাচিত তিরস্কারে: ‘আর প্রশ্ন কোরো না তোমার মাথা খসে পড়ে যাবে।’(২৪)

পরবর্তীকালে ব্যাকরণ গ্রন্থে একটি স্ত্রী প্রত্যয় যোগ করার নিয়ম করা হয়েছে যার ফলে শিক্ষয়িত্রীকে শিক্ষকের স্ত্রীর থেকে ভিন্ন করা যায়। ফলে আমরা কাশাকৃৎস্না আপিশলার সঙ্গে পরিচিত হই, যিনি মীমাংসা ও ব্যাকরণে পারদর্শী ছিলেন। আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, কবে শিক্ষার অধিকার এমন ভাবেই কেড়ে নেওয়া হল যে নারীর শিক্ষার উচ্চাকাঙ্ক্ষা সম্পূর্ণ লোপ পেয়ে গেল; কেন এবং কবে উপনয়নের অধিকার কেড়ে নেওয়া হল, স্বাধ্যায় নারীর কাছে অগম্য হয়ে গেল এবং যে ব্যতিক্রম পাওয়া যায় তা প্ৰাদেশিক বংশগত মাত্ৰ।(২৫) আমরা শুনতে পাই যে শিক্ষিতা নারী আসলে পুরুষই, যদিও শিক্ষিতা বধূর আকাঙ্ক্ষা ছিল। এ থেকে স্পষ্টই নারীর শিক্ষা বিষয়ে সমাজের দৃঢ় আপত্তির প্রতিফলন পাওয়া যায়।

ধীরে ধীরে, কিন্তু নিশ্চিত ভাবেই নারীর নির্বাসন হচ্ছিল গৃহকর্মে; সে বন্দি হচ্ছিল অন্তঃপুরে। যদিও ঋগ্বেদ-এর একটি সূত্রে নববধূকে আশীৰ্বাদ করা হয়েছে ‘তোমার শ্বশুর কুলের সবার সম্রাজ্ঞী হও।‘(২৬) তা সত্ত্বেও অথর্ববেদ-এ বলা হয়েছে, সূর্যোদয়ের সময়ে তেমনি ভাবেই প্রেতেরা পালায়, যেমন ভাবে পুত্ৰবধু শ্বশুরের কাছ থেকে পালায়।’(২৭) ঋগ্বেদ-এর আশীৰ্ব্বাদ সদিচ্ছামাত্র, বাস্তবতার বিরোধী বলেই তাকে এ ভাবে প্ৰকাশ করা হয়েছে; বাস্তব জীবনে নারী তার স্বাধীনতা আগেই হারিয়েছে এবং অথর্ববেদের পরিস্থিতির দিকে চলেছে। এও আবার এক প্ৰহেলিক; কেমন করে, কেন এবং কবে এই বিবর্তন ঘটিল; এর পিছনে সামাজিক-অর্থনৈতিক, ধাৰ্মিক-সাংস্কৃতিক কী কী শক্তি কাজ করছিল তা অনুসন্ধানের বিষয়।

শোনা গেছে, নারীর স্থান গৃহে। বাইরের জীবন বলতে যা কিছু সে এক সময়ে ভোগ করেছে, ভারতীয় মাটিতে আর্যেরা বসতি করার পর আনুমানিক দুই শতক অবধি সেই স্বাধীনতাটুকু তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের সব অধিকারের সঙ্গেই সে হারিয়েছে। তার মনের উপর কোনও অধিকার নেই, এমনকী নিজের শরীরের উপরেও না।(২৮) সে যেহেতু শিক্ষার অধিকার হারিয়েছে, তার জীবন দুটি ভাবে বিভক্ত: প্রথম, পিতৃগৃহে কয়েক বছর, এবং দ্বিতীয়, বয়ঃসন্ধির পর (পরবর্তীকালে বয়ঃসন্ধির পূর্বেই) যখন তাকে সম্প্রদান করা হত এবং বাকি জীবনটা শ্বশুরালয়ে কাটত। বিবাহিতা নারী কোনও অবস্থাতেই পিতৃগৃহে ফিরে সেখানে থাকতে পারত না, কারণ তাতে কলঙ্ক হয়। বেদাঙ্গের গ্রন্থকাররা কঠোর ভাবে তার ফিরে আসার নিন্দ করেছেন।(২৯) অবিবাহিতা নারীদেরও নিচু চোখে দেখা হত, সম্ভবত সামাজিক ভাবে তাদের একঘরে করে রাখা হত। এমনকী ঋগ্বেদ-এও বয়স্কা কুমারীদের উল্লেখ আছে, যারা পিতৃগৃহে বৃদ্ধ হয়ে যায়।’(৩০) এর সাক্ষ্য বহন করে ‘কুলপা’— গৃহে পালিতা, ‘অমাজু’, আমাজুর’— যে গৃহে বৃদ্ধ হয়ে যায়, ‘বৃদ্ধকুমারী’ এবং জরৎকুমারী’— আইবুড়ি, ইত্যাদি। সুতরাং পরে বিবাহ যেমন আবশ্যিক হয়ে উঠেছিল, ততটা তখন ছিল না। মেয়েদের শরীরে কোনও খুঁত থাকলে যৌতুকের প্রয়োজন হত।(৩১) এর থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, নারী এর মধ্যেই এক দায় বলে গণ্য হয়েছে। বৃদ্ধ বয়সী কুমারীত্ব যুগের সঙ্গে অপ্রচলিত হয়ে পড়ে।

ঋগ্বেদ-এর যুগে সম্ভবত বিধবারা বেঁচে থাকত, কখনও কখনও তাদের দেবরের সঙ্গে বিবাহ হত। একটি সূক্ত থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যেখানে স্বামীর মৃত্যুর পর এক নারী তার পাশে শুয়ে থাকে, তখন এক পুরুষ (সম্ভবত দেবর, ভাষ্যে বলা হয় গুরু বা প্রাচীন দাস) তার হাত ধরে জীবিতের রাজ্যে প্রবেশ করে বংশবৃদ্ধি করতে অনুরোধ করে।(৩২) এখানে দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, স্বামীর চিতায় মত্যুর ইচ্ছা অনুকরণ করে তাকে সেখান থেকে আবার জীবনে ফিরিয়ে আনা। গ্রন্থের পটভূমিকা থেকে মনে হয়, সতীদাহের রেওয়াজ জানা ছিল এবং সম্ভবত কোথাও কোথাও তা অনুষ্ঠিতও হত। অথর্ববেদের একটি সূত্রে এর সাক্ষ্য পাওয়া যায়: ‘জীবিত নারী মৃতের বন্ধুরূপে গৃহীত হচ্ছে, অথবা ‘এই নারী তার স্বামীর দেশে চলেছে, সে প্রাচীন রীতিই অনুসরণ করছে।’(৩৩) এই রীতি কত প্রাচীন ছিল? কোথায় কখন এবং কেন তা প্রচলিত ছিল? দেওরালার ঘটনা যে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় সে কথা বোঝার আগে এ বিষয়ে গবেষণা প্রয়োজন। ইন্দো-ইউরোপীয়রা সতীদাহ করত না; হোমার, ভাৰ্জিল, নিবেলুঙ্গলিয়েড ও বীরগাথা থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। একি তবে দেশীয় রীতি, সিন্ধুসভ্যতার রীতি? কিন্তু বিধবা বেঁচে থাকলেও তার জীবন খুব সুখের ছিল না; একটি মন্ত্রে বলা হয়েছে, ‘আমি যেন ইন্দ্রাণীর মতো অবিধবা থাকতে পারি।’(৩৪) এ শুধু তার পতি প্রেমের অভিব্যক্তি নয়; কিন্তু কোনও পুরুষের বিপত্নীক না হওয়ার প্রার্থনার নিদর্শন কোথাও পাওয়া যায় না।

নারীর বহুবিবাহও একেবারে অজ্ঞাত ছিল না; অথৰ্ববেদে বলা হয়, ‘যে নারীর পূর্বে স্বামী ছিল, সে যদি দ্বিতীয় পরিগ্রহ করে, তাহলে তাকে পঞ্চোন্দন অর্থদান করতে হয়।’(৩৫) অথবা, ‘যে নারীর দশ স্বামী আছে, সেও যখন ব্ৰাহ্মণ স্বামী গ্ৰহণ করে, সেই ব্ৰাহ্মণই তখন তার প্রকৃত স্বামী, রাজন্য ও বৈশ্য স্বামীরা নয়।’(৩৬) গ্রন্থগুলিতে বিধবা বিবাহের বিকল্প অর্থ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু নারীর বহু বিবাহ এবং বিধবা বিবাহ–দুটি ক্ষেত্রেই এই অংশগুলিতে নারীর যে অধিকারের ইঙ্গিত আছে, তা সে পরে হারিয়েছিল। তা কবে এবং কেন?

গণিকাবৃত্তিকে বলা হয় পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন পেশা এবং বেদে নানা নামে গণিকার পরিচয় মেলে: হস্ত্ৰা, অগ্রূ,(৩৭) সাধারণী ও সামান্যা,(৩৮) পুংশচলী,(৩৯) রজয়িত্রী,(৪০) অতিস্কন্দ্ৰরী, অপস্কদ্বরী।(৪১) পরে নামগুলির সংখ্যা আরও বেড়েছে, এবং এদের অধিকার, কর্তব্য এবং সামাজিক অবস্থান আরও স্পষ্ট ভাবে চিহ্নিত হয়েছে।(৪২)

নারীহরণের উল্লেখও পাওয়া যায়। ঋগ্বেদের একটি সূত্রে জনৈক পুরুষ তার প্রেমিকার আত্মীয়দের মতের বিরুদ্ধে —তবে অনমান করা যায়। তার নিজের মতানুসারে–প্রেমিকাকে অপহরণ করার সময়ে প্রার্থনা করে ফেন সমস্ত পরিবার প্রেমিকার ভাইয়েরা, তার আত্মীয়েরা এমনকী কুকুরগুলো পর্যন্ত গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে পড়ে, যাতে সে নির্বিঘ্নে প্রেমিককে নিয়ে পালাতে পারে।’(৪৩) পুরুমিত্রের কন্যাকে নিয়ে বিনদের পালানোর কথা জানা যায়।(৪৪) নারীর বহুবিবাহ যদিও সংখ্যায় কম এবং ব্যতিক্ৰমী চরিত্রের–অন্তত লিখিত নিদর্শন যেটুকু পাওয়া যায়–কিন্তু পুরুষের বহুবিবাহ সাধারণ ব্যাপার। পুরুষের দুটি বিবাহের সমর্থনে এক যন্ত্রীয় অনুষ্ঠানের ছদ্মযুক্তি পাওয়া যায়: ‘যেহেতু দুটি বস্ত্ৰখণ্ড একটি দণ্ডকে বেষ্টন করে থাকে, বিপরীতটি হয় না, অতএব নারীর দুই স্বামী থাকতে পারে না, কিন্তু পুরুষের দুই স্ত্রী হয়।’(৪৫) রাজা বৈধ ভাবেই চারটি মহিষী রাখতে পারতেন।(৪৬) তার পরেও যত খুশি বিবাহ করতে পারতেন এবং তার অন্তঃপুরে নানা প্রকৃতির উপপত্নীও রাখতে পারতেন। ইন্দ্ৰিয়গুলি দিয়ে দ্বিতীয় পত্নীকে ভোগ করা যায়–তাই প্রত্যেক পুরুষের দুটি করে পত্নী ভোগ করার ক্ষমতা আছে।’(৪৭) যদিও পুরুষের একাধিক পত্নী থাকে, এক নারীর পক্ষে এক স্বামীই যথেষ্ট।’(৪৮)

একটি অত্যন্ত ইঙ্গিতবহ অংশে বলা হয়, সমৃদ্ধি সেই পুরুষেরই যার পশুপালের চেয়ে স্ত্রীরা সংখ্যায় কম।’(৪৯) লক্ষণীয় যে, ধনের অর্থে পশুপাল ও স্ত্রীর কথা এক নিঃশ্বাসে বলা হয়েছে। ধনীর পশুপালের সঙ্গে যখন তুলনা হচ্ছে, তখন তার স্ত্রীর সংখ্যা যে কত তা কল্পনাতীত। এক পুরুষের অনেক স্ত্রী থাকত।(৫০) এমনকী ঋগ্বেদেও পুরুষের বহুবিবাহের কথা শুনি।(৫১) মৈত্ৰায়ণী সংহিতা-য় মনুর দশ পত্নীর উল্লেখ আছে। তৈত্তিরীয় সংহিতা-য় সাতাশ পত্নীর স্বামী চন্দ্রের রোহিণীর প্রতি পক্ষপাতের জন্য শাস্তির বিবরণ আছে।(৫২) বলা বাহুল্য, সাতাশটি পত্নীর বিবরণ সমাজের অতি পরিচিত বাস্তব চিত্রের একটি পৌরাণিক প্রতিফলন মাত্র। সাধারণ ভাবে নারীর তপস্যা করার কথা নয়; একমাত্র স্বামীলাভের জন্য তপস্যা তার ব্যতিক্রম।(৫৩)

বিবাহ অধিকাংশ নারীর পক্ষে আবশ্যিক; এক বিবাহে নারীকে শুধু এক ব্যক্তির হাতে দেওয়া হয় না, দেওয়া হয় ‘পরিবারকে’,(৫৪) ফলে গোটা পরিবারেরই তার উপর অধিকার জন্মায়। বিবাহে বধু বরের তুলনায় নিকৃষ্ট; স্বামীর পরিবারের প্রতি তার প্রচুর কর্তব্য; কিন্তু তার পরিবারের প্রতি স্বামীর কোনও কর্তব্য নেই। সে শুধু স্বামী ও সন্তানদের সেবা করে না, শ্বশুরবাড়ির সব আত্মীয়দেরই সেবা করে। ‘তাকে অন্তঃপুরে অবরুদ্ধ থাকতে হবে, না হলে তার শক্তিক্ষয় হয়।‘(৫৫) প্রশ্ন করার বাসনা হয়, এ কোন শক্তি যা শুধুমাত্র অবরোধে থাকলেই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়? ‘সতী স্ত্রী সে-ই যে স্বামীকে তুষ্ট করে, পুত্রসন্তানের জন্ম দেয় এবং স্বামীর মুখের উপর জবাব দেয় না।’(৫৬) ‘পুরুষের সম্মুখে স্ত্রীর ভোজন উচিত নয়।’(৫৭) শোনা যায়, স্ত্রী যজ্ঞের উত্তরার্ধ,(৫৮) কিন্তু ধর্মাচরণে স্ত্রীর স্বাতন্ত্র্য নেই’,(৫৯) স্ত্রী মন্ত্রোচ্চারণ করতে পারে না। তার উপস্থিতি যজ্ঞে আবশ্যক, কিন্তু সে সেখানে পুতুলমাত্র।(৬০) ‘সে যজ্ঞে আহুতি দিতে পারবে না।’(৬১) সে সভায় উপস্থিত থাকতে পারত না,(৬২) মধুপান করতে পারত না। ‘সে মধু খায় না, বলে–আমি আমার পুত্রদের জন্য এই ব্ৰতপালন করলাম।’(৬৩) তার প্রধান কর্তব্য পুত্রের জন্ম দেওয়া(৬৪) এবং সে যদি তা না পারে তবে তাকে ত্যাগ করা যায়।(৬৫) অন্যান্য গ্রন্থে বলা হয়, স্ত্রী কলহপরায়ণা, অশুচি, ধর্ষিতা বা চৌর গৃহীতা হলেও ‘তাকে ত্যাগ করা যাবে না।’(৬৬) ‘যে স্ত্রী ভ্ৰষ্টা, সেও প্ৰায়শ্চিত্তের দ্বারা পবিত্র হতে পারে।’(৬৭) ‘যে স্বামী স্ত্রীকে ত্যাগ করে তার কঠোর দণ্ড হতে পারে, কিন্তু যে স্ত্রী স্বামীকে ত্যাগ করে, প্ৰায়শ্চিত্তের দ্বারা তার শুদ্ধি হয়।’(৬৮) ‘যে স্বামী স্ত্রীর প্রতি কটুভাষণ করে, তাকে উপবাস ও প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়।’(৬৯) বন্ধ্যা নারী দশ বছর পরে আইনত পরিত্যাজ্য হত, যে নারী মৃত্যুবৎসা বা শুধু কন্যাসন্তানের জন্ম দেয়, সে বারো বছর পর পরিত্যাজ্য হত, এবং কলহপরায়ণা তৎক্ষণাৎ পরিত্যাজ্য।’(৭০) লক্ষণীয় যে বশিষ্ঠ ধর্মসূত্র অনুসারে কলহপরায়ণা স্ত্রীও অপরিত্যাজ্য।(৭১) সেখানে যে স্বামী ধৰ্ষিত স্ত্রীকেও ত্যাগ করে, তার জন্য কঠোর দণ্ডের বিধান আছে। কিন্তু মহাকাব্য বা পুরাণে যে রকম নিদর্শন পাওয়া যায়, তাতে দেখা যায়, স্ত্রীর কোনও রকম চারিত্রিক বিচূতি থাকলে, বা সে বিষয়ে সন্দেহ থাকলেও তাকে অবশ্যই ত্যাগ করা হত। সমাজে কন্যাসন্তানের পরিস্থিতি অতিরিক্ত প্রকট হয়ে পড়ে, শুধুমাত্র কন্যাসন্তানের জননীর কঠিন শাস্তি পাওয়ার বিষয়ে নিয়মগুলি থেকে। একটি সোমযাগে কয়েকটি যজ্ঞপাত্র মাটিতে রাখা হয়, কয়েকটি উপরে তুলে ধরা হয়: ‘সুতরাং সদ্যোজাত কন্যাসন্তান মাটিতে রাখা হয়, পুত্রসন্তান উপরে তুলে ধরতে হয়।’(৭২) অতএব নারীকে সামাজিক ভাবে নিচু করে দেখার যে সহজাত প্রবণতা, সেটা জন্মক্ষণ থেকেই পরিস্ফুট এবং একটি কু-তর্কের সাহায্যে তার একটি ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। বিবাহেও সে তার দাম্পত্যজীবন শুরু করে নিচু হয়েছে; পরিচিত বিবাহের মন্ত্রে স্বামী বলেন, ‘তোমার হৃদয় আমার ব্ৰতে নিহিত হোক, তোমার চিত্ত আমার চিত্তকে অনুসরণ করুক।’(৭৩) লক্ষণীয় যে, তাকে তার ব্যক্তিত্ব স্বামীর ব্যক্তিত্বে সম্পূর্ণরূপে ডুবিয়ে দিতে হতো। ‘স্বৰ্গ ধ্রুব, পৃথিবী ধ্রুব…স্ত্রী যেন স্বামীর পরিবারে ধ্রুব হয়।’(৭৪) যে জিনিসটা খুব প্রকট ভাবে অনুপস্থিত, তা হল তার প্রতি ধ্রুব হওয়ার, তার মানসিক ভাবগত প্রয়োজনগুলি মেটাবার বিষয়ে তার স্বামীর কোনও প্রতিশ্রুতি। তাকে ব্যবহার করা হয় একটি অসাড়, চিত্তহীন পদার্থী হিসেবে, যার অস্তিত্বে একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে তার স্বামীর তুষ্টিসাধন করা। ‘স্ত্রী স্বামীর অনুগামী হবে।’(৭৫) ‘নারী তার স্বামীর পথে চলবে।’(৭৬) নারীকে শৈশবে পিতা রক্ষা করেন, যৌবনে স্বামী রক্ষা করে, বার্ধক্যে পুত্র রক্ষা করে; স্ত্রীর স্বাতন্ত্র্যের অধিকার নেই।’(৭৭) অগ্নিপত্নীবৎ— অনুষ্ঠানে যেমন হবিকে লাঠি দিয়ে পেটানো হয়, ‘ঠিক তেমন ভাবেই পত্নীকে প্রহার করা উচিত, যাতে তার নিজের শরীরের উপর বা সম্পত্তির উপর কোনও অধিকার না থাকে।’(৭৮) তার যে সম্পত্তির অধিকার ছিল না, অন্য অনেক গ্রন্থ থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়–এবং এখান থেকে এবং অন্য আরও গ্রন্থ থেকে–পরিষ্কার হয় যে, তার নিজের দেহ তার নিজের নয়। মান্যবর যাজ্ঞবল্ক্য বলেছেন, স্ত্রী যদি স্বামীর সম্ভোগ কামনা চরিতার্থ করতে অস্বীকার করে, তাহলে স্বামী প্ৰথমে কোমল ভাবে তাকে বোঝাতে চেষ্টা করবে, তার পরে উপহার দিয়ে তাকে কিনে নিতে চেষ্টা করবে (অবক্ৰীণীয়াৎ) এবং তারও পরে স্ত্রী রাজি না হলে হাত দিয়ে বা লাঠি দিয়ে মেরে তাকে বশ করবে।’(৭৯)

বরুণপ্রঘাস যজ্ঞে যজমানের পত্নীকেই প্রকাশ্য ভাবে তার ব্যভিচারের বৃত্তান্ত স্বীকার করতে হত।(৮০) যজমান নিজে যজ্ঞের জন্য দায়ী হলেও তাকে কোনও লজ্জাকর প্রশ্ন করা হত না। বস্তুত যজমানকে দীক্ষার দিনটুকুই শুধু গণিকার সঙ্গে এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। পরের দিন তাকে পরস্ত্রীর সঙ্গ এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে, এবং যজ্ঞের দিন তার নিজের স্ত্রীর সঙ্গ তাকে এড়াতে বলা হয়েছে।(৮১) পুরুষের যৌনজীবনে বিচূতিগুলির বিষয়ে সমাজের ক্ষমাশীল মনোভাব লক্ষ্য না করে উপায় নেই। কিন্তু সেই সমাজ বিবাহিত নারীর বিচূতির বিষয়ে অবিশ্বাস্যরকম নিষ্ঠুর; তার জন্য বিহিত শাস্তি অত্যন্ত বীভৎস, জুগুঙ্গাজনক এবং তা উচ্চারণ করার পক্ষে বড় বেশি নির্মম।(৮২) এবং এটি যে প্রয়োগ করা হত না, এ রকম মনে করার আমাদের কোনও কারণ নেই, সাহিত্যে এর অনুল্লেখের কারণ, স্পষ্টতই এর মধ্যে অন্তর্নিহিত হযে আছে যে কুৎসিত অত্যাচার স্পৃহা, তাই। গৃহে স্ত্রীর স্থান স্বামীর নিচে,(৮৩) সে সব সময়ে স্বামীর অনুগামিনী হবে।(৮৪) স্বামীকে বলা হয়েছে, খাবার পরে স্ত্রীকে উচ্ছিষ্টটি দিতে।(৮৫) এই স্পষ্ট উক্তির কোনও ভাষ্য প্রয়োজন হয় না, এবং তার মধ্যে দিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে। পুংসবন নামে গৰ্ভধারণের যে অনুষ্ঠানটি আছে, তার উদ্দেশ্য পুত্রসন্তান লাভ করা। অথর্ববেদে পুত্রসন্তানের জন্মের জন্য একটি মন্ত্র আছে।(৮৬) স্পষ্টতই সমাজ সম্পূর্ণ গুরুত্ব দিত পুত্রসন্তানের উপর। ‘স্ত্রী সঙ্গিনী, কন্যা অভিশাপ, পুত্ৰ স্বৰ্গে আলো।’(৮৭) প্রথম অংশটি কিছুটা বিভ্রান্তিকর, এর ফলে আমাদের বিশ্বাস করতে স্পৃহা হয় যে স্ত্রীকে সঙ্গী হিসেবে দেখা হত। অপর একটি অনুরূপ অংশে আছে, ‘স্ত্রী পুরুষের অপরার্ধ’এটিও সমাজের নারী সম্বন্ধে মনোভাবের বিষয়ে আমাদের আশঙ্কাকে শান্ত করে, কিন্তু এর পরে বলা হয়েছে, ‘সুতরাং যতদিন কারও স্ত্রী সংগ্ৰহ না হয়, তার সন্তান আসে না।’(৮৮) অতএব পুত্রসন্তান লাভের প্রয়োজনেই স্ত্রীর মূল্য। একের পর এক গ্রন্থে তার মানবিক অধিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। উপরন্তু ‘যার স্ত্রী নেই সে যজ্ঞে অনধিকারী।’(৮৯) পুরুষের অধিকার আছে একাধিক পত্নীকে বিবাহ করার, অসংখ্য উপপত্নী রাখার এবং গণিকার কাছে যাওয়ার, স্ত্রীর কিন্তু উপপতি রাখার অধিকার নেই; স্ত্রীর উপপতিকে ধ্বংস করার জন্য উপচার ক্রিয়ার বিধান আছে।(৯০) কিছু কিছু গ্রন্থে অবশ্য স্ত্রীকে প্রতারণা করে অপর রমণীর কাছে যাওয়ার জন্য স্বামীর নিন্দা করা হয়েছে: ‘সে গর্দভের চামড়া দিয়ে নিজেকে ঢেকে ভিক্ষা করবে এবং নিজের অপরাধের কথা ঘোষণা করে ঘুরে বেড়াবে।’(৯১) কিন্তু সাহিত্যে এ রকম প্ৰায়শ্চিত্তের একটি ঘটনাও বর্ণনা করা হয়নি, যদিও অসতী বা আপাত অসতীর কঠোর–কখনও নির্মম–ভাবে শাস্তি পাওয়ার নিদর্শন আছে।

নারী নিজেই পাপ। কতটা? ‘অমৃতকে দেখবে না, অর্থাৎ নারী, কুকুর ও কালো পাখি দেখবে না; অন্যথায় পুণ্য ও পাপ জ্যোতি ও অন্ধকার সত্য ও মিথ্যা মিশে যাবে।‘(৯২) ‘স্ত্রীলোক রাত্রে তার স্বামীকে মুগ্ধ করে নিজের ইষ্ট সিদ্ধি করে নেয়।’(৯৩)

এমনকী যজুৰ্বেদ-এর সময়েও শুনি, ‘নারী মিথ্যা, দুৰ্ভাগ্য, সে মদ বা জুয়ার মতো ব্যসন মাত্ৰ।‘(৯৪) গর্ভাবস্থার পূর্বে নারীর জন্য কোনও যজ্ঞকর্মের বিধান নেই, এখনও পুত্রসন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য এবং তার জন্মের পূর্বে ও পরে তার মঙ্গল কামনায় পুংসবন অনুষ্ঠান। যে যজ্ঞে তার উপস্থিতি থাকে, সেখানেও মন্ত্র ছাড়াই তার কাজ অনুষ্ঠিত হয়। বৈদিক সমাজের নারীর প্রতি মনোভাব সবচেয়ে পরিস্ফুট ভাবে প্রমাণিত হয় একটি বেদাঙ্গ সূত্রে ‘(মাত্র একদিনের কৃচ্ছসাধন) কালো পাখি, শকুনি, নেউল, ছুঁচো, কুকুর, শূদ্র ও নারী হত্যার জন্য প্ৰায়শ্চিত্ত।‘(৯৫) সামগ্রিক ছবিটা ঊনমানব এবং সম্পূর্ণভাবে পাপের। তাই তাকে যে নিম্নশ্রেণির জীব বলে গণ্য করা হয় তা কিছু বিচিত্র নয়। অতএব, ‘সর্বগুণসমন্বিতা নারীও অপকৃষ্টতম পুরুষের চেয়ে নিকৃষ্ট।‘(৯৬)

সমাজে নারীর স্থান ঊনমানবীর, তাকে শুধু ভোগের সামগ্ৰীরূপে দেখা হত। তার দেহ, তার শ্রম তার প্রভুর ভোগের জন্য। তাই তাকে বন্ধক রাখা যেত, কেনা যেত, বিক্রি করা যেত; যজ্ঞের দক্ষিণা হিসাবে, যৌতুক হিসাবে বা অতিথির উপহার হিসাবে দানও করা যেত। শাস্ত্ৰে স্পষ্টই বলা হয়েছে, ‘নারী সম্ভোগ আনে।‘(৯৭) তাছাড়া, পশু, ভূমি ও নারীর অতিভোগ নয়।(৯৮) সারস্বতস্বস্তয়ন নামক যজ্ঞের দক্ষিণা একটি ঘোটকী এবং একটি সন্তানবতী দাসী।(৯৯) অন্য অনেক যজ্ঞেই নারী দক্ষিণা হত, মহাকাব্যে যার প্রমাণ পাওয়া যায়। এই নারীদের শ্রেণিভাগ ছিল কুমারী, সধবা, সন্তানবতী বা নিঃসন্তানরূপে। কারা পেত তাদের? পুরোহিতেরা। তারা এত নারী নিয়ে কি করত? তাদের মধ্যে কারওকে গ্রহণকর্তা ভোগ করত, বাকিদের মধ্যে কারওকে দান করত, কারওকে বিক্রি। কেউ কেউ আবার সমাজের নানা অন্ধকার এলাকায় আঁকাবাঁকা পথে ঘুরে শেষ পর্যন্ত উপস্থিত হত বেশ্যালয়ে।

এর থেকে নারীর যে দ্ব্যর্থহীন চিত্র বেরোয় তাতে নারীকে মূলত ঊনমানবী হিসাবে দেখা হয়, যার জীবনে একমাত্র উদ্দেশ্য পুরুষকে তার যৌবন, রূপ, লাস্য এবং গৃহকর্মে তার শ্রম দিয়ে তুষ্ট করা। সেই পুরুষ ও তার আত্মীয়স্বজনকে তার নম্র হয়ে সেবা করতে হবে, কাজে বা কথায় তাদের কোনও প্রতিবাদ না করে। নিজের শরীরের উপরে তার কোনও অধিকার নেই; তার সম্পত্তি অর্জন বা ভোগ করার অধিকার নেই, এমন কি স্বামীর সম্পত্তিতেও অধিকার নেই।(১০০) সে তো নিজেই একটি সম্পত্তি, কি করে সে কোনও রকমের সম্পত্তি অর্জন বা ভোগ করবে? অবশ্যই কিছু কিছু ব্যতিক্রম ছিল। অবশ্যই এমন স্বামী ছিল যারা স্ত্রীকে সম্মান করে, ভালবাসে, তার যত্ন নেয়।(১০১) কিন্তু তা তো ব্যতিক্রম; এবং ব্যতিক্রমই নিয়মকে প্রমাণ করে। এবং এই নিয়ম পূৰ্ণমাত্রায় নারীর মানুষ হিসাবে গণ্য হওয়া ও মানবিক অধিকার পাওয়ার বিরোধী।

বলা হয়েছে, ‘সুন্দরী নারী স্বামীর প্রিয় হয়।‘(১০২) প্রথমত সব নারী সুন্দর নয়; সাধারণ চেহারার নারী কি স্বামীর প্ৰেম পেত না? আবার সুন্দরী বধু যখন বয়স, বহু-প্রসব এবং সাংসারিক শ্রমের ফলে তার রূপ হারিয়ে ফেলত, তখন কী হত? এর উত্তরের ইঙ্গিত আছে বিবাহ অনুষ্ঠানে বরের উচ্চারিত একটি মন্ত্রে: ‘এস আমরা মিলিত হই, যেন পুত্রসন্তান উৎপন্ন হয়, যে সন্তানদ্বারা সম্পত্তিবৃদ্ধি হবে।’(১০৩) এই মন্ত্রেই বলা হয়েছে, ‘আমি যেন পুত্র, পৌত্র, দাস, শিষ্য, বস্ত্ৰ, কম্বল, ধাতু, বহু ভাৰ্যা, রাজা, অন্ন ও নিরাপত্তা লাভ করি।’ যখন চিন্তা করি যে, এই মন্ত্র দম্পতির নতুন জীবন শুরুর প্রতীক, এবং নববধূর উপস্থিতিতেই তা উচ্চারিত হচ্ছে, তখন বহু ভাৰ্যার’ জন্য এই প্রার্থনা প্রয়োজনে বিনিময়যোগ্য ভোগ্যবস্তু হিসাবে নববধূর স্থান খুব প্রকট করেই তালে। পরিস্থিতির চাপে যখন তার রূপ বা প্রয়োজনীয়তার অভাব ঘটত, তখন সহজেই তার জায়গায় অন্য কাউকে আনা যেত। তার সন্তানেরা বড় হয়ে যাওয়ার পরও তা ঘটতে পারত; তাদের পিতা একটি তরুণী ও অধিকতর সুন্দরী সপত্নীকে এনে তাদের মা-কে অপমান করতে পারত। ঋগ্বেদ থেকে শুরু করে আমরা সপত্নী বশ করার মন্ত্র পাই। পুরুষের সামাজিক সমৃদ্ধি বিচার হত তার পত্নীর সংখ্যা দিয়ে, যেমন তার পশু বা দাস তার সমৃদ্ধির প্রতীক। যে পুরুষেরা বহু পত্নী রাখার মতো সমৃদ্ধ ছিল না তারা বেশ্যালয়ে যেত; প্রাচীনতম যুগ থেকে সমাজে বেশ্যার উপস্থিতির প্রমাণ সাহিত্যে মেলে। পরিত্যক্তা পত্নী, ধর্ষিতা কুমারী, ক্রীতদাসী এবং লুষ্ঠিতা মেয়েরা তাদের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলেছিল। প্রাচীন ভারতে তারাই ছিল নারী সমাজের একটিমাত্র শ্রেণি যারা সরকারি খরচে আনন্দ দিত যা তাদের শিক্ষা-বঞ্চিতা পত্নীরা পারত না। নিজের বাড়ির বাইরে পুরুষদের আনন্দ দেওয়ার ব্যবস্থা করে সমাজ পত্নীকে এমন এক অন্ধকার কোণে ঠেলে দিয়েছিল, যেখানে সে তার কর্তব্য পালন করত বিনা কৃতজ্ঞতায়, এবং যেখানে তার সামান্যতম ক্রটির কঠোর শাস্তি মিলত। কখনওই ভুলে গেলে চলবে না যে, ‘সতী’ শব্দটির বিশিষ্ট অর্থে কখনও পুংলিঙ্গ পর্যায় শব্দ নেই। সতীত্ব পুরুষের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হত না; তা শুধু নারীর একার বিশেষ কর্তব্যকর্ম।

যে প্রশ্নগুলি উত্তর দাবি করে, তা হল: কবে, কেমন ভাবে এবং কেন নারী তার মানবিক অধিকার ও সামাজিক সম্মান হারাল? কারণ বৈদিক যুগের প্রারম্ভে তার কিছুটা সম্মান ছিল। ঋগ্বেদে ঊষসকে সূর্যের পত্নী বলা হয়েছে, সে স্বামীর আগে আগে যায়।(১০৪) এ নিশ্চিত ভাবে বাস্তব সমাজের প্রতিবিম্ব। তবে কি করে সে স্বামীর ছায়ারূপে তার অনুসরণ করে, কোনও রকম ব্যক্তিত্বের লেশমাত্র রহিত হয়ে? এর উত্তর দিতে হলে বৈদিক মানুষের সামাজিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনে পরিবর্তনের মধ্যে অনুসন্ধান করতে হবে। তারা যাযাবর ও পশুপালক জাতি থেকে কৃষিতান্ত্রিক জীবনে স্থিতিলাভ করল, সেখানে উন্নততর প্রযুক্তি ও লোহার লাঙলের ব্যাপক ব্যবহার–যা অর্বাচীন বৈদিক যুগে দেখা যায়–তার ফলে, এবং মধ্যপ্রাচ্য, গ্রিস ও রোমের সঙ্গে নৌবাণিজ্য সূত্র পুনর্ভুক্ত হওয়ার ফলে সংখ্যালঘু এক শ্রেণির হাতে প্রচুর উদ্ধৃত্তি ধন সংগৃহীত হল। এই সংখ্যালঘু শ্রেণির আকাঙ্ক্ষা ছিল এই উদ্ধৃত্ত তার প্রকৃত সন্তান-সন্ততির হাতে, অর্থাৎ যে পুত্রদের সে তাঁর পত্নীর গর্ভে উৎপন্ন করেছে, তাদের হাতে দিয়ে যাওয়ার। সন্তানপরম্পরা নির্দিষ্ট করতে এবং পুত্রদের তার উরসপুত্র বলে চিহ্নিত করতে স্ত্রীর অন্য পুরুষ সঙ্গ নিবৃত্ত করা আবশ্যক ছিল। এটি সুনিশ্চিত করা যেত শুধুমাত্র আত্মীয় পুরুষের সঙ্গে স্ত্রীর সাক্ষাৎ নিষিদ্ধ করে। একটি আনুষ্ঠানিক আপাতযুক্তি অবরোধের কারণস্বরূপ দেখানো হয়েছে: ‘পত্নীকে পুরুষসঙ্গ করা থেকে নিরুদ্ধ করতে হবে, কারণ পরলোকে শুধুমাত্র জন্মদাতাই পিণ্ড-তৰ্পণাদি লাভ করে, স্বামী নয়।’ আসল কারণ অবশ্যই ইহলৌকিক। পিতা পুত্রকে সম্পত্তি দান করার আগে অবশ্যই নিঃসন্দেহে জানবে, সে তার নিজেরই পুত্র, অপর কারও নয়। এরই ফলে নারী বন্দি হল অবরোধে, যেখানে অনাত্মীয় পুরুষের প্রবেশাধিকার নেই।

এই সব ঘটার আগেই নারী তার শিক্ষার অধিকার, জীবিকার অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, এমনকী নিজের শরীরকে আপনি বলার অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। নারী হয়ে দাঁডিয়েছে। তার স্বামীর সম্পত্তি। আহার বেশভূষা এবং আচ্ছাদনের বিষয়ে সে তাকে নিয়ে যা খুশি করতে পারে। মনে রাখতে হবে, ‘ভার্যা’ ও ‘ভৃত্য’ শব্দ দুটি একই ‘ভৃ’ ধাতু থেকে নিম্পন্ন (অর্থাৎ ভরণ করা), এবং মূলগত ভাবে তাদের বিষয়ে একই ধারণা। নিছক জীবিকার প্রয়োজনে স্বামীর উপর নির্ভরশীল নারীর অর্থনৈতিক মূল্য এখন কোনও ভাবেই আর্থিক দিক থেকে নির্ধারণ করা যায় না, কারণ অর্থনৈতিক দিকে তার গৃহকর্ম কোনও উপার্জন আনে না, তার ভূমিকা এখন শুধুই প্ৰজননমূলক ও সহায়কের। এর ফলে তাদের অবনমন তাদের নিজের কাছে এবং সাধারণ ভাবে সমাজের কাছে যুক্তিসিদ্ধ হয়েছে। উৎপাদনের প্রক্রিয়া থেকে নারীকে সরিয়ে দেওয়ার ফলে তাকে সহজেই বোঝানো যেত যে, তার স্বামীই তার ভরণপোষণ যোগায়। তার গৃহকর্ম প্রচলিত অর্থে ‘কাজ’ নয়, যদিও তা পুরুষের বেঁচে থাকার জন্য আবশ্যক। বিবাহের সময়ে যেহেতু তাকে দান করা হয়েছে ‘সমগ্র পরিবারের’ হাতে, সে সমগ্র পরিবারের দয়ায় আছে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে, কারণ প্রায়ই তাকে আরও কমবয়সি, আরও সুন্দরী সপত্নীর সঙ্গে বাস করতে হয়েছে।

দাম্পত্য জীবনে আনুগত্যের একপেশে ব্যাখ্যা ছিল; স্ত্রী বিবাহের শপথের প্রতি অনুগত থাকবে, কিন্তু শাস্ত্রানুসারে পুরুষ তা বিনা শাস্তিতে অবহেলা করতে পারে। নারীর বিবাহের কর্তব্যের অংশবিশেষ হচ্ছে পুত্ৰ সন্তানের জন্ম দেওয়া, এবং সে যদি এই কর্তব্য পালন করতে না পারে। তবে সমাজের অনুমোদন নিয়েই তাকে ত্যাগ করা যায়—শাস্ত্রের অনুশাসন মতে। ধর্মগ্রন্থে এমনও বলা হয়েছে, অসতী স্ত্রীকেও ত্যাগ করা উচিত নয়। অন্যান্য শাস্ত্ৰে বলা হয়েছে, স্বামী পরিত্যক্ত মায়ের জন্যও পুত্ৰ তৰ্পণাদি করবে। এখানে এবং অন্যান্য অনেক শাস্ত্রগ্রন্থে স্বামী পরিত্যক্ত নারীর বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া যায়। অশিক্ষিতা, স্বামী পরিত্যক্তা নারীর একমাত্র গতি দাসী বৃত্তি করা অথবা বেশ্যা হওয়া; কোনও ক্ষেত্রেই সম্মান বা সামাজিক নিরাপত্তার কোনও অবকাশ নেই। যদিও স্বামী বা পিতার উদারতায় কিছু কিছু নারী শিক্ষা পেয়েছে, সাধারণ ভাবে তারা শিক্ষা থেকে বঞ্চিতই ছিল। অতএব তারা স্বাধীন ভাবে উপার্জন করার মতো জীবিকা থেকেও বঞ্চিত ছিল। তাছাড়া দক্ষিণ ও পূর্বদিকে আর্যদের আক্রমণের ফলে বিস্তার ঘটায় অনেক বন্দি দাস হয়ে এসেছিল–তারাই অধিকাংশ গৃহকর্মের ভার নেয় এবং চাষবাস ও পশুপালনে সাহায্য করে। এখন আমরা দুটি মাত্র শ্রেণি পাচ্ছি, ‘অজবন্ন’ এবং ‘পেসসবন্ন’, হেরেনভোক ও হেলট, প্ৰভু ও ভৃত্য। এর প্রমাণ খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের জৈন গ্রন্থ অংগবাজা তে পাওয়া যায়। সুতরাং উচ্চতর শ্রেণির নারীরা খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতক থেকেই উৎপাদনমূলক শ্রম থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকে, যে শ্রম ধনমূল্যে পরিণত করা যায়। এতে তাদের এক অবনমনের অবস্থায় নিয়ে আসা হয়। তারা তখন পুরুষের অধীন: পিতা, ভ্ৰাতা, স্বামী বা পুত্র, যে আহার্য সংগ্রহ করে, যাকে তাদের তুষ্ট রাখতে হয়। নিশ্চয়ই ব্যতিক্রম ছিল, কিন্তু ব্যতিক্রমই নিয়মের প্রমাণ। অর্থনৈতিক অবনমন, যা শিক্ষাগত বিভেদের সঙ্গে যুক্ত, একাধারে নারীর সামাজিক অবস্থানকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করেছিল।

পত্নী যখন স্বামীর আগে চলত, তার থেকে সমাজ অনেক দূরে চলে এসেছে। মনে পড়ে, কাটিয়ামা ভারতবর্ষে নারীযোদ্ধার উল্লেখ করেছেন (আনুমানিক ৩২৭ খ্রি.পূ.); এটি অর্বাচীন বৈদিক বা সূত্র যুগের সঙ্গে খাপ খায়। এর কয়েক শতাব্দীর মধ্যেই নারী সম্পূর্ণ ভাবে তার মানবিক সম্মান হারিয়েছে। যদিও ভান করা হয় যে তার সম্মান ছিল, লিখিত তথ্য অন্য রকম প্রমাণ দেয়। সে কুমারী হিসাবে সাহিত্যে উপস্থিত নেই, বিধবা হিসাবে তাকে এক বিষন্ন অন্ধকার অস্তিত্বে ঠেলে দেওয়া হয়, তাকে নাগরিক বা সমাজের দায়িত্বশীল

অংশ হিসাবে দেখা যায় না; কন্যা বা ভগ্নি হিসাবেও তাকে তত দেখা যায় না। তাকে একটি মাত্র ভূমিকাই দেওয়া হয়, পত্নী ও মাতা রূপে, বিশেষ পুত্রসন্তানের মাতা। সেখানেও তার অস্তিত্ব না থাকারই মতো, কারণ তার ব্যক্তিত্ব স্বীকার করা হয় না, তার চিন্তা ও অনুভূতি, তার আশা ও স্বপ্ন সমাজ সম্পূর্ণরূপে অবহেলা করে। সে বেঁচে আছে শুধু তার স্বামীকে তুষ্ট করতে এবং তার শ্বশুরবাড়ির লোকেদের সেবা করতে। আমাদের সামনে এই পরিণতির অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং দার্শনিক পটভূমিকা অনুসন্ধান করার কাজ রয়েছে। নিঃসন্দেহে খ্রিস্টপূর্ব শেষ সাহস্রাব্দের শেষ কয়েকটি শতক এবং খ্রিস্টিয় প্রথম সহস্রাব্দের প্রথম কয়েকটি শতাব্দীতে বিদেশি আক্রমণে এ বিষয়ে কিছুটা অবদান আছে। জাতিগত সংকর এবং বর্ণপ্রথার বেড়ে ওঠা জটিলতাও বৈদিক ভারতে নারীর অবস্থার অবনমন ঘটাতে সাহায্য করেছে। আমাদের প্রয়োজন সার্বিক ভাবে প্রত্যেকটি গঠনমূলক বিষয়ে গবেষণা এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ, যাতে ছবিটা আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে ওঠে।

সূত্রাবলি
১. ভারতের মাটিতে ঋগ্ধেদের রচনা শুরু হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতাব্দীর আশপাশে, এবং সর্বাপেক্ষা অর্বাচীন বেদাঙ্গসূত্রের কাল আনুমানিক খ্রিস্টিয পঞ্চম শতাব্দী।
২. আর্যমগুলে, ২য় থেকে ৭ম মণ্ডল।
৩. ঋগ্বেদ ১২৩.১
৪. ঋগ্বেদ ১.১২৪.৭
৫. ঋগ্বেদ ১.৪৬:৪
৬. ঋগ্বেদ ৩.৬২.৮
৭. ঋগ্বেদ ১.৬২:১
৮. ঋগ্বেদ ১.৭৩:৩
৯. আদর্শ উদাহরণের জন্য ঋগ্বেদ ১১:১১৫ ২ দ্রষ্টব্য।
১০. দ্রষ্টব্য : মর্যো ন যোষামভোতি পশ্চাৎ–একটি সাধারণ উপমা অন্যতম, ঋগ্বেদ ৭.৮০.২ দ্রষ্টব্য।
১১. ঋগ্বেদ ১০:৬১:৫, ৭
১২. ঋগ্বেদ ১০.১০
১৩. ঋগ্বেদ ৩.৪৫.১
১৪. তৈত্তেরীয় ব্রাহ্মণ ২:৪:৫:৫৬
১৫. ঋগ্বেদ ৪.৫৮.৯
১৬. দ্র, স্বয়ং সা মিত্ৰং বুনতে জনে চিৎ; ঝম্বেদ ১০.২৭.১২
১৭. ঋগ্বেদ ৪.৫.৫
১৮. শতপথ ব্রাহ্মণ ১২.৮.২.১
১৯. ঋগ্বেদ ১০.১০২.২
২০. সাংখ্যায়ন গৃহ্যসূত্র ৪:১০:৩; আপস্তম্ব গৃহ্যসূত্র ৩.৪.৪; কৌষীতকী গৃহ্যসূত্র ১ ২৮,২২।
২১. মানব গৃহ্যসূত্র ১.৭৬; বরাহ গৃহ্যসূত্র ১০.৫
২২. স্মৃতিচন্দ্রিকা, মাইসোব জি আই এস সংস্করণ, পৃ. ৬২
২৩. বৃহদারণ্যকোপনিষদ ৬:৪.১৩
২৪. বৃহদারণ্যকোপনিষদ ৩.৬.১
২৫. তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ১.১১.৪
২৭. অথর্ববেদ ৮.৬.২৪
২৮. মনুসংহিতা ১.১০, ১১, ৩.৬, ৪.৬
২৯. তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ১-৫; ২-৩১; ভরদ্ধাজগৃহ্যসূত্র ১.২২, আপত্তিস্তম্ব গৃহ্যসূত্র ১ ৩:৩
৩০. ঋগ্বেদ ১.১১৭ ৭; ১-০ ৩৯.৩; ৪০.৫
৩১. ঋগ্বেদ ৬.২৮.২৫, ১০.২৭.১২
৩২. দ্র, উদীর্ধ নার্যভি জীবলোকমা ইত্যাদি, ঋগ্বেদ ১৫:১৮:৮
৩৩. অথর্ববেদ (০, ১৮.৩.৩.১)
৩৪. তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩.৪ ১১ ১
৩৫. অথর্ববেদ ৯.৫.২৭
৩৬. অথর্ববেদ ৫.১৭.৮.৯
৩৭. ঋগ্বেদ ৪.১৬:১৯, ৩০, ৪.১৯.৯
৩৮. ঋগ্বেদ ১.১৬৭.৪; ২.১২.১২, ১৫, ১৬
৩৯. অথর্ববেদ ১৫.১.৩৬; ২০:১৩৬.৫
৪০. বশিষ্ঠ সংহিতা ৩.১
৪১. তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩, ৪ ১১ ১
৪২. এই গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ‘প্রাচীন ভারতে গণিকা’ দ্রষ্টব্য।
৪৩. ঋগ্বেদ ৭.৫৫.৫-৮
৪৪. ঋগ্বেদ ১.২১২.৭ এবং ১.১১৬.১
৪৫. তৈত্তিরীয় সংহিতা ৬.৫৬.৪ ৩, তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ১.৩.১০ ৫৮
৪৬. মহিষী, বাবাতা, পরিবৃক্তি (বা পবিবৃত্তি) এবং পালাগলী
৪৭. তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ১.৩ ১০ ৫৮
৪৮. তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩ ৫.৩ ৪৮
৪৯. শতপথ ব্রাহ্মণ ২.৩ ২.৮
৫০. শতপথ ব্রাহ্মণ ৯.৪.১.৬
৫১. ঋগ্বেদ ৭.২৬.৩
৫২. তৈত্তিরীয় সংহিতা ২.৩.৫.১৩
৫৩. অথর্ববেদ ১১.৫.১৮
৫৪. দ্র. কুলায় হি স্ত্রী প্রদীয়তে—ধর্মসূত্র ২.১০.২৭.৩
৫৫. বা. ব্রা. ১৪.১.১৩১
৫৬. বা. ব্রা. ৩.২৫.২৭; আপস্তম্ভ ধর্মসূত্র ১.১০.৫১-৫৩
৫৭. শতপথ ব্রাহ্মণ ১ ০ ২.২; ৩.৪.২২, ৫.২.১-১০
৫৮. গৌতম ধর্মসূত্র ১৮.১
৫৯. সীতার হিরন্ময় প্রতিকৃতিই মাত্র রামের যজ্ঞের পক্ষে যথেষ্ট ছিল, এই তথ্যই এর সমর্থন করে।
৬০. মনুসংহিতা ৪.৭.৪
৬১. আপস্তস্ব ধর্মসূত্র ২.৭.১৫.১৭
৬২. আপস্তম্ভ ধর্মসূত্র ১.১০.৫১-৫৩
৬৩. শতপথ ব্রাহ্মণ ৫.২ ৩.১৩
৬৪. বশিষ্ট ধর্মসূত্র ২৮.২-৩
৬৫. বশিষ্ট ধর্মসূত্র ২১.৮.১০
৬৬. বশিষ্ট ধর্মসূত্র ২১.৮-১০
৬৭. বৌধায়ন গৃহ্যসূত্র ২.২.৬৩, ৬৪ এগুলি যে সাধারণ সদিচ্ছামূলক উক্তি প্রমাণিত হয রামের আচরণে এগুলির প্রতি সামগ্রিক অবহেলা, অহল্যার প্রতি গৌতমের এবং রেণুকার জমাগ্নির আচরণ থেকে এই মানবিক রীতিগুলি যে অনুসরণ করা হত না তার অসংখ্য প্রমাণ পাওযা যায়।
৬৮. আপস্তস্ব ধর্মসূত্র ১.১০-১৯, ২৮
৬৯. বৌধায়ন ধর্মসূত্র ২.২.৬৩, ৬৪
৭০. বৌধায়ন ধর্মসূত্র ২.৪.৬, আপস্তম্ব ধর্মসূত্র ২.৫.১৪; সমর্থন করে মনুসংহিতা ৯.৪
৭১. বশিষ্ঠ ধর্মসূত্র ২১.৮-১০
৭২. তৈত্তিরীয় সংহিতা ৬.৫.১০:৩
৭৩. ওঁ মম ব্ৰতে তে হৃদয়াং দধাতু মম চিত্তং তে…
৭৪. ধ্ৰুবো দ্যৌর্ধ্রুবা পৃথিবী, ধ্রুবা স্ত্রী পতিকুলে ইয়ম্‌।
৭৫. বৃহদারণ্যকোপনিষদ ১ ৯:২ ১৪
৭৬. শতপথ ব্রাহ্মণ ১৩.২.২৪, বশিষ্ঠ ধর্মসূত্র ৫.১-২, ২.২, ৩, ৪৪, ৪৫
৭৭. মৈত্রায়নী সংহিতা ১.১০.১১, ৩.৬.৩, তৈত্তিরীয় সংহিতা ৬.৫.৮.৭
৭৮. শতপথ ব্রাহ্মণ ৪.৪.২.১৩
৭৯. বৃহদারণ্যকোপনিষদ ৬.৪.৭
৮০. তৈত্তিরীয় সংহিতা ২.৫.২.২০
৮১. তৈত্তিরীয় সংহিতা ৬.৫.৮.৭
৮২. আপস্তম্ভ ধর্মসূত্র ২৩.৪; হিরণ্যকেশী গৃহসূত্র ১.৪.১৪.২
৮৩. বৃহদারণ্যকোপনিষদ ১.৯.২.১৪
৮৪. শতপথ ব্রাহ্মণ ১৩.২.২৪
৮৫. ভুক্তোচ্ছিষ্টং উবেব দদ্যাৎ খাদির গৃহ্যসূত্র ১.৪.১১, ক্রিয়াপদে বিধিলিঙ্‌ লক্ষনীয়।
৮৬. অথর্ববেদ ৬.৩.৭.১৩
৮৭. তৈত্তিরীয় সংহিতা ৬.৫.১০.৩; মৈ সং. ৪.৬.৪
৮৮. তৈত্তিরীয় সংহিতা ৬.১.৮.৫
৮৯. আপস্তস্ব ধর্মসূত্র ১.১০.২৮.২৯
৯০. বৃহদারণ্যকোপনিষদ ৪.৪.১২, ১৩; হিরণ্যকেশী গৃহ্যসূত্র ১.৪.১৪.৭
৯১. কৃষ্ঠক সংহিতা ১.১০.১১.৩.৬.৩
৯২. শতপথ ব্রাহ্মণ ১৪.১.১.৩১
৯৩. কৃষ্ঠক সংহিতা ৩১.১
৯৪. মৈত্রায়ণী সংহিতা ১.১০.১১; ৩.৬.৩
৯৫. আমস্তম্ভ ধর্মসূত্র ১.৯.২৩, ৪৫
৯৬. তৈত্তিরীয় সংহিতা ৬.৫.৮.২
৯৭. তৈত্তিরীয় সংহিতা ২.৩.১০.৭
৯৮. গৌতম ধর্মসূত্র ১২.৩৯
৯৯. শাঙ্খায়ন শ্রৌতসূত্র ১২.২৯.২১
১০০. মনুসংহিতা ৩.৬.৩, ৪.৬.৭, ৪.৭.৪
১০১. ১০.১; তৈত্তীরীয় সংহিতা ৬.৫.৮.২
১০২. শতপথ ব্রাহ্মণ ১৩.১.৯.৬
১০৩. হিরণ্যকেশী গৃহ্যসূত্র ১.৬.১২.১৪
১০৪. উষো যাতি স্ব সরস্য পতনী :ঋগ্বেদ

প্রাচীন ভারতে মাতৃত্ব

আলতেকার লিখেছেন, ‘মাতৃত্বের উপরে দেবত্বের আরোপ ভারতবর্ষে যেমন উচ্চতম পর্যায়ে পৌঁছেছিল, এমন আর কোথাও নয়।’(১) কিন্তু দেবত্বের আরোপ সমাজে নারীর অবস্থানের বাস্তব অবস্থা প্রতিফলিত না-ও করতে পারে–তা হয়তো কেবলমাত্র ক্ষতিপূরণ, মায়ের প্রতি সমাজের নিম্পূহতার ক্ষতিপূরণ। তবে প্রাচীন ভারতের সমাজজীবনে মাতৃত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। মাতৃত্ব ছিল আবশ্যিক; একটি মেয়েকে শেখানো হত ভাল স্ত্রী, ভাল মা হতে। তাকে ‘একাধিক পুত্রের জননী’ হওয়ার জন্য আশীৰ্বাদ করা হত। মনে পড়ে অভিজ্ঞানশকুন্তলম নাটকের চতুর্থ অঙ্কে গর্ভবতী মেয়েটিকে তপস্বিনীরা আশীর্বাদ করছেন, সে যেন বীরপ্ৰসবিনী এই দুর্লভ সম্মান লাভ করে। গর্ভাধান, গর্ভধারণ, প্রসব এবং প্রসব উত্তর অবস্থাগুলির আনুষ্ঠানিক দিক দেখা যাক।

বিবাহ অনুষ্ঠানের অব্যবহিত পরে নবদম্পতি প্রার্থনা করত, অর্থাৎ বধু নীরবে সমর্থন করত স্বামীর উক্তি ঃ ‘এস, আমরা মিলিত হই, যাতে আমরা পুত্রসন্তান লাভ করতে পারি, সম্পত্তির বৃদ্ধির প্রয়োজনে পুত্ৰলাভ করতে পারি।’ বর আরও প্রার্থনা করত, ‘পুত্ৰ, পৌত্র, দাস, শিষ্য, বস্ত্ৰ, কম্বল, ধাতু, পত্নী, রাজা, অন্ন, নিরাপত্তা’।(২) বিবাহের সময়ে বধূর পক্ষ থেকে প্রার্থনা হত, সে যেন কখনও শূন্য কোলে না থাকে (অশূন্যোপস্থ), অর্থাৎ তার কোলে যেন সব সময়ে সন্তান থাকে। অতএব বিবাহ মূলত পুত্রসন্তানের প্রয়োজনে এবং যেহেতু একটি মাত্র পত্নী যে পুত্রসন্তানই প্রসব করবে। তার স্থিরতা নেই, তাই বর কোনও কুঁকি নেয় না। সে বহু পত্নীর প্রার্থনা করে—তার নববিবাহিত বধুর উপস্থিতিতেই।–যে বধুর সামাজিক ভাবে প্রস্তুতি ছিল এ রকম প্রার্থনা মেনে নেওয়ার, কারণ পুত্র তো বংশরক্ষা এবং সম্পত্তি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির রক্ষা ও বৃদ্ধির জন্য অবশ্য প্রয়োজনীয়।

গর্ভাধান নামক অনুষ্ঠানে পুত্রসন্তানের জন্য প্রার্থনা আছে; অথৰ্ববেদ-এ(৩) পুত্রসন্তানের জন্য প্রার্থনা। পরবর্তীকালের এক উপনিষদে বিভিন্ন রকম সন্তান–জ্ঞানী পুত্র, পণ্ডিতা বুদ্ধিমতী কন্যা, ইত্যাদি লাভের জন্য স্বামী তার স্ত্রীকে কি কি খাওয়াবে তার নির্দেশ আছে।’(৪) প্রার্থনার শুরু: ‘এস আমরা দুজনে মিলে পুত্রসন্তান লাভের জন্য চেষ্টা করি।’ স্ত্রী এখানে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চেষ্ট গ্রহীতা; তার কোনও কথা নেই। তারপরে স্ত্রী গর্ভবতী হলে তার দুটি অনুষ্ঠান করতে হয়: পুত্রসন্তান প্রসবের জন্য পুংসবন এবং সিঁথি ভাগ করার জন্য সীমস্তোন্নয়ন। পুংসবন নামটি থেকেই বোঝা যায় এটা পরিস্ফুট ভাবেই পুত্রসন্তানের জন্মের উদ্দেশ্যে প্রযুক্ত। সব প্রার্থনাগুলিই অত্যন্ত স্বচ্ছ ভাবে কন্যাসন্তানের জন্মে বাধা দেয়, যাতে শুধুমাত্র পুত্রসন্তানই জন্মায়।’(৫) সীমাস্তোন্নয়ন আরও জটিল একটি অনুষ্ঠান। যে নারীর স্বামী ও সন্তান বেঁচে আছে তারা গর্ভিণীর সামনে বীণা বাজাবে, গান গাইবে ও নাচবে। রান্না করা ভাতের একটি পিণ্ড তার সামনে ধরা হবে এবং তার স্বামী জিজ্ঞাসা করবে: ‘কি দেখছ?’ উত্তর, ‘সন্তান’। আশীর্বাদ, ‘বীরপ্ৰসবিনী হও, অবিধবা হও।’(৬) ভরদ্বাজ গৃহ্যসূত্র-তে পড়ি, রান্না করা ভাতের তিনটি পাত্র তার সামনে রেখে জিজ্ঞাসা করা হয়: ‘কী দেখছ?’ সে উত্তর দেয়: ‘পুত্র ও পশু।’(৭) আর একটি বৈচিত্ৰ্য পাওয়া যায় জৈমিনীয় গৃহ্যসুত্র-তে, যেখানে একটি কঁচুসার পাত্রে জল ভরে তাতে এক টুকরো সোনা রাখা হয়। বন্ধুকে প্রশ্ন করা হয়: ‘কী দেখছ?’ সে বলে: ‘সন্তান, পশু, আমার জন্য সৌভাগ্য ও আমার স্বামীর জন্য দীর্ঘ জীবন!’(৮) শাস্ত্ৰে কোথাও বধূর বা ভাবী মায়ের দীর্ঘ জীবনের জন্য কোনও প্রার্থনা নেই। এবং এই সময়ে প্রসবোত্তর মৃত্যুর হার এখনকার তুলনায় অনেক বেশি ছিল। শুধু স্বামীর দীর্ঘজীবনের কামনাই শুনি। এর ব্যাখ্যা হয়তো প্রার্থনায় পত্নীশব্দের বহুবচনে পাওয়া যায়; যদি সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে পত্নীর মৃত্যু হয়, তবে আর একটি বিবাহ করা চলবে, কারণ শাস্ত্রে নির্দেশ আছে, স্ত্রী সৎকারের পরদিনই স্বামী বিবাহ করবে।(৯) সাংখ্যায়ন গৃহ্যসূত্র নির্দেশ দেয়, যে নারীর স্বামী-সন্তান বেঁচে আছে সে নববধূকে নিরামিষ খাদ্য ও মদ দেবে এবং তারপরে তারা গান গাইবে, বীণা বাজাবে ও নাচবে। এ সবই পুত্রসন্তানের জন্মের প্রত্যাশায়।(১০) ঋগ্বেদ-এ গৰ্ভধারণের বিষয়টিকে নাম দেওয়া হয়েছে উদরামাময়ং।(১১) গর্ভের চতুর্থ মাসে স্বামী শজারুর কঁটা দিয়ে তার চুল আঁচড়ে দেয়–ভূমিতে হলকর্ষণের প্রতীক এবং জোড় সংখ্যার একগুচ্ছ কঁচা ফল দেয়, যা অসম্পূর্ণ ভ্রণের প্রতীক। তারপর বীণা বাদন ও নাচ হয়, যার ফলে আশ্বলায়ন বলেছেন, ভ্ৰাণ ধ্বংসকারিণী কিছু রাক্ষসীকে তাড়ানো হয়। তারপর তাকে ঘৃতের দিকে তাকাতে বলে প্রশ্ন করা হয়: কী দেখছ?’ সে উত্তর করে: ‘সন্তান।‘(১২)

অপর গুরুত্বপূর্ণ গৰ্ভধানের অনুষ্ঠান হল পুংসবন। তার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় অথর্ববেদ-এ। (১৩) পরবর্তী সাহিত্যে অনুষ্ঠানের অনুপুঙ্খগুলি পাওয়া যায়। সেখানে আমরা জানতে পারি, গর্ভের তৃতীয় মাসে গর্ভবতী একদিন উপবাস করে থাকলে তারপর তার স্বামী তাকে খাবার দেয়; ভাত, দুটি সিম, এক দানা যাব, এক এক গ্রাস দইয়ের সঙ্গে। তারপরে সে স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করে: ‘তুমি কী পান করবে?’ সে উত্তর দেয়: পুংসবন।।(১৪) কখনও কখনও গর্ভাবস্থায় অনবলোভন নামে একটি ছোট অনুষ্ঠান করা হয়; তার উদ্দেশ্য গর্ভপাত নিরোধ করা। আশ্বিলায়ন গৃহ্যসূত্র-তে এর বর্ণনা আছে।(১৫)

প্রসবের সময় যখন এগিয়ে আসে, জন্মের ঠিক পূর্বে শোষ্যস্তীকর্ম নামে একটি অন্তিম অনুষ্ঠানের কথা বলা হয়। এটি মনে হয় অত্যন্ত প্রাচীন অনুষ্ঠান, এবং নবাগতের আগমনের সময়ে পরিবার ও সমাজের মধ্যে যে নাটকীয় টান টান ভাব, তার চিহ্ন বহন করে। প্রসবের অব্যবহিত পূর্বে স্বামী স্ত্রীর উপরে জল ছেটাতো, এবং প্রসব হওয়া পর্যন্ত তা ক্ৰমান্বয়ে চালিয়ে যেত।(১৬)

শিশুর জন্মের পরে পরিবারের প্রধান লক্ষ্য মনে হয় দুষ্ট প্রেতদের দূরে রাখা: তারা নবজাতকের ক্ষতি করে বা তাকে নষ্ট করে। জাতকর্ম অনুষ্ঠানে সূতিকাগ্নি অর্থাৎ জন্মসংস্কারের জন্য বিশেষ ভাবে আহিত অগ্নিতে সর্ষে ও তুষ আহুতি দেওয়া হত। এই আহুতি এগারো বার দিতে হত।(১৭) তখন পিতা হোম করত এবং শিশুর সেই গোপন নাম অস্মৃটি ভাবে উচ্চারণ করত, যা শুধু পিতামাতাই জানে।(১৮) তার পরে পিতা সুবর্ণ ও অন্যান্য মাঙ্গলিক দ্রব্য দিয়ে শিশুর মুখ ছুঁত এবং তাকে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার আগে ঘি ও মধু খাওয়াত। তার পরেই কেবল শিশুকে স্তন দেওয়া যেত।

গর্ভিণী নারীর খাদ্যের প্রয়োজন বিষয়ে কিছুটা সচেতনতা ছিল, কারণ আমরা শুনতে পাই, নববধূ, কুমারী কন্যা, রোগী ও গর্ভবতী নারীকে অতিথিরও আগে খেতে দেবে।’

পুত্রের জন্ম থেকে তার শিক্ষালাভের উপনয়ন পর্যন্ত বহু ছোট ছোট অনুষ্ঠান থাকত। প্রথম ছিল বিষ্ণুবলি, তার পরে মেধাজনন তার পরে নামকরণ। এর পরে পিতা পুত্ৰকে ধরে গৃহের বাইরে নিয়ে আসে (নিষ্ক্রমণ); এর ফলে যেন তার বহিঃপ্রকৃতির সঙ্গে সংস্রব ঘটে। শিশুর প্রথম ভাত খাবার অনুষ্ঠান অন্নপ্রাশন; বর্ষবর্ধন তার দীর্ঘায়ু কামনা করে। প্রথমবার ন্যাড়া হওয়া চোল এবং শিশু শিক্ষা শুরু করলে বিদ্যারম্ভ। এই সব অনুষ্ঠানেই পিতা অনুষ্ঠান পরিচালনা করে, মাতা শুধুমাত্র পটভূমিকায় থাকে। সে কোনও অনুষ্ঠানেই কিছু করেও না, বলেও না।

শিশুকে মানুষ করার ব্যাপারে তার ভূমিকা কী? কিছুই প্রায় শোনা যায় না, শুধু তির্যক ভাবে বলা হয়, চতুর্মাস্যের বরুণপ্রঘাস যজ্ঞে পুরোহিত যজমানের স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করে, কার সঙ্গে ব্যভিচার করেছ?’(১৯) ‘সেই স্ত্রী বকুণের শাসনীয়া, যে এক পুরুষের হয়েও অপর পুরুষের সঙ্গে সম্বদ্ধ হয়। পাছে সে হৃদয়ে শূল নিয়ে যাগ করে. সে যা স্বীকার করে না তা তাঁর আত্মীয়দের ক্ষতি করে।’(২০) সুতরাং সন্তানের মাতা সর্বসমক্ষে নিজের ব্যভিচার স্বীকার করে, যাতে তার স্বামী ও সন্তানদের ক্ষতি না হয়। ‘সে মদ্যপান করে না; তার পুত্রদের জন্য এই তার ব্ৰত।’(২১) শিশুর লালন-পালনে মায়ের আনুষ্ঠানিক ছাড়া কোনও ভূমিকা যে ছিল তার কোনও ইঙ্গিত আমরা পাই না। আসলে শিক্ষা, শাসন, তদারক এবং পেশাগত বিদ্যা সম্পূর্ণভাবে পিতার অধীন। মায়ের একমাত্র অবদান কিছু ব্রত ও অনুষ্ঠান যা পরবর্তী সাহিত্যে পাওয়া যায়। বৈদিক সাহিত্যে গর্ভধারণ, প্রসব এবং কিছু প্রসবোত্তর অনুষ্ঠানের বিবরণ পাওয়া যায়–সবই পিতার কর্তব্য। তারপর উপনয়ন হলে পুত্ৰ আনুষ্ঠানিক ভাবে পিতারযদি পিতা পেশাদার শিক্ষক হন।—না হলে গুরুর শিষ্য হয়ে যায়।

বৈদিক সাহিত্যেও পুত্রসন্তানের প্রতি সমাজের পক্ষপাত অত্যন্ত প্রকট ভাবে লক্ষ্য করা যায়। বন্ধ্যা নারীকে পরিত্যাগ করা যায় (পরিবৃত্তি বা পুরিবৃক্তি), কারণ নিঋতি তাতে ভর করেছে।’(২২) প্ৰজনন বিষয়ে অত্যধিক গুরুত্ব প্রমাণের ফলে একটি ধারণার সৃষ্টি হয়েছেএক অশুভ ধারণা যা কিনা অত্যন্ত কুৎসিত ও সম্পূর্ণ অশুভ, যার বিশেষ কাজ হল সমস্ত রকম শুভ বিষয়কে ধ্বংস করা।(২৩) বন্ধ্যা নারীকে দশ বছর পরে পরিত্যাগ করা যেত; শুধু কন্যার যে জন্ম দেয় সেই নারীকে বারো বছর পরে, এবং মৃত্যুবৎসা মাকে পনেরো বছর পরে।(২৪) পুত্ৰহীন পত্নীর স্বামীর আবার বিবাহ করা উচিত।(২৫) ভাল নারীর লক্ষণ, ‘যে স্বামীকে সন্তুষ্ট করে, পুত্রের জন্ম দেয় এবং কখনও স্বামীর কথার উত্তর করে না।’(২৬)

পরবর্তী ধর্মশাস্ত্র ও পুরাণে সন্তানকামী নারীর জন্য বহুব্রতের কথা বলা হয়েছে। ততদিনে নারীর সন্তানদাত্রী এক সম্পূর্ণ দেবীমূর্তির পরিকল্পনা করা হয়েছে–তিনি ষষ্ঠী।(২৭) নারীদের ষষ্ঠী বিষয়ক ব্ৰতের উদ্দেশ্য তাদের গর্ভধারণের ক্ষমতা বাড়ানো, কারণ তিনি শিশুদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী এবং শিশুর জন্মের পর ষষ্ঠ দিনে সূচিকাগৃহে তাঁর পূজা হয়। তিনি সন্তান দেন এবং তাদের রক্ষা করেন।(২৮) তাকে তুষ্ট করতে নানা অনুষ্ঠানের নির্দেশ আছে, যাতে তিনি ক্ষুদ্র শিশুদের মঙ্গল করেন, কারণ শিশু যত ছোট হবে অন্তরিক্ষচারী অসংখ্য বুভুক্ষু প্রেতি তাকে গ্ৰাস করার সম্ভাবনা ততই বেশি।(২৯) গর্ভস্থ শিশু সবচেয়ে ছোট, লুণাকরে আছে তাই তার বিপদের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। মানর গৃহ্যসূত্র-তে ষষ্ঠীকল্প (৩:১৩:৬) এবং বিনায়ককল্প (২:১৪) এই প্ৰেতগুলিকে দূর করে শিশুর মঙ্গল বিধান করে।

গৰ্ভধারণ, নির্বিঘ্নে পুত্ৰ প্ৰসব ও তার নিরাপত্তা ও দীর্ঘায়ুর জন্য অনেকগুলি ব্ৰতের নির্দেশ আছে। তাই সেখানে মহাষষ্ঠী ব্ৰত আছে, সন্তানের জন্য কৃষ্ণাষ্টমী, আট পুত্রের জন্য লোকেশ্বরী বা কোটীশ্বরী, জীবিত পুত্রের জন্য জীবৎ পুত্রিকষ্টমী। বারো বছর ধরে পালনীয় জ্যেষ্ঠ ব্ৰত আছে; জ্যেষ্ঠা নক্ষত্রের সময়ে মেয়েরা সারা রাত জেগে জ্যেষ্ঠা দেবীর মূর্তিকে পূজা করে। যে নারীর সন্তান মারা যায় অথবা যার দরিদ্র পুরুষের ঔরসে একটিমাত্র পুত্ৰ আছে, এই ব্ৰত তারই জন্য।(২৯) হেমাদ্রি পুত্রলাভের জন্য দুর্বষ্টিমীর নির্দেশ দেয়।’(৩০) হেমাদ্রিতে পুত্রলাভের জন্য নাগব্ৰত আছে’।(৩১) পিতৃব্ৰতে পুত্রের পিতৃত্বই পুরস্কার।’ আরও পরিস্ফুট পুত্ৰকাম,(৩৩) পুত্ৰবিধি, পুত্রপাপ্তি,(৩৪) পুত্রীয়।(৩৫) এছাড়া ছোটখাট আরও অনুষ্ঠান আছে, যেমন কৌমব্রত, মরুদ্মম্ব্রত, মঙ্গলগৌরী, রুক্মিন্যাষ্টমী, বরাহদ্বাদশী, বিষ্ণু, দেবকী, ব্রতরাজতৃতীয়া, শনি-প্ৰদোষ, সর্ষপসপ্তমী, সূর্য–সূৰ্য্যনাকৎ–সপ্তমী সবই ওই একই উদ্দেশ্যে।’(৩৬) মাতৃব্রতে মৃত্যুবৎসা বা একটি সন্তান আছে যার এ রকম নারীর মাতৃকার পূজার বিধান আছে; শ্রাবণকৃত্যা এমন নারীর যার সন্তান শৈশবে মারা যায়। সংঘাতক ব্ৰত স্বামী ও পুত্রদের সঙ্গে বিচ্ছেদ রোধ করার জন্য। এগুলি এবং সহস্ৰ সংখ্যক আঞ্চলিক বৈচিত্ৰ্য ষষ্ঠীপূজার জনপ্রিয়তার সাক্ষ্য বহন করে।

বন্ধাত্বের অপবাদ এড়াবার যে তীব্র বাসনা, সেটি সর্বজনীন ঘটনা। সারা পৃথিবীতে এবং যুগ থেকে যুগান্তরে মেয়েরা পুত্ৰ কামনা করেছে এবং অবন্ধ্যাত্বি ঘোচাবার জন্য তপস্যা করেছে; ব্ৰত পালন করেছে, পূজা করেছে, প্রার্থনা করেছে। ভারতবর্ষে এই ব্ৰতগুলি সময়ের সঙ্গে সংখ্যায় বেড়েছে; পরবর্তী শাস্ত্রগ্রন্থে পুত্রসন্তান ধারণ করা ও প্রসব করার জন্য আরও অধিকসংখ্যক বিধান আছে।

যে কোনও আদিম জাতির মানুষের মতো ভারতীয়রাও মনে করত যে জগৎটা বিশেষ করে অন্তরীক্ষা ও পাতাল ভূত-প্ৰেত-পিশাচাদিতে পরিপূর্ণ–তাদের একমাত্র কাজ হচ্ছে জীবিত প্ৰাণীদের ক্ষতি করা। কিন্তু তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ লক্ষ্য লুণ ও নবজাত শিশু; এই প্ৰেতগুলির অনেকেই এদের ভক্ষণ করে পুষ্ট হয়। যাতে তারা ভ্রূণ ও নবজাতকের ক্ষতি করতে না পারে, তাই সহস্ৰ সংখ্যক বিচিত্ৰ ব্ৰত আবিষ্কার করা হয়েড়ছিল; ওষধি, ফল, মূল, ধাতু, প্রভৃতি নানা কার্যকর পদার্থ এই সব ব্ৰতে ব্যবহার করা হত; ‘শামান’রা গোপন মন্ত্র আওড়াত। কিন্তু এত সব সত্ত্বেও যখন মা মৃতসন্তান প্রসব করত অথবা গৰ্ভধারণই করতে পারত না, তখন তাকে বন্ধ্যা বা গৰ্ভধারণের পক্ষে অত্যন্ত অশুচি বলে অপরাধী করা হত। বোঝাই যায়, নির্বিদ্ম প্রসবের পর এই কবচ প্রভৃতি এবং ব্ৰতগুলি মায়ের চেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠেছিল। তা সত্ত্বেও যে মায়ের সন্তানেরা দীর্ঘায়ু হত, তাকে সম্মান করা হত।

প্রেতে বিশ্বাস তার যুক্তিযুক্ত অন্ত পর্যন্ত টেনে নেওয়া হত না, যার ফলে অভাগিনী বন্ধ্যা নারী বা যার সন্তান শৈশবে মারা যায় যে দোষমুক্ত হতে পারে। পুরুষের বন্ধ্যাত্বি আবছা ভাবে জানা ছিল, নিয়োগ প্রথা থেকে যার ইঙ্গিত পাওয়া যায়, কিন্তু ‘বন্ধ্যা’ পুরুষ কখনও দোষের ভাগী হত না। ব্ৰাহ্মণ্য ও বৌদ্ধ সাহিত্যে নিঃসন্তান রাজাদের কথা শোনা যায়, কিন্তু অশুভতর কোনও ইঙ্গিত সেখানে নেই। কৃষিকেন্দ্ৰিক মানুষ হিসাবে প্রাচীন ভারতীয়রা জানত যে মরা বীজ উর্বর ক্ষেতে ফলবে না; কিন্তু তারা সন্তানহীনতার এই দিকটা সম্বন্ধে রহস্যময় নীরবতা পালন করেছিল। সব সময়েই অপ্রসবের জন্য নারীকেই দায়ী করা হত। অবশ্যই প্ৰেত-পিশাচন্দের–ধ্বংসকারী অতিপ্রাকৃত শক্তির আবিষ্কারের ফলে কিছুটা দোষ স্বালন হত এবং তাদের কাছ থেকে বিপদ এড়াতে ব্ৰতের বিধান করা হত।

যদিও অবন্ধ্যাত্বি প্রধান ভাবে কাম্য ছিল, কিন্তু সেটাই শুধু এখানে যথেষ্ট নয়। পুত্ৰ কন্যার চেয়ে উচ্চ স্থান অধিকার করেছিল। সোমযোগের সেই প্রাচীন যুগেও একটি অনুষ্ঠানে কিছু যজ্ঞের বাসন তুলে ধরা হত, কতগুলি আবার নীচে রাখা হত। তেমনই জন্মের সময়ে পুত্রদের উঁচুতে তুলে ধরা হবে, কন্যাদের মাটিতে শোয়ানো হবে। বলাই বাহুল্য, এটি সামাজিক বাস্তবের আনুষ্ঠানিক প্রতিফলন। তাই শুধু কন্যার মায়েদের যে সামাজিক ভাবে পুত্রের মায়ের চেয়ে নিচু চোখে দেখা হবে, তা বিচিত্র নয়।

কিন্তু মাতৃত্বলাভের পরই মা-কে ঠেলে দেওয়া হত। পিছনে, অন্তত পরের প্রসব পর্যন্ত। সে পূজা করতে পারে, আহুতি দিতে পারে, সন্তানদের স্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু এবং মঙ্গলের কামনায় ব্ৰতপালন করতে পারে, কিছু কিছু স্বাদু খাদ্য পানীয় পরিত্যাগ করতে পারে।(৩৭) কিন্তু এ ধরনের নেতিবাচক এবং আপাত নিস্ক্রিয় আচরণ ছাড়া মা হিসাবে তার ভূমিকা ধর্মগ্রন্থে আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে না। বাড়ির গৃহিণী হিসাবে নিঃসন্দেহে সে আহার্যের তদারকি করত এবং সম্ভবত স্বামী, শ্বশুরকুলের আত্মীয় ও সন্তানদের পরিবেশনও করত। কোনও কোনও মা পরিবারের জন্য রান্নাও করত এবং সেই ভাবে সন্তানদের পুষ্টির বিষয়ে সরাসরি যুক্ত ছিল। সে সম্ভবত সন্তানদের পোশাক-আশাক, খেলনা, গহনা ও অন্যান্য সম্পত্তির দায়িত্বে ছিল। রোগের সময়ে পিতা নয়, সে-ই তাদের সেবা করত এবং তাদের আরামের ব্যবস্থা করত। কিন্তু এ সবই অনুমান, কারণ শাস্ত্র এ বিষয়ে নীরব। যদিও সব শাস্ত্ৰই শুধু পুত্রের কথাই বলে, মা অবশ্যই নিরপেক্ষ ভাবে সব সন্তানের প্রয়োজনই মোটাত। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ কথা স্পষ্ট যে সে পুত্রের প্রতি সামাজিক পক্ষপাতের শরিক ছিল। তার সমস্ত সামাজিক সম্মান নির্ভর করত পুত্রের জননী হওয়ার উপরে।

এতৎসত্ত্বেও পিতার তুলনায় মাতার কন্যার চেয়ে পুত্রকে পছন্দ করার কারণ কমই ছিল, যদি না এমন হত যে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্তিগত না হয়ে সামাজিক এবং এই কারণে নিয়ন্ত্রিত এবং প্রথাগত। পিতার সম্পত্তির মালিকানা ছিল। সে চাইত। তার নিজের (অর্থাৎ ঔরস) পুত্রকে সম্পত্তি এবং সম্ভবত কাজ, ব্যবসা বা পেশা দান করে যেতে; মায়ের সম্পত্তির মালিকানা ছিল না, এবং মনে করতে ভাল লাগে যে অনুভূতির দিক দিয়ে তার পছন্দ ছিল মেয়ে–খুব অল্পদিন, বিবাহ পর্যন্ত, যার সঙ্গ সে উপভোগ করতে পারবে। তাছাড়া তার অনুভূতি ও কল্পনা দিয়ে সে কন্যার মধ্যেই নিজেকে দেখতে পাবে। পরবর্তী সাহিত্যে আমরা মাঝে মাঝে দেখি মেয়ের সুখের জন্য মা বাবাকে অনুনয় করছে। কিন্তু মূলত সমাজ কন্যাকে দেখত অভিশাপরাপে। ‘পত্নী বন্ধু, কন্যা দুঃখের আধার, পুত্ৰ স্বর্গের আলো’,(৩৮) অথবা ‘পুত্ৰ নিজস্বরূপ, পত্নী বন্ধু, কন্যা পুরুষের দুঃখমাত্ৰ।’(৩৯)

যেহেতু রুচির ব্যতিক্রম ঘটে, কোনও কোনও পিতা কখনও কখনও বুদ্ধিমতী এবং পণ্ডিত কন্যার কামনা করত। তাই আমরা একটি অনুষ্ঠানের কথা পড়ি: ‘যে চায় তার কন্যা পণ্ডিতা হোক, সে তিল দিয়ে ভাত রাধবে এবং দু’জনে তা খাবে।’(৪০) মনে করলে মজা লাগে যে, শঙ্করাচার্যের টীকায় পণ্ডিতা শব্দটির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে ‘গৃহকর্মের ব্যাপারে নিপুণা’। ফলে কন্যাদের শাস্ত্ৰাধ্যয়ন বিষয়ে প্রচলিত নিয়মের পোষকতা করা হয়েছে। কিন্তু ব্যাখ্যাটি মিথ্যা, পক্ষপাতদুষ্ট এবং ভ্রান্ত; পণ্ডিতা শব্দটি গৃহকর্ম বিষয়ে প্রয়োগ করা হয়নি।

মায়ের পুত্র সম্বন্ধে মনোভাব বা সম্বন্ধ বিষয়ে কোনও বিবরণই তাই আমরা পাই না। সব শাস্ত্ৰই কিন্তু ‘পুত্র প্রিয়ের চেয়েও প্রিয়তর’(৪১) নিয়েই ব্যাপৃত। বৌদ্ধ শাস্ত্রে বলা হয়েছে ‘পুত্র পুরুষের ধন।।’(৪২) শাস্ত্রগুলি একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুত্রের উপকারিতার প্রশংসা করেছে। ‘পুত্র দিয়ে পৃথিবী জয় করা যায়, পৌত্র দিয়ে অমৃত্বলাভ করা যায়।’(৪৩) পুত্র জন্মালেই পিতা পূর্বপুরুষের ঋণ থেকে মুক্ত হয়।’(৪৪) পুত্ৰ মাতার কাছে কতখানি তা স্পষ্ট হয় যখন কুন্তী পুত্রদের অনুপস্থিতির জন্য আক্ষেপ করেন: মাধব! বৈধব্য, সম্পদহানি বা শক্ৰতা কিছুই আমাকে তত দুঃখ দেয় না। যা দেয় পুত্ৰগণের বিরহ।(৪৫)

পিতামাতা সন্তানদের ভালবাসে, কিন্তু বিপদের সময়ে যখন তাদের জন্য খাদ্য সংগ্ৰহ করতে পারে না তখন তাদের দত্তক নেওয়ার জন্য অপরকে বিলিয়ে দেয়। শাস্ত্রে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, পিতামাতা দুজনে অথবা তাদের মধ্যে একজন এই সিদ্ধান্ত নিতে পারে।(৪৬) অপর এক গ্রন্থে বলা হয়েছে পিতা অথবা মাতা পুত্র দত্তক নিতে পারে।(৪৭) অতএব পুত্রের ভাগ্যবিষয়ে অত্যন্ত গুরুতর সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে পুঁথিগত ভাবে মায়ের কিছু বলার আছে। কিন্তু পরবর্তী সাহিত্যে দেখা যায়, এক পিতাই এ রকম সিদ্ধাস্ত নিয়েছে।

পুত্রের কাছ থেকে সম্মান মাতার প্রাপ্য। অধ্যাপক দশ শিক্ষকের সমান, পিতা অধ্যাপকের সমান এবং মাতা সম্মানে সহস্ৰ পিতার অধিক।’(৪৮) ‘মাতাকে শ্রদ্ধা করলে পৃথিবী জয় করা যায়, পিতাকে শ্রদ্ধা করলে অন্তরীক্ষ জয় করা যায় এবং গুরুকে শ্রদ্ধা করলে ব্ৰহ্মলোক জয় করা যায়।’(৪৯) ‘পুত্ৰ মাতার সেবা করবে, যদি মাতা সমাজ পরিত্যক্ত হয় তাহলেও, কারণ তারই জন্যে মাতা বহু কষ্ট সহ্য করে।’(৫০)‘পুত্ৰ মাতাকে ভরণপোষণ করবে, সমাজপরিত্যক্তা হলেও, তবে তার সঙ্গে কথা বলবে না।(৫১) সমাজপরিত্যক্ত পিতাকে ত্যাগ করা যায়, কিন্তু মাতাকে নয়। মাতা কখনও পুত্রের পরিত্যাজ্য নয়।’(৫২) এখানেই শঙ্খ ও লিখিত বলেছেন, ‘পুত্র পিতামাতার বিবাদে কোনও পক্ষ অবলম্বন করবে না, যদি করে, তবে মাতাই পক্ষই নেবে, কারণ মাতাই তাকে গর্ভে ধারণ, প্রসব ও লালন-পালন করেছে।’(৫৩) পুত্ৰ মাতার ঋণ থেকে কখনওই মুক্তি পায় না, একমাত্র মুক্তি পায় যদি সে (জটিল ও প্রচুর অর্থসাপেক্ষ) সেঁত্রামণি যাগ করে।’ ‘কোনও গুরুই মাতার চেয়ে উচ্চ নয়।’(৫৪) পাণ্ডবেরা বলেন ‘অন্য সব অভিশাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়, মাতার অভিশাপের থেকে মুক্তি নেই।’(৫৫) তখনই কেবল তার বাৰ্ধক্য আসে, তখনই কেবল তার শোক হয়, তখনই কেবল তার জগৎ শূন্য হয়ে যায়, যখন কেউ তার মাকে হারায়।(৫৬) অজাতশত্রু তার পিতাকে তার আদেশ অমান্য করে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য তাঁর মাতাকে হত্যা করতে চাইলে তাঁর মন্ত্রীরা তাকে বলেন: ‘এমন আঠারো হাজার মন্দ রাজার বিবরণ পাওয়া যায় যাঁরা পিতৃহস্তা। কিন্তু মাতৃহন্তার কোনও বিবরণ মেলে না।’(৫৭) কিন্তু পরশুরাম তার পিতার আদেশে মাতাকে হত্যা করেছিলেন, যদিও পিতার কাছ থেকে প্রাপ্ত প্রথম বরে তিনি মাকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন।

মাতা যদি যৌন ব্যভিচারের দোষে দোষী হয়, পুত্রের উপর নির্দেশ আছে, শ্রাদ্ধের সময়ে তার জন্য প্রার্থনা করতে: ‘যদি আমার মাতা কোনও পাপ করে থাকেন, কর্তব্যে অবহেলা করে থাকেন, পিতা যেন সেই বীজ নিজের বলে গ্রহণ করেন।’(৫৮) পুত্রের কর্তব্য মায়ের প্রতি সম্মান দেখানো(৫৯) এবং কখনও মাকে শাস্তি বিধান না করা। যদি তা করে তবে তাকে কঠোরতম শাস্তি দিতে হবে।(৬০)

পুত্ৰ নানা শ্রেণির হতে পারত। তার মধ্যে মাতার সাক্ষাৎ যোগ ছিল ঔরস (স্বামীর থেকে জাত), কানীন (বিবাহের পূর্বে গর্ভধৃত), সহোঢ় (বিবাহের সময়ে গৰ্ভধৃত), পুত্রিকাপুত্ৰ (কন্যার পুত্র, যাকে কন্যার পিতা নিজের পুত্র বলে গ্রহণ করতেন), গূঢ়োৎপন্ন (গোপনে পরপুরুষের দ্বারা উৎপন্ন) এবং নিয়োগ। এর মধ্যে কানীন, সহোঢ় এবং গূঢ়োৎপন্ন বিষয়ে সমাজের আপত্তি ছিল। অন্য দুটি প্রকট ভাবেই সমাজ দ্বারা অনুষ্ঠিত হত। দত্তক নেওয়ার সময়ে পুথিগত ভাবে পিতামাতা উভয়েরই সম্মতির প্রয়োজন ছিল, কিন্তু অনুমান হয়, পুরুষশাসিত সমাজে মায়ের অনুমতি আছে এটা গ্রহণ করেই নেওয়া হত। ভয়াবহ দুৰ্ভিক্ষ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে দুস্থ ব্যক্তিরা সন্তান বিক্রয় করত; এ রকম ‘ক্রীত’ পুত্র পিতামাতা দুজনেরই হত, কিন্তু বিক্রয় বা ক্ৰয়ের মূল সিদ্ধান্ত পুরুষেরই–মহাকাব্য, পুরাণ ও বৌদ্ধ সাহিত্যে বর্ণিত ঘটনাগুলি তারই প্ৰমাণ দেয়।

মাতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত জটিলতাগুলি সাহিত্যে প্রকাশ পায়। সব কিছু যে শাস্ত্রের বিধি অনুসারে সহজ সরল ছিল না তা মহাকাব্য, পুরাণ, বৌদ্ধ সাহিত্য এবং প্রাচীন মধ্যযুগের সাহিত্য থেকে উদঘাটিত হয়। এমনকী বৈদিক সাহিত্যেও পিতা এবং কন্যার মধ্যে (ব্ৰহ্মা ও বাক) অবৈধ সম্পর্ক দেখতে পাই। বৌদ্ধ সাহিত্যে মাতা-পুত্রের মধ্যে অবৈধ সম্পর্কের একটি নিদর্শন পাওয়া যায়।

বিশ্বান্তর জাতকে পিতা পুত্রকন্যাকে বিলিয়ে দেয় মাতার অনুমতি ছাড়াই। যদিও শাস্ত্ৰে নির্দেশ আছে, পুত্রেরা বার্ধক্যে মায়ের দেখাসশোনা করবে। তবু কুন্তী পুত্রদের ছেড়ে বনে গিয়েছিলেন। গর্ভবতী স্ত্রী স্বামীর কাছে বিশেষ দায়িত্ব ও যত্নের বিষয়, কিন্তু গর্ভবতী অবস্থায় সীতা পরিত্যক্ত হয়েছিলেন বিনা শাস্তিতে। শাস্ত্রে প্রায়ই বলা হয়, ‘ন স্ত্রী দুষ্যতি জারেণ–স্ত্রী উপপতির দ্বারা দূষিত হয় না’।(৬১) কিন্তু সীতাকে এ বিষয়ে শুধুমাত্ৰ সন্দেহের কারণে বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল। এই অপরাধে অহল্যা অভিশাপ পেয়ে পাষাণমূর্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। বিবাহিত রমণী ব্যভিচার করলে এক মাসের পর তাকে শুদ্ধ বলে গণ্য করতে হবে।(৬২) কিন্তু রামচন্দ্ৰ বা গৌতম কেউই এই বিধি মানেননি। আরও অসংখ্য এ রকম নিদর্শন মহাকাব্যে ও পুরাণে পাওয়া যায়, যেখানে, যে নারীর পদস্থলন ঘটেছে তাকে কঠোর শাস্তির দ্বারা দণ্ডিত করা হয়। তার মধ্যে কয়েকটি এত বীভৎস যে সেগুলি উচ্চারণ করা যায় না। যাই হোক, বিবাহিত রমণী শুধু তার স্বামীর থেকেই গর্ভধারণ করবে এবং স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারীর জন্ম দেবে, এটাই প্রত্যাশিত ছিল।

মাতৃত্বের বিষয়ে বা পুত্রের সম্বন্ধে মাতার মনোভাব বিষয়ে কতকগুলি বিচিত্র নিদর্শন পাওয়া যায়। গঙ্গা তার সাত পুত্রকে জলে বিসর্জন দেন। অবশ্য এরা ছিল বসু (স্বৰ্গবাসী), অভিশপ্ত হয়ে পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছিল। এবং, তাদের শাপ কিছুটা হ্রাস করার একমাত্র উপায় ছিল। সদ্য মৃত্যু, যাতে তারা অবিলম্বে স্বৰ্গে ফিরে আসতে পারে, এবং গঙ্গা তাই করতে অঙ্গীকৃত ছিলেন। কিন্তু পিতা যখন সদ্যোজাত পুত্রদের তাৎক্ষণিক মৃত্যুতে শোকাবিষ্ট, তখন যে মা তাদের গর্ভে ধারণ করেছেন, প্রসব করেছেন এবং স্বয়ং ডুবিয়ে মেরেছেন, তাঁর দিক থেকে কোনও অনুশোচনা বা বেদনার কথা শুনতে পাই না। দিব্যাঙ্গনা মেনকাও তাঁর সদ্যোজাত শিশু কন্যা শকুন্তলাকে তীব্র ঋষি স্বামীর সঙ্গেই পরিত্যাগ করেছিলেন। ইন্দ্র তাকে আদেশ দিয়েছিলেন বিশ্বামিত্রের তপস্যা ভঙ্গ করতে, যে তপস্যার দ্বারা ইন্দ্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছিল। মেনকা ঋষির সঙ্গে বাস করলেন একটি সুন্দরী কন্যার জন্ম পর্যন্ত। তারপরেই তিনি স্বৰ্গে চলে গেলেন, কারণ তাঁর কার্য সমাধা হয়েছে। হর্ষচরিত-এ সরস্বতীও সারস্বতের জন্ম দিয়ে তৎক্ষণাৎ স্বগে প্ৰস্থান করেছিলেন। এমনকী হর্ষের মাতা যশোমতীও আসন্ন বৈধব্যের আশঙ্কায় পুত্র হর্ষের করুণ মিনতি। অবহেলা করে চিন্তারোহণ করলেন। সীতাও দুই শিশুপুত্ৰ ফেলে তাঁর মায়ের কাছে চলে গেলেন। মাদ্ৰী দুই পুত্রকে কুন্তীর কাছে রেখে স্বামীর চিন্তারোহণ করলেন, কুন্তীও পুত্রদের ফেলে চলে গেলেন। পুরুরবার প্রতি উর্বশীর কামনা এতই তীব্র এবং যে কোনও রকম বাধার প্রতি এতই অসহিষ্ণু যে, তিনি নবজাত শিশুকে আশ্রমে লালিত হতে পাঠিয়ে দিলেন। মর্ত্য গণিকার প্রতীক হিসাবে উর্বশী স্বাভাবিক ভাবেই কামসর্বস্বতা এবং অপত্যস্নেহহীনতার প্রতিনিধি।

এমনকী গণিকাদেরও কোনও কোনও সময়ে সন্তান জন্মাত। ছেলেদের বলা হত বন্ধুল এবং তাদের গীতবাদ্য ও নৃত্যশিক্ষা দেওয়া হত, যাতে তারা গণিকদের রঙ্গমঞ্চে নাট্যাভিনয়ে যোগ দিতে পারে। মেয়েদের গান, বাজনা, অভিনয় ও অন্যান্য সুকুমার কলা শেখানো হত, কিন্তু অধিকাংশই তাদের মায়ের জীবিকাই অবলম্বন করত, যদি না কোনও সদয় পৃষ্ঠপোষক তাদের নিষ্ক্রয় করে নিতেন। তখন সেই পুরুষেরা তাদের রক্ষিতা রাখত অথবা বিবাহ করত। যাই হোক, এই সন্তানেরা মায়ের কাছেই মানুষ হত, এবং যুক্তিসঙ্গত ভাবে ধরে নেওয়া যায়, মায়ের সঙ্গে তাদের ভাবগত যোগ থাকত।

অনেক সময়েই অনিচ্ছুক নারীদের উপর মাতৃত্ব চাপিয়ে দেওয়া হত। মহাভারত-এ অম্বিক ও অম্বালিকা ব্যাসকে দেখে শিউরে উঠেছিলেন, কিন্তু ব্যাসের কাছে আত্মসমর্পণ করতে এবং তাঁর সন্তান ধারণ করতে তাঁরা বাধ্য হয়েছিলেন। কোনও কোনও যাগে কুমারী, নিঃসন্তান বধু ও সন্তানবতী রমণী— এই তিন প্রকারের দক্ষিণা ছিল; তিন শ্রেণই গ্ৰহীতার সন্তান ধারণ করত। কুলজাতকে নিবীৰ্য ইক্ষাকু রাজার পাঁচশো মহিষীকে প্রতি মাসে তিন রাত্রি করে যে কেউই দাবি করত। তার অধীন হতে হত; এই সব রাত্রে রাজার আদেশে প্রাসাদের তোরণদ্বার উন্মুক্ত করে দেওয়া হত। অবশ্যই অনেক অনিচ্ছক নারীর উপরে গৰ্ভধারণ আরোপিত হত, গল্পে আছে, তারা বিলাপ করেছিল, বাধা দিয়েছিল এবং অবশেষে অসহায় ভাবে বশ্যতা স্বীকার করেছিল। মহাকাব্য ও পুরাণে এমন বহু কাহিনি আছে যেখানে বহু অনিচ্ছক রমণীর উপরে মাতৃত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। অতিথিদের আমোদের জন্য গৃহিণীকে দান করা হত, কখনও বা কুমারী কন্যাদের দান করা হত এবং যুক্তিসঙ্গত ভাবেই বলা যায়, তাদের সকলেই সেই সঙ্গীর জন্য আগ্রহী ছিল না। কোনও কোনও গল্পে বলা হয়েছে, তারা ঘৃণা করেছে, কিন্তু বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে।

মাতৃত্বের জন্য যে সরল কামনা, তা কুমারী কুন্তীর নবপ্রাপ্ত বর নিয়ে খেলা করার মধ্যে প্রকাশ পায়। তিনি যে কোনও দেবতাকে আহ্বান করতে পারতেন, এবং তাঁর আহ্বানে দেবতা আসতেন। সূর্য এসে তাকে একটি পুত্র দিলেন। কিন্তু বিবাহের পরে তাঁর নিবীৰ্য স্বামী পাণ্ডুই তাঁকে প্ররোচিত করেন তিন ভিন্ন ভিন্ন সঙ্গীর কাছ থেকে প্রথম তিন পাণ্ডবকে লাভ করতে। মাদ্রীও প্ররোচিত হয়েছিলেন এবং কুন্তীর কাছ থেকে মন্ত্র শিখেছিলেন। তিনিও এই একই উপায়ে দুই পুত্র লাভ করেন। সমাজ পুত্রের উপর এতটাই গুরুত্ব দিত যে, যে ভাবেই হোক পুত্ৰলাভ করতে হত। সেই পুত্রেরা যে শুধু আইনসঙ্গত ছিল তা নয়, তার জন্য তাদের কোনও কলঙ্ক ছিল না, এবং উরসপুত্রের সমান অধিকারই তাদের ছিল। নিয়োগ প্রথা বহুল প্রচলিত ছিল। মৃত বা নিবীৰ্য পুরুষের সম্পত্তির জন্য পুত্ররূপ উত্তরাধিকারী লাভের কামনাই ছিল এই প্রথার মূলে।

জরৎকারু মুনিকে তাঁর পুর্বপুরুষেরা বলেছিলেন, তিনি পুত্রের জন্ম না দিলে স্বর্গে যেতে পারবেন না। তিনি তা করলেন, কিন্তু পত্নীর সঙ্গে মিলনের পূর্বে তিনি শর্তা রাখলেন যে, সামান্যতম ছল ধরে তিনি পুত্র ও মাতাকে ত্যাগ করে চলে যাবেন। অতএব পুত্র সম্পূর্ণ ভাবে মায়েরই দায় হয়ে দাঁড়াল। পিতা পুত্রের ভরণপোষণের পর্যন্ত ব্যবস্থা করলেন না। অনুরূপ পরিস্থিতিতে শকুন্তলা তার ছেলেকে নিয়ে দুষ্যন্তের সভায় গিয়ে রাজাকে পিতৃ-কর্তব্যে অবহেলার জন্য তিরস্কার করলেন। দুই রাজকুমারের মা সীতা তাদের তপোবনে প্রসব করলেন এবং ভিক্ষুবকরূপে লালন করলেন, কেননা তাদের পিতা পুত্রদেরও তাদের মাতার কোনও উদ্দেশ্যই করলেন না।

সুখী পরিবারের প্রতীক শিব, পার্বতী, গণেশ ও কাৰ্ত্তিকেয়, পরে যেখানে লক্ষ্মী ও সরস্বতীকে যোগ করা হয়েছে। কিন্তু পরিবারের শুরু কীৰ্ত্তিকেয়ের জন্ম দিয়ে। শিব ও পার্বতীর মিলনের কাহিনির ভূমিকায় বলা হয়েছে, তারকাসুর দেবতাদের উত্তাক্ত করছিল; তখন দেবতারা ব্ৰহ্মার কাছে দল বেঁধে যান উপায় জানতে। ব্ৰহ্মা তাদের বলেন, কেবলমাত্র শিব-পার্বতীর পুত্ৰই অসুরদের বিরুদ্ধে দেবতাদের উপযুক্ত সেনাপতি। কিছু দৈব ষড়যন্ত্রের পর মহাদেব ও পার্বতীর মিলন ঘটল।

এই কাহিনির একটি অন্য রূপ হল ‘রুদ্র অগ্নির মধ্যে প্রবেশ করে স্কন্দকে সৃষ্টি করলেন।’(৬৩) আর একটিতে বলা হয়েছে কাৰ্ত্তিকেয়কে গর্ভে ধারণ ও প্রসবের জন্য উমা অগ্নির স্ত্রী স্বাহাতে প্ৰবেশ করেছিলেন।(৬৪) আবারও একটিতে বলা হয়েছে, শিবের বীজ অগ্নিতে পড়েছিল, তিনি তা ধারণ করতে অসমর্থ হয়ে তা গঙ্গায় নিক্ষেপ করেন এবং গঙ্গাও অসহ্য তেজ সহ্য করতে না পেরে কুশের মধ্যে নিক্ষেপ করেন এবং সেখানে কৃত্তিকা ভগ্নিগণ তা লালন করেন।(৬৫) এই সমস্ত ভিন্ন ভিন্ন রূপের সমান ধর্ম দুটি; অগ্নি যদিও পৌরাণিক মতে শিবের অপর স্বরূপ, বীজের উৎস শিবের থেকেই। কিন্তু পার্বতীর মাতৃত্ব নিশ্চিত ভাবে অস্বীকার করা হয়েছে। এই কাহিনিতে এবং এর অন্যান্য রূপে যেটা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তা হল কোথাও পার্বতীকে কাৰ্ত্তিকেয়ের মাতা বলে স্বীকার করা হয়নি। আমরা যে ভাবে জানি গণেশ আংশিক ভাবে হস্তী–তাই পার্বতী যাকে জন্ম দিয়েছিলেন, ঠিক সেই পুত্র নন। সরস্বতী এথেনার মতো ব্ৰহ্মার মস্তক থেকে এবং লক্ষ্মী ভিনাসের মতো মথিত সাগর বেরিয়েছেন। তাই আমাদের সামনে এই বিস্ময়কর তথ্য থাকে–পার্বতী তার সন্তানদের কারওরই সম্পূর্ণ ভাবে মা নন। এই ইতস্তত ভাব কেন, কেন এই ব্যাখ্যাতীত দ্বিধা? বীজ যখন শিবের, তখন কাৰ্ত্তিকেয়ের ক্ষেত্রে তাঁর পিতৃত্ব অবিসংবাদিত— যে কাৰ্ত্তিকেয় সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান, মহাসুর তারকের নিহস্তা, দেবসেনার সেনাপতি। কিন্তু বীজের পিতৃত্ব সম্বন্ধে নিঃ সংশয় হলেও তা কোনও নারীর গর্ভে বৃদ্ধিপ্ৰাপ্ত হয়নি। সোজা কথায় বলতে গেলে, কাৰ্ত্তিকেয়ের মা হওয়ার গৌরব কোনও নারীই লাভ করেনি। লোক পরম্পরা পাৰ্বতীকে কাৰ্ত্তিকেয়ের সঙ্গে যুক্ত করলেও পুরাণ তা করেনি। মনে রাখতে হবে, ইন্দ্ৰ-শচী ও জয়ন্ত, কৃষ্ণরুক্মিণী এবং তাদের পুত্রেরা–এই সব দৈব পরিবারগুলিও শিব, পাৰ্বতী ও তাদের সন্তানদের তুলনায় নিতান্তই ফিকে। কিন্তু জীববিদ্যাগত দিক দিয়ে এটি যথার্থ পরিবার নয়।

মনে হয়, এর কারণ নিহিত আছে প্রজননে যৌনসঙ্গীর ভূমিকা বিষয়ে সমাজের অবচেতন ধারণায়। বৈদিক আর্যেরা যখন ভারতবর্ষে এসেছিল, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব দ্বাদশ শতাব্দীতে, তখন তারা নিজেরা পশুপালক যাযাবর মানুষ ছিল। তারা তাদের পশুপালের মধ্যে প্ৰজনন ক্রিয়া দেখত এবং জীবতত্ত্বগত প্রজননের মৌলিক জ্ঞান তাদের ছিল। কিন্তু ভারতবর্ষেদেশীয় কৃষিজীবী মানুষেরা ছিল। আর্যেরা তাদের কাছ থেকে কৃষিশিক্ষা করেছিল, যাযাবর বৃত্তি ত্যাগ করেছিল এবং শিকার ও পশুপালন আহার্য সংগ্রহের একটি পরিপূরক উৎস হিসাবে বজায় রেখেছিল। পশুপালক সমাজে সমগ্ৰ পশুপালক, তা পুরুষই হোক বা স্ত্রী, প্রভুর সম্পত্তি এবং নবজাত বৎসগুলিও স্বাভাবিক ভাবে তারই হত। কৃষিতে যৌথ প্ৰভুত্ব আছে; ভুমির প্ৰভু সব সময়ে বীজের প্রভু নয়। তাছাড়া ভূস্বামী সব সময় নিজের জমি চাষ করে ফসল তোলে না। সমাজের অর্থনীতির নানা স্তরে ভূমির, বীজের এবং শ্রমের ভিন্ন ভিন্ন প্ৰভু ছিল। মহাভারত-এ একটি উপাখ্যান আছে, এখানে পৃথিবী চোখের জল ফেলতে ফেলতে ঈশ্বরের কাছে আসেন, বিক্রয় এবং হস্তান্তরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে। মনে হয় প্রাচীন যুগে ভূমির প্রভুত্ব অপরিচিত ধারণা ছিল; ভূমি কৰ্ষিত হত মানুষের খাদ্য যোগাতে।(৬৬)

পার্বতীকে কার্ত্তিকেয়ের মাতৃত্ব প্রদান করার বিষয়ে পুরাণবিদের অনীহা হল কার্ত্তিকেয়ের একমাত্র পৌরাণিক জনক হিসাবে শিবকে প্রতিষ্ঠিত করার একটি পন্থা। যে বীজ পাৰ্বতীর গর্ভে আগুন ছিল তা তিনি ছুড়ে ফেলতে সোনা হয়ে গেল; তা গঙ্গাকে তীব্র ভাবে দহন করল। যতক্ষণ না তিনি তা কুলের ঘাসের উপর ছুড়ে ফেললেন, এবং দেবমাতা কৃত্তিকারা তা লালন করলেন। ভাষার ইঙ্গিত ভেঙে বোঝা যায়, শিবের বীজের উন্নততম শক্তি, অসহনীয় সৃষ্টির উত্তাপ, পার্বতী, গঙ্গা–এমনকী কৃত্তিকারা, যাঁরা ধারণ করেনি–এঁদের নিষ্ফল প্রয়াস। অবশেষে তা প্ৰায় স্বকীয় ভাবেই কুশের মধ্যে বৃদ্ধিপ্ৰাপ্ত হয়েছিল, যদিও দেবমাতারা প্রায় দাসীর মতোই তাকে লালন পালন করেছিলেন। এই উপাখ্যান পিতা-মাতার ক্রমিক অবস্থান সম্বন্ধে সমাজের মনোভাবের বিষয়টিকে আমাদের কাছে সরাসরি নিয়ে আসে। বীজটি যদিও অবিসংবাদিত ভাবে শিবের, গর্ভ পার্বতীর নয়, অন্য কোনও নারীরও নয়। পার্বতী বীজটিকে নিক্ষেপ করেন; গঙ্গা, যিনি পৌরাণিক মতে মহাদেবের অপর ভার্যা, তা ধারণ করতে পারেননি, এবং কৃত্তিকারা ধাত্রীমাত্র।

খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর মধ্যে আর্যেরা কৃষিজীবী হয়ে পড়েছিলেন, এবং তাদের জীবন সম্বন্ধে দৃষ্টিভঙ্গি কৃষিজীবীরই দৃষ্টিভঙ্গি। পিতামাতা বিষয়ে এই দৃষ্টিভঙ্গি নিশ্চিত ভাবেই পুরুষতান্ত্রিক। নারী ক্ষেত্র, পুরুষ তার মধ্যে বীজ বপন করে। এই দৃষ্টি প্রধান ভাবে পিতৃতান্ত্রিক, যেহেতু ক্ষেত্র ও বীজ উভয়েই পুরুষের, অতএব পুত্র প্রধানত পিতারই। মনু এ ব্যাপারে নিষ্ঠুর ভাবে স্পষ্টবাদী: বীজ এবং গর্ভের মধ্যে বীজই উৎকৃষ্ট। সব প্রাণী বীজের ধর্মগ্রহণ করে।’(৬৭) ‘গর্ভের ধর্ম বীজের হয় না।’(৬৮) তবে সন্তান কার? এ ব্যাপারেও মনু স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন: ‘যেমন গবাদি পশু, অশ্ব, উট, দাসী, মহিষ, ছাগ ও মেয়ের ক্ষেত্রে পুরুষ সঙ্গীরা বৎসের অধিকারী হয় না, নারীর ক্ষেত্রেও তাই।‘(৬৯) ‘স্বামী ছাড়া অন্য পুরুষ যদি পুত্রের জন্ম দেয়, তখন ক্ষেত্ৰ বীজের চেয়ে উৎকৃষ্ট এবং পুত্র তখন স্বামীর, জন্মদাতার নয়।’(৭০) এখানে অবশ্য জন্মদাতা না স্বামী, কে পুত্রের অধিকারী সে বিষয়ে মতভেদ আছে।(৭১) ‘নারী ক্ষেত্ৰ, পুরুষ বীজ।’(৭২) পত্নী থাকার উদ্দেশ্য কী? ‘পুত্রের জন্ম, শিশুর লালন-পালন, দৈনন্দিন সেবা, সব কিছুই পত্নীর উপর নির্ভর করে।’(৭৩) আর সবচেয়ে বড় কথা, মনু স্পষ্ট ভাবে বলেছেন: ‘নারীর সৃষ্টি কেবলমাত্র জন্ম দেওয়া, তাই তারা পূজ্যা, গৃহের আলো।’(৭৪) সুতরাং নারীর সৃষ্টি জন্ম দিতে, পুরুষের সৃষ্টি বংশ রক্ষা করতে।

এই সব ধারণাগুলো যেহেতু সমাজ চেতনায় গভীর ভাবে প্রোথিত ছিল, অতএব মাতৃত্বের ভাবনা কয়েকটি বিশেষ ব্যঞ্জনার অধিগ্ৰহণ করে: শিশুর জন্মবিষয়ে, কেবলমাত্র প্রসবের সময় ছাড়া, নারীর ভূমিকা কৃষিক্ষেত্রের মতোই নিস্ক্রিয়। যেমন কর্ষণের পর উপ্ত বীজ। আপনা। থেকেই বৃদ্ধিলাভ করে ক্ষেত্রের দৃষ্ট ও সক্রিয় প্রচেষ্টা ছাড়াই, তেমনই মাতাও নিস্ক্রিয় ভাবে বীজ ধারণ করত।(৭৫) ভ্রূণ নিজে নিজেই বাড়ত। ফসল কাঁটার সময়ে যেমন ক্ষেতের মালিক, যে সম্ভবত বীজ বপনকারীও বটে, এসে ফসল সংগ্রহ করে নিয়ে যায়, তেমনই স্বামী শিশুকে দাবি করে। ক্ষেত্রের মূল্যবোধও এই ধারণায় সমর্থন পায়: গোবৎস, মহিষ, উট, ঘোড়া, ছাগ, মেষ, এদের বৎসরা তাদের জন্মদাতার নয়, পালের মালিকের। এই তালিকায় দাসীর অন্তর্ভুক্তি সমাজে তার যৌন অবস্থান সম্বন্ধে যে মনোভাব তা মর্মদ্ভদ ভাবে পরিস্ফুট করে। সে তার প্রভুর পরিবারের সব পুরুষ সদস্যের সহজ ভোগ্য। তার পুত্র যদি তার স্বামীর সন্তানও হয়, সে তারও নয়, তার স্বামীরও নয়, তার প্রভুর–ক্ষেতে বা কারুকর্মে উৎপাদনমূলক শ্রমে বাড়তি বাহুবল হিসেবে।

মানুষের উৎপাদনের উপায় নিয়ন্ত্রিত করতে এবং তৎকালীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে সেই উপায়গুলি নিবেদন করতে রাষ্ট্র বাধ্য হয়েছিল তার (নারীর) শরীরের উপর তার নিয়ন্ত্রণ ও অধিকার বিস্তুত করতে। তাই সে তার নিজের শরীরের উপর প্রভুত্ব হারিয়েছে।’ নারীর নিজের দেহের উপর অধিকার হারানোর যুগ্ম প্রমাণ হল, দাসীই হোক আর পত্নীই হোক, তাকে তার প্রভু বা স্বামীর যৌন দাবি মেটাতে হত এবং তার গর্ভের ফলের প্রভু হত সে নয়, তার স্বামী বা প্ৰভু। তাকে প্রায়ই যৌন সংসর্গে বাধ্য হওয়ার যন্ত্রণা সহ্য করতে হত, দীর্ঘ মাসের পর মাসব্যাপী গর্ভধারণের কষ্ট সহ্য করতে হত, তীব্ৰ গৰ্ভযন্ত্রণা, লালন-পালন, উদ্বেগ, শিশুকে স্তন্যপান করানো, অসুস্থতায় ও আঘাতে তার সেবা করা সবই করতে হত। কিন্তু শেষ পর্বে শিশু তার নয়, তার স্বামী অথবা প্রভুর।

তা সত্ত্বেও কিন্তু মাতৃত্বের মহিমা উত্তরোত্তর বেড়ে যেতে লাগল; যে বাস্তবকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তার উপরে চাপিয়ে দেওয়া হত, এ তারই ভাবগত এবং মানসিক ক্ষতিপূরণ। এখানে, ভারতবর্ষে, মাতৃত্বকে ততটাই মর্যাদা দেওয়া হত, যত পরিমাণে সমাজে নারীর অবস্থার অবনতি ঘটছে। ঋগ্বেদ-এর দেবমণ্ডলী প্রধানত পুরুষবহুল।(৭৭) ক্রমশ পরবর্তী শতাব্দীগুলি ধরে দেবতাদের বিবাহিত রূপে দেখানো হতে লাগল, যেহেতু ব্রাহ্মণ-সাহিত্যের সময় থেকেই সমাজে বিবাহ আবশ্যিক হয়ে দাঁড়ালো। কিন্তু মহাকাব্য ও পুরাণ-সাহিত্যে তাঁদের পুত্রসন্তান জন্মাতে লাগল। পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকার সমাজে সর্বব্যাপী প্রয়োজন হয়ে উঠল, যে সমাজে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী পুত্রদের নানা প্রকারভেদ স্বীকার করা হত। তখন দেবী মাতারাও তাদের স্বামীদের নামে পরিচিত হতে লাগলেন। সামাজিক বাস্তব তত দিনে নারীকে সামাজিক গুরুত্বপূর্ণ জননীর ভূমিকায় ঠেলে দিয়েছে। নারী হিসেবে, সামাজিক জীব হিসেবে, স্বাধীন চিন্তা, কর্ম ও ভাবনা বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে তার যে নিজ সত্তা, তা সে খুঁইয়েছে। যদি সামগ্রিক ভাবে নাও হয়, অন্তত প্রধান ভাবে সে শুধুই মা, পুত্রসন্তানের জন্মদাত্রী।

ষষ্ঠ থেকে সপ্তম শতাব্দীর আশপাশে তন্ত্রের প্রভাব ভারতে অনুভূত হতে লাগল। তন্ত্রে আবার নারীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তাই সপ্তম শতাব্দীর এক প্রধান গদ্য কবি বাণভট্ট যে দেবী চণ্ডীর উদ্দেশে গদ্যে স্তুতি রচনা করেছেন, তা কোনও আকস্মিক ঘটনা নয়। অন্যেরাও তাঁর অনুসরণ করলেন এবং একটি সম্পূর্ণ স্তোত্রসাহিত্য সৃষ্টি হল, যা দেবীদের স্তুতি করে। সপ্তমাতৃকাকে মূর্তিতে পূজা করা হত। তাদের কীর্তিকলাপ সৃষ্টি করা হল এবং এই দেবীদের যে সাম্প্রদায়িক পূজা, তার উদ্দেশ্যে গুচ্ছ গুচ্ছ উপকথা তৈরি হল। এই ভাবে মাতৃকারা কেমন ভাবে তাদের সন্তানদের লালন-পালন ও উদ্ধার করেন, তারই গুরুত্বহীন কিছু উপকাহিনি সৃষ্টি হল। দৈবস্তরে মাতৃত্বের এই উন্নয়নের অবশ্যম্ভাবী ফল ফলেছিল মানবিক স্তরে। নারীর অস্তিত্বের একমাত্ৰ হেতু ছিল মাতৃত্ব। ‘নারীদের পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের ভূমিকায় এবং তারই মাধ্যমে জীবন কাটাতে অনুপ্রেরিত করা হত এবং মাতা হিসেবেই সর্বাগ্রে তাদের স্তুতি করা হত।’(৭৮) এই ব্যাপার অন্যত্রও ঘটেছিল। ‘ভিক্টোরীয়রা অশান্তি বোধ করে অনেক সময়ে এই অনুভূত শক্তিকে যুক্তিসম্মত করত–মাতৃত্বের আত্মত্যাগমূলক ও লঘু পাক পূজনীয়তায় নারীত্বকে গুলে।’(৭৯)

শুধু যে নারীর উপর অনেক সময়ে মাতৃত্ব আরোপিত হত, তাই নয়, নারীরা বাধ্য হত। মাতৃত্বকে তাদের জীবনের মূল তত্ত্ব হিসাবে গ্রহণ করতে; তারা বন্ধ্যান্ত্বের নিন্দ করত এবং গৰ্ভকে ফলপ্রদ করার জন্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অকথ্য যন্ত্রণা ভোগ করত। পুরুষের বীর্যহীনতা আবছা ভাবে মাত্র জানা ছিল, নারীরাই সব সময়ে সন্তানহীনতার জন্য সামাজিক ভাবে ও মানসিক ভাবে মূল্য দিত। নারীরাই আবার দুর্ভাগিনী বন্ধ্যা রমণীকে দোষ দিত ও ব্যঙ্গ করত, কারণ নারীরা পুত্ৰধারণের গুণ বিষয়ে পুরুষের সামাজিক মূল্যবোধ অন্তঃসার করেছিল। তাই প্রতিটি বালিকাকে দেখা হত পুত্রসন্তানের ভাবী মাতা হিসেবে, তাকে এই দৈব কর্তব্য পালন করার জন্য শিক্ষা দেওয়া হত এবং তৈরি করা হত এবং যদি সে এ কাজ সম্পন্ন করতে না পারত, তবে সেটা তারই দুর্ভাগ্য; সে নিজে এবং সমাজ তাকে মনে করত সম্পূর্ণ রূপে অশুভ, অসম্পূর্ণ এবং নিস্ফল জীব। ‘নারীর মাতৃত্ব ছিল লিঙ্গগত কর্ম বিভাগের প্রধান হেতু এবং নারীর উপর পুরুষের শাসনেরও প্রধান হেতু।’(৮০)

নারীর প্রতি এবং মাতা হিসেবে তার ভূমিকার প্রতি যে মনোভাব, সেটা যে সামাজিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে উদ্ভূত, তার দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। যখন কৃষিপ্রধান সমাজে কৃষিকর্মের জন্য আদিম যন্ত্রাদি ব্যবহার করা হয় এবং কৃষিকর্মের নানা প্রাকৃতিক বিপাকের কারণে ভাল ফসল হওয়ার কোনও স্থিরতা থাকে না, তখন সেই সমাজে চাষবাসের জন্য অনেকগুলি জাতের প্রয়োজন হয়। সেখানে সম্পত্তি রেখে যাওয়ার জন্য পুত্রেরও প্রয়োজন হয়। প্রাসঙ্গিক ভাবে, সেখানে কন্যাসন্তানেরও প্রয়োজন আছে, যে কন্যারা বিবাহ করে সন্তানের জন্ম দেবে। তাই মূলত নারীর উর্বরতার উপরে বিশাল গুরুত্ব দেওয়া হত এবং এ কথা অনুমান করলে ভুল হবে না যে, নারীরা নিজেরাই প্রথম পর্বে উর্বরতাকে শক্তিরূপে ব্যবহার করেছিল। বহুবিবাহের পরিবারে সন্তানের মাতা তার বন্ধ্যা বা নিঃসন্তান সপত্নীর তুলনায় সামাজিক উৎকর্ষ ভোগ করত এবং তার গর্ব করত। বহু অনুষ্ঠানে যে নারীর স্বামী-সন্তান বেঁচে আছে, তারই শুধু অধিকার ছিল। সন্তানবতী নারী কিছু কিছু সুবিধা ভোগ করত, যা থেকে নিঃ সন্তান নারী বঞ্চিত হত। মহাকাব্য ও পুরাণ সাহিত্যে অনেক পুরুষই তার মায়ের নামে পরিচিত। কিন্তু যে সমাজে বহুবিবাহ আছে, সেখানে মাতৃনামের ব্যবহার পুত্রের স্পষ্ট পরিচয়ের একটি পদ্ধতি। তাহলেও তা মায়ের সঙ্গে পুত্রের যোগ নির্দিষ্ট করত এবং অন্তত বুদ্ধিগত ভাবেও তাদের ও মাতৃত্বের সামাজিক স্বীকৃতির মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করত। কিন্তু মায়ের সামাজিক বন্দিত্ব তার শক্তিকে হরণ করে নিয়েছিল এবং স্বার্থসাধনে তার উর্বরতাকে ব্যবহার করেছিল। তাই এর পক্ষে মাতৃত্ব মানে সহজ সরল যন্ত্রণাভোগ, কারণ সে শেষ পর্যন্ত তার গর্ভের সন্তানকে নিজের বলে দাবি করতে পারত না। এই প্রক্রিয়ায় সে কষ্ট পেত, কিন্তু অবশ্যই ভাবগত ভাবে কিছু সুখ পেত, তার উর্বরতা এবং তার থেকে উদ্ভূত তার পবিত্রতার সামাজিক স্বীকৃতি রূপে।

‘নারীর মাতৃত্ব এবং তার থেকে সুখ পাওয়ার ক্ষমতা প্রবল ভাবে অন্তঃসারকৃত হয়েছে এবং মনস্তাত্ত্বিক ভাবে চাপানো হয়েছে ও বিবর্তনমূলক ভাবে নারীর মনস্তাত্ত্বিক গঠনে গ্রথিত হয়েছে।’(৮১) এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি মায়ের ব্যবহারের কাঠামো গঠিত করে। নারীর উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য সামাজিক অনুরপ্রেরণা পরিপূর্ণ ভাবে আত্মসাৎ করেছিল, গ্রহণ করেছিল এবং নিজেদের অজান্তে অন্তঃকৃত করেছিল নারীরাই। এই অন্তঃকৃত করার আর একটি সহায়ক ছিল। বিবাহিতা নারীর শিক্ষার সুযোগ অস্বীকার করা হয়েছিল। নিজস্ব কোনও পেশা, স্বাধীন সামাজিক বা রাজনৈতিক অস্তিত্ব অধিকাংশ সুকুমার কলা এবং বহু বিনোদন থেকে সে বঞ্চিত ছিল। গৰ্ভধারণই একমাত্ৰ পথ যা তার কাছে খোলা ছিল, যার মাধ্যমে সে তার সামাজিক প্রয়োজনীয়তা প্ৰমাণ করতে পারে এবং পারিবারিক ও সামজিক আবেষ্টনে কিছু সম্মান পেতে পারে। জীবিকা উপার্জনের সুযোগ থেকে নারীকে বঞ্চিত করে তাকে অবদমিত করে রাখা সম্ভব হয়েছিল। তার স্বামী তার প্রভু।’(৮২) তাই তারা তাদের রুটি-রোজগারকারীর উপর নির্ভরশীল ছিল, মনে করত, স্বামীর সন্তান ধারণ করে তারা প্রভুর কিছুটা ঋণ শোধ করছে।

আর্যরা যখন উত্তর ভারত জয় করেছিল, সেই দেশের কিছু মানুষকে দমন করা বা ক্রীতদাস বানানো হয়েছিল, বাকিরা বিন্ধ্য অঞ্চলে পালিয়ে গিয়েছিল। যারা পালিয়েছিল তাদের মধ্যে কেউ কেউ ধরা পড়ে দাসে পরিণত হয়। নবোদ্ভূত সমৃদ্ধ শ্রেণিতে দাসেন্দের ব্যবহার করা হত গৃহে কর্মে, গ্রিস ও রোমের মতো সামাজিক উৎপাদনমূলক কাজে নয়।

গৃহকর্মের অনেকটা অংশ দাসেন্দের হাতে যাওয়ায় এই সব গৃহের নারীরা সমস্ত উৎপাদনমূলক কাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল এবং কিছুটা নিম্প্রয়োজন হল, ফলে তাদের একমাত্র সামাজিক প্রয়োজনীয়তা হয়ে দাঁড়াল সন্তানের জন্ম দেওয়া, যা কোনও প্রাচীন কালে সামাজিক উৎপাদনমূলক ছিল। কারণ, আমরা দেখেছি, সমাজে এই পর্বে অর্থনীতি চালু রাখার জন্য বেশি সংখ্যক হাতের প্রয়োজন হত এবং উদ্ধৃত্ত তৈরি করার জন্যও তার প্রয়োজন ছিল।

পুরুষ সমাজ শাসন করত, অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করত এবং সমাজের বিভিন্ন অংশের ভূমিকা নির্ধারণ করত। নারীর প্রধান কাজ যখন হয়ে দাঁড়াল সন্তানধারণ, তখন তারা যন্ত্রণারই ভাজন হল এবং পরিবর্তে সম্মান বা ক্ষতিপূরণ সামান্যই পেল। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে অধিকাংশ নারীর কাছে মাতৃত্ব ছিল যন্ত্রণা ও বঞ্চনা ’বস্তুত মাতৃত্ব ছিল ‘পুরুষের নিয়ন্ত্রণের যে সর্বাপেক্ষা বৈচিত্ৰ্যময় সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা, তারই ভিত্তিপ্রস্তর. নারীর বন্দিত্বের তথ্য শুধু নয়. কিন্তু যে পদ্ধতিতে এই তথ্য অনুপ্রবিষ্ট হয়েছিল নারীর ওপর পুরুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার ব্যবস্থায়।’(৮৩)

প্রাচীন ভারতে মাতৃত্বের ট্রাজেডি ছিল, বিকল্পহীন যে জোর নারীর উপর খাটানো হয়েছিল সেইটা। আর এই জোর ছিল সমাজে সেই সব অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির ফলে যে শক্তিগুলির উপরে নারীর কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না। পুরুষ উত্তরোত্তর লাভবান হচ্ছিল এবং তার প্রত্যক্ষ সহকারী হিসেবে নারীর তদনুযায়ী ক্ষতি হচ্ছিল। মাতৃত্ব যে আনন্দময় হতে পারে, যখন নারী নিজে তা চায় এবং গর্ভধারণ ও প্রসবের কষ্ট সহ্য করতে প্ৰস্তুত হয়। এই আশায় যে দম্পতির কিছুটা যৌথ নিয়ন্ত্রণ থাকবে সন্তানের উপর, কন্যাসন্তান যে পুত্রের মতোই সুখকর এবং আনন্দদায়ক হতে পারে, মা যে নিজের ইচ্ছায় কষ্ট সহ্য করেছে একটি জীবনকে পৃথিবীতে আনার জন্য, তাই কিছু সম্মান তার প্রাপ্য— এ সব কথা প্রাচীন ভারতে কোনও মা ভাবতেই পারত না। সে শুধু তার উর্বরতার গর্ব করত— যে শক্তি মানবেতর প্রাণীরও আছে–কিন্তু তার কষ্টের জন্য কোনও স্বীকৃতি প্রত্যাশা করত না। তার আনন্দ, তার আশা-আকাঙ্ক্ষা, তার স্বপ্ন, সবই শিশুর মধ্যে বদ্ধ। যতদিন সে সাবালক হয়ে না। ওঠে এবং তার পরেও ভিন্ন স্তরে। সন্তানকে আনার ইচ্ছা’ থেকে সে বঞ্চিত, শিশুর মানসিক লালন-পালন ও শিক্ষাদান থেকে সে বঞ্চিত, সে শুধুমাত্ৰ গৰ্ভধারণের যন্ত্রে পর্যবসিত। যাজ্ঞবল্ক্যু-র স্ত্রী শাসনের বিধানের কথা আগেই বলেছি। এই পুরুষেরাই সমাজের চরিত্র গঠন করে। এই ধরনের শাস্ত্ৰ যৌন সংসর্গে নারীর স্বাধীনতা কেড়ে নেয়, তাকে স্বামীর যেমন খুশি ব্যবহারের যন্ত্র করে তোলে। তাই গর্ভাবস্থা তার উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। সে কি এমন গর্ভাবস্থা উপভোগ করতে পারে, সে কি সামান্যতম আনন্দের সঙ্গে সন্তানের জন্মের প্রতীক্ষা করতে পারে? সত্য কথা, সব গর্ভাবস্থার ক্ষেত্রে এটা ঠিক নয়, কিন্তু মহাকাব্য ও পুরাণে বহু অংশে অনিচ্ছুক নারীকে পুরুষের যথেচ্ছ ব্যবহারের কথা বলা হয়। এ রকম মাতৃত্ব আপনা থেকেই বোঝা হয়ে উঠত, অত্যাচার হয়ে উঠত। যুগ্ম ভাবে প্ৰাণ সৃষ্টি করা সন্তানকে লালন-পালন করা, সমস্যা ভাগ করে নেওয়া, দুজনে মিলে বাধা ডিঙোনো, এ সব গ্রন্থে নেই। মায়েরা শৈশবে শিশুর কাছাকাছি আসতে ও থাকতে বাধ্য হত যেহেতু পিতারা তাদের বাইরের জীবিকা ও দায়িত্ব নিয়ে ব্যস্ত থাকত। তাই সন্তানেরা স্বভাবতই মাকে বেশি ঘনিষ্ঠ ভাবে চিনত। ‘সন্তান পালনের ব্যাপারে নারীর সামগ্রিক অধিকারের পরিপ্রেক্ষিতে পিতা অনেক পরে উল্লেখযোগ্য এবং পরিচিত একটি সত্তা হয়ে উঠত।’(৮৪)

তা সত্ত্বেও কিন্তু যে মুহুর্তে পুত্রের দৈনন্দিন শারীরিক প্রয়োজনে মায়ের উপর নির্ভরশীলতা শেষ হত, তখন থেকেই সে তার পিতার উত্তরাধিকারী এবং কন্যা যখন শারীরিক ভাবে মায়ের উপর নির্ভরশীল থাকত না, তার অল্প পরেই তাকে বিবাহ দেওয়া হত। তখন মা একা হয়ে যেত, যদি না সে একটি গর্ভ থেকে আর একটি গর্ভে চলে যেতি–যা প্রায়ই ঘটত। তারপর একটা সময় আসত যখন পরস্পর সন্তান ধারণ এবং গৃহকর্মের ফলে তার যৌবন ও রূপ চলে যেত; তখনই তার স্বামী আরও তরুণী, আরও সুন্দরী এক নারীকে ঘরে আনত, যে স্বামীকে খুশি করবে এবং তার সন্তান ধারণ এবং রক্ষা করবে। পূর্ব স্ত্রীর কোনও কোনও সন্তান, বিশেয করে পুত্রসন্তান, ঘরে থাকবে এবং পিতার আচরণ থেকে দাম্পত্য জীবনের একটি ছক অন্তঃস্থ করবে। তারা বুঝবে এবং তাদের বৃদ্ধা মা বুঝবে, যে মা হওয়ায় মানসিক কোনও নিরাপত্তা আসে না, সে শুধুমাত্ৰ সন্তান জন্মের যন্ত্র, যাকে অনায়াসে ত্যাগ করা যায়, যখন তার প্রধান উৎপাদনমূলক কাজে সে ব্যর্থ হয়। তাই মাতৃত্বের মধ্যে ছিল সংশয়, উদ্বেগ, অনিরাপত্তা এবং শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা, তার পরিবর্তে সামান্যই ক্ষতিপূরণের সুখ। এ কথা সত্য যে তাকে খেতে পরতে দেওয়া হত আশ্রয় দেওয়া হত, এমনকী যৌন বিষয়ে তার স্বলন হলেও তার পুত্র তার জন্য প্ৰায়শ্চিত্ত করত এবং তার জন্য প্রার্থনা করত। স্বামীর মৃত্যু হলে পুত্রেরা ধৰ্মগত ভাবে মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিত। কিন্তু তার স্বামীর জীবদ্দশাতেও যেহেতু সে সামাজিক সম্মান অল্পই পেত, তাই পুত্রেরা যে তাকে সম্মান দেখাতে বাধ্য ছিল না, এমন অনুমান কিছু উদ্ভট নয়। এটাই প্রাচীন ভারতে মাতৃত্বের প্রধান ব্যঙ্গাত্মক দিক। নারীকে মানুষ করা হত এই ভাবনায় যা তাকে শিক্ষা দিত, সে ভাবী মাতা। বালিকা কাল থেকে তাকে এই সামাজিক ভাবে নিয়ন্ত্রিত ভূমিকার জন্য প্ৰস্তুত করা হত।

তা সত্ত্বেও, যেমন কৃষিকর্মে থাকে, তেমনই ক্ষেত্র কর্ষনের জন্য অনুষ্ঠান থাকত–পুংসবন, সীমন্তোন্নয়ন, ইত্যাদি। কিন্তু কোনওটিতেই গর্ভবতী নারীর সুস্বাস্থ্য, সুখ বা দীর্ঘজীবনের জন্য কোনও প্রার্থনা নেই। এ রকম প্রার্থনা করা হয়। পিতার জন্য, যার এ সবের প্রয়োজন নেই, এবং ক্রুণের জন্য, যার অবশ্য প্রয়োজন আছে। কিন্তু মাতা, ক্ষেত্র, তার পরে অবজ্ঞাত হয়, যত দিন না তার প্রসব হয়। মা শুধু গৰ্ভধারণের যন্ত্র, বেশিও নয়, কমও নয়। শিশুর আবির্ভাবের জন্য সে অত্যাবশ্যক, কিন্তু শিশু তার পিতার, যার একটি প্রার্থনা বিশেষ উল্লেখযোগ্য: ‘আমার থেকে জন্ম, অঙ্গ থেকে অঙ্গ, তুমি আমার হৃদয় থেকে জন্মেছ, পুত্ৰ, তুমি আমারই স্বরূপ।’ এখানে ভ্রূণের বৃদ্ধির ব্যাপারে মায়ের অবদান সম্পূর্ণ অবজ্ঞাত এবং শিশুর মানসিক বৃদ্ধির বিষয়ে তার ভূমিকার কোনও স্থানই নেই। এতে তার সঙ্গে শিশুর মানসিক যোগসূত্রও ছিন্ন করা হয়, অন্তত ভাবগত ভাবে। নবজাতকের হৃদয় শুধু তার পিতার এটাই দাবি। ক্ষেত্ৰ। যেমন ফসল উৎপাদন করে, কিন্তু তার উপর তার অধিকার নেই, তা ভোগ করতেও পারে না, তেমনই মাকে দেখা হত তেমনই অসার। তাই ফসল তোলার পর অনায়াসে তাকে ভুলে যাওয়া যেত।

দুটি ভাবগত অসাধারণ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন আছে। প্রথমটা হল ‘মাতা সহস্র পিতার সমান’ এই ধরনের বক্তব্য। যে শারীরিক জনন ছাড়া পিতা তার সম্পত্তি হিসেবে পুত্রকে পান না, এ সেই তথ্যেরই উদ্দেশ্যে স্তুতি। কতকটা ক্ষতিপূরণও বটে, কারণ আরও উক্তি আছে, ‘মাতৃভক্তির দ্বারা পুত্ৰ পৃথিবী লাভ করে, পিতৃভক্তির দ্বারা স্বৰ্গলাভ করে।’ এর মধ্যে পিতা-মাতার ভিতরে সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য পরিস্ফুট হয়। তাছাড়া মায়ের তুলনায় বাবাকে উচ্চাসনে বসাবার সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রয়োজন সত্ত্বেও বাস্তবজীবনে মায়ের নিঃ স্বাৰ্থ সেবা নিঃসন্দেহে তাকে তার সন্তানদের কয়েকজনের কাছে অন্তত অনেক উঁচুতে তুলে দিতে বাধ্য এবং এরই প্ৰকাশ ঘটেছে মাকে সম্মান দেওয়ার বিধানে।

দ্বিতীয় পার্থক্য হল মাতৃকাদের অস্তিত্ব, যা সৃষ্টির মাধ্যমে সমাজ মাতৃগণের সামাজিক বিড়ম্বনার ক্ষতিপূরণ করতে চেষ্টা করেছে। এই মাতৃকাদের অধিকাংশের সন্তান আছে, কিন্তু উপকাহিনিতে মাতা ও শিশুর রূপ বিশেষ দেখানো হয়নি, কয়েকটি বিশেষ ভঙ্গিতে ছবি ও মূর্তিতে ছাড়া। এই মাতৃকারা সর্বশক্তিময়ী, অসুর হাননে শ্রেষ্ঠ; অন্তত যে অশুভ শক্তি ক্ষতি করে বলে ভাবা হয়, তারা তাকে খর্ব করেন। স্তোত্রে তাদের স্তুতি করা হয় সন্তানদের রক্ষা করার জন্য। যখন আর্ত তাঁদের কাছে আসে, তারা বর দেন এবং আর্তি দূর হয়। অর্থাৎ তাঁরা তাদের মর্ত্য সন্তানদের কাছে সাক্ষাৎ কািন্ত্রীর চেয়ে বরং ঘাটয়িত্রিী। তারা বর ও শাপের মাধ্যমে কাজ করেন, অর্থাৎ ইচ্ছামূলক উক্তির দ্বারা। এ দিক দিয়ে তাঁরা মর্ত্য মায়েদের থেকে ভিন্ন, যে মায়েদের ইচ্ছা ও উক্তি সাধারণত সম্পূর্ণ নিৰ্ম্মফল। তারা তাদের সন্তানদের জন্য যা চান তা ঘটে না, যখন মায়েরা সক্রিয় ভাবে সন্তানের মঙ্গল চেষ্টা করছেন, তখনও না। প্রধান পার্থক্য অবশ্যই এই মাতৃকারা পুরোপুরি মুক্ত, স্বাধীন কর্তা, কিন্তু মর্ত্য মায়েরা স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি ও অন্যান্য গুরুজনের অধীন, এমনকী বার্ধক্যে পুত্রেরও অধীন। এছাড়া এবং এরই ফলে, মর্ত্য মায়েরা মাতৃকাদের অতিলৌকিক শক্তির অধিকারী নন, এমনকী লৌকিক শক্তিরও অধিকারী নন। স্বামী ও গুরুজনের অধীন, প্রত্যক্ষ কর্ত্রী হিসেবে সম্পূর্ণ শক্তিহীন মর্ত্য মায়েরা ক্ষমতাহীনতার বেদনা ভোগ করেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও মাতৃক পূজকেরা দেখান, তারা ভাবগত ভাবে মাকে কত উচ্চে তুলেছেন যা তারা সত্যি সত্যি তুলেছেন, তা হল ‘মাতৃত্বের ভাবনা’। একে সেই স্তরে তুলেছেন যেখানে তারা অসুরদমন করেন, প্ৰলয় রোধ করেন, যেমন পূর্বে পুরুষ দেবতারা করেছেন।

অভাগিনী মর্ত্য মায়েরা কি মাতৃকার মূর্তি ও উপকাহিনি থেকে কোনও সান্ত্বনা বা মানসিক পুষ্টি পেতে পারেন, যে মূর্তি পুরুষ দেবতাদের শক্তিরূপে সৃষ্টি করেছেন। মূল কল্পনাটি আসে সাংখ্যদর্শন থেকে, যেখানে পুরুষ নিস্ক্রিয় ভাবে তার সঙ্গিনী প্রকৃতিকে দিয়ে কাজ করায়। তন্ত্র এই দর্শনকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেছে, যখন শক্তি একই উল্লেখযোগ্য এবং শক্তিময়ী দেবী হয়ে উঠেছে। ইতিহাসে মাতৃকাদের উন্নয়ন ও মর্ত্য-মায়ের অবস্থার ক্রমিক অবনমনের মতো বিরাট পার্থক্য প্রকট হয়ে ওঠে। এই দুটি ঘটনা। কুড়িটি ধর্মশাস্ত্র এবং শাস্ত্রগ্রন্থনিবন্ধের মাঝখানে ঘটেছে। সমাজে নারী হিসেবে, স্বাধীনচেতা কািন্ত্রী হিসেবে সামাজিক সত্তা হিসেবে, মুক্ত যৌনসঙ্গী হিসেবে, শিশু পালনে সম-দায়িত্বশীল মাতা হিসেবে, সন্তানের গড়ে-ওঠা ও বৃদ্ধিতে সব সিদ্ধান্তে সহযোগী হিসেবে তাঁর অবস্থান সমানেই নেমে গেছে। মর্ত্য-মা সন্তানের জন্য যা করে দেবী তা করে না: মর্ত্য-মানটি কষ্টদায়ক মাস ধরে ভূণকে গর্ভে ধারণ করে এবং প্রবল যন্ত্রণায় তাকে প্রসব করে; সে শিশুকে স্তন্য দান করে, খাওয়ায়, তার কাপড় বদলায়, তাকে ঘুম পাড়ায়, তার সব শারীরিক প্রয়োজন দেখাশোনা করে, রোগে সেবা করে। অত্যন্ত শ্রমসাপেক্ষ এই শারীরিক কাজগুলি থেকে মাতৃকারা দেবী হিসেবে সম্পূর্ণ ভাবে মুক্ত। কিছুদিন পরে যখন পিতা দায়িত্ব নেয়, মা তখন নীরব ও কতকটা সুদূর দর্শক হয়ে থাকে, পরিবর্তে খুব কমই দাবি করে: ক্বচিৎ আনুষ্ঠানিক সম্মান, বার্ধক্যে ভরণপোষণ এবং প্রয়োজন মতো পৌত্রপৌত্রীদের দেখাশোনা। মাতৃকা কিন্তু ভাবগত ও মানসিক স্তরে তার সন্তানদের সঙ্গে যুক্ত হয়, প্রায়ই সম্মান ও পূজা পায় এবং বিপদের সময়ে তারা বিপদ দূর করতে শক্তিময়ী বররূপা বাণী উচ্চারণ করে। অপর দিকে তারা দৈবস্তরেও সক্রিয়। যেখানে পুরুষ দেবতারা প্ৰলয় রুখতে নিৰ্ম্মফল হয়। মাতৃকারা সেখানে সফল। এই মহতী মূর্তিগুলির সঙ্গে কি কোনও মর্ত্য মাতা সম অনুভূতি বোধ করতে পারে, না নিজেকে এই দেবী রূপে প্ৰকাশ করতে পারে?

এদের স্থান দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত ভূমিতে: একজন তার গুরুতর রূপে সীমিত সাংসারিক প্রদেশে, যেখানে সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পিতার আয়ত্তে বলে তার সন্তানদের মঙ্গলের জন্যও নিজের ইচ্ছা খাটাবার স্থান নেই; তাকে কোনও পর্যায়ে তার মত জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করা হয় না, কিন্তু দেবী মায়ের ইচ্ছা মহাবিশ্বের স্তরে সৃজনশীল। মাতৃকা তার কাজ করে কোনও ব্যথা ছাড়াই, দৈব আনন্দে; মর্ত্য মাতা মাতৃত্ব শুরু ও শেষ করে ব্যথার মধ্যে। পুত্র তার শিক্ষা ও জীবিকা শুরু করলে, কন্যার বিবাহ হয়ে গেলে, মা ফিরে যায়। তার একাকিত্বের বাঁধা গুটিতে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে আবার গর্ভধারণ না করে। তার মাতৃত্ব তাকে কয়েক মাস আনন্দ দেয়, যতদিন তার শিশু খুব ছোট আছে, তার প্রতি নির্ভরশীল আছে। কিন্তু শীঘ্রই–বড়বেশি শীঘ্ৰ, এই সংক্ষিপ্ত মুক্তির কাল শেষ হয়ে যায় এবং মাতৃত্বের উজ্জ্বলতা ধীরে ধীরে নিশ্চিত ভাবে মিলিয়ে যায়।

সূত্রাবলি

১. আলতেকার ১৯৫৬.১০১
২. হিরণ্যকেশন গৃহ্যসূত্র ১:৬:২২:১৪
৩. স্তোত্র তৃতীয়: ২৩; পঞ্চম: ২৫; এবং ষষ্ঠ: ১১
৪. বৃহদারণ্যকে পনিষদ ষষ্ঠ: ৪ষ8; ১৩। ১৯-২২
৫. হিরণ্যকেশন গৃহ্যসূত্ৰ দ্বিতীয়: ১:২
৬. গোভিলা গৃহ্যসূত্র দ্বিতীয়: ৭:১-১২; খাদিরা গৃহ্যসূত্র দ্বিতীয়: ২২:২৪-২৮
৭. ভরদ্বাজ গৃহ্যসুত্র ১:২:১
৮. ঐ ১.১৭
৯. সামবর্ত সমহতা ২০; ৪
১০. ১.১১.৪
১১. দশম: ৮৬; ২৩
১২. এই শাস্ত্রীয় আচারটি সামান্য কিছু পরিবর্তিত হয়ে অশ্বলায়ন গৃহ্যসুত্ৰ ১; ১৪, ১-১, আপিস্তম্ব গৃহ্যসূত্র চতুর্দশ: ১-৮; হিব্রুন্মাকেশিন গৃহ্যসূত্র দ্বিতীয়: ১; বৌদ্ধায়ন গৃহ্যসূত্ৰ প্ৰথম ১:১০; পরাশর গৃহ্যসূত্র প্রথম ১:১৫; ভৈখানাসা গৃহ্যসুত্ৰ তৃতীয়: ১২; এবং কথক গৃহ্যসুত্র একত্রিশতম: ১-৫, এ-অন্তর্ভুক্ত হয়েছে
১৩. ষষ্ঠ.১১.১
১৪. সমস্ত প্রকার গর্ভধারণ সংক্রান্ত আচার অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য হল পুত্র সন্তানের জন্মদান নিশ্চিত করা। এখানে সামাজিক চাহিদার ব্যাখ্যা করে সেই অনুসারে ব্যাখ্যায়িত করা হয়েছে।
১৫. আচার অনুষ্ঠানের নামটি গুরুত্বপূর্ণ, শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হল অজ্ঞাত কাউকে লোভী না করা।
১৬. আপস্তম্ব গৃহ্যসূত্র চতুর্দশ: ১৩-১৫; হিরণাকেশিন গৃহ্যসুত্ৰ দ্বিতীয়. ২:৮-১১:৩:১; ভরদ্বাজ গৃহ্যসূত্র ১.২২, গোভিলা গৃহ্যসূত্র ১১.৭.১৩-১৪, খাদিরা গৃহ্যসূত্র ১১.২.২৯, ৩০; পরাশর গৃহ্যসূত্র ১.১৬; কথক গৃহ্যসূত্র-তে ত্রিশতম ১-৩, বৃহদারণাকোপনিষদ-এর চতুর্থ ভাগের: ৪:২৩ অংশে এর উল্লেখ আছে।
১৭. পরাশর গৃহ্যসূত্র প্রথম: ১৬; আপস্তম্ব গৃহ্যসূত্র দ্বিতীয়: ১৩:৭-১৪ এবং ভরদ্বাজ গৃহ্যসুত্ৰ প্ৰথম. ২৩।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এগারো সংখ্যাটি যা হল রুদ্রদের সংখ্যা। যে সকল দেবতারা যারা সাধারণত লুণ এবং সদ্যজাত শিশুদের ক্ষতিসাধন কবে থাকে। মহাভারতের ত্রয়োদশ খণ্ডে রুদ্র শিবের সঙ্গী সাখীদের বিবরণ দেওয়া আছে। এদের কেউ কেউ ভ্রূণের মাংস খায়। অন্যরা সদ্যজাত শিশুদের খেয়ে থাকে।
১৮. প্রাচীন মিশরীয় এবং ব্যাবেলনীয় ধর্মীয় আচার এ ধরনের বিশ্বাসের ধারণা বিদ্যমান। অভিভাবকের কাছে।
১৯. কার্তুমাস্য থেকে
২০. শতপথ ব্রাহ্মণ দ্বিতীয়: ৫:২২০
২১. জৈমিনীয় উপনিষদ ব্ৰাহ্মণ সপ্তদশ, ৩:১।
২২. শতপথ ব্রাহ্মণ যষ্ঠ: ২:৩:১৩; পঞ্চম: ৩:১:১৩
প্ৰজনন বিষয়ে অত্যধিক গুরুত্বপ্রদানের ফলে একটি ধারণা সৃষ্ট হয়েছে যে একজন মহিলা নিঋতি তাতে ভর করেছে। আত্মায় এক অশুভ ধারণা যা কিনা অত্যন্ত কুৎসিত, শত্রুপরায়ণ। যার বিশেষ কাজই হল সমস্ত রকম শুভ বিষয়কে ধ্বংস করা। নিঋতি-ব ধারণা সম্পর্কে জানতে আমার দ্য ইন্ডিয়ান থিওগনি পৃষ্ঠা ৮০-৯২, ১২৯, ১৬২-১৬৩ দেখুন। বন্ধ্যা মহিলাকে নিঋতি কর্তৃক নিদান এমন একটি কথা সামাজিক অবগুষ্ঠিত মানসিকতা থেকে সৃষ্টি হয়েছে যে মহিলাদের সমাজের প্রাথমিক দায়িত্ব হল সন্তান ধারণ করা। আমরা পরবর্তীকালে বিষয়টিতে আসব।
২৩. আমাদের এই জরুরি বিষয়টি থেকে দৃষ্টি ফেরালে চলবে না যে এই অংশটিতে সমস্ত আচার-অনুষ্ঠানের লক্ষ্যই হল পুত্র সন্তান লাভ। সম্পূরক পাঠ্যে বলা হয়েছে একই আচার বাল্য সন্তানরে জন্য পালন করা যেতে পাবে, তবে মন্ত্রেচারণ চলবে না। অর্থাৎ, আচার পালনের সময় কোনও রকম পবিত্র পাঠ্যসমূহ উচ্চাবণ করা যাবে না।
২৪. বৌদ্ধায়ন ধর্মসূত্র দ্বিতীয়: ৪-৬; অ্যাপস্তম্ব ধর্মসূত্র দ্বিতীয়; ৫:১১-১৪; যা যাজ্ঞবল্ক্য সংহিতা প্ৰথম: ৭৩-৮১; মনুসংহিতা নবম ৪”
২৫. বশিষ্ঠ ধর্মসূত্র আঠাশতম, ২-৩
২৬. ঐতত্র্য ব্রাহ্মণ ৩য়, ২৪-২৭, আপস্তম্ব ধর্মসূত্র প্রথম ১০.৫১-৫৩
২৭. ষষ্ঠী হল ছয কৃত্তিকার অন্যতম দেবতা। দুলা, নিতান্তনি, কুপুনিকা, অভ্ৰবন্তি, মেঘবন্তী এবং বর্ষাবন্তী। এব মধ্যে শকোন তিনটি প্রত্যক্ষ ভাবে বৃষ্টিব সঙ্গে সংযুক্ত তা তাদের নামকরণ থেকেই বোঝা যায়। প্রথম তিনটি সম্ভবত প্ৰাচীন মধ্যপ্রাচ্যের পৌরাণিক কাহিনি থেকে গৃহীত এবং তা অনেকখানি একই অর্থে। উদাহরণস্বরূপ, আরবি ক্রিযাপদ ‘দিলি’ বা ভর্তি করা থেকে গৃহীত। অন্য দুটির এখনও ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি, যাই হোক, কৃত্তিকার সঙ্গে ষষ্ঠীর সম্পর্কটি তার প্রজনন প্রেক্ষাপটকে তুলে ধরে। যেখানে বৃষ্টিপাত হল পৌরাণিক প্রতীক।
২৮. আগ্রহের বিষয় হল তার নাম দেবসেনা, স্বর্গীয় সেনা। স্কন্ধেব স্ত্রী। স্কন্ধ হল ছয় মুখ বিশিষ্ট স্বর্গীয় সেনাপতি যার সৃষ্টি হয়েছিল তারকা রাক্ষসীকে বধ কবতে। সুতরাং ষষ্ঠী সন্তানসম্ভবা বা বাস্তবিক মায়েদের সঙ্গে গভীর ভাবে সম্পর্কিত। ষষ্ঠী ব্ৰত (ষষ্ঠীর উপাসনা) মায়েরা পালন করেন। পঞ্চম দিনে এবং সূর্যের উপাসনা করা হয়। পরবর্তী দু’দিনব্যাপী। মৎস্যপুরাণ একশত একতম ১-৮৩।
২৯. ভবিষ্যপুরাণ, উত্তরাখণ্ড
৩০. ব্ৰতখণ্ড দ্বিতীয় ৩১৫-১৮
৩১. ভবিষ্যপুরাণ পঞ্চম ৩১৩
৩২. ধারণার সৃষ্টি হয়েছে এই ভাবে যে যেহেতু দুর্বা প্ৰভূত পরিমাণে উৎপন্ন হয় সুতরাং মহিলাদের বহু পুত্ৰলাভ সম্ভব হবে।
৩৩. ব্রতখণ্ড দ্বিতীয় ৩১৫-১৮
৩৪. মৎস্য পুরাণ একশত একতম. ২৯-৩০, বিষ্ণুধর্মোক্ত পুরাণ তৃতীয় ১৮৯:১-৫
৩৫. হিমাদ্রি ব্রতখণ্ড দ্বিতীয় ১৭১-৭২, কর্তকল্পতরু, ৩৭৪ –৭৫
৩৬. হিমাদ্রি, রচনায় উল্লিখিত, দ্বিতীয় ২৩১-৩৩
৩৭. বিষ্ণুধর্মোত্তর পুরাণ দ্বিতীয় ৫৫: ১-১২, পুত্রিযাসপ্তমী (রচনায় উল্লেখিত, ব্ৰত্যখণ্ড প্রথম: ৭৮৯৮-৯০)
৩৮. তৈত্তিরীয় সংহিতা ষষ্ঠ, ৫ –১০.৩; মৈত্রযানী সংহিতা: চতুর্থ-৬.৪
৩৯. মায়েদের পানীয় আচার সম্পর্কে উপধের অংশটি দেখুন
৪০. ঐতরেয় ব্ৰাহ্মণ সপ্তম ৩:৭, ১৩
পরবর্তীকালে এই প্রবণতা অন্য পুস্তিকাতেও লক্ষণীয। বিষয়টি আংশিক ব্যাখ্যা করা যেতে পাবে দেশে প্রচলিত পণপ্রথার মাধ্যমে, যা অভিভাবকদেরকে আর্থিক সঙ্কটের মুখে ঠেলে দেয। যদিও মহাভারতেব এক জায়গায় বলা হয়েছে যে লক্ষ্মী কন্যাসন্তানদেব মধ্যেই বিরাজ করে (দ্বাদশ: ১১:১৪; এছাড়া বিষ্ণুস্মৃতি ৯৯.৪১) কিন্তু তা কোনও ভাবেই সাধারণ সামাজিক প্রবণতাকে বোঝায় না।
৪২. মহাভারত চতুর্থ ২২.১৭
৪৩. সংযুক্ত নিকায় প্রথম ৬.৪
৪৪. বশিষ্ঠ সংহিতা সপ্তদশ, ৩
৪৫. রচনায় উল্লেখিত, পদ্য ৫৫; মহাভারত পঞ্চম ৮৮ ৬৮
৪৬. মনুসংহিতা নবম: ১৬৮
৪৭. দশম: ১৭১
৪৮. মনুসংহিতা দ্বিতীয়: রচনায় উল্লেখিত ১৪৫
৪৯. রচনায় উল্লেখিত, দ্বিতীয়, ২৩৩
৫০. আপস্তম্ব ধর্মসূত্র প্রথম, ১০:২৮:৯
৫১. বৌদ্ধায়ন ধর্মসূত্র দ্বিতীয় ২.৪৮
৫২. বশিষ্ঠ ধর্মসূত্র একাদশ ১০, ত্রয়োদশ ৪৭; বিষ্ণু ধৰ্মসূত্র সাতান্নতম ১-৫
৫৩. ৫৭ তম ১-৫
৫৪. অত্ৰি সংহিতা ১৫১
৫৫. মহাভারত প্রথম ৩৭:৪
৫৬. মহাভারত ত্রয়োদশ ২৬৮.৩০
৫৭. অমিতায়ুর্ধ্যানসূত্র
৫৮. হিরণ্যাকেশিন গৃহ্যসূত্র দ্বিতীয়. ৪:১০৭, মনুসংহিতা নবম ১৮
৫৯. বিষ্ণুসংহিতা একত্রিশতম ১.৩
৬০. রচনায় উল্লেখিত পঞ্চম ৩৪
৬১. অত্রিসংহিতা ১৮৬ এবং অন্যত্র
৬২. যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতি প্রথম: ৭২
৬৩. মহাভারত ৩য় ২২৮.৩০-৩১
৬৪. রচনায় উল্লেখিত, তৃতীয় ২৩০.৯-১১
৬৫. মহাভারত-এর লাতিন সংস্করণ নবম ৪৪। যখন অগ্নি গঙ্গার কাছে বীজ প্ৰদান করে, তখন গঙ্গা অজ্ঞান হয়ে পড়ে। জলের অন্য জীবেবা গভীর আর্তনাদ করে ওঠে এবার সে সেই বীজ ধারণ করতে অস্বীকার করে। (লাতিন সংস্করণ ত্ৰযোদশ ৮৫.৫৫-৮২)
৬৬. স্ত্রোব ত্রয়োদশ, অথর্ববেদ-এর প্রথম সংখ্যা। প্রাচীন কিন্তু ইতোমধ্যে জমির পরিবর্তিত চিত্র।
৬৭. নবম ৩৫
৬৮. নবম ৩৭
৬৯. নবম ৪৮
৭০. নবম ৫২
৭১. নবম ৩২
৭২. নবম ৩২
৭৩. নবম ২৭
৭৪. নবম ২৬
৭৫. নবম ৯৬
৭৬. সাদবি ১৯৮০ পূ: ৬৩
৭৭. চার্বাক ৮২.৬২
৭৮. রচনায় উল্লেখিত, পৃঃ ২১৯
৭৯. চোদরভ ১৯৭৮.৭৪
৮০. চোদরভ ১৯৭৮.৩৯
৮১. আইনস্টাইন, ১৯৮৮:৭১
৮২. ইংরাজি lord কথাটি এসেছে half (loaf) + ward থেকে–যার অর্থ রুটি জোগায় যে।
৮৩. বৃহদারণ্যকোপনিষদ ষষ্ঠ ৪:৭
৮৪. ১৯৮৮.৮১

প্রাচীন ভারতে নারীর অর্থনৈতিক অধিকার

বৈদিক সাহিত্য (বিশেষ করে ঋগ্বেদ সংহিতা) সাধারণ ভাবে সে যুগে নারীর অর্থনৈতিক অবস্থা বিষয়ে নীরব। যদিও পুরুষের অর্থনৈতিক অবস্থান, তাদের জীবিকা ও সম্পদ সম্বন্ধে কিছু তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু নারীর সম্বন্ধে অল্পই জানা যায়। আমরা জানি বৈদিক নারীরা পশম পাকাত ও সম্ভবত বুনত, জল আনত, পশুপালন করত, কিন্তু কেবলমাত্র খোরপোষ বাদে তারা এই সব কাজের জন্য কিছু উপাৰ্জন করত কি না তা জানতে পারি না। নিঃসন্দেহে নারীরা গৃহকর্ম করত; রান্নাঘর ও শিশুপালন তাদেরই এক্তিয়ারে ছিল, কিন্তু এখনও যেমন হয় তখনও সেই কাজগুলির অর্থনৈতিক দিক দিয়ে কোনও হিসেব হত না, ফলে কোনও মাইনে দেওয়া হত না। কুমারীর কোনও পৃথক সত্তা ছিল না; সে তা এক ভাবে পেত। কেবল বিবাহের পরে। ব্রাহ্মণ সাহিত্যে স্পষ্ট ভাবে পুত্ৰকে বর এবং কন্যাসন্তানকে অভিশাপ বলে অভিহিত করা হয়। তাই স্নেহশীল পিতামাতা বাদে অন্য সকলে কন্যাকে, খুব কম করে বললেও, উৎপাত মনে করত। বিবাহের সময়ে দান করে দেওয়ার আগে পর্যন্ত গৃহে তার উপস্থিতি কোনও রকমে সহ্য করা হত।

পরবর্তী এক সংহিতায় কিন্তু অত্রি বলেছেন, পিতার, ভ্রাতার বা পুরুষানুক্রমিক সম্পত্তিতে কুমারীর অধিকার আছে।’(১) এই সম্পত্তি বিক্রি করার, বাঁধা দেওয়ার বা নিজের বলে ভোগ করার সম্পূর্ণ অধিকার তার ছিল। অবশ্যই আমরা এখানে প্রৌঢ়া কুমারী–কুলপা কুমারী, আমাজু বা অমাজুরার কথা চিন্তা করছি। ‘সাংকৃত্যায়নী’ বা ‘পণ্ডিত কৌশিকী’, উপনিষদের ব্ৰহ্মবাদিনীর আধ্যাত্মিক মানসকন্যা, যাদের কাছে সম্পত্তির অধিকার, বিক্রয় বা বন্ধকের কোনও গুরুত্ব ছিল না তাঁরা সাহিত্যে উল্লিখিত। হয়তো আরও কোনও কোনও প্রৌঢ়া কুমারী থাকত, যারা না ছিল পণ্ডিত, না করত ধ্যান, যাদের অর্থের প্রয়োজন ছিল জীবনধারণের জন্য, হয়তো ভাল ভাবে ও স্বাধীন ভাবে জীবনধারণের জন্য। এমনও হতে পারে যে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে তাদের সম্পত্তির উপর অধিকার ছিল। কিন্তু অত্ৰিও সম্পত্তি দান করার অধিকারের কথা কিছু বলেন না। আমরা পরে এই বিষয়ে আসব।

‘যে কুমারীকে বিক্রি করা বা কেনা হয়েছে, তাকে কখনও স্ত্রীরূপে গ্ৰহণ করা যায় না।’(২) এর থেকে প্রমাণ হয়, কুমারীদের বেচা-কেনা চলত। কিছু শাস্ত্রগ্রন্থের মতে, অত্যন্ত দুৰ্গতির অবস্থায় পিতামাতা উভয়ের সম্মতিতে তা সম্ভব হত। কুমারী হিসেবে যে স্ত্রী কেনা হয়েছে, তার গর্ভস্থ পুত্রসন্তান পিতার শ্রদ্ধাদিকর্মের অনুষ্ঠান থেকে বঞ্চিত হত। বিবাহের কারণে কুমারীর সতীত্ব, অর্থাৎ সামাজিক দৃষ্টিতে তার কৌমার্যের অক্ষমতা, যথেচ্ছ ভাবে কলুষিত করা যেত না। যে ঈর্ষাবশত তা করে তাকে ২২৫ পণ দণ্ড দিতে হয়।’(৩) অতএব তার সামাজিক মর্যাদার অর্থমূল্য ছিল। যে দোষযুক্ত কন্যার দোষগুলি ঢাকা দিয়ে বিবাহ দেয়, তার বরকে ৯৬ পণ দণ্ড দিতে হত।(৪)

‘যে দ্বিজ তার পত্নীর বান্ধবীকে (মনে হয় কুমারী) জানে… তাকে সাধারণ প্ৰায়শ্চিত্ত অনুষ্ঠান করতে হবে এবং একটি দুগ্ধবতী ধেনু দান করতে হবে।’(৫)

মনু অনুজ্ঞা দিয়েছেন, ব্রাহ্মণ ভাইয়েরা তাদের পৈতৃক সম্পত্তির তাদের যে ভাগ তার এক চতুর্থাংশ করে পৃথক পৃথক ভাবে তাদের অবিবাহিতা ভগ্নিকে দেবে। তা না করলে তাদের সর্বনাশ হবে।(৬) গৌতম বলেছেন, অবিবাহিত কন্যারা যদি জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত না হয় তবে তারা মায়ের মৃত স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে।’(৭) অবিবাহিত কন্যার ভাইয়েরা মাতার মৃত্যুর পূর্বে না। পরে তার স্ত্রীধন দেবে, সে বিষয়ে মতভেদ আছে। কিন্তু বৌধায়ন ধর্মসূত্র এবং তাঁর বহু পূর্বে তৈত্তিরীয় সংহিতা (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দী) অনুসারে: ‘ন্ত্রিয়ো নিরিন্দ্ৰিয়া আদায়াদীঃ’(৮), অর্থাৎ সাধারণ ভাবে নারীরা (বিশেষ করে ভগ্নির) পারিবারিক সম্পত্তির ভাগে অনধিকারী।(৯)

কুমারীর বাগদত্ত পতি মারা গেলে সে শুধু তার পিতারই। কুমারী যদি বলপূর্বক অপহৃত হয় এবং অপহরণকারী তাকে বিবাহ না করে, তবে আইনত অপরের সঙ্গে তার বিবাহ হতে পারে।’(১০) ‘নববধূ কুমারী কন্যা, রুগ্না অন্তঃপুরিকা, গর্ভিণী-গৃহস্থ অতিথিকে ভোজন করাবার পূর্বে এদের ভোজন করাতে পারে।’(১১) কন্যাদের কখনও কখনও কিছু শিক্ষা দেওয়া হত, যদিও বৈদিক শিক্ষা থেকে তারা বঞ্চিত ছিল; ভরদ্বাজ গৃহ্য সূত্ৰ-তে কোনও কন্যাকে বিবাহ করার বিষয়ে চারটি আগ্রহের কারণ দেখানো হয়েছে–ধন, রূপ, বুদ্ধি ও বংশ।(১২) বুদ্ধির পরিবর্তে মানব গৃহসূত্রে বিদ্যা শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। বৃহদারণাকোপনিষদ-এ পণ্ডিত কন্যালাভের জন্য অনুষ্ঠানের নিয়ম আজ।(১৩) এই সব শাস্ত্রগ্রন্থের থেকেই গার্গী, সুলভা, প্রমুখ বিদুষী নারীদের আবির্ভাবের ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কিন্তু যদিও বৈয়াকরণ শিক্ষয়িত্রী নারী বোঝাতে স্ত্রীলিঙ্গ শব্দ তৈরি করার নিয়ম করেছেন,(১৪) তারা শিক্ষার দ্বারা উপার্জন করতে পারতেন কি না তা জানিবার আমাদের কোনও উপায় নেই। খুব সম্ভব না, কিন্তু ব্যতিক্রম থাকতে পারে। একটি অত্যন্ত অর্বাচীন তান্ত্রিক গ্ৰন্থ বলে, ‘গৃহস্থের উচিত পুত্রের মতো কন্যাদেরও সমান শিক্ষা দেওয়া।’(১৫)

আট ধরনের বিবাহের কয়েকটিতে বধুর পিতা বরের আত্মীয়দের অর্থ দিত; কেবলমাত্র আসুর বিবাহে বরের পিতা মাতা পণ দিত। আসুর বিবাহে বর নিজের কামনা চরিতার্থ করতে বধুর পিতাকে এবং বধুকেও পণ দেয়।(১৬) ব্ৰাহ্ম, দৈব ও আর্য বিবাহে বধূর পিতা নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী ধন, অলংকার, একজোড়া বলদ এবং অন্যান্য উপহার দেবে। ব্রাহ্ম বিবাহে প্রসাধিতা ও সুসজ্জিত কন্যাকে দান করা হত, আৰ্য বিবাহে বধূকে সম্প্রদান করা হত বরকে একটি বলদ ও একটি গরু বা দুটি বলদ ও দুটি গরু দান করার পরে।(১৭) এই প্রথার প্রতি তৎকালীন সামাজিক জুগুপ্সার প্রকাশ হয় আসুর নামটায়। কিন্তু বিবাহের সময়ে যখন অর্থদান হত তখন বন্ধু বা তার পিতামাতাই তার সুযোগ পেত। যাকে স্ত্রীধন বলে, তা তিন প্রকারের: পণ, যা দিয়ে বন্ধুকে কেনা হত; যৌতুক, অর্থাৎ বিবাহের সময়ে আত্মীয়-বন্ধুরা বধুকে যে উপহার দিত এবং সৌদায়িক অর্থাৎ বধু বা বরের গৃহে আত্মীয় বন্ধুদের বধূকে বা দম্পতিকে দেওয়া উপহার। যাজ্ঞবল্ক্য বলেছেন: নারীকে তার বন্ধু, মাতা, স্বামী বা ভ্রাতা যা দেয়, তা হল স্ত্রীধন।(১৮) তার আত্মীয়স্বজন (অর্থাৎ তার পিতামাতার সঙ্গে সম্বন্ধীয় ব্যক্তিরা) এবং তার স্বামী অথবা পিতার পরিবার তাকে বিবাহের পর শুষ্ক স্বরূপ যা দেয়, তাও স্ত্রীধন।(১৯) স্পষ্টতই সে সময়ের সমাজ বরের কাছ থেকে বধুর পিতা যে অর্থ নেবে এটা পছন্দ করত না। মনু বলেছেন, জ্ঞানী পিতা কখনওই কন্যাশুষ্ক নেবে না, কারণ লোভাবশত কন্যাশুদ্ধ নিলে সে তার সন্তানকে বিক্রি করছে।(২০) এমনকী গেমিথুন বা বলীবর্দযুগল (কন্যার পিতা বরের কাছ থেকে গ্ৰহণ করলে) তাও কোনও কোনও শাস্ত্রগ্রন্থে পণ বলে গণ্য হয় (পাণ গ্রহণ করা, তা বহুমূল্যই হোক বা অল্প মূল্যই হোক কন্যা বিক্রয়ের সমান’)। লক্ষ্য করা যায়, বরকে পণ দেওয়ার প্রথা ছিল–স্পষ্ট ভাবেই হোক বা গুঢ় ভাবেই হোক; কিন্তু বরের পিতার পণ নেওয়ার বিরুদ্ধে কোনও শাস্ত্র নেই, কেউ এই আদান-প্ৰদানকে বিক্রি বলে না, যদিও প্রকৃতপক্ষে তা বিক্রয়ই।

‘কন্যাশুঙ্কের বিরুদ্ধে এই যে নির্দেশ, তার দ্বারা সূচিত হয়। বরপণের সপক্ষে পুরোমাত্রায় ক্টোক। এটা কুষাণ যুগের সংস্কৃতায়নের একটি অবশ্যম্ভাবী লক্ষণ–যে সময়ে মনুসংহিতার প্রথম সংস্করণ রচিত হয়েছিল। আধুনিক পণ সম্পূর্ণ ভাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কর্তৃক শৃঙ্খলমুক্ত শক্তিগুলির কার্য।’(২১) ‘পাণপ্ৰথা অসাম্য, অনিশ্চয়তা ও আকস্মিকতার দ্বারা নিরূপিত।’(২২) বরের জন্য পণ হল hypergamy (উচ্চতর বিবাহ প্রথা), যা ক্রমিক স্তর বিশিষ্ট বর্ণগুলির মধ্যে ব্যাপক; উচ্চতর শ্রেণিগুলিতে প্ৰধানত পণ এবং নিম্নতর শ্রেণিগুলিতে প্ৰধানত কন্যাশুষ্ক এবং পণ ও কন্যাশুল্ক দুটিই সামাজিক প্রতিষ্ঠাকামী মধ্যস্তরের পরিবারগুলিতে ব্যাপক।’(২৩)

পণই হোক বা কন্যাশুদ্ধই হোক–তা সমাজে সম্পন্নতার পরিচায়ক, কিন্তু বরাপণ কন্যাশুঙ্কের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু কন্যাশুষ্ক গ্রহণের এই যে অনিচ্ছা, তা মনে হয় অনেকগুলি সামাজিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। সম্পন্নতা যার ফলে বধুর পরিবার পণ দিতে পারে, তা তো বটেই, এটি ইঙ্গিত দিতে পায়ে ব্যাপক যুদ্ধের অবসানের, যে যুদ্ধ পুরুষের সংখ্যা হ্রাস করছিল, উচ্চতর বিবাহ প্রথার কামনা, সম্পদ দিয়ে সামাজিক সিঁড়িতে উপরে ওঠা এবং শেষ পর্যন্ত এর ভিত্তি হয়তো এমন কোনও ধারণা, যাতে বধুর পিতা বুঝতে পারছিল যে সে যা পণ হিসেবে খরচ করেছে তা তার পুত্রের বিবাহের সময়ে আদায় করতে পারবে। এই প্ৰথা অবশ্যই ইঙ্গিত করে নারীর সামাজিক অবনমনের, কারণ যখন একজন পুরুষ একটি কুমারীকে বিবাহ করে এবং তাকে চিরকৌমার্যের লজ্জা থেকে উদ্ধার করে, তখন কন্যার পিতার তাকে কিছু মূল্য দিতে হয় এই উপকারটুকুর জন্য। আড়ম্বর এবং জাকজমক দেখাবার বাসনাও এখানে ছিল। খ্রিস্টিয় প্রথম শতাব্দীগুলির সময়ে সমাজের উপর যাঁর প্রভাব ভগবদগীতা এবং বাৎস্যায়নের সঙ্গে সমান ভাবে প্রবল ছিল সেই মধু দুই সহস্র বছর ধরে সমাজ নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তিনি ভিন্ন ভিন্ন প্রকারের বিবাহের বিবরণ দিয়েছেন, যার প্রথম তিনটিতে কন্যার পিতা পণ দেয়, বরকে উপহার দেয়; কেবলমাত্ৰ আসুর বিবাহে এর বিপরীতটাই ঘটে। এর নিচ অর্থে ব্যবহৃত নাম ‘আসুর’ হয়তো দ্রাবিড় অঞ্চলে এর উদ্ভবের সূচনা করে–যেখানে দুশো বছর পূর্ব পর্যন্তও এটি ব্যাপক প্রচলিত প্রথা ছিল।

কিন্তু ‘কন্যাশুল্কা’ অর্বাচীন বৈদিক যুগ থেকে নিয়মিত প্রথা হিসেবে গৃহীত হয়ে এসেছে। আমরা শুনি, ইন্দ্ৰ তুমি ঈষৎ ত্রুটিগ্রস্ত জামাতা বা শ্যালকের তুলনায় অনেক বড় দাতা।’(২৪) অতএব ত্রুটিযুক্ত বরেরা অর্থমূল্য ক্ষতিপূরণ দিত। কন্যাশুঙ্কের সঙ্গে পণকে মেলানোর এক প্রচেষ্টা দেখা যায় আপস্তম্ব ধর্মসূত্রে (২:৬:১৩:১০:১১)। সেখানে বলা হয়েছে, ‘এ বিষয়ে ক্রয়-বিক্রয় বলে কিছু নেই। বিবাহকালে একশত মহারথী দিতে হবে, এবং তারপর তাদের দাতার কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে।’ এখানে ক্রিয় শুধুমাত্র প্রশংসার উক্তি; সম্বন্ধের মূল ধর্ম। কৌটিল্য বলেছেন, ‘স্লেচ্ছদের পক্ষে কন্যাবিক্রয় নিন্দনীয় নয়।’(২৫) যাজ্ঞবল্ক্য খুব যুক্তিসঙ্গত ভাবেই বলেছেন, পুত্র বা কন্যা, কাউকেই বিক্রয় করা যায় না।(২৬) এই অংশের উপর মিতাক্ষরা টীকায় বলা হয়েছে ‘যদিও কেউ তার পত্নী বা কন্যাকে বিক্রয় করতে পারে না, তবুও সে তাদের প্রভু।’ মনে পড়ে, পুত্র শূনঃশেফিকে পিতা বিক্রয় করতে পেরেছিলেন, কিন্তু কন্যা বিক্রয়েরও উদাহরণ আছে।

পণের ব্যাখ্যা করা হয়েছে, বধুর ভরণপোষণের মূল্য হিসেবে। এই মত যুক্তিসঙ্গত নয়, কারণ বধু তার সংসারের কাজকর্মে সাহায্য করে এবং ভাগ্য সুপ্ৰসন্ন হলে পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকারীও উৎপাদন করে। এ কথাও বলা হয়েছে যে, এটি কন্যাদানের দক্ষিণা। এ কথাও গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ তথাকথিত দক্ষিণা সামাজিক অস্তিত্বহীন নারীর দানের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন। এসথার বোসরাপ বলেন যে, বাইরের জগতের উৎপাদনশীল শ্রমশক্তির থেকে নারীকে সরিয়ে নেওয়ার পর পণ এল ক্ষতিপূরণ হিসেবে, কারণ তাদের জায়গায় পুরুষদের পারিশ্রমিক দিয়ে আনতে হল।(২৭) এর মধ্যে ঐতিহাসিক সত্যের কিছুটা উপাদান থাকতে পারে। পণ স্ত্রীধন নয়, কারণ এটি বরের পিতার প্ররোচনায় দেওয়া হয়। এম এস শ্ৰীনিবাস বলেন, ‘ভারতীয় উপদ্বীপ ছিল ব্ৰাহ্মণদের নিয়ে কন্যাশুষ্ক এলাকা; সেখান থেকে তা উচ্চতর বিবাহ প্রথার প্রতি এবং সামাজিক উন্নতির প্রতি আকাঙ্ক্ষাবশত উত্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল।’(২৮)

এখন বধূর পিতা যে পণ দিত তা বর ও তার পিতাকে দেওয়া হত, ফলে তা স্ত্রীধনের অংশ কোনও মতেই হত না; তার ব্যবহার বা অপব্যবহার সম্বন্ধে স্ত্রী কোনও কথাই বলতে পারত না। যদি বর কন্যাশুষ্ক দেওয়ার পরে ভাবী বধু মারা যেত, তাহলে সে যা দিয়েছে তা ফিরিয়ে নিত।(২৯) অপরার্কের একটি অর্বাচীন গ্রন্থে দ্ব্যর্থহীন ভাবে বলা হয়েছে ‘সৌদায়িকের উপর স্ত্রীর সম্পূর্ণ অধিকার’–এমনকী স্থাবর সম্পত্তি হলেও সে তা বেচিতে বা দান করতে পারে। সে তা অবিকৃত রাখতে পারে; তার স্বামী, পুত্রেরা, তার বা তার স্বামীর ভাইয়েরা তা গ্রহণ করতে বা দান করতে পারে না; তার উপর নারীর সম্পূর্ণ অধিকার। কিন্তু তার আত্মীয়-বন্ধুরা বিবাহের সময়ে তার পিতৃগৃহে যা দেয় তা নির্বাচিত ভাবে যৌতুক, এক শ্রেণির স্ত্রীধান, এবং যা দম্পতিকে বধু বা বরের গৃহে দেওয়া হয় তা সৌদায়িক এবং তার অন্তত অর্ধেকের উপর বধুর অধিকার। মনু আরও বলেছেন, ‘যে নারীর স্বামী দ্বিতীয় বার বিবাহ করে, তার সমান পরিমাণ ধন (প্রথমা স্ত্রীকে) উচ্ছিন্ন করার জন্য ক্ষতিপূরণ স্বরূপ দিতে হবে, যদি তাকে স্ত্রীধন না দেওয়া হয়ে থাকে। যদি দেওয়া হয়ে থাকে, তবে অর্ধেক দিতে হবে।’(৩০) কিন্তু ‘পুত্ৰহীনা পুত্রিকার মৃত্যুর পরে তার স্বামী তার সমস্ত সম্পত্তি বিনা দ্বিধায় গ্রহণ করবে।(৩১) বিষ্ণু কিন্তু বলেছেন যে অপুত্ৰক ব্যক্তির সম্পত্তি তার স্ত্রীগামী হয়, তারপর তার কন্যারা, তারপর তার ভ্রাতারা এবং তারপর তার ভ্রাতুষ্পপুত্রেরা তা পায়।(৩২)

এই সব গ্রন্থে আমরা সামাজিক নিয়ম ও মনোভাবের নানা স্থানীয়, আঞ্চলিক ও কালিক ব্যতিক্রম পাই। কোনও কোনও শাস্ত্রকার অপরদের চেয়ে একটু বেশি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেন। কিন্তু সাধারণ চিত্রটা স্ত্রীদের পক্ষে। আশাহীন ও নির্মম। স্বামী তার পরবর্তী বিবাহের সময়ে তাকে যা দেয় তা সম্পূর্ণ ভাবে তার নিজস্ব। নারদ বলেন, দ্বিতীয় বিবাহের সময়ে স্বামী তার সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ তার স্ত্রীকে দেবে এবং সেই সম্পত্তি তার নিজের মতো ব্যবহার করার স্বাধীনতা স্ত্রীর আছে–অন্তত পুথিগত ভাবে। যাজ্ঞবল্ক্য বলেছেন, দুৰ্ভিক্ষ, অবশ্য পালনীয় ধর্মীয় অনুষ্ঠান, রোগ বা তা নিজের কারারুদ্ধ থাকার সময়ে ছাড়া স্বামীর স্ত্রীধন স্পর্শ করার অধিকার নেই।'(৩৩) যদিও ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিগুলি যথেষ্ট নিরীহ শোনায়, সেগুলি কিন্তু প্রকৃতপক্ষে স্বামীর সুবিধা মতো ব্যাখ্যা করার অনেক ফাঁকফোকর রেখে দেয়। আর এক জায়গায় যাজ্ঞবল্ক্য বলেছেন, ‘স্বামী দুর্ভিক্ষের কালে, কর্তব্যপালনের জন্য, রোগে অথবা বন্দিদশায় যদি স্ত্রীধন ব্যবহার করে তবে তা ফেরত দিতে সে বাধ্য হবে। না।(৩৪) অপর এক গ্রন্থে তিনি বলেছেন, ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য বা প্রজাপত্য বিবাহে নিঃসন্তান নারীর স্ত্রীধন তার স্বামী পায়।’ তাই নারী তার নিজস্ব সম্পত্তি ব্যবহার করবে, সমাজ এটা দেখতে পারত না বা মেনে নিতে পারত না। বশিষ্ঠ খুব স্পষ্ট ভাবেই তা প্রকাশ করেছেন: ‘স্বামীর পুনর্বিবাহের সময়ে তাকে যা দেওয়া হয়েছে, যা তাকে তার আত্মীয়স্বজন দিয়েছে (সৌদায়িক বা যৌতুক হিসাবে) এবং তার শুষ্ক অর্থাৎ যা তাকে বিবাহের পর দেওয়া হয়েছে, তা নারীর সম্পত্তি, তার স্ত্রীধন।(৩৫) মনু বলেন মাতার স্ত্রীধন কন্যার প্রাপ্য এবং কন্যার পুত্ৰ অপুত্ৰক পুরুষের সমস্ত সম্পত্তি নেবে।’(৩৬) কিন্তু মনু আরও বলেছেন, ‘কোনও নারীর বন্ধু বা আত্মীয়েরা মূঢ়তা বা লোভাবশত যদি তার সম্পত্তি ভোগ করে, বা সে সব পাপীরা তার নিজের সম্পত্তি বস্ত্ৰাদির ভোগ থেকে তাকে বঞ্চিত করে, তাহলে তারা নরকে যায়।(৩৭) প্রথমত, পুথিগত ভাবে নারীর সম্পত্তি বস্ত্ৰাদি’ ছাড়াও আরও অনেক বেশি কিছু কোঝাতে পারে। কেননা, গ্রন্থে যেমন বলা হয়েছে। এ সম্পত্তি এমন হতে পারে, যা ‘বন্ধু এবং আত্মীয়েরা লোভাবশত ভোগ করতে পারে।’ একটি খুব প্রাচীন গ্ৰন্থ, মৈত্ৰায়ণী সংহিতা, যা আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীর বৈদিক গ্ৰন্থ, সেখানে বলা হয়েছে, ‘নারীর যে আত্মীয়েরা তার স্ত্রীধন গাড়ি, কাপড়-চোপড় এবং স্বৰ্ণালংকার বিক্রি করে জীবিকানির্বাহ করে, তারা পাপ করছে এবং পরলোকে তারা আরও দুর্ভাগ্যের অধিকারী হবে।’(৩৮) সুতরাং ‘বস্ত্ৰাদি’ কেবলমাত্র চোখে ধুলো দেওয়া; শ্বশুরবাড়ির লোকেরা কখনও কখনও, খুব সম্ভব প্রায়শই নির্লজ্জ ভাবে নারী যে সম্পত্তি নিয়ে এসেছে তা ভোগ করত। তাই ধনী পিতার কন্যাও— যা তার স্ত্রীধন থেকে স্পষ্টই প্রমাণিত হয়—শ্বশুরবাড়িতে সত্যকার কোনও নিরাপত্তা পেত না। শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এবং সেই কারণে অর্থকরী জীবিকা থেকে বঞ্চিত, অসহায়, শ্বশুরবাড়ির প্রবল ভাবে সংখ্যাগুরু লোভী মানুষগুলির মধ্যে আশাহীন সংখ্যালঘু নারীর তার নিজত্বের যা কিছু তা রক্ষণ করার সত্যিকারের কোনও উপায় ছিল না— তা ভোগ করা তো দূরস্থান। সুতরাং এ ধরনের ঘটনা ঘটত–শাস্ত্রকার শূন্য কল্পনা করছেন না, নিম্পাপ মস্তিষ্কে কুবুদ্ধিও ঢোকাচ্ছেন না। নরকে যাওয়ার বা পরকালে গুরুতর দুর্ভাগ্য ভোগের ভয় সেই বেচারি মেয়েটির স্ত্রীধন ভোগ করা থেকে তাদের কতটা বাধা দিত সেটাই চিন্তনীয়। অনুপার্জিত ধন ভোগ করা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বেশ লোভনীয়। দেবল অবশ্য দাবি করেছেন যে, কন্যাশুল্ক এবং সুন্দ থেকে পাওয়া লভ্যাংশ নারীর নিজস্ব সম্পত্তি, স্বামীর তার উপরে কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। জৈমিনিও বলেছেন, নারী বিশেষ কোনও কোনও ধরনের সম্পত্তির অধিকারিণী। কিন্তু কাতায়ন বলেন, নারী তার শিল্পকর্মের দ্বারা যা উপার্জন করে এবং যা আপরে ভালবেসে তাকে দেয়, স্বামী তার অধিকারী। বাকি যা থাকে, তা স্ত্রীধন।(৩৯) এটা পরিষ্কার যে, বিশেষ কিছুই আর বাকি থাকে না, কারণ কাতায়নের নির্দেশ নারীর উপার্জন এবং উপহার স্বামীর নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। অন্য কোনও রকম স্ত্রীধন কল্পনা করা দুষ্কর।

গৃহস্থলির অর্থ এবং সম্পত্তি ব্যবহারে স্ত্রীর ভূমিকা কী? আপস্তম্ব বলেছেন, ‘দম্পতি পারিবারিক ধন ব্যবহার করত।’(৪০) এমনকী দার্শনিক গ্ৰন্থ পূর্বমীমাংসাও বলেছে: দম্পতি যৌথ ভাবে সম্পত্তির অধিকারী।’(৪১) মনে পড়ে সংস্কৃত দম্পতি’ শব্দের ইন্দো-ইউরোপীয় মূল শব্দটি এসেছে দোমোস+পতি— গৃহস্বামী থেকে। স্পষ্টতই আপস্তম্ব এবং পূর্বমীমাংসা দুইয়েই শব্দের মূল অর্থের সূচনা আছে।

স্বামী যদি কাজের জন্য বাড়ি ছেড়ে যায়, তাকে আগে স্ত্রীর ভরণপোষণের ব্যবস্থা করে রেখে যেতে হবে।’(৪২) ‘তার অনুপস্থিতিতে তার স্ত্রী যদি মদ্যপান করে বা প্রকাশ্য নৃত্যানুষ্ঠানে যায়, তাকে ছয় কৃষ্ণল দণ্ড দিতে হবে।’(৪৩) কিন্তু স্বামী বা পুত্রের ঋণ শোধ করতে নারী বাধ্য নয়।(৪৪) গোয়ালা, সুরাবিক্রেতা, অভিনেতা, রাজক ও শিকারীর স্ত্রী যে ঋণ করবে তা তাদের স্বামীরা শোধ করবে, কারণ তাদের জীবিকা তাদের স্ত্রীর উপার্জনের উপর নির্ভর করে। যে ঋণ সে নিজে শোধ করবে বলে প্রতিশ্রুত, যে ঋণ সে তার স্বামীর সঙ্গে করেছে এবং যা সে নিজে নিয়েছে, এ সবই নারীকে শোধ করতে হবে: অন্য কিছু শোধ করতে সে বাধ্য নয়। ‘ঋণী ব্যক্তির স্ত্রীকে নিলে তার স্বামীর ঋণ শোধ করতে হবে।’(8৬) ঋণ শোধের প্রশ্নটিই নারীর শোধ করার ক্ষমতা উত্থাপিত করে। কিন্তু সে রকম ক্ষেত্রে শোধ করা হয় যৌথ পারিবারিক কোষ থেকে এবং যদি নারীর অধিকার না থাকে তাকে সম্ভবত তার নিজস্ব স্ত্রীধন থেকে। এই ধারণার পিছনে এই অনুমান কাজ করে যে, নারীর সম্পত্তিতে অধিকার থাকা উচিত নয়, তাই তা নেই। মেধাতিথি বলেন, নারী যা উপার্জন করে তা তার স্বামীর।(৪৬) আপস্তম্ব বলেন, ‘কোনও কোনও পূর্বাচার্য মনে করেন, অলংকারগুলি স্ত্রীর নিজস্ব এবং যে সম্পত্তি তার পিতৃকুল থেকে লব্ধ তাও তার নিজস্ব।’(৪৭) মনে হয় স্ত্রীর অলংকারের উপরেও তার স্বত্ব বিষয়ে মতভেদ ছিল–যে অলংকার সে তাঁর পিতৃগৃহ থেকে এনেছে! বৌধায়ন বলেছেন, ‘কন্যা মাতার অলংকার ও আর যা নিয়মসঙ্গত, তা পেয়ে থাকে।’(৪৮) মনু স্ত্রীধনের একটি ঊর্ধ্বসীমা ধাৰ্য করেছেন— ২০০০ পণ পর্যন্ত।(৪৯) কিন্তু ভূমি বা গৃহ স্ত্রীধন হতে পারে না। এই শাস্ত্রকাররা এটা বলেন, সম্ভবত এই কারণে যে, সেগুলি শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যাওয়া যায় না। জৈমিনি এ বিষয়ে একমত যে নারী কিছু কিছু সম্পত্তির অধিকারিণী হতে পারে এবং হয়ও। মনু বলেছেন স্ত্রীধনের উৎস দুটি: বিবাহের সময়ে, যাত্রার সময়ে, প্রীতির কারণে দান, ভ্ৰাতা ও পিতামাতার দান। কাত্যায়ন একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় যোগ করেছেন: যা সে শিল্পকার্য দ্বারা উপার্জন করে এবং যা তাকে ভালবেসে দেওয়া হয় তা তার স্বামীর অধীন, বাকিটুকু স্ত্রীধন।(৫০) এক নিষ্ঠুর উপলব্ধি হয় যে, তার নিজস্ব উপার্জন তার নিজের নয়। ‘যৌতুক’ শব্দের বুৎপত্তিগত অর্থ, যা একত্ৰ উপবিষ্ট যুগলকে (যুতক) দেওয়া হয়।(৫১) দুষ্টা অমিতব্যয়িনী স্ত্রীর স্ত্রীধনের উপর অধিকার নেই।’(৫২) দুষ্ট ও লোভী শ্বশুরবাড়ির লোকেদের পক্ষে স্ত্রী যে অমিতব্যয়িনী এ কথা প্রমাণ করা এবং যা আইনত তার নিজের তা কেড়ে নেওয়া খুব কঠিন ছিল না। ‘স্বামীর প্রতিশ্রুত স্ত্রীধন স্ত্রীকে অবশ্যই দিতে হবে’(৫৩)–এ কথা বলার পরও আইনের ফাক খুঁজে নেওয়াটা সমস্যা ছিল না।

কন্যাশুল্ক দেওয়া স্ত্রীর উপরে একটা বোঝা চাপানো, কারণ সে এবং অন্য সকলে তাকে পণ্যদ্রব্য বলে মনে করত। প্রাচীন গ্ৰন্থ মৈত্ৰায়ণী সংহিতায় বলা হয়েছে, ‘স্বামী যে স্ত্রীকে ক্রয় করেছে, সে যখন অপরের সঙ্গে ব্যভিচার করে, তা মিথ্যাচার।’ কিন্তু মনে রাখতে হবে, যখন পণপ্রথার প্রচলন ঘটল, তখন বর। কখনওই নিজেকে পণ্যদ্রব্য মনে করত না, যদিও সে স্ত্রীর তুলনায় অনেক বেশি পণ্যদ্রব্য কারণ পণের তুলনায় কন্যাশুষ্ক প্রায় কিছুই না, পণ হল সামাজিক প্রতিষ্ঠার লক্ষণ ও অন্যায্য এবং নির্লজ ভাবে অর্থ আদায়।

মনু বলেন, ‘স্ত্রীকে জোর করে বশে রাখা যায় না; নিম্নোক্ত উপায়গুলি প্রয়োগ করে তাকে বশে রাখতে হয়। স্ত্রীদের নিযুক্ত করতে হবে অর্থ সঞ্চয় ও ব্যয় করার কাজে (অর্থাৎ পরিবারের অর্থ রক্ষণাবেক্ষণে) এবং নিজেদের দেহ, গৃহ, বিছানাপত্ৰ, বস্ত্র, আসবাবপত্র পরিচ্ছন্ন রাখার কাজে। গৃহে বন্দি থাকলে এবং পুরুষ আত্মীয়দের পাহারায় থাকলেও (দুষ্ট) নারী যথেষ্ট রক্ষিত নয়।’(৫৪) তাহলে স্ত্রীকে বশে রাখা, যা কি না বৈধ পুত্রসন্তান লাভে আবশ্যিক, তার একটি উপায় হল, তাকে নানা রকম গৃহকর্মে নিযুক্ত রাখা, যেগুলি আর্থিক মূল্যে কখনওই রূপান্তরিত করা যায় না, যার ফলে সর্বদাই তার নিজেকে পরিবারের আর্থিক বোঝা বলে মনে হত।

স্বামী হারাবার পর সমাজ তাকে দেখতে শুরু করত। আর্থিক বিপদ এবং ভার হিসেবে। কৃষিপ্রধান সমাজে যৌথ পরিবার ছিল মূল, সেখানে পরিবারের সম্পত্তি কর্ষণীয় ভূমি ভাগ করার আশঙ্কা খুবই বাস্তব ছিল। এ ব্যাপার ঘটতে পারত যদি স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী ভূমি পেত এবং সে পুনর্বিবাহ করলে তার নতুন স্বামী তার ভূমির ভাগ পেত। দুটি ধারণাই অন্য ভাইদের কাছে নিশ্চয়ই জুগুলাজনক ছিল। দু-একজন বাদে পরবর্তী বৈদিক স্মৃতিকারেরা নিয়ম করলেন যে, বিধবাকে স্বামীর শবদেহের সঙ্গে দাহ করা হবে। অথবা তাকে যদি আদৌ বেঁচে থাকতে দেওয়া হয়, তাহলে স্মৃতিকারেরা তার জীবনকে জীবনমৃত্যুতে পরিণত করেছিলেন—তার যে কোনও অর্থনৈতিক আশ্রয় নেই এ বিষয়ে তার দৈনন্দিন জীবনে সহস্ৰ খোঁচা দিয়ে।

যাজ্ঞবল্ক্য বলেন, ‘যে নারীর স্বামী নেই তার দেখাশোনা করবে তাঁর পিতা, মাতা, পুত্র, ভ্ৰাতা, শ্বশুর বা শাশুড়ি; না হলে সে নিন্দার ভাজন হবে।’(৫৫) তার অভিভাবকের তালিকায় শেষ দুজন বাদে বাকি সকলে তার নিজের পরিবারেরই সদস্য, যারা তার রক্ষণাবেক্ষণ করবে বলে প্রত্যাশা করা হয়। আপস্তম্ব, মনু এবং নারদ একমত যে অপুত্ৰক স্বামীর বিধবা স্ত্রী সম্পত্তির উত্তরাধিকার পায় না। কিন্তু গৌতম বলেছেন, সে তার সপিণ্ড ও সগোত্রদের সঙ্গে সমান ভাবে উত্তরাধিকারী।(৫৬) অন্যত্র যাজ্ঞবল্ক্য নিয়ম করেছেন যে, অপুত্ৰক ব্যক্তির বিধবা প্ৰথম উত্তরাধিকারিণী।(৫৭) এ ব্যাপারে বিষ্ণু ও কাত্যায়নও যোগ দিয়েছেন। কোনও নারীর স্বামীর যদি আট থেকে দশ বছর কোনও সংবাদ না পাওয়া যায়। তবে সে পুনর্বিবাহ করতে পারে।(৫৮) স্বামীর যদি পৃথক ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকে এবং এক বা একাধিক পুত্ৰ থাকে তাহলে বিধবার শুধু ভরণপোষণের অধিকার আছে। নিয়োগ প্রথায় পরপুরুষের বিধবা নারীতে পুত্রোৎপাদন বিষয়ে মনু খুব স্পষ্ট নন। তিনি এর নিন্দা করেন।(৫৯) বিধবা, এমনকী সাধারণ ভাবে নারী নিজে সন্তান পোষ্য নিতে পারে না, কারণ তারা প্রয়োজনীয় বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করতে পারে না। তাই তারা স্বাধীন ভাবে এমন সন্তান পোষ্য নিতে পারত না। যার উপরে তারা অর্থনৈতিক ভাবে নির্ভর করতে পারত।

নারদ বিধবার যে সাত রকম ব্যবস্থার কথা কল্পনা করেছেন, তার মধ্যে অন্যতম বিদেশির দ্বার ক্রীত হওয়া।(৬০) পরাশর নারীর বিষয়ে যে পুনর্বিবাহের বিধান করেছেন তার ফলে সে পুনর্ভুব হয় এবং স্বামীর সম্পত্তির অধিকার হারায়। স্মরণ করা যেতে পারে, দায়ভাগ নিয়ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে বিধবা স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকার পেত, যা মিতাক্ষরা নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে সম্ভব ছিল না। ফলে দায়ভাগ নিয়ন্ত্রিত বাংলায় ১৮১৫ থেকে ১৮৮০-র মধ্যে সামগ্রিক ভাবে ২৩৬৬ জন বিধবাকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল, যার মধ্যে শুধু কলকাতাতেই এ রকম নৃশংসতা ঘটে ১৮৫৮টি। ঋগ্বেদের সময়েও বিধবা করুণার পাত্রীই ছিল, নচেৎ আমরা অবৈধব্যের প্রার্থনা পেতাম না। কিন্তু মহাকাব্যে এবং এমনকী মনুও তাদের মৃত্যুর বিধান দেননি। কুন্তী ও গান্ধারী এবং দশরথের তিন মহিষী এবং বৌদ্ধ ও জৈন সাহিত্যে বিধবারা বেঁচেই ছিল এবং সম্মানের সঙ্গেই বেঁচে ছিল। নিম্নতর শ্রেণির মধ্যে, যতদিন না সংস্কৃতায়নের দুৰ্ভাগ্যজনক মিশ্রণ ঘটেছিল, ততদিন পর্যন্ত সতীদাহ ছিল না; তা শুরু হয় সংস্কৃতায়নের সঙ্গে সঙ্গেই। তথাকথিত নিম্নতর শ্রেণিতে বিধবাদের উদাহরণ সাহিত্যে পাওয়া যায় না।

বিধবাদের অর্থনৈতিক সমস্যা আরও জটিল হয়েছিল বহু বিবাহ এবং পুত্রের মাতার বিষয়ে সামাজিক গুরুত্বের কারণে। শুধু কন্যা আছে যার এ রকম বা নিঃসন্তান বিধবারা অর্থনৈতিক ভাবে উৎপীড়িত ছিল এবং সাধারণ ভাবে তাদের পিতামাতা বা ভ্রাতার উপর নির্ভরশীল ছিল। শ্বশুরবাড়িতে তাদের আরোপিত দায়িত্ব হিসেবে দেখা হত। তাছাড়া যে পুরুষের বিভিন্ন বর্ণের পত্নী থাকত, সে তার বিষয় সম্পত্তি আরও জটিল পরিস্থিতিতে রেখে যেত, কারণ বিধবাদের ভাগ্য বিষয়ে স্মৃতিকারদের পরস্পর মতভেদ ছিল। কেউ ভরণপোষণে বিধবার দাবি সমর্থন করতেন, কেউ আবার নামমাত্র ভূতির পক্ষপাতী ছিলেন। কখনও কখনও আবার শাস্ত্রের বিধি এবং সমাজব্যবহার, যা সাহিত্যে পাওয়া যায়, এই দুইয়ের মধ্যে বিরোধ দেখা যায়। গৌতম বলেছেন, ‘নিঃসন্তান ব্যক্তির সম্পত্তি তার স্ত্রীগামী।’(৬১) কিন্তু অভিজ্ঞানশকুন্তলম-এ আমরা শুনি এ রকম একটি বিষয় দুষ্যন্তের কাছে বিজ্ঞাপিত হলে তিনি বলেন যে, শাস্ত্ৰমতে এই সম্পত্তি রাজকোষে বাজেয়াপ্ত হবে।(৬২) সম্ভবত অন্য কোনও শাস্ত্রগ্রন্থ বা আঞ্চলিক ব্যবহার দ্বারা তিনি উপদিষ্ট ছিলেন।

বিবাহ বিচ্ছেদ পাশ্চাত্য অর্থে স্বীকৃত ছিল না। যদিও এমন শাস্ত্রগ্রন্থও আছে, যেখানে নিয়ম আছে যে, প্রতিকুল পত্নীকেও ত্যাগ করা যাবে না। কিন্তু পারস্পরিক দ্বেষ থাকলে দম্পতি বিচ্ছিন্ন হতে পারে। অর্থশাস্ত্র-তে আছে ‘স্বামী যদি স্ত্রীর দোষে বিচ্ছেদ চায়, তবে সে স্ত্রীর কাছ থেকে যা পেয়েছে তা ফেরত দেবে। যদি অনুরূপ কারণে স্ত্রী স্বামীর কাছ থেকে মুক্তি চায়। তবে স্বামী তার কাছ থেকে যা পেয়েছে তা ফেরত দেবে না। ধর্মবিবাহে বিবাহ বিচ্ছেদ নেই।’(৬৩) এই গ্রন্থে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিদ্বেষের কারণে উভয়পক্ষকে বিচ্ছেদের অধিকার দিয়েছে, কিন্তু বিচ্ছেদের বিষয়ে পুরুষের স্বাধীনতা সম্মান পেলেও নারীকে অর্থনৈতিক দণ্ড ভোগ করতে হয়েছে, কারণ সে তার স্ত্রীধন হারাচ্ছে।

সব সমাজেই সাধারণ ধর্ষণ কতকটা ক্ষমার চোখে দেখা হয়েছে। যাজ্ঞবল্ক্য বলেছেন। দাসীকে ধর্ষণ করলে পুরুষের দশ পণ দণ্ড হবে।(৬৪) সে যদি ভিক্ষুণীকে ধর্ষণ করে তবে তার দণ্ড ২৪ পণ।(৬৫) প্ৰভু দাসীকে ধর্ষণ করার বিষয়ে প্রথমেই যে প্রশ্ন মনে আসে, তা হল, সে কি করে পুরুষকে দণ্ড দিতে বাধ্য করবে? কে তাকে বিশ্বাস করবে, কে তার পক্ষ নেবে? বরং ভিক্ষুণীর কথা অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য এবং সে হয়তো জোর করলে অর্থ পাবে, কিন্তু গোটা বাস্তাবটাই কতকটা অবাস্তব শোনায়।

সাহিত্যে ধর্ষণকারীর বেকসুর খালাস পাওয়ার অসংখ্য উদাহরণ আছে। তাছাড়া আইন ও সামাজিক প্রথা উচ্চবর্ণের পুরুষের প্রতি এতটাই ক্ষমাশীল ছিল যে, তথাকথিত নিম্নবর্ণের নারীরা তাদের কাছে বিনা মূল্যেই সহজলভ্য ছিল। সুতরাং শাস্ত্র বাধা দেবে এমন প্রত্যাশা ছিল না। সমাজে নারীর অতি নিম্নস্তরের অবস্থানের কারণে সে পুরুষের লালসার কাছে অত্যন্ত অসহায় ছিল এবং সেই পুরুষেরা ধর্মশাস্ত্রকারদের সাহায্যে সামাজিক স্বীকৃতি নিয়ে বিনা শাস্তিতে এই আচরণ করত।

অসতী স্ত্রীদের ভয়াবহ রকম নিষ্ঠুর ভাবে শাস্তি দেওয়া হত; যে সব ধর্মশাস্ত্ৰে এই শাস্তির বিধান আছে, সেগুলি ধর্ষকাম লেখকদের রচনার মতো লাগে। অন্যান্য শাস্ত্ৰে বিধান আছে: অসতী স্ত্রীকে তার সব অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে হবে এবং তাকে কষ্টে থাকতে বাধ্য করতে হবে, এক গ্ৰাস মাত্র অন্ন দিয়ে। তাকে সব সময়ে তিরস্কার করতে হবে, মাটিতে শুতে হবে, কিন্তু তার স্বামীর বাড়িতেই থাকতে হবে। (যাতে সে তার পপকর্ম থেকে বিরত হয়)।(৬৬)

এখন প্রশ্ন হল, সে যখন তার কার্যকলাপ সংশোধন করবে, তখন কী হবে? তখন কি তাকে ভরপেট খেতে ও স্বামীর শয্যায় শুতে অনুমতি দেওয়া হবে? যদি স্বামী তার আজ্ঞানুবর্তিনী স্ত্রীকে ত্যাগ করে, যে স্ত্রী কর্মপটু এবং বীর পুত্রের জননী, তাহলে সেই স্ত্রীকে (স্বামীর) সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশ এবং ভরণপোষণ দিতে হবে।(৬৭) স্ত্রীর জীবনে অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাব ঘটায় এই নিয়মে নির্দোষ স্ত্রীকেও শুধুমাত্র স্বামীর সম্পত্তির এক তৃতীয়াংশ দিয়ে ত্যাগ করা যায়। সমাজে। শুধু পুরুষ ও নারীর জন্য দ্বিমুখী বিচারব্যবস্থা ছিল তাই নয়, যে স্ত্রী তার স্বামীর অপ্রিয়, তার পক্ষে তার আইনত যে অধিকার তা পাওয়ার সম্ভাবনাও দেখা যায় না। অসতী স্ত্রীকে দৈনন্দিন আহাৰ্যটুকু দিয়ে ঘরে বন্দি করে রাখতে হবে। সতীত্বের কর্তব্য যে লঙ্ঘন করেছে, সেই স্ত্রীকে প্ৰায়শ্চিত্ত করতে হবে। তাকে বন্দি করে রাখতে হবে এবং খেতে দিতে হবে।’(৬৮) ‘ব্যভিচারিণী নারীকে তার অধিকার (ভূত্যাদির উপরে) থেকে বঞ্চিত করতে হবে, ময়লা কাপড় পরতে দিতে হবে, নামমাত্র খেতে দিতে হবে। যদি সে পরপুরুষের দ্বারা গর্ভবতী হয়, তবে তাকে তাড়িয়ে দিতে হবে।(৬৯) বশিষ্ঠ বলেন, ‘উচ্চতর তিন বর্ণের স্ত্রীরা শূদ্রের সঙ্গে ব্যভিচার করলে তাকে তাড়িয়ে দিতে হবে। স্ত্রী যদি স্বামী বা গুরুকে হত্যা করতে চেষ্টা করে, তবে তাকে তাড়িয়ে দিতে হবে।’ গৌতম বলেছেন, ‘যদি উচ্চতর তিন বর্ণের স্ত্রী নিম্নবর্ণের পুরুষের সঙ্গে ব্যভিচার করে তবে তাকে কুকুর দিয়ে খাওয়ানো হবে।’(৭১)

অপর দিকে আপস্তম্ব ও বৌধায়ন দুজনেই বলেন মা যদি গুরুতর অপরাধের জন্য সমাজে একঘরে হয়, তাহলেও পুত্র তার সঙ্গে কথা না বলে তার সেবা করবে।(৭২) একঘরে পিতাকে ত্যাগ করা যায়, সম্ভবত সে নিজের ব্যবস্থা নিজে করতে পারে এবং সে-ই পরিবারের সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণ করে বলে, কিন্তু মায়ের পতন ঘটলেও পুত্র তাকে কখনওই ত্যাগ করতে পারে না। অসতী স্ত্রীর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান এবং পুত্রের মাকে ত্যাগ না করার মধ্যে মৌলিক ও নৃত্যুনতম মানবিকতার নিষ্কৰ্য, এই শাস্ত্রবিধানের মধ্যে স্বাভাবিক স্ববিরোধিতা আছে। সাহিত্যে কিন্তু ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়, ‘পতিতা’ নারীদের অভিশাপ দেওয়া হয়, শাস্তি দেওয়া হয় এমনকী মেরেও ফেলা হয় (যথা, সীতা, অহল্যা ও রেণুকা)।

বৈদিক যুগ থেকেই ভারতবর্ষে গণিকাবৃত্তির পরিচয় পাওয়া যায়। নানা প্রতিশব্দ সম্ভবত নন শ্রেণি বা স্তর বোঝায়, তার মধ্যে সর্বোচ্চ গণিকা, যাকে সরকারি ব্যয়ে নানা কলায় শিক্ষণ দেওয়া হত; তার মূল্যও সর্বাপেক্ষা অধিক। বৌদ্ধগ্রন্থে বলা হয়েছে, রাজগৃহে সালাবতী প্রতি রাত্রে একশত কার্যাপণ দাবি করত, এবং আম্রপালীর দক্ষিণা নিয়ে রাজগৃহ ও বৈশালীর মধ্যে বিবাদ হয়েছিল। মৃচ্ছকটিকনাটকে ঋগ্বেদ-এর গণিকার অনুগ্রহের জন্য সহস্ৰ সুবর্ণমুদ্রা পাঠানোর বিবরণ পাই; অর্ধকাশীর কাহিনি তো সুপরিচিত। গণিকা থাকত প্রাসাদে প্রাচুর্যের মধ্যে, তার বহু দাসদাসী, কুট্টনি, বিট, পীঠমর্দ, পুরুষ সেবক ও সঙ্গীতকারী থাকত। কৌটিল্য বলেন, গণিকা রাজকোষ থেকে মাসোহরা পেত এবং তার প্রতিনিধি প্ৰতিগণিকা তার অর্ধেক বেতন পেত। সম্ভবত গণিকার প্রাসাদ, দাসদাসী, সংসার সবই ছিল রাষ্ট্রের সম্পত্তি।(৭৩) এর অর্থ হল, গণিকার যে শুধু স্বত্ব ছিল না। তাই নয়, তা বেচবার, বাঁধা দেওয়ার বা দান করারও তার অধিকার ছিল না। এই নিয়ম গণিকালয়ে যারা থাকত। তাদের জন্য কার্যকর। কিন্তু অবরুদ্ধা, অর্থাৎ যারা কিছু সময়ের জন্য পুরুষের রক্ষিতা হত, এবং নিজেই গৃহ পরিচালনা করত, আমরা অনুমান করতে পারি— এই নারীরা যা উপার্জন করত, তা রাজকোষে প্রয়োজনীয় করা দেওয়ার পরে তাদের নিজস্ব সম্পত্তি হয়ে যেত।

রাজকোষ থেকে গণিকাদের ১৫০০ থেকে ২০০০ পণ বার্ষিক বেতন দেওয়া হত। যদি কেউ কোনও গণিকার নিষ্ক্রয় দিয়ে তাকে মুক্ত করতে চাইত বা বিবাহ করতে চাইত, তার রাজকোষে ২৪০০০ পণ নিষ্ক্রয় মূল্য দিতে হত। এ অনেক টাকা, কিন্তু গণিকার বেতনও অনেক টাকা। রাষ্ট্র যে গণিকার শিক্ষার ভার নিত, তার একটা কারণ হল, রাজা এবং তার সভাসদরা অনেক সময়েই বিনোদনের জন্য যুবতী ও সুন্দরী গণিকাদের ডাকতেন। আর একটা কারণ হল, গণিকারা সুকৌশলে তাদের খদ্দেরদের কাছ থেকে নানান রাজনৈতিক ভাবে প্রাসঙ্গিক সংবাদ আদায় করত। সেগুলি সংগ্ৰহ করার জন্যই অধিকাংশ সময়ে গণিকাধ্যক্ষ নিযুক্ত হত।

কিন্তু গণিকারা প্ৰায় স্বাধীন ভাবেই ধনী হত; অধিকাংশ নগরে তাদের মধ্যে যারা শ্রেষ্ঠ তাদের নগরশোভিনী বলা হত এবং তারা ধনী নাগরদের আকর্ষণ করতে পারত। ধৰ্ম্মপদের টীকায় সালাবতীর কন্যা সিরিমার প্রতি রাত্রে ১০০০ পণ উপাৰ্জন করার বিবরণ পাই। গণিকার তুলনায় সামাজিক ও পরিশীলনের দিক থেকে নিকৃষ্ট রূপাজীবী, যে সাধারণত মদ মাংস ব্যবসায়ীর সঙ্গে বাস করত। তার উপার্জন ছিল মাত্ৰ ৪৮ পণ। কোনও পুরুষ গণিকার কন্যার উপরে বলাৎকার করলে তার ৫৪ পণ দণ্ড হত এবং মায়ের প্রাপ্যোর ১৬ গুণ দণ্ডও দিতে হত, হয়তো তার বিবাহের সময়ে মুখবন্ধ করার উপায় হিসাবে। পুংশচলী ছিল এই উপজীবিকার শেষ ধাপে, তার কোনও বাঁধা প্রাপ্য ছিল না। কৌটিল্য বলেছেন, বৃদ্ধা ও অবসরপ্রাপ্তা বেশ্যাদের রাঁধুনি, ভাণ্ডারী, পশম ও তসর বয়নকারিণীরূপে এবং অন্যান্য কায়িক শ্রমের কাজে নিয়োগ করতে হবে। তাদের ধাত্রী বা মাতৃকারূপে বেশ্যালয়ে অথবা বেশ্যাদের শিক্ষা দেওয়া কাজেও নিযুক্ত করা যেত, যাতে তারা কিছু উপাৰ্জন করতে পারে। কিন্তু কৌটিল্য অর্থশাস্ত্র-তে তাদের যে অবসর ভাতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা অন্য ভাবে অসহায় এই নারীদের খুব অল্পই নিরাপত্তার আশ্বাস দিত। বেশ্যাকে তার আয়-ব্যয় বিষয়ে বেশ্যালয়ের রক্ষককে জানাতে হত।(৭৪)

দেবদাসী বা মন্দিরের গণিকাদের শস্যে বেতন দেওয়া হত–অন্যান্য কিছু রাষ্ট্রীয় কর্মচারীর মতো। দেবদাসীদের উপার্জন কোথাও স্পষ্ট ভাবে বলা হয়নি এবং তাদের বিশেষ কর্তব্যও উল্লিখিত হয়নি। যে সব ধনী পৃষ্ঠপোষক পরলোকে পুণ্য অর্জনের জন্য মন্দিরে দাসী কিনতেন, তাঁদের সদিচ্ছাতেই এদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। বেশ্যালয়েই হোক বা মন্দিরেই হোক, কোনও বারাঙ্গনাই নিজস্ব নিরাপত্তা পায়নি; গৌতম ধর্মসূত্র-তে স্পষ্টই বলা হয়েছে, ‘বেশ্যার হত্যা অপরাধ নয়।’(৭৫)

আমরা দেখেছি, সাধারণ ভাবে নারীর উপার্জন বা সম্পত্তির অধিকার ছিল না। প্ৰাচীন গ্রন্থ শতপথ ব্রাহ্মণ-এ (সম্ভবত অষ্টম-সপ্তম খ্রিস্টপূর্ব শতক) বলা হয়েছে পত্নীর সম্পত্তির উপরে কোনও অধিকার নেই, এমনকী নিজের শরীরের উপরেও নয়। (৪:৪:২:১৩)। শতপথ ব্রাহ্মণ-এ এর আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। যজ্ঞে লাঠি দিয়ে হবিকে পেটানো হয় যেমন তেমনি স্বামীও স্ত্রীকে পেটাবে, যাতে তার নিজের শরীর বা সম্পত্তির উপরে কোনও অধিকার না থাকে।’(৭৬) কিন্তু সমাজে দানকর্ত্রীর বহু নিদর্শন পাই: শুধু রানিরা নয়, শ্রদ্ধেয় জয়সেনের জৈন শিষ্যা, অথবা সীহমিত্রের জৈনধর্মাবলম্বনকারিণী শিষ্যা, সথিসিহ ও পুষ্যমিত্রের শিষ্যা, ইত্যাদি উদাহরণ আছে।(৭৭) সার্থিবাহপত্নী ধর্মসোমা বা শ্ৰমণদের গৃহস্থ শিষ্যা কোচ্ছা ধাৰ্মিক জৈন ভ্রাতৃগণকে নানা উপহার দিয়েছিলেন। বৃহৎকল্পভাষ্যসূত্ৰ-তে গণিকা আম্রপালীর উদ্যান দানের কথা আছে। অনাথাপিণ্ডদের কন্যা বুদ্ধ ও তার হাজার শিষ্যকে আহার দিয়েছিলেন। এ ছাড়া গণিকা ও অন্যান্য বৌদ্ধ নারীদের মঠ, চৈত্য, বিহার, উদ্যান, সেতু, কুপ,, জলাধার ও অর্থ দানের কথা শুনি। খ্রিস্টিয় পঞ্চম শতাব্দীতে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কন্যা মহিষী প্ৰভাবতী নানা মূল্যবান উপহার দিয়েছিলেন। ওড়িশার ভীেমক রাজবংশে সতেরো জন রাজার মধ্যে ছ’ জন মহিষীর বিবরণ পাওয়া যায়। রাজতরঙ্গিনীতে দিদা খেমা প্ৰথমে রাজপ্রতিভূ হিসেবে এবং পরে স্বয়ং রানি হিসেবে রাজত্ব করেন। একই গ্রন্থে মহিষী চুদা ও ডামারী যুদ্ধে সৈন্যবাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। নিঃসন্দেহে এই মহিষীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতাও ছিল। কিন্তু এর অধিকাংশই তন্ত্র পরবর্তী কালের প্রমাণ, যখন ব্যাপক ভাবে নারীকে দেবী ভাবে দেখা হয়েছিল। নিঃসন্দেহে রানিদের মান্য করা হত, অতিমানবিক শক্তির নিয়ন্তা হিসেবে, যেমন রাজাদেরও মনে করা হত–তারাও ইতিহাসে আগাগোড়াই সম্মানিত হয়েছেন।(৭৮) তেমনি ভাবে যে রানি তাঁর নিজ ক্ষমতায় অর্থের নিয়ন্ত্রণ করেছেন, তিনিও সম্মানিতা।

প্রথম যে প্রশ্নটা আমাদের মনে জাগে, তা হল: নারীর যদি অর্থ না থাকে, তবে তারা এমন মূল্যবান দান করতে কি করে পারত? একটি উত্তর হল, যে সব ধনী গণিকা নিজেদের গৃহ পরিচালনা করত, তাদের রাজকোষে কর দিয়ে বাকি উপার্জনের অর্থের উপর স্বত্ব ছিল। অনেক সময়েই পাপবোধের কারণে তারা তাদের অর্থের একটা বড় অংশ ধর্মকর্মে ব্যয় করত। দ্বিতীয়ত, সমাজে সবাই শাস্ত্রের অনুশাসন হুবহু পালন করত না, কিছু নারীর স্ত্রীধনের উপর অধিকার ছিলই। বিশেষ করে যদি তারা রাজ পরিবার বা সম্রান্ত পরিবার বা বণিক পরিবারের নারী হত, তাহলে তা বেশ ভাল পরিমাণ হতে পারত, এবং প্রায়ই তার নিন্দা বা তিরস্কারকে নীরব করিয়ে দেওয়ার অবস্থায় থাকত, কারণ টাকা কথা বলে। তাই তারা দান করতে পারত এবং করতও। তৃতীয়ত, পাশাপাশি ভিন্ন ভিন্ন অনুশাসনের আইন সমান্তরাল ভাবে থাকত, বিশেষ করে মাতৃতান্ত্রিক অঞ্চলগুলিতে। চতুর্থত, নারী, সন্ন্যাসী, পত্নী, বিধবা অথবা গণিকার দান বলে যেগুলি লিপিবদ্ধ আছে, তা সব সময়ে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করা ঠিক নয়, প্রায়ই ভক্ত বা শিষ্যেরা ধাৰ্মিক, ক্ষমতাশালিনী বা খ্যাতনামা নারীর নামে দান করত। তাছাড়া দাতা স্বামীরাও এ রকম দানে উৎসাহ দিত, যদিও আপস্তম্ব বলেছেন, ‘স্বামী গৃহে না থাকলে স্ত্রী সাধারণ ব্যয়াদি করবে; তা চৌর্য বলে গণ্য হবে না।’(৭৯) এর থেকে স্পষ্ট সিদ্ধাস্ত হয় যে, সে যদি অসাধারণ ব্যয় করে তবে সে স্বামীর অর্থ চুরি করছে বলে মনে করতে হবে! কিন্তু সমাজ যথেষ্ট পরিমাণে ফাঁক রেখেছিল যার সাহায্যে অসাধারণ পরিস্থিতিতে নারীরা তাদের নিজের ধন দান করতে বা ব্যয় করতে পারত।

তৃতীয়-চতুর্থ খ্রিস্টপূর্ব শতকে স্পার্টার সম্বন্ধে শুনতে পাই যে, ‘সমগ্র দেশের প্রায় দুই-পঞ্চমাংশ নারীদের অধীন; এটা এই জন্য যে অনেক ধনী উত্তরাধিকারিণী আছেন, এবং প্রচুর যৌতুক দেওয়া হয়।’(৮০) এথেন্সে যৌতুক দেওয়ার ক্ষেত্রে আইনে বলত যে, বিবাহ শেষ হয়ে গেলে সেটা ফেরত দিতে হবে।(৮১) রোমান আইনে বধু কেনা যেত।(৮২) স্বামী যদি (ব্যভিচার ছাড়া) অন্য কোনও কারণে স্ত্রীকে ত্যাগ করত, তাহলে তাকে তার সম্পত্তির অর্ধাংশ দিতে হত, বাকিটা দেবী সেরেস-এর কাছে বাজেয়াপ্ত হত। এই পিকিউলিয়াম’ তারা নিজেদের মতো ব্যবহার করতে পারত, যদিও প্রকৃতপক্ষে তা পিতার সম্পত্তি(৮৩) ভোকেনিয়ান আইন অনুসারে আদমসুমারির প্রথম শ্রেণিতে যে ব্যক্তি আসে, অর্থাৎ যে সম্পন্নতম, সে নারী উত্তরাধিকারিণী নিয়োগ করতে পারে না।(৮৪) ক্রীট-এ ‘পিতার মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা না করেই কন্যাকে তার ভাগ দেওয়া যাবে।(৮৫) পুত্ৰহীন পিতার সম্পত্তি কন্যাগামী হত, তার নাম প্যাট্রিওখস (অথবা এপিক্লোরস)।(৮৬) তাই দেখা যায়, ভোকেনিয়ান আইন, যা সমাজের সর্বাপেক্ষা ধনী অংশের জন্য নিয়ম করেছে, তা বাদে গ্রিস ও রোমে বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন আইন অনুসারে নারী সম্পত্তির উত্তরাধিকার পেতে পারত এবং পেতও।

গর্তিন আইন অনুযায়ী ‘বিবাহিত ক্রীতদাসীর নিজস্ব সম্পত্তি থাকতে পারে, কারণ বিবাহ বিচ্ছেদের নিয়মে বলা হয়, সে তার অস্থাবর সম্পত্তি (সম্ভবত নিজের জিনিসপত্র) এবং ছোটখাটো প্ৰাণী সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে।’(৮৭) ফলে উদার গর্তিন আইন অনুসারে দাসেরও সম্পত্তির অধিকার ছিল। কিন্তু গ্রিস ও রোমেও সাধারণ চিত্রটা খুবই হতাশাব্যঞ্জক–পুরুষের সম্পত্তির স্বত্ব ও ব্যবহারের পরিপ্রেক্ষিতে, যদিও ভারতবর্ষের তুলনায় আইন অনেক বেশি উদার। নারীর সম্পত্তির উপর পুরুষের নিয়ন্ত্রণ তার উপরে সার্বিক নিয়ন্ত্রণের একটা অঙ্গ। ‘মানুষের প্রজননের উপায় নিয়ন্ত্রণ করতে এবং এই উপায়গুলি তৎকালে কার্যকরী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার স্বার্থে প্রয়োগ করতে রাষ্ট্র বাধ্য হয় তার নিয়ন্ত্রণ ও অধিকার নারীর নিজের দেহের উপরে বিস্তুত করতে। সুতরাং, সে তার দেহের উপর সত্যকার স্বত্ব হারায়।’(৮৮) মনে পড়ে যজ্ঞের ঘি-কে লাঠি দিয়ে মারার যে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ব্ৰাহ্মাণে দেওয়া হয়েছে, তা হল ‘এই ভাবে মারলে স্ত্রী তার নিজের দেহ ও সম্পত্তির উপর অধিকার হারায়।’ দেহ ও সম্পত্তির পারস্পরিক স্থানপরিবর্তন তাৎপর্যপূর্ণ দেহও সম্পত্তির অংশ।

আমাদের মনে রাখতে হবে, দ্রৌপদীকে সর্বসমক্ষে অপমান করতে সভায় টেনে নিয়ে যাওয়ার সময়ে দুঃশাসনের প্রতি তাঁর প্রশ্ন: ‘রাজা যুধিষ্ঠির কি আমাকে জুয়ায় বাজি রেখে হেরে যাওয়ার আগে নিজেকে বাজি রেখেছিলেন?’ প্রশ্নটা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি ইঙ্গিত করছেন যে, যুধিষ্ঠির যদি আগে নিজেকে হারিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর দ্ৰৌপদীকে বাজি রাখার কোনও অধিকার নেই। অর্থাৎ তিনি মুখে না বলেও স্বীকার করছেন, তিনি কৌরবদের অধিকারভুক্ত, তার মানে, তিনি প্রকৃতপক্ষে তাঁর স্বামীর সম্পত্তি, এবং স্বামী তাঁকে বাজি রাখতে পারেন। এর বহু পূর্বে ঋগ্বেদের জুয়াড়ি আক্ষেপ করে যে, সে তার স্ত্রীকে বাজিতে হেরেছে। সুতরাং স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তি হিসেবেই ব্যবহৃত হত। শৰ্মিষ্ঠা দেবযানীর যৌতুকের অংশবিশেষ ছিলেন; কিন্তু যযাতি দেবযানীকে বিবাহ করে গোপনে শমিষ্ঠাকে উপভোগ করেন এবং তাঁর গর্ভে অনু, পুরু ও দ্রুতুর জন্ম দেন। সুতরাং যৌতুকের অচেতন অংশ যেমন স্বামী দখল করতে পারত। তেমনই বধুর মানুষ সহচরদেরও সে তা করতে পারত। নারী যে পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারত, মাধবীর কাহিনি তার প্রমাণ:

‘গালিব যখন গুরুদক্ষিণা সংগ্ৰহ করতে না পেরে রাজা যযাতির কাছে যাঞা করলেন, তখন যযাতি শূন্য রাজকোষের অজুহাত দিলেন। কিন্তু তিনি গািলবকে একটি অন্য সুযোগ দিলেন, রাজার সুন্দরী তরুণী কুমারী কন্যাকে ধার নিয়ে এক বছর রাজাদের কাছে ভাড়া দেওয়া যাবে, যতদিন না সেই রাজাদের একটি করে পুত্ৰ হয় এবং তাঁরা কৃতজ্ঞতাবশত গালিবকে কিছু অর্থ দেন। গালিব মাধবীকে পরপর তিনজন রাজার কাছে ভাড়া দিলেন এক এক বছর করে, যতদিন না তার গুরুদক্ষিণার খরচ উঠল। যযাতি, গালিব বা এই রাজারা, কেউই এই ব্যবস্থাকে নোংরা বা ঘৃণ্য মনে করলেন না এবং শুরুও দক্ষিণা গ্রহণ করলেন–মনে হয় সানন্দেই। একমাত্র মাধবীই এই সমস্ত ব্যাপারের প্রতি গভীর জুগুঙ্গা প্ৰকাশ করলেন এবং পরে দৃঢ় ভাবে বিবাহ করতে অস্বীকার করলেন। তাঁকে একটি অর্থকরী পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল এবং তার অন্তরাত্মা এতে ঘৃণা বোধ করেছিল। তিনি তপস্যা করতে গেলেন।’

প্রাচীন ভারতের নারীদের অর্থ উপার্জন, অধিকার বা ব্যয় করার থেকে এবং অর্থ বা অন্য সম্পত্তি বিক্রি, বাধা দেওয়া, গচ্ছিত রাখা বা দান করা থেকে বঞ্চিত করার ব্যবস্থাকে বিশ্লেষণ করলে আমরা কয়েকটি কারণ দেখতে পাই। আর্যরা উত্তর ভারতীয় ভূখণ্ডের অধিকাংশ দখল করে নেওয়ার পর তাদের অল্প মূল্যের দাসের এক সরবরাহ ছিল। পূর্বে পরিবারের মেয়েরা বাইরের অর্থনৈতিক কার্যকলাপে পুরুষের সহায়তা করত এবং তাই তারা উৎপাদন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে স্বীকৃত হত। তারা উপার্জনকারী বা উপার্জনকারীর সহায়ক হিসেবে কিছুটা মানবিক সম্মান পেত। কিন্তু যখন বিশাল এক দাস শ্রেণি আৰ্যদের ব্যবহারে লাগল তখন নারীদের আর বাইরের শ্রমসাধ্য কাজে যোগ দিতে হত না। ততদিনে দেশের ভিতরে এবং সাগরপারে উৎপাদন ও বাণিজ্যের উদ্ধৃত্তি সঞ্চিত হয়েছে শ্রেণিবিভক্ত এক সমাজে অল্পসংখ্যক সুবিধাভোগীর হাতে। ব্রাহ্মণ সাহিত্য থেকে শুরু করে আমরা সমাজের উপরের স্তরে মুষ্টিমেয় কিছু পরিবারের পরিস্ফুট ভোগের উল্লেখ পাই। সেই সময়ে আইনসঙ্গত উত্তরাধিকারীর হাতে সম্পত্তি রেখে যাওয়ার উৎকণ্ঠায় অন্তঃপুরেও পুরুষের আরও সজাগ পাহারায় নারীর আরও কঠিন বন্দিত্ব উপস্থিত হল। তাছাড়া এই ভাবে ঘরে থাকায় নারীর রূপের সৌকুমাৰ্য বজায় রইল, যা সম্পত্তির পুরুষ অধিকারীদের কাছে প্রিয়। তখন এ কথা স্পষ্ট হল যে নারীরা, যাদের মধ্যে অধিকাংশই প্রকৃতপক্ষে নিরক্ষর এবং কেবলমাত্র গৃহকর্মে নিপুণা, তারা অর্থনৈতিক ভাবে তাদের স্বামীদের উপর বোঝা এবং এই থেকেই তাদের ভোগ্যবস্তু হিসেবে গণ্য করার পদ্ধতি সহজ হল। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে বাৎস্যায়ন নারীর সম্বন্ধে দুই পরিপ্রেক্ষিতে— কুমারী হিসেবে ও গণিকা হিসেবে–পরিষ্কার বলেছেন, ‘তাদের সমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয় ভাবে সাজগোজ করতে হবে, কারণ নারী পণ্য।’(৮৯)

এখন নারীদেরই যদি পণ্য বলে মনে করা হয়, সম্পত্তি বা পদার্থ হিসেবে, তাহলে তাদের সম্পত্তি বা ঐশ্বর্য ব্যবহার করার স্বাধীনতা কেউ আশা করে না। সমাজ তাদের ব্যক্তি মানব হিসেবে স্বীকার করতে ভয় পেত।

গৃহকর্মে নারীর অবদান কখনও অর্থের নিরিখে পরিমাপ করা হয়নি, তাই যদিও তাদের মধ্যে অনেকেই অনেক গৃহকর্ম করত, তাদের খাদ্য, বস্ত্ৰ, আশ্রয় ও জীবনের অন্যান্য প্রয়োজনীয় বস্তুর জন্য পুরুষের উপরে অর্থনৈতিক ভাবে নির্ভরশীল বলেই মনে করা হত। উৎপাদনের কাজে যুক্ত থাকলেও তা যথেষ্ট নয়, তাকে তবুও বোঝা বলেই গণ্য করা হয় এবং প্রত্যাশা করা হয়। সে তার পিতা, ভ্রাতা, স্বামী বা পুত্রের অধীনে থাকবে। যখন তার হাতে টাকা এবং স\৩্যকারের সম্পত্তি আছে, যা সে নিজের ইচ্ছা মতো ব্যবহার করতে পারবে, তখনই তার অর্থনৈতিক সত্তা স্বীকৃত হয়েছে। আইনেই স্বীকৃতি এবং ব্যয়, সঞ্চয় বা যথেচ্ছ ভাবে নিজের অর্থ ব্যবহার করার সচেতন স্বাধীনতাই তাকে সম্পন্ন নারীর স্থান দিয়েছে। স্ত্রীধন বা সৌদায়িক বা যৌতুক পুথিগত ভাবে একান্তই তার নিজস্ব; কিন্তু সমাজের অনুভূতি ও তার নিজের অনুভতি হল যে, সে ‘ভাৰ্যা’ বা ভরণীয়া’, অর্থাৎ যাকে ভরণ করতে হয় এবং সেই কারণেই ভরণপোষণের জন্য স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকেদের অধীন, যেমন ভৃত্য, দাস, তেমনই এবং এতে স্ত্রীধন লুঠ করায় শ্বশুরবাড়ির লোকেদের সুবিধা হয়। কেবলমাত্র খুব ধনী নারীরা, যেমন রানি, যাদের ঐশ্বর্য রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বারা বুদ্ধিপ্রাপ্ত, তারাই সত্যি করে নিজেদের অর্থের উপরে নিয়ন্ত্রণ রাখত। অথবা যে গণিকা তার নিজের অর্থ ‘উপার্জন’ করে করা দেয় এবং কখনও এতই সম্পন্ন হয় যে রাজা এবং বণিকরাও তার ক্ষমতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়, সে-ই সময়বিশেষে সমাজে অর্থবল প্রয়োগ করার স্বাধীনতা পায়। তাছাড়া সর্বত্রই ধনী দাতারা সম্মানিত হয় এবং লোভী প্রার্থীদের কাছে অর্থে কোনও কলঙ্ক নেই। ধর্মকর্ম সর্বত্র এবং সর্বকালে অর্থের পাপ স্বলন করে।

কিন্তু এই ব্যতিক্রমগুলি বাদ দিলে সাধারণ ভাবে দাসী, গৃহবধু বা বিধবারা পুরুষ ও তার পরিবারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকত, কারণ গৃহে তাদের শ্রম যতই গুরুতর হোক না কেন, উৎপাদনমূলক বলে গণ্য হত না। তোদর একমাত্র মূল্য তাদের প্রজননের ভুমিকায়। কিন্তু সেখানেও তাদের ক্ষেত্র হিসাবে দেখা হত, ফসল হল বপনকারীর নিজের। দীর্ঘ শতাব্দী ধরে সমাজ ধীরে ধীরে কিন্তু নিশ্চিত ভাবে নারীর পায়ের তলা থেকে তার আত্মসম্মানের শেষ অবলম্বনটুকু সরিয়ে নিয়েছে, তাকে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে এবং গৃহে তাকে এমন এক নিশ্চেতন ভূমিকা দিয়ে যাতে তার সাধারণ বুদ্ধি সীমাবদ্ধ হয়ে যায় এবং পুরুষ ঘোষণা করতে পারে যে, নারীর অর্থের প্রয়োজন নেই এবং অর্থ পেলেও তার উপরে নির্ভর করা যায় না।

সূত্রাবলি
(অসম্পূর্ণ)

শাস্ত্রে পণপ্রথা ও স্ত্রীধন

বধূদাহন ও অন্যান্য নানা প্রকার পণপ্রথার কারণে হত্যা আজকাল সংবাদপত্রে এতই দৈনন্দিন ব্যাপার যে শাস্ত্রে তার মূল খোঁজার এবং এই সব দুষ্ট ধারণা ও কার্যকলাপের অবসান ঘটানোর তাগিদ বাড়ে। এই সব হত্যার প্রধান কারণ অসন্তুষ্ট শ্বশুর-শাশুড়ি, তাদের অপূরণীয় অর্থলগসা, যা প্ৰাথমিক ভাবে বর ও তার পরিবারকে বিবাহের সময়ে দেওয়া পণের দ্বারা উদ্দীপিত হয়। কিন্তু পরিতুষ্ট হয় না। এর বৃদ্ধি ঘটে অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও লোভকে কেন্দ্র করে এবং এর অবসান নির্ভর করে পুরুষের আত্মমর্যাদার উপরে, যা অনুপার্জিত যে কোনও রকম অর্থ গ্রহণ করে নিজেকে বিকিয়ে দিতে অস্বীকার করে।

সর্বপ্রাচীন ঋগ্বেদ-এর সংহিতায় বধু বা বরের কারও পক্ষ থেকেই অর্থ বা অন্য কোনও রকম ধনের আদান-প্রদানের উল্লেখ নেই। বিবাহের সর্বপ্রথম উল্লেখ হচ্ছে ‘কুমারী নিজের সঙ্গী বেছে নেয়।’ (ঋগ্বেদ সংহিতা ১০:২৭:১২) বোঝাই যায়, পুরুষ ও তার সঙ্গী বেছে নিত; কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এটা স্বাধীন নির্বাচন, কোনও পক্ষের কোনও অর্থদানের উপর নির্ভর করে না। এক জায়গায় ঋগ্বেদ-এ অবশ্য দোষযুক্ত বরের বধূর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা আছে। (১:১০৯:২) ঋগ্বেদ-এর দশম মণ্ডল থেকে শুরু করে পরবর্তী বৈদিক সাহিত্যে বিবাহের কয়েকটি বিক্ষিপ্ত উল্লেখ আছে, যেমন সূর্যকে বলদের গাড়িতে করে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যাওয়া। এই সূক্তে বলা হয়েছে, বধুর পিতা বরের গৃহে উপহার পাঠিয়েছিলেন (প্রাগুক্ত ১:৮৫:১৩)। এই উপহার স্পষ্টতই কন্যার উদ্দেশ্যে পিতামাতার স্নেহোপহার। এটা প্রকৃতপক্ষে পণ নয়। ’

পরবর্তীকালের একটি বৈদিক গ্ৰন্থ, খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীর আশপাশে সংকলিত তৈত্তিরীয় সংহিতা-য় বলা হয়েছে, নবদম্পতি যখন বারের গৃহের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে, তখন বন্ধু’ধরে থাকে’ (শকিটাট), কারণ বধু সব ‘গৃহ সম্পত্তির কর্ত্রী। (৬:২:১:১)। মনু গৃহসম্পত্তির অর্থে ‘পরিনাহ্য’ শব্দটি ব্যবহার করছেন এবং এই মন্ত্রটি ভিন্ন ভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, বলেছেন, ‘বধু সম্পত্তির তদারকের দায়িত্ব পেয়েছে।’ (মনু সংহিতা৯:১)। এই ভাবে সাংসারিক সম্পত্তির উপর স্ত্রীর স্বত্ব অস্বীকার করা হয়েছে। যদিও জৈমিনি বলেছেন নারীদের কোনও কোনও বিশেষ সম্পত্তির অধিকার থাকতে পারে ও থাকে। মনু সংহিতা (৮:৪:১৬)-র উপরে টীকা করতে গিয়ে মেধাতিথি বলেছেন, নারী যা উপাৰ্জন করে তা সবই তার স্বামীর। স্পষ্টতই সামাজিক মনোভাব হল নারীর নিজস্ব ধন-সম্পত্তিতে অধিকার নেই। দুঃখের বিষয়, আধুনিক ভারতবর্ষেও বহু পরিবারে এমন মনোভাব এখনও দেখা যায়। পুরুষের যেমন সম্পত্তির উপর সম্পূর্ণ অধিকার, নারীর তা নয়।

তা সত্ত্বেও বিবাহের সময়ে নারীকে তার পরিবার ও বন্ধুবৰ্গ উপহার দিত এবং পরে তার স্বামীর পরিবারও দিত। পারিভাষিক ভাবে বিবাহের সময়ে অগ্নির সামনে তাকে যা দেওয়া হত (অধ্যাগ্নি) এবং স্বামীগৃহে যাওয়ার সময়ে পথে তাকে যা দেওয়া হত (অধ্যাহবনিক)— যা স্নেহবশত (অপারে) তাকে দিত বা তার ভাই বা মাতা পিতা তাকে যা দিতি— এই দুটি হল স্ত্রীধান, নারীর ব্যক্তিগত ধন সম্পত্তি। (মনু, সংহিতা ৯:১৯৫) মনু যে কেবল বধুর নিজস্ব সম্পত্তি স্বীকার করেন তা নয়, তিনি বলেছেন, কন্যাপণ শুধুমাত্র সর্বনিকৃষ্ট আসুর বিবাহোঁই গ্রহণযোগ্য (প্রাগুক্ত ৩:৩৯)। অন্যান্য আচার্যদের মতো উদ্ধৃত করে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে আর্য বিবাহে কন্যার পিতা বাধ্য হয় বরকে একটি গরু এবং ষাঁড় দিতে এবং এই দৃষ্টিভঙ্গিকে নিন্দ করে তিনি বলেছেন, এটি মিথ্যা, কারণ ছোট হোক বা বিশাল হোক, পণ হল আনুষ্ঠানিক ভাবে বরের বিক্রয়।’ (প্রাগুক্ত ৩:৫৩) এর উপর জোর দিতে মনু আরও বলেছেন ‘যে সব বিবাহে কন্যার ক্ষতিপূরণ মূল্য গ্রহণ করা হয়, সেখানে (বরের) বিক্রয় হয় না, সেখানে কন্যা সম্মানিত হয় এবং তার প্রতি সদয় আচরণ করা হয়।’ (প্রাগুক্ত ৩:৫৪)

যদি কোনও কারণে স্বামী বধূকে কোনও স্ত্রধনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার জীবদ্দশায় তা পূরণ করতে না পারে, তার পুত্রদের তখন তা তাদের মাকে দিতে হয়। অপরার্ক নামে এক টীকাকার বলেছেন, স্বামী, পুত্ৰ, ভ্রাতা, এমনকী পিতারও স্ত্রীধন কেড়ে নেওয়ার বা দান করার অধিকার নেই। কেবলমাত্র দুষ্ট ও অপব্যয়ী পত্নী স্ত্রীধনের উপর অধিকার হারাতে পারে। তবে এখানে একটা ফাকি থেকে যাচ্ছে, কারণ স্বামী এবং/অথবা তার পরিবার স্ত্রীকে অপব্যয়ের অপবাদ দিলেই স্ত্রীধন থেকে তাকে বঞ্চিত করতে পারে। এই ব্যাপারটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন আমরা মনে করি যে জুয়া খেলে, সুরা ও নারীতে, এমনকী কাণ্ডজ্ঞানহীন কার্যকলাপে সম্পত্তি উড়িয়ে দিলে স্বামীকে নিয়ন্ত্রিত করার স্ত্রীর কোনও আইনগত অধিকার নেই। পরাশর তাঁর গৃহ্যসূত্ৰ-এ পরিষ্কার বলেছেন, মাতার মৃত্যুর পর স্ত্রীধন কন্যাদের কাছে যায়। কেবলমাত্র কন্যা না থাকলেই পুত্র তা পেতে পারে। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, এখানে উদ্দেশ্য হল স্ত্রীধনের সঙ্গে একক ভাবে বধূকে এবং সাধারণ ভাবে তাঁর আত্মীয়াদের যুক্ত করা, বোধহয় এই কারণে যে স্ত্রীধনই নারীর একমাত্র সম্পত্তি। কাত্যায়ন স্ত্রীধনের উপরে আরও পরিস্ফুট: সাতাশটি কারিকায় তিনি বধুর এই একমাত্র সম্পত্তির লক্ষণ করেছেন। বিবাহে যা সে তার পিতামাতা, ভ্ৰাতভগ্নি, অন্যান্য আত্মীয়-বন্ধুর কাছ থেকে পায়, যা সে তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের কাছ থেকে লাভ করে, প্রথমবার পিত্ৰালয়ে ফেরার সময়ে তাকে তার পরিবার থেকে যা দেওয়া হয়, তা সবই তার নিজস্ব। কাত্যায়ন বলেন, শুষ্ক হল মূল্য, যা বর বধূকে দেয়, বিবাহের সময়ে বা তার গৃহের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার সময়ে। স্মৃতিচন্দ্ৰিক বা ব্যবহার ময়ুখ-এর মতো পরবর্তী গ্রন্থে এই দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থন করা হয়েছে। বরদরাজ কিন্তু তার ব্যবহার নির্ণয়ে বলেছেন, শুষ্ক দুই প্রকার হতে পারে: (১)বধুর শ্বশুর-শাশুড়ি তাঁর পিতামাতাকে যা দেন, যা তার মৃত্যুর পরে তার মা এবং/অথবা ভাইয়েরা পায়; এবং (২) তাকে অলংকার বা গৃহস্থলীর সামগ্ৰীর মূল্য বাবদে বর যা দেয়। কাত্যায়ন যোগ করেছেন যে, তার শিল্প’ দিয়ে সে যা উপার্জন করে এবং অপরের কাছ থেকে যা পায় তা তার স্বামীর প্রাপ্য, কিন্তু অবশিষ্ট সবই স্ত্রীধন। এতে করে বধুকে প্রায় সব সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়। কিন্তু আর এক স্মৃতিকার দেবল বলেন, ভরণপোষণ, শুষ্ক এবং সুদ থেকে যে লাভ হয় তা পুরোপুরি স্ত্রীধান, যার উপরে বধূর সম্পূর্ণ আধিপত্য আছে। মনুর প্রখ্যাত টীকাকার মেধাতিথি বলেছেন অলংকার যদিও সাক্ষাৎ ভাবে বধূকে দেওয়া হয়নি, কিন্তু সে স্বামীর অনুমতি নিয়ে তা পরে, তাই তাও স্ত্রীধনেরই অন্তর্ভুক্ত।

আর এক ধরনের স্ত্রীধনকে বলা হয় সৌদায়িক। যা কিছু যে কেউ দেয়, তা সে তার নিজের পরিবারের হোক, বন্ধু লোক, স্বামীও তার পরিবার বা তাদের বন্ধু হোক–তা সৌদায়িক। (দায়ভাগ ৪:১:২১) অপরার্ক বলেছেন, এই সম্পত্তি সম্পূর্ণভাবে বধুর; সে তা দান করতে পারে, বন্ধক রাখতে পারে, যদি তা ভূসম্পত্তি হয়, তাহলেও।

পরবর্তী গ্রন্থ স্মৃতিচন্দ্ৰিকা স্ত্রীধন হিসেবে বধু কত দূর পেতে পারে তার সীমা নির্দেশ করে। সব রকম উৎস এক করলে সে দু’হাজার পণ পর্যন্ত পেতে পারে, কিন্তু সে ভূমির অনুদানও পৃথক ভাবে পেতে পারে। (২:২৮১) ব্যবহোরমন্থখ-এ। কিন্তু বলা হয়েছে, সে বাৎসরিক দু হাজার পণ উপার্জন হয় এ রকম সম্পত্তির অধিকার পেতে পারে। কিন্তু এককালীন উপহার হিসেবে তার আরও বেশি অধিকার ছিল। আপস্তম্ব ধর্মসূত্রে বলা হয়েছে, পূর্বাচার্যগণ বলেছেন অলংকার এবং অন্যান্য যা ধন তার আত্মীয়রা উপহার হিসেবে দেয় তা পত্নীর নিজস্ব। (২:৬১৪:৯) বৌধায়নের মতো কন্যা মায়ের অলংকার এবং অন্যান্য প্রথাগত উত্তরাধিকার পায়। (ধৰ্মসূত্র ২:২:৪৯) বশিষ্ঠও বলেছেন, যা মায়ের স্ত্রীধন ছিল, তা তার কন্যাদের মধ্যে ভাগ করে দিতে হবে, তা তখন তাদের নিজস্ব স্বাধীন সম্পত্তি (১৭:৪৬)। ভিন্ন ধরনের বিবাহের উপহার হল যৌতুক। বুৎপত্তিগত ভাবে তার অর্থ বিবাহের সময় দম্পতি (যুতিক)কে যা দেওয়া হয়। (কাতায়ন ধর্মসূত্রঃ ১৯০৫, ৯০৭, ৯১১) এই বিশেষ উপহারটিতে সম্ভবত দম্পতির যৌথ অধিকার ছিল। পুথিগত ভাবে অন্তত এই সম্পত্তির উপর পুরুষের নারীর মতোই অধিকার ছিল।

মনু স্ত্রধনের একটি রক্ষাকবচের কথা উল্লেখ করেছেন: যে আত্মীয়েরা মুখতাবশত (বধুর) দাসী, রথ বা বস্ত্ৰ ব্যবহার করে, তাদের সর্বনাশ হয়। (৩:৫২) তাই বোঝা যায়, নারীর শ্ৰীধনকে বেআইনি ভাবে তার শ্বশুরবাড়ির লোকেদের ব্যবহার করার ঘটনা ঘটত, এবং তাকে তার ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হত। বধু মনে হয় সম্পূর্ণ ভাবে অসহায় এবং নিজের সম্পত্তি রক্ষা করতে পারত না। এ নিয়ম কিন্তু শুধু ধনী মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য (দাসী ও রথের উল্লেখ দ্রষ্টব্য); অপেক্ষাকৃত দরিদ্র যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং যাদের অনেক কম সম্পত্তি ছিল, তারা তাদের যৎসামান্য সম্পত্তির উপরে শ্বশুরবাড়ির লোভী হস্তক্ষেপে নিঃস্ব হয়ে পড়ত।

প্রাচীন ও পূর্ব মধ্যযুগীয় সমাজের দুটি গুরুতর বৈশিষ্ট্য উপরের এই বক্তব্য থেকে বেরিয়ে আসে। প্রথমত, পুথিগত ভাবে নারীর সম্পত্তির, এমনকী ভূমির, উপরেও অধিকারের ধারণা ছিল। যেহেতু তাকে শিক্ষার সুযোগ দেওয়া হত না এবং তথাকথিত নিম্ন অর্থাৎ শ্রমজীবী বা কৃষিজীবী শ্রেণি ছাড়া তার অর্থকরী জীবিকাও ছিল না, সে অন্ন বস্ত্ৰ আশ্রয় ও জীবনের অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের জন্য তার স্বামী ও তার পরিবারের পোষ্যই ছিল। তাই তারা তার ধন খুশি মতো খরচ করে দাবি করতে পারত, তার ভরণপোষণের জন্য তা ব্যবহার হয়েছে। সেও তাদের যুক্তি খণ্ডন করতে সফল হত না। রানি বা ধনী নারী, যাদের পিতা বা ভ্ৰাতা সামাজিক ভাবে তার শ্বশুরবাড়ির চেয়ে বেশি শক্তিশালী, তারা ছাড়া আর সকলের সৌদায়িক স্ত্রীধন বা যৌতুক, সবই স্বামী এবং তার পরিবারের হাতে যেত। যেমন এখনও যায়।

দ্বিতীয় যে বৈশিষ্ট্য আমাদের প্রবল ভাবে নাড়া দেয় তা হল, খ্রিস্টিয় প্রথম শতাব্দীগুলির কালেও, এমনকী মনুর সময় পর্যন্ত, বধূর পরিবারের পক্ষ থেকে বরের পরিবারকে পণ দেওয়ার ধারণা স্বীকৃত ছিল না, অনুমোদিতও নয়। রামায়ণ-মহাভারত-এ সমাজের যে প্রতিফলন ঘটেছে, সেখানে বধু ও বরের পরিবারের মধ্যে উপহার বিনিময়ের নিদর্শন পাওয়া যায়। মনু খুব পরিস্ফুট ভাবেই বলেছেন যে, বধূর পরিবার যদি পণ দেয়। তবে বিক্ৰয়ের প্রসঙ্গ আসে। ‘পণ’ শব্দটির অর্থ মূল্য’, এবং বধূর পরিবার যদি মূল্য দেয়। তবে তারা কী কিনছে? অবশ্যই বরকে, যে তখন ‘পণ’ হয়ে দাঁড়ায়। স্পষ্টতই এ ধারণা সমাজে জুগুপ্তসাজনক। এতে বরের সামাজিক সম্মান ও আত্মমর্যাদাও হ্রাস করে, কেননা এতে সে তার শ্বশুরকুলের কাছ থেকে পণ মূল্য গ্রহণ করার লজ্জা অনুভব করে না, ফলে তার দাম্পত্যজীবন ব্যবসায়িক বেচাকেনার উপরে নির্ভর করছে। তার সম্মানবোধের সম্পূর্ণ নিঃস্বতাই প্রমাণ করে। মনুর যুগেও সে সাধারণ ভাবে সমাজ এবং বিশেষ ভাবে তার শ্বশুরবাড়ির দ্বারা স্বীকৃত, তা সে মনে করত না। আবার এই স্বীকৃতি যে শ্বশুরবাড়ির কাছ থেকে সে যে পরিমাণ পণ আদায় করতে পারে তার দ্বারা নির্ধারিত, এমনও সে মনে করত না। পরে পণ দেওয়া নেওয়ার এই ঘৃণ্য প্রথায় লজ্জার লেশমাত্র রইল না। কন্যার পিতামাতা যে মুহুর্তে বর কেনার জন্য মূল্য দিতে সম্মত হল, তখনই তারা বধূর পরিবারকে চাপ দিয়ে আরও বেশি আদায় করার জন্য শ্বশুরকুলের লোভকে আরও শান দিল। এই লোভের যথার্থ খাদ্য যোগাতে না পারার ফল হত–এখনও হয়–বধুর সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও অত্যাচার। সে যদি এই যন্ত্রণার জীবন মেনে নিত তাহলে তাকে জীবস্মৃত অবস্থায় বেঁচে থাকতে হত। যদি সে তা না পারত–বা এখনও যদি না পারে–সে আত্মহত্যা করে তার অবসান ঘটায়। যদি তার মধ্যে সেই মরিয়া ‘সাহসী’ না আসে, তাহলে তার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তা নিজেদের হাতে তুলে নেয়; বিষ, আগুন, অথবা উঁচু জায়গা থেকে সফল একটি ঠেলা দেওয়া। যে অবাঞ্ছিত বধুর পিতামাতা প্রত্যাশিত কামধেনুর ভূমিকা পালন করতে চায় না বা আর পারে না, তাকে সরিয়ে দেওয়ার কত রাস্তাই না আছে। তা ছাড়া, প্রবাদে বলে, ‘ভাগ্যবানের বউ মরে, অভাগার গরু মরে।’ শাস্ত্ৰ বিপত্নীককে খোঁচায়–আবার এবং যত শীঘ্র সম্ভব বিবাহ করতে। তারপরে, যদি ভাগ্য ভাল হয় তবে তৃতীয়বার, চতুর্থবোর যতবার হয়–নির্লজ্জ ভাবে, বারে বারে। তার বয়স কোনও বাধা নয়, কারণ নারী তো সস্তা পণ্যদ্রব্য, আর কুমারী মেয়ে মা-বাবার লজ্জা। তাই পুনঃ পুনঃ বিবাহ অর্থে পার্জনের একটি বর্ধমান উপায় হয়ে দাঁড়াল এবং এই প্ৰথা এখন চেতনাকে এত লজ্জাহীন ও অনুভুতিহীন করে তুলেছে যে কোনও পক্ষই আর কোনও লজ্জা অনুভব করে না।

কিন্তু তবু এটি একটি সম্পূর্ণরূপে দুষ্ট ও লজ্জাকর নিয়ম। দরিদ্র পরিবারের বধু সংসারে কায়িক শ্রম দেয় এবং ধনী ঘরের বধু ভাল পণ নিয়ে আসে। সুতরাং দ্বিতীয়টি বরকে কিনে নেয়, কিন্তু সে এই প্রথায় লজাবোধ করার পরিবর্তে নিজের বাজার দর নিয়ে বড়াই করে, তাই সহজেই মেনে নেয় সে পণ্যদ্রব্য ছাড়া আর কিছু নয়। এই কুপ্ৰথা আমাদের সমাজজীবনে এতটাই ওতপ্রোত এবং ব্যাপক যে শিক্ষিত ছেলেরাও কোনও রকম বিবেকের দংশন ছাড়াই এই জঘন্য প্রথাকে মেনে নেয়। প্রায়ই তারা সুবোধ সন্তান হওয়ার ভান করে, নোংরা কাজটা পিতামাতার হাতে ছেড়ে দেয়। শাস্ত্ৰে বলে, ‘কন্যা একটি পরিবারকে দান করা হয়, অতএব সমগ্র পরিবার তার কাছ থেকে সেবা আদায় করতে পারে, ইচ্ছামতো তার উপরে অত্যাচার করতে পারে, আরও বেশি টাকা আদায়ের জন্য তার বাবা-মাকে চাপ দিতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত আর পণ না দিলে তাকে মেরে ফেলতেও পারে। তারপরে সে আবার স্ত্রী ঘরে আনেসমস্ত পদ্ধতিটার পুনরাবৃত্তি করে।

এ কথা সত্য যে পাশ্চাত্য দেশেও পণপ্ৰথা ছিল— অষ্টাদশ শতাব্দীতে শিল্প বিপ্লবের আগে পর্যন্ত নারীকে নিকৃষ্ট জীব ও দাসী হিসেবে দেখা হত। কিন্তু গত দুই শতাব্দীতে, বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, পশ্চিমে পণের নির্লজ্জ আদানপ্রদান পশ্চিমে লোপ পেয়েছে। শিক্ষা এবং স্ত্রী পুরুষের পরিবর্তিত অর্থনৈতিক অবস্থানের ফলে উন্নততর আলোকপ্ৰাপ্তি ঘটেছে যা এই প্রথার অবসান এনেছে। কিন্তু শিক্ষা সত্ত্বেও, এমনকী নারীশিক্ষা সত্ত্বেও ভারতবর্ষে বরের পরিবারের এই লোভ কমেনি, মুষ্টিমেয় কিছু লোকের মধ্যে ছাড়া। বরং নানাপথে কলো টাকা ও সহজলভ্য টাকার আবির্ভাবের ফলে এই পণের লোভটা আরও বেড়ে উঠেছে। গোপন পণ, অর্থাৎ মনস্তুষ্টি ঘটানোর উপহার অনুপার্জিত ধনের জন্য লিন্সা আরও বাড়িয়ে দেয় এবং সেই ভাবে এই নির্লজ্জ প্রথা চলতেই থাকে। এখন বন্ধুর পরিবার কখনও কখনও হঠাৎ বড়লোক, উপযুক্ত বরের জন্য অর্থ ও অন্যান্য বস্তুতে যে অসীম পরিমাণ খরচ করেছে সে বিষয়ে বড়াই করে বেড়ায়, ভুলে যায় যে এই ভাবে তারা বরের পরিবারকে এই ধারণা দেয় যে এখানে সোনার খনি আছে, অনির্দিষ্টকাল ধরে যা থেকে লাভ করা যায়।

পণ, স্ত্রীধন এবং সৌদায়িক–এই সব উপহারের প্রধান প্রাপক বধু। শুধু যৌতুকের ক্ষেত্রে দম্পতি তার যৌথ প্রাপক। কিন্তু বেশির ভাগ পরিবারেই শ্বশুর-শাশুড়ি নিজেদের মেয়ের বিয়ে দেয় অথবা বরকে বিদেশ পাঠায় বধুর বাড়ি থেকে পাওয়া অর্থে। তারা সহজে এবং বিনা লজ্জায় বধুর পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা ধন ভোগ করে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তাদের আরও বেশি অর্থলিন্সা বধুর পিতামাতাকে সর্বস্বান্ত করে দেয়। সত্য কথা, পরবর্তী শাস্ত্ৰে অনুচ্চারিত ভাবে, কখনও স্পষ্ট ভাবে এই প্রথা স্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের কি ভুলে যাওয়া উচিত, এমন কি মনু, যিনি এমনিতেই প্রাচীন পন্থী ও প্রতিক্রিয়াশীল, তিনিও এমন পরিস্ফুট ভাবে আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে কেবলমাত্র আসুর বিবাহেই পণ স্বীকৃত? তিনি এবং আরও কয়েকজন ধর্মশাস্ত্রকার বলেছেন যে এই প্রথার অর্থ হল পণের টাকা নিয়ে নিজের পুত্ৰকে বিক্রি করা এবং এমন ইঙ্গিত দেন যে, কোনও আত্মসম্মান বিশিষ্ট পুরুষের এই বিক্রয়ে সায় দেওয়া উচিত নয়। পণ দেয় বা নেয় যারা, তাদের সামাজিক ভাবে একঘরে করে রাখা অথবা মাইক্রোফোনে বা পোস্টারে এই ঘৃণ্য কাজ ঘোষণা করা, এই সব হয়তো এই প্রথার বিরুদ্ধে লড়তে সাহায্য করবে। মেয়েদের উচিত, যে বর পণ চায় তাকে বিবাহ করতে অস্বীকার করা, তাদের নিজেদের বিবাহের সময়ে পিতামাতার থেকে আদায় করা আরামের সামগ্রীর উপর এই নিকৃষ্ট লোভ ত্যাগ করা উচিত। ছেলেদের উচিত, যেখানে অর্থ বা সামগ্ৰী–যেমন আসবাব, গহনা, গাড়ি, ফ্রিজ, ইত্যাদি–বিধুর সঙ্গে দেওয়া হয়, সেখানে বিবাহ করতে অসম্মত হয়ে তাদের পিতামাতা, পরিবার ও আশপাশের সামাজিক পরিবেশের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, তাদের বধু ছাড়া আক্ষরিক ভাবে কোনও কিছু গ্ৰহণ করতে অস্বীকার করার সংকল্পে স্থির থাকা উচিত, কারণ তা মানবিক সম্মানের পরিপন্থী এবং প্রাচীন গ্ৰন্থকারেরাও নিম্নতম স্তরের বিবাহই কেবল স্বীকার করেছেন। ছেলেদের উচিত অনুপার্জিত অর্থ গ্রহণ করা যে শুধু অপরাধ তা নয়, তাদের নিজেদের উপাৰ্জনক্ষমতার বিরুদ্ধে অপমান, এ কথা ঘোষণা করা; এই প্ৰথা তাদের মানবিক সম্মানের অবমাননা এবং তাদের আত্মসম্মানের পরিপন্থী।

তনয়া

প্রাচীন ভারতবর্ষে পুত্র জন্মালে শাঁখ বাজত, কন্যা জন্মালে নয়। তাছাড়া ভাইফোঁটা, জামাই ষষ্ঠী, সবই পুরুষকেন্দ্ৰিক অনুষ্ঠান। জন্মদিনও ছেলেদেরই বেশি হয়। ঐতরেয় ব্রাহ্মণ-এ বলা হয়েছে: যে নারী পুত্রের জন্ম দেয় সেই শ্রেষ্ঠ নারী। যে নারী কন্যার জন্ম দেয় তাকে বারো বছর পরে ত্যাগ করা যায় (৬:৩:১৭:১৩)৷ বৌধায়ন ধর্মসূত্র (২:৪:৬) ও আপস্তম্ব ধর্মসূত্র (১:১০:৫১-৫৩; ২২:৫:১১,১৪) অনুযায়ী প্রাচীন সমাজ কন্যার জন্মে হতাশ হত। মনুসংহিতা-য় বলা হয়েছে, পুৎ নামক নরক থেকে উদ্ধার করে বলে ‘পুত্ৰ’ বলা হয়; শাস্ত্রকারেরা কল্পনাশক্তি দিয়ে এমন একটি নরক সৃষ্টি করার প্রয়োজন মনে করেননি, যেখােন থেকে কন্যা তার পিতামাতাকে রক্ষা করতে পারে। পিতার মুখাগ্নি করার মৌলিক অধিকার পুত্রেরই আছে, মৃত পিতাকে পিণ্ডদান ও পিতামাতার শ্রাদ্ধেরও অধিকার আছে। কারণ সমাজে বাল্যবিবাহের অনুপ্রবেশ ঘটার পর বিবাহের সময়ে বালিকা কন্যার গোত্রাস্তার হত, তাই ভিন্ন গোত্রের পিতামাতার জন্য তার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করার অধিকার ছিল না। কিন্তু পিতামাতার সঙ্গে একই গোত্র হওয়ায় পুত্রের সেই অধিকার ছিল। পিতা যেহেতু পরলোকে তার মঙ্গলের জন্য শ্ৰাদ্ধানুষ্ঠান করার বিষয়ে পুত্রের উপর নির্ভরশীল ছিল, পুত্রের সামাজিক মূল্য কন্যার চেয়ে বেশি, কন্যা সেই অনুপাতে উপেক্ষিত।

তৈত্তিরীয় সংহিতায় আমরা দেখি, সোমযাগের একটি বিশিষ্ট অনুষ্ঠানে কতগুলি যন্ত্রীয় পাত্ৰ মাটিতে রাখা হত, কতগুলি আবার উপরে রাখা হত। ‘সেইজন্য শিশুকন্যাদের জন্মের পর মাটিতে রাখা হয়, শিশুপুত্রদের তুলে ধরা হয়।’ (৬:৫:১০:৩)। রোমে শিশুকে জন্মের পর মাটিতে রাখা হত এবং পিতাকে ডাকা হত,। পিতা যদি শিশুকে দেখে বেঁচে থাকার যোগ্য মনে করত, সে তাকে মাটি থেকে তুলে নিত। এখান থেকেই আমরা ইংরেজি ‘rearing up the child’ বাক্যাংশটি পেয়েছি। কিন্তু লক্ষণীয় যে এই তুলে ধরায় ছেলে-মেয়ের মধ্যে কোনও পার্থক্য করা হত না। এ দেশে কন্যাসন্তান জন্ম থেকেই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক।

গর্ভাবস্থায় ‘পুংসবন’ অনুষ্ঠান করা হত, যাতে নলজাতক পুত্রসন্তানই হয়, কন্যা নয়। সমাজ নানা মন্ত্র ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একটাই আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে— সদ্যোজাত সন্তানটি যেন সব সময়ে পুত্ৰই হয়। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর আশপাশে রচিত ঐতরেয় ব্রাহ্মণ-এ বলা হয়েছে, ‘নারী অমঙ্গলজনক, কন্যা অভিশাপ।’ (৬:৩:৭:৩) মহাভারত-এও দেখি কন্যা শোকের কারণ। (১:৫৯:১)

আমরা শুনতে পাই পূর্বজন্মের পুণ্যফল পুরুষ হয়ে জন্মানো যায়। মহাভারত-এ স্পষ্টই বলা হয়েছে, পূর্বজন্মের পাপের ফলে নারী হয়ে জন্মাতে হয়। (৬:৩৩:৩২) এক নারীর আত্মত্যাগে সন্তুষ্ট হয়ে বুদ্ধ এক সময়ে তাকে আশীর্বাদ করেছিলেন, সে যেন পরজন্মে পুরুষ হয়ে জন্মায়। সোজা কথায়, এই গল্পটি সেই ধারণাই সমর্থন করে যে নারী হিসেবে জন্ম ঘৃণ্য, কিন্তু পুরুষ হয়ে জন্মানো শুভ, কারণ তা পূর্বজন্মের পুণ্যকর্মের ফল। তাই কন্যার জন্মে পরিবারের বা সমাজের সব সদস্যরা তৎক্ষণাৎ মনে করত, সে নিশ্চয়ই পূৰ্ব্বজন্মে কোনও পাপ করেছে, তাই কন্যা হয়ে জন্মেছে।

সমাজ সাধারণ ভাবে কন্যাদের শিক্ষার অধিকার দেয়নি, কারণ উপনয়ন না হলে কেউ বেদ পড়তে পারে না এবং কন্যাদের উপনয়ন হতে পারে না। কিন্তু কয়েকটি সম্মানজনক ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই ছিল; বৃহদারণ্যকোপনিষদ-এ বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি পণ্ডিতা ও দীর্ঘায়ু কন্যা কামনা করে, তার উচিত তার পত্নীকে তিল ও ঘি দিয়ে অন্ন খাওয়ানো।’ (৬:৪:১৭)

অতএব কিছু মানুষ নিশ্চয়ই শিক্ষিত কন্যা চাইত এবং কন্যাদের শিক্ষা দেওয়ার কোনও উপায় খুঁজে পেয়েছিল, এগুলি যদি ব্যতিক্রমও হয়। সারা পৃথিবীতেই কিছুদিন আগে পর্যন্ত নারীর শিক্ষার অধিকার স্বীকার করা হত না। এখানেও ঠিক তাই। মনু বলেছেন, ‘বিবাহ হল নারীর উপনয়ন, স্বামীর গৃহে জীবন কাটানো গুরুগৃহবাস এবং স্বামীসেবা বেদপাঠ।’ (মনু, সংহিতা ২:৬৭)

সাহিত্যে কন্যার শৈশবের কোনও বর্ণনা নেই। কালিদাসের কুমারসম্ভক এ দু’ একটি শ্লোকে গৌরীর শৈশবের বর্ণনা আছে, যদিও গৌরী পূর্ণ দেবী। কৃষ্ণের শৈশব সম্বন্ধে কিন্তু শুধু যে বিশাল সাহিত্য সৃষ্টি আছে তাই নয়, সঙ্গীতে, চিত্রে, মূর্তিতে, যাত্ৰাভিনয়ে তার অসংখ্য বৰ্ণনা আছে। কোনও দেবীর বা কোনও নারীর শৈশবের এ রকম বর্ণনা কিন্তু কখনও মেলে না।

পুরুষকেন্দ্ৰিক সমাজে কন্যা অবাঞ্ছিত অতিথি। রাজস্থানে জন্মের পরেই কন্যা হত্যার দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এখনও ওই রাজ্যে এমন কিছু গ্রাম আছে যেখানে কোনও কন্যাসন্তান নেই; গ্রামবাসীরা প্রতিবেশী গ্রাম থেকে স্ত্রী জোগাড় করে। এ দেশে অন্তত ২৫০০ বছর ধরে দৃঢ়মূল ধারণা আছে যে কন্যা অমঙ্গল। কন্যাপণ যখন ধীরে ধীরে অথচ সাধারণ ভাবে যৌতুকে পরিণত হল, যা আবশ্যিক এবং আকাশচুম্বী, যাতে পিতামাতা সর্বস্বান্ত হয়ে যায়, সমাজ যে তখন এই যন্ত্রণার মূল কন্যাকে দৈব নিষ্ঠুরতা হিসেবে দেখেছিল, তা আশ্চর্য নয়। তাই পণপ্ৰথা প্রচলিত হওয়ার পর এই বিশ্বাস, যা জনমানসে আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত ছিল, তা অর্থনৈতিক স্বীকৃতি পেল।

তার মানে সব কন্যাসন্তান সব সময়েই পিতামাতার কাছে অবাঞ্ছিত ছিল বা তাদের স্নেহ পেত না, তা নয়; সমাজে নিশ্চয়ই ব্যতিক্রম ছিল। অনেক পরিবার ও ব্যক্তির উদারনৈতিক মতবাদ কন্যার আগমনকে উষ্ণ ভাবে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল, কিন্তু আগে যা বলা হল তা হল সাধারণ চিত্র। পরিবারে পুত্র ও কন্যার প্রতি যত্ন ও স্নেহের তারতম্য এখনও অনেক ক্ষেত্রেই চমকে দেয়। সমাজত্যুত্ত্ববিদ ও চিকিৎসকদের গবেষণা দেখিয়েছে যে অপুষ্টির অনুপাত ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের মধ্যে অনেক বেশি। চিকিৎসার ক্ষেত্রে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের অবহেলা অনেক বেশি হয় এবং অনেক বেশি দিন ধরে হয়। যে মায়ের শুধু মেয়ে আছে, সে সঙ্কুচিত হয়ে থাকে, অপরাধবোঁধে ভোগে। সে যে উত্তরাধিকারী ও শ্রাদ্ধাদিকারী না হতে পারার অপরাধবোধ। পুত্র ও কন্যার মধ্যে সাম্যভাবের অভাবে অনেক পরিবারে মেয়েরা সঙ্কুচিত হয়ে থাকে। শাস্ত্ৰে এই দৃষ্টিভঙ্গি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যার ফলে বহু শতাব্দী ধরে তাকে কোথাও জন্মের পরেই হত্যা করা হয়েছে, কোথাও অবহেলা করা হয়েছে এবং সারা দেশেই পরিবারে ও সমাজে নীচু চোখে দেখা হয়েছে। সে অস্বাস্থ্যে ভোগে, রোগের সময়ে অবহেলিত হয় এবং অবহেলা ও অপুষ্টির কারণে তার ক্ষেত্রে মৃত্যুর আনুপাতিক হার অনেক বেশি।

আধুনিক যুগে এর আর একটি প্রকাশ হল, গর্ভাবস্থায় ভ্রমণের লিঙ্গ নির্ধারণের জন্য পিতামাতার অশোভন, উগ্র আগ্রহ, যাতে চিকিৎসকেরা সহায়তা করেন। এগুলি একত্র হয়ে দিবালোক দেখতে পাওয়ার পূর্বেই কন্যাসন্তানকে হত্যা করে। আজকেও কী আমরা শুধু কথায় নয়, কাজেও স্বীকার করতে পারি না, যে পুত্র এবং কন্যার দুজনকেই সমান স্থান দেওয়া পিতামাতা ও সমাজের আবশ্যিক মানবিক কর্তব্য? এর ব্যতিক্রমকে মহাপাপ বলে গণ্য করার সময় হয়েছে? এবং সেই ব্যতিক্রমকে আইনত দণ্ডনীয় করতে এখন আইন তৈরি করা উচিত। জন্মসূত্রে যে অধিকার এবং পারিবারিক ও সামাজিক অভ্যর্থনা কন্যাসন্তানের প্রাপ্য যা এতদিন তাকে অস্বীকার করা হয়েছে, তাই এখন তাকে দেওয়া উচিত? তা না হলে মানবিক মূল্যবোধের অবমূল্যায়ন ঘটবে; তা না হলে আমাদের সব শিক্ষণ লজ্জা পাবে এবং কুটিল বলে গণ্য হবে।

মহাভারত-এ ভার্গব-প্ৰক্ষেপণের সামাজিক কারণ

পণ্ডিতদের মতে মহাভারতমহাকাব্যের সূচনা এবং চূড়ান্ত রূপায়ণ এই দুই পর্বের মধ্যে প্রায় আট শতাব্দী সময় কেটে গেছে–মূল বীর গাথা যা এই মহাকাব্যের বীজ এবং তার পরে প্রক্ষিপ্তভাবে এবং কখনও বা ধীরে ধীরে, এই কাব্যের সৃষ্টি নিরন্তর ভাবে এই দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছিল। এই আট শতাব্দী ধরে উত্তর ভারতে অন্যান্য সাহিত্যও রচিত হয়েছিলএর মধ্যে ছিল মহাবস্তু ও ললিত বিস্তার, কিছু কিছু জৈন গ্ৰন্থ, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতি, পতঞ্জলির মহাভাষ্য, বাৎস্যায়নের কামসূত্র, রামায়ণ ও মনুসংহিতা। এই সময়ের অপেক্ষাকৃত পরবর্তী স্তরে অর্থাৎ খ্রিস্টিয় যুগের প্রারম্ভিক শতাব্দীগুলিতে যে সমস্ত গ্রন্থ রচিত হয়েছে সেগুলিতে দেখা যায় বহু উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত অথচ সুসংহত সামাজিক ধ্যান ধারণা মিলে গেছে।

মধ্যপ্রদেশের খোহা গ্রামে একটি লেখে (৫৩৬ খ্রি.) বলা হয়েছে মহাভারত-এর শ্লোক সংখ্যা শতসহস্ৰ (১ লক্ষ)(১); বর্তমানে প্রাপ্ত পুনা সংস্করণে দেখা যায়। এই সংখ্যা মোটামুটি ৮২,০০০। মহাকাব্যের মধ্যেই বলা হয়েছে এর শ্লোক সংখ্যা ২৪,০০০। কেমন করে এই ২৪,০০০ শ্লোকের বীজকাব্য পল্লবায়িত হল ৮২,০০০-এ সে কথাও কাব্যের মধ্যেই বলা হয়েছে।(২) এই কাব্যের মুখবন্ধছিল তিনটি; মনুর উপাখ্যান, আস্তিকের উপাখ্যান আর উপরিচর উপাখ্যান।(৩) অর্থাৎ মহাকাব্যটি রচিত হয়েছিল তিনটি পর্যায়ে, এর তিনটি পৃথক পৃথক নামও ছিল, সম্ভবত রচনার বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই জয়, ভারত এবং মহাভারত।(৪) এই মহাকাব্যে বলা হয়েছে এই গ্ৰন্থ রচনার পরে ব্যাসদেব তা পাঠ করেন। তাঁর পুত্ৰ শুকদেবের কাছে, এবং তারপরে তাঁর অন্যান্য শিষ্যদের কাছে।(৫) শুকদেব এটি আবৃত্তি করেন জন্মেজয়ের সর্পযজ্ঞে এবং সম্ভবত সেই সময়ই চিরন্তন মূল্যবোধের নীতিমূলক আখ্যানগুলি যুক্ত হয়। কিন্তু এই প্ৰক্ষেপণ খুব বৃহৎ অংশের নয় এবং এই বীরগাথাত্মক কাব্যের মূল সুরের সঙ্গে প্রক্ষিপ্ত অংশের ভাবনা ও সৌন্দর্যবোধ মিলে যায়। অনেক পরে, শৌনকের দ্বাদশ বর্ষব্যাপী সোম যজ্ঞে, রাজা সূত লোমহর্ষণের পুত্ৰ উগ্ৰশ্রবসকে মহাকাব্যটি আবৃত্তি করতে অনুরোধ করেন। কিন্তু তাঁর প্রথম অনুরোধ ছিল ভার্গব বংশের একটি ঐতিহাসিক, প্রথম বিবরণের জন্য।(৬) এই ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর ফলে আলোচ্য অংশের রচয়িত ভৃগুবংশের গুণকীর্তন করার সুযোগ পেয়ে যান, ভার্গবদের কীর্তিকে মহত্তর রূপে প্রচার করা হয় এবং প্রক্ষিপ্ত অংশের অতিরিক্ত প্রামাণ্যতা সৃষ্টির সুযোগ পাওয়া যায়। যখন এই ভার্গবদের বিবরণ শেষ হল, তখন শৌনক ব্যাসরচিত জয় সংহিতা শোনার ইচ্ছা করলেন।(৭)

চারণ লোমহর্ষণ ও তাঁর পুত্ৰ উগ্ৰশ্ৰবস, এই সূত পরিবার একত্রে প্রক্ষিপ্ত অংশের এক বৃহৎ ভাগের অধ্যায়গুলি রচনা করেন। এই প্ৰক্ষেপণ, বর্তমান মহাকাব্যটির আকারের দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি; একেই বলা হচ্ছে ভার্গব বা ব্ৰাহ্মণ্য সংযোজন। রচনাশৈলির বিচারে এই অংশটি অপেক্ষাকৃত দুর্বল, অতি-অলকৃত, শব্দভারাক্রান্ত এবং পুনরুক্তি দুষ্ট।(৮) আদি, বন, দ্রোণ, শল্য, শান্তি এবং অনুশাসন পর্বগুলির অধিকাংশ এই প্রক্ষিপ্ত অংশেরই অন্তৰ্গত; এবং আশ্বমেধিক, আশ্রমবাসিক, মৌষল, মহাপ্রস্থান এবং স্বৰ্গারোহণ সম্ভবত সম্পূর্ণভাবেই প্ৰক্ষেপণের অন্তর্ভুক্ত। এখানে আকর্ষণীয় তথ্য এই যে, এই ভার্গববংশেরই কৃষ্ণের জন্ম, যারা তাকে মহিমান্বিত করে উপস্থিত করবেন। ভৃগুর পুত্র কবি, তারই সন্তান শুক্রাচার্য, যার কন্যা দেবযানী হয়েছিলেন যদুর জননী; এই বংশধারাতেই কৃষ্ণের জন্ম। সুতরাং এটাই স্বাভাবিক যে চূড়ান্ত ভাবে ভাৰ্গবেরা কৃষ্ণের গুণগান করে যাবেন যতক্ষণ না তিনি প্রকৃত অর্থে একজন দেবতা হয়ে উঠেছেন।

মনুসংহিতা-ও সেই একই যুগের সৃষ্টি যখন এইসব সংযোজন ঘটেছিল; এই গ্ৰন্থ ভার্গব বংশেরই এক শিষ্যের রচিত।(৯) মহাভারত কোনও ধর্মসূত্র বা স্মৃতি গ্রন্থের উল্লেখ করে না; যে সময়ে মহাভারত রচিত হয়েছিল তাতে প্রাচীন সূত্রসমূহের প্রকৃত উৎস বিস্মৃতিতে ঢেকে গিয়েছিল, যদিও শাস্ত্রের কোনও বস্তুগত পরিবর্তন ঘটেনি।(১০) এই ভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, ভৃগুবংশের তরুণ ব্যক্তিরা ও শিষ্যেরা, খ্রিস্টিয় যুগের প্রারম্ভিক শতাব্দীগুলিতে দুটি অত্যন্ত প্রভাবসম্পন্ন গ্রন্থ রচনা করেন; অর্থাৎ মনুসংহিতা এবং মহাভারত-এর ভার্গব সংযোজন এই সময়ে ঘটেছিল।

আধুনিক পণ্ডিত এম আর ইয়াদি, মহাকাব্যের রচনার পর্যয়গুলির বিষয়ে সুকথঙ্করের মতামত মেনে নিয়েছেন।(১১) কিন্তু তার মতে আরও দুজন লেখক এই রচনার সঙ্গে জড়িত, যাঁরা হরিবংশ এবং আলোচ্য মহাকাব্যের পর্বসংগ্ৰহ পার্বণ রচনা করেন। হরিবংশ অনেক পরবর্তী রচনা, আর পার্বণ। অধ্যায়টি মহাকাব্যের উপর তার প্রভাবের বিচারে অকিঞ্চিৎকর। ভার্গব অধ্যায়েই আলোচ্য দুটি পর্বের সূত্রপাত যথাযথ ভাবে আন্দাজ করা যায়। এই সংযোজিত অংশেই যে যুদ্ধ কাহিনি প্রকৃতপক্ষে যুদ্ধের ঘটনার সময়ে তৎকালীন শাসকবংশে কৌরবদের অনুকূলে রচিত হচ্ছিল, সেই কাহিনিকে বিজয়ী পাণ্ডবদের অনুকূলে পরিবর্তিত করা হয়। সূত লোমহর্ষণ ও সৌতি উগ্ৰশ্ৰবসের এই রচনাই আমাদের আলোচ্য বিষয়। কেন তাঁরা এই অংশগুলি রচনা করলেন? ভার্গব অংশগুলির সঙ্গে সহঘটিত ভাবে যুক্ত আর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হল সংস্কৃত ভাষার ক্রমবর্ধমান ব্যবহার। প্রাকৃতের ক্রমশ সমৃদ্ধি হচ্ছিল। কিন্তু বিদেশি অভিযানকারীরা সংস্কৃতকেই প্রাধান্য দিতেন। খ্রিস্টিয় দ্বিতীয় শতকের প্রথম ‘যূপ’ শিলালেখে কণিষ্ক সংস্কৃত ব্যবহার করেছেন, রুদ্ৰদমন ও তাঁর বিখ্যাত শিলালিপিতে (১৫০ খ্রি.) সংস্কৃতই ব্যবহার করেছেন। এই ভাবে বিদেশি শাসক গোষ্ঠীগুলি সংস্কৃতের মাধ্যমে ভাষাগত ঐক্য খুঁজেছেন এবং পুরোহিততন্ত্রের এতে সাগ্রহ সম্মতি ছিল, কারণ প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা থেকে দূরবর্তী এবং সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য না থাকার ফলে এটি পুরোহিত শ্রেণির হাতে একটি শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে উঠেছিল।

যেহেতু মহাভারত তার কাব্যগত উৎকর্ষের জন্য ইতিমধ্যেই বিপুল ভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, ভার্গবদের পক্ষে নিজেদের মতামত বিজ্ঞাপিত করার জন্য এটিই ছিল শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। তাদের রচনার প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলেই এই সংযোজনের কারণ বোঝা যায়।

ধর্মের ক্ষেত্রে এই ভার্গব গোষ্ঠী সর্বপ্রথম সম্প্রদায়গাত ধর্মের জন্য এক প্রকার দেবতাতত্ত্ব ও একটি ধর্মশাস্ত্রের সৃষ্টি করলেন–মুখ্যত শিব এবং কৃষ্ণ এই দুই দেবতাকে ঘিরে। ঋগ্বেদ-এ রুদ্র ছিলেন সম্পূর্ণ ভাবে এক গৌণ দেবতা। ব্রাহ্মণ-সাহিত্যে তিনি অবশ্য রুদ্র-শিব রূপে অপেক্ষাকৃত গুরুত্ব পেয়েছেন। কিন্তু মহাকাব্যের আলোচ্য অংশে তিনি প্রকৃতই গুরুত্বপূর্ণ, ভীতিকর, একজন প্রধান দেবতা হয়ে উঠেছেন, গ্রিক পর্যটকরা ‘সিবই’ নামে জনগোষ্ঠীর উল্লেখ করেছেন। সম্ভবত তাঁরাই শৈব সম্প্রদায়। ভার্গব প্ৰক্ষেপণগুলিতেই প্রথম শিবের উপর মানবত্ব আরোপিত হতে দেখা যায়। এখানে শিবের ভাবমূর্তি ধীরে ধীরে, অত্যন্ত অধ্যবসায়ের সঙ্গে একজন প্রধান দেবতারূপে গড়ে তোলা হয়েছে। দ্ৰোণপর্বে আমরা প্রথম শিবের মধ্যে প্রলয়কতাঁর রূপ দেখি; সৌপ্তিক পর্বেও তাঁর ভূমিকা ওই একই রকম। দ্ৰোণপৰ্ব এবং অন্যত্র কৃষ্ণ তাঁর গুণগান করেছেন।(১২) ব্যাস ও পরমেশ্বর শিবের স্তুতি করেছেন।(১৩) অন্যান্য দেবতারাও ত্রিপুর ধ্বংসের পূর্বে তাঁর বন্দনা করেছেন।(১৪) অশ্বথামা(১৫) এবং উপমন্যু(১৬) তাকে দেবাদিদেবরূপে, সৃষ্টি-স্থিতি ও সংহারের দেবতারূপে স্তুতি করেছেন। এই সব চিন্তার কোনও কোনও ধারণা ইতিপূর্বেই বৈশম্পায়ন রচিত মহাকাব্যের ‘ভারত’ পর্যায়েই দেখা গিয়েছিল। এই সময়েই পাশুপত ও লকুলীশ এই সম্প্রদায় দুটির বীজাকারে সূচনা হয়। বনপর্বে আমরা গাণপত্য সম্প্রদায়ের ধর্মগত আচার অনুষ্ঠানের সূচনা দেখতে পাই।

ভার্গব পর্যায়ের অপর প্রধান দেবতা হলেন কৃষ্ণ; তাঁর দেবত্ব আরোপ করেছেন সূত এবং সৌতি। বাসুদেব এবং নারায়ণীয় সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব ইতিপূর্বেই ছিল; এখন যা ঘটল তা হল: প্রথমত বিষ্ণু এবং নারায়ণ উভয়ের সমন্বয় ঘটেছিল কৃষ্ণের মধ্যে এবং এদের সম্মিলিত ভাবরূপ হয়ে উঠেছিলেন পরমেশ্বর। ক্ষত্ৰিয় কাব্য জয়সংহিতা-তে পাণ্ডবের সখা রূপে, মথুরার রাজা রূপে কৃষ্ণের যে চরিত্র সেখানে কোথাও কৃষ্ণ দেবতা নন। পরবর্তীকালে, তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাসুদেব সম্প্রদায়ের ধমৰ্মতত্ত্বের কেন্দ্ৰবিন্দু।(১৭) বৈশম্পায়ন কৃত বিবরণে তিনি কেবলমাত্র বৃষ্ণিদের কাছেই একজন দেবতা রূপে স্বীকৃত। এই অংশের মানব কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরের পদস্পর্শ করেন, যেমন ভাবে কনিষ্ঠেরা জ্যেষ্ঠকে প্ৰণাম করেন, সাধারণ মানুষ কোনও ধাৰ্মিক সাধু চরিত্রের ব্যক্তিকে প্ৰণাম করে। পরবর্তীকালে ভার্গব-সংযোজন অংশে, যুধিষ্ঠির কৃষ্ণের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেন, যেমন আচরণ করেন কোনও শিষ্য তার গুরুর প্রতি। ভূরিশ্রবস, কৃষ্ণের কোনও দেবমহিমা উপলব্ধি করে না, তাই অৰ্জ্জুনকে তিরস্কার করে বলে–‘বৃষ্ণিরা অ-সভ্য, পাপপুণ্যের ভেদজ্ঞান রহিত দুষ্ট; এই গোষ্ঠীর কোনও লোককে তুমি কি করে সম্মান কর?’(১৮) এই মানব কৃষ্ণ উমার কাছে বর প্রার্থনা করেন এবং উমা বলেন ‘কেমন করে তুমি, একজন সাধারণ মানুষ, সত্যের পথ জানবো?’(১৯)

৪০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে আগাথোর্কেস-এর মুদ্রায় কৃষ্ণের প্রতিমূর্তি প্রথম পাওয়া যায়। একজন বিদেশি শাসকের মুদ্রায় এটিই একমাত্র প্রতিমূর্তি। পরবর্তী সময়ে হেলিওডোরাস নিজেকে বলেছেন একজন ভাগবত, বাসুদেবভক্ত। বিষ্ণু নারায়ণের পরে, পঞ্চ বৃষ্ণি-বীরের বৃহ থেকে বাসুদেবই নিজস্ব, পৃথক সত্তা রূপে পরিগণিত হন এবং ধীরে ধীরে একজন মুখ্য দেবতার স্থান গ্ৰহণ করেন। ভার্গব গোষ্ঠী তার নিঃসংশয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে নিজেদের লক্ষ্য স্থির করেছিল। সভাপর্বে শিশুপালের প্ররোচনামূলক ঔদ্ধত্যের প্রত্যুত্তর স্বরূপ এই অঘোষিত লক্ষ্যের প্রথম বহিঃপ্রকাশ। এর পরে, বনপর্বে মার্কণ্ডেয় দেখেন শিশুর উদরে মহাজাগতিক সমুদ্রে ভাসমান মহাব্ৰহ্মাণ্ড।(২০) দ্ৰোণ পর্বে এবং অন্যত্র এরই বর্ধিত এবং অতিরঞ্জিত বিবরণ দেখা যায়। বনপর্বে আমরা কৃষ্ণবন্দনা দেখতে পাই। এগুলি উদাহরণযুক্ত আখ্যানের অন্তর্নিহিত। এমনকী বনপর্বে কন্ধি অবতারেরও উদ্ভব হয়েছে। শিব এবং কৃষ্ণকে ঘিরে এই যে নূতন সম্প্রদায়গত ধর্ম গড়ে উঠল তার কিছু কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছিল। এই প্রথম একজন দেবতা অধ্যাত্মজীবনে একজন পরিত্রাতার ভূমিকায় দেখা দিলেন। এ বিষয়ে প্রথম ছিলেন ঐতিহাসিক চরিত্র বুদ্ধ, তার মহিমা গান করা হয়েছে ললিত বিস্তার, মহাবস্তু, অবদানশতক এবং বৌদ্ধ সাহিত্যের অন্যত্র। বৈদিক দেবতারা ব্যক্তিগত পরিত্রাতা ছিলেন না; তারা শুধুমাত্র পার্থিব প্রাপ্তির বিষয়ে আশীৰ্বাদ দিয়েছেন এবং ঋগ্বেদ সংহিতা-র অর্বাচীন অংশগুলিতে স্বৰ্গসুখের বিষয়ে কিছু অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতিও দেখা যায়। জীবন এতই আনন্দময় ছিল যে মানুষের লক্ষ্য ছিল যত দীর্ঘ সময়ের জন্য সম্ভব, জীবনকে প্রাণভরে উপভোগ করা। তাই বৈদিক ঋষিরা প্রার্থনা করেছেন দীর্ঘ জীবন, প্রাচুর্য, সমৃদ্ধি অর্থাৎ সর্বপ্রকার বৈচিত্র্যসহ পার্থিব সুখ’। পরবর্তী ব্রাহ্মণ সাহিত্য এবং প্রাথমিক যুগের উপনিষদগুলিতে, জীবনকে মূলত দুঃ খদায়ী বলে চিত্রায়ন শুরু হল কারণ এই সময় থেকেই জন্ম-মৃত্যুর পুনরাবর্তনের ভাবনা রূপ নিয়েছে। সুতরাং এই সময়েই জীবনের উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় এই অস্তিত্বচক্রের শৃঙ্খল থেকে মুক্তিলাভ করা। এখন লক্ষ্য ছিল মোক্ষলাভ এবং এই সব নুতন দেবতারা মুক্তির বরদান করতেন। এই প্রথমবারের জন্য আরাধ্য দেবতা আর তাঁর ভক্তের মধ্যে সম্পূর্ণ বিশ্বাস আর আত্মসমর্পণের দ্বারা একটি ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল–তা হল ভক্তি। এখন থেকে এই ভক্তিই মোক্ষলাভের একমাত্র সত্য পথ বলে স্বীকৃত হল। মৌর্য এবং গুপ্ত যুগের মধ্যবর্তী সময়ে সম্রাটের অনুগ্রহ লাভ করার একমাত্র উপায় ছিল তার কর্তৃত্বের কাছে ভক্তির মাধ্যমে নিঃশর্ত আত্মসমৰ্পণ; এই যুগের ধর্মমতেও এই মনোভাবই অন্তত আংশিক প্রতিফলিত হয়েছে। ভক্তির সঙ্গে সম্পর্ক ধরেই এল পূজা, বিগ্রহ, মন্দির এবং নুতন ধরনের অর্ঘ্য-উপহার। ভগবদগীতা-য় কৃষ্ণ বলেছেন ‘পত্র, পুষ্প, ফল, জল যা কিছু ভক্তির সঙ্গে আত্মসংযমী ভক্ত আমাকে উৎসর্গ করেন তা-ই আমি গ্ৰহণ করি।’(২১)

এই অংশেই প্রথম মূর্তি পূজা দেখা গেল। কৃষ্ণ বলেন, ‘আমার একনিষ্ঠ ভক্ত যে রূপে আমায় পূজা করতে চায় আমি সেই রূপই গ্রহণে স্বীকৃত হই।’(২২) এখনই সর্বপ্রথম আমরা উপবাসের উপকারিতা এবং ব্ৰতরক্ষার পুণ্যফল সম্পর্কে অবহিত হই।(২৩) এই সব তত্ত্বও পুরাণে বিস্তৃত আলোচিত হয়েছে, কিন্তু মহাকাব্যের এই সব আলোচ্য অংশেই এগুলি প্রথম উদ্ভাবিত হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, ব্ৰতপালন না করে, তীর্থদর্শন না করে কেউ স্বৰ্গলাভ করতে পারে না।(২৪) বনপর্বেতীর্থসমূহের একটি বিশদ বিবরণী আছে।(২৫) নদী ও সমুদ্রতীরবর্তী আশ্রয়স্থল, পর্বত এবং অন্যান্য সুন্দর সুন্দর প্রাকৃতিক আকর্ষণীয় স্থান এবং বাণিজ্য কেন্দ্রগুলিও তীৰ্থস্থানে পরিণত হয়েছিল। এই প্রক্ষিপ্ত অংশগুলিতে বিষ্ণুর অবতার সমূহের উল্লেখ করা হয়েছে মেন নৃসিংহ, বামন, পরশুরাম, বলরাম এবং কল্কিন।(২৬)

স্বৰ্গনরকের বিচার উদ্ভূত হল এই প্রথম। বিত্তবান সমাজের প্রত্যক্ষগোচর উচ্চমানের জীবনযাত্রার এক কল্পিত প্ৰতিফলনেই স্বগের রূপকল্পনা করা হয়েছিল এবং ক্ষমতাশালীর হাতে দুর্বলের নিপীড়নের প্রতিচ্ছবি ছিল নরকের রূপকল্পনাতে। এই ভার্গব অংশে আমরা দুর্লক্ষণ, অমঙ্গলের পূর্বাভাস, প্রভৃতির বিবরণ পাই।(২৭) অর্বাচীন ব্ৰাহ্মণ সাহিত্যে ইতিপূর্বেই পুরোহিতদের যজ্ঞ-দক্ষিণার কথা সুস্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল, এখন দেখা দিলেন এক নূতন শ্রেণির পুরোহিত যাঁরা পূজা পরিচালনা করতেন, ব্ৰতপূর্ণ করার পারণ কর্যে সাহায্য করতেন এবং তীর্থস্থানে সঠিক ভাবে পূজা দেওয়ার কাজে তীর্থযাত্রীদের সাহায্য করতেন। এই সব পারিবারিক ও মন্দিরের পূজারীরা বর্তমানে বর্ধিত দক্ষিণা চাইতে লাগলেন এবং পেতে শুরু করলেন।

এই সব কিছুরই কারণ যে সব দার্শনিক তত্ত্ব সেগুলি ইতোমধ্যেই উপনিষদসমূহে প্রচারিত হয়েছিল, এর মধ্যে কর্ম ও জন্মান্তরিবাদের তত্ত্বগুলিই প্রধান। এখন যে নুতন তত্ত্বের উদ্ভব হল তা হল ভাগ্য বা নিয়তিবাদ।(২৮) যুক্তির বিচারে, নিয়তিবাদ আর কর্মফল্যবাদ একে অন্যের সঙ্গে মেলে না, কিন্তু ভার্গব অংশে উভয় তত্ত্বের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান দেখা যায়। গৌতমীপুত্রের অকালমৃত্যুর উপাখ্যান দিয়ে অনুশাসন পর্ব শুরু হয়–কাল, মৃত্যু এবং কর্ম পরস্পরকে দোষারোপ করতে থাকে, যতক্ষণ না সিদ্ধান্ত হয় যে মৃত বালক তার মৃত্যুর জন্য নিজেই প্রকৃত দোষী। সমস্যা ছিল এই যে গৌতমী বা তার পুত্র কেউ জানত না যে মৃত্যু কেন ঘটেছে; তাদের কাছে এই মৃত্যু ছিল ভাগ্য, অ-দৃষ্ট। কর্মফলবাদের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করার জন্য অজস্র উপাখ্যান নির্মাণ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও কর্ম আর পুরুষকারের মধ্যে কে বেশি শক্তিশালী তাই নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, কিন্তু কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। দৈব অনুগ্রহ, অকারণ আনুকূল্যের বিপরীতে কেলভিনের পূর্ব নির্ধারণের তত্ত্বের মতোই এখানেও একটি তত্ত্ব দেখা যায়। এই সব তত্ত্বের অন্তর্নিহিত বিরোধ বোঝা যায় একটি প্রশ্ন থেকে: তথাকথিত বিদেশী আত্মার পরিণতি কী হয়? মুক্তি? স্বৰ্গ? নরক? প্রেতাবস্থা? পুবর্জন্ম? মানুষ রূপে না পশুরূপে? প্রথমে কোনটি? কত দিনের জন্য? মৃত্যুর পরে কর্মের আপেক্ষিক ফলাফল সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা করার জন্য কোথাও একটি নির্দিষ্ট বিধি নেই।

বিভিন্ন কর্মের জন্য আমরা একই প্রকার ফলের বিভিন্ন উদাহরণ এবং একই কর্মের বিভিন্ন ফলের উদাহরণ দেখতে পাই; চিত্ৰগুপ্ত একজন সাধারণ হিসাবরক্ষক, তার উপরে কোনও সচিব নেই। এই শেষতম প্রক্ষিপ্ত অংশে হঠাৎ অলৌকিক ভাবনার অত্যাধিক্য দেখা যায়। মূল জয়সংহিতা প্রকৃতপক্ষে ছিল মানব বীরদের কাহিনি; সেখানে দেবতাদের মুখ্য স্থান ছিল না। চাডউইক বলেন, ‘বীরগাথাতে যে লৌকিক কাহিনি অপেক্ষা অলৌকিকের প্রাধান্য অনেক কম, তার কারণ নিঃসন্দেহে এই যে, ওই সময়ের রাজসভাগুলি জনসাধারণের অবশিষ্ট অংশ অপেক্ষা এক অনেক উন্নত স্তরের সংস্কৃতির অধিকারী ছিল।’(২৯) অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন পুরোহিত শ্রেণির লেখকরাই ভার্গবদের সংযোজিত অংশে অলৌকিক ঘটনার বাহুল্য বিস্তার করেন।

ঘটনাপ্রবাহকে আরও জটিল করে তুলতে, এই সময়ই প্রথম দেখা যায় রাশি রাশি অভিশাপ আর আশীর্বাদের ঘটনা। তপস্যার অন্তর্বতী অবসরে কোপনস্বভাব মুনিঋষিরা মানুষকে অভিশাপ দেন। আবার সেবা প্ৰাপ্তিতে প্ৰসন্ন হয়ে তারা বরদান করেন–কিন্তু কাৰ্য আর অভিশাপ/আশীর্বাদের কোনও নৈমিত্তিক যোগসূত্র নেই। অতএব বিভ্রান্ত মানুষের কাছে অভিশাপ বা আশীর্বাদ দৈবলীলার রূপ নেয়। পুনর্জন্ম, কর্ম এবং ভাগ্যের তত্ত্বসমূহ একই উদ্দেশ্য সাধন করে, অতীত এবং ভবিষ্যৎকে অজ্ঞাত এবং অ-জ্ঞেয় তত্ত্বসমূহ একই উদ্দেশ্য সাধন করে, অতীত এবং ভবিষ্যৎকে অজ্ঞাত এবং অ-জ্ঞেয় বলে প্রচার করে; ফলস্বরূপ, বর্তমান হয়ে পড়ে বোধের অতীত। এই সব কিছুই অবধারিত ভাবে সাধারণ মানুষের জীবনের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা তুলে দেয় এক বিশেষ শ্রেণির হাতে, যারা জীবনের রহস্যময়তার গভীরে প্রবেশ করার ভান করে থাকে। এক শ্রেণি-বিভক্ত সমাজে এই সুবিধাভোগী শ্রেণির প্রাথমিক স্বার্থ হল জনসাধারণের কাছে অটল বিশ্বাস এবং প্রশ্নহীন আনুগত্য প্রাপ্তি, ভাষান্তরে যাকে বলা যায় শোচনীয় বশ্যতা। যার ফলে ইহজন্মে দুঃখ প্রাপ্তি। পূৰ্ব্বজন্মের সেই অজ্ঞাত পাপকে ব্যাখ্যা করার নামে এবং উন্নততর অবস্থায় পুনর্জন্ম নিশ্চিত করার নামে এই শ্রেণি সাধারণ মানুষের কাছে আনুগত্য ও সেবা দাবি করে, পেয়েও থাকে। এই তথ্যের উদাহরণে ভার্গব সংযোজিত অংশ ভারাক্রান্ত।

এখানে আমরা দেখি রাজা এক নূতন মহিমায় মণ্ডিত। ইহ-পরলোকে তাকে ধর্মত এবং বাস্তবত ‘গুরুর আসন দেওয়া হয়েছে। রাজাকে যে অবহেলা বা অপমান করে তার দান, যজ্ঞ এবং শ্রাদ্ধের পুণ্য বিনষ্ট হয়।(৩০) ন্যায়নিষ্ঠ রাজা একজন চিরন্তন দেবতা, এমনকী দেবতারাও তাকে সম্মান করেন।(৩১) সমৃদ্ধি চায় যে মানুষ তারা প্রথমেই রাজা নির্বাচন করে।(৩২) যেমন করে শিষ্যরা গুরুকে প্ৰণাম করে তেমনই মানুষদের উচিত রাজাকে প্ৰণাম করা। যেমন দেবতারা ইন্দ্ৰকে স্তুতি করেন তেমনিই প্রজাদের উচিত রাজাকে স্তুতি করা।(৩৩) একজন রাজাকে কখনও মানুষ ভাবা এবং অবহেলা করা উচিত নয়। নররূপে তিনি এক মহতী দেবতা।(৩৪)

খ্রিস্ট পূর্ব যুগের শেষ শতকগুলিতে যে সব অভিযানকারী গোষ্ঠীগুলি উত্তর ভারতে এসেছিল, তারা সকলেই নিজ নিজ রাজাকে অতিমানব মনে করত। ব্যাকট্রিয়ার গ্রিক, রোমান, হ্রণ রাজ্যের অধিবাসীরা; সিথিয়ান, কুয়াণ, য়ুয়ে চিহ, পাসীয় সকলেই নিজেদের রাজাকে অতিমানবীয় মর্যাদা দিয়েছে। এই বিশ্বাসের কথা তাদের মুদ্রা ও শিলালিপি থেকে জানা যায়, তাদের রাজাকে প্রায়ই বলা হয়েছে দেবপুত্র, তাদের মাথা ঘিরে এক জ্যোর্তিবলয় দেখা যায়। ভারতবর্ষেও এই সব প্রভাব পড়েছিল এবং গুপ্ত সাম্রাজ্যের শেষ পর্যন্ত এখানে শক্তিমান রাজাদের পরম্পরা দেখা যায়। সুতরাং রাজশক্তিকে মনে করা হত দৈব শক্তিরই রূপান্তর। ভার্গব সংযোজন সোৎসাহে এই ধারণাকে শক্তিশালী করেছিল। সমুদ্রগুপ্তের সময় হরিষেরের লিপিতে আমরা জানতে পারি যে রাজা শক্তিশালী, কারণ, তিনি বন্দি করতে পারেন, মুক্ত করতে পারেন এবং অনুগ্রহ করতে পারেন; তিনি এই তিন কর্যের সমন্বয় সাধক।(৩৫) সুতরাং রাজকীয় কর্তৃত্ব ছিল বন্ধন, মোচন এবং অনুগ্রহ প্রদানের নিরঙ্কুশ ক্ষমতার উপর নির্ভরশীল; খ্রিস্টিয় দ্বিতীয় শতকের প্রথমে নাসিক শিলালেখে আমরা চতুৰ্বর্ণের ধারক রাজা গৌতমী বলশ্রীর কথা শুনি; নাসিকে রাজা নহপানের জামাতা উষভদত এক ব্রাহ্মণকে তার কন্যার বিবাহের জন্য প্রচুর দান করেছিলেন, এ কথাও জানা যায়। বনঘটে সাতকণীর শিলালেখে বলা হয়েছে রাজা ব্ৰাহ্মণদের মুক্ত হস্তে দান করেন এবং তিনি বর্ণসংকর রোধ করেছেন।(৩৬) একটি গুপ্ত যুগের শিলালিপিতে বলা হয়েছে দানের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। সুতরাং রাজার কাছে এইটিই ছিল প্রত্যাশিত; তিনি ব্রাহ্মণদের প্রচুর দান করবেন এবং বর্ণ বিভাগকে অক্ষুন্ন রাখবেন যাতে বৰ্ণসংকর না ঘটে।

ভাগবি অংশের অন্যতম কেন্দ্রীয় ভাবনা হল বর্ণধর্ম। বৰ্ণাশ্রমের উচ্চতম যে ব্রাহ্মণ তিনি রাজার মতোই পূজনীয়; তার ক্ৰোধে সর্বনাশ হতে পারে। বাতাপি ও ঈম্বলের উপাখ্যান একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।(৩৭) অনুরূপ একটি উপাখ্যান হল কর্তবীর্যাজুন ও পরশুরাম,(৩৮) এগুলি প্রমাণ করে যে ব্রাহ্মণ হল পৃথিবীচারী দেবতা।(৩৯) তার ব্যবহার সাধু বা অসাধু যাই হোক না কেন ব্ৰাহ্মণকে কখনও অপমান করা চলে না।(৪০) ব্রাহ্মণ অন্য সব বর্ণের সম্পদ নিতে পারে। কিন্তু যে ব্ৰাহ্মাণের ধন অপহরণের চেষ্টা করে সে দুঃখভাগী হবে। অন্যান্য বর্ণের ক্ষেত্রে রাজদ্রোহের জন্য চরম দণ্ড পেতে হত, কিন্তু রাজদ্রোহে অপরাধী ব্ৰাহ্মাণের শাস্তি কেবল নির্বাসন।(৪১) যখন রাজা পাওয়ার জন্য উৎসুক প্রজারা বেণ-পুত্ৰ পৃথুকে অভিষেক করেছিল তখন ভবিষ্যৎ প্রজাদের জন্য তাঁর প্রথম প্রতিশ্রুতিই ছিল যে তিনি ব্রাহ্মণদের শাস্তি দেবেন না এবং অন্তর্বর্ণ বিবাহ রোধ করবেন।(৪২) ইওরোপে যেমন চার্চ ও রাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘ, তিক্ত বিরোধ চলেছিল, তেমনই এ দেশেও ব্রাহ্মণ সাহিত্যের যুগেই ক্ষত্রিয় ও ব্ৰাহ্মণের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল।(৪৩) ভার্গব অংশে আমরা দেখি ‘পৃথিবীর আধিপত্য কার? ব্রাহ্মণ না ক্ষত্ৰিয়ের?’— উত্তর, ‘পৃথিবীর সমস্ত কিছুরই অধিপতি ব্ৰাহ্মণ।’ তবে ক্ষত্ৰিয় কেন রাজা?’— উত্তর, যেমন স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা তার দেবরকে আলিঙ্গন করে, এ-ও তেমন।(৪৪) উপাখ্যানে বলা হয়েছে ব্ৰাহ্মণের ফল চুরি করায় এক ব্যক্তি বানর হয়ে পুনর্জন্ম নিয়েছিল; আর একজন ব্ৰাহ্মণকে উদার ভাবে দান না করায় শৃগাল হয়েছিল।(৪৫) এই সব গল্পের স্পষ্ট ভাবেই একটি প্রচ্ছন্ন উদ্দেশ্য ছিল। একটি উপাখ্যানে বলা হয়েছে যে, জমদগ্নি তীর নিয়ে খেলা করতে করতে সেগুলিকে ক্রমেই দূর থেকে আরও দূরে নিক্ষেপ করেছিলেন; তার পত্নী রেণুকা সেগুলি কুড়িয়ে আনছিলেন। একবার মধ্যাহ্নের খর রৌদ্রে ক্লান্ত হয়ে তিনি ফিরে আসতে দেরি করলেন; ক্রুদ্ধ জমদগ্নি সে কথা জেনে সূর্যকে অভিশাপ দিতে উদ্যত হলেন। সূর্য নীচে নেমে এসে তাকে একটি তাপ নিরোধকারী শ্বেতছত্ৰ দিলেন। অতএব ব্ৰাহ্মণকে ছত্ৰদান করলে পুণ্য লাভ হয়।’(৪৬) ব্রাহ্মণকে দানযোগ্য বস্তুর দীর্ঘ ক্লাস্তিকর তালিকা দেখা যায়। সেই সঙ্গে আছে পরলোকে এই সব দানের কত গুণ পুণ্য হবে সে তালিকাও ৷ কেবলমাত্র অনুশাসন পর্বেই পয়ত্রিশটি দীর্ঘ পরিচ্ছেদে এই বর্ণনা রয়েছে।(৪৭)

কেবল দান নয়, দক্ষিণাও প্রচলিত ছিল বৈদিক যুগ থেকেই; কিন্তু আলোচ্য ভার্গব অংশে এগুলির পরিমাণ বৃদ্ধি হয়েছিল গাণিতিক অনুপাতে; পুরাণে এই বৃদ্ধির প্রবণতা শুরু হয়। খাদ্য, বস্ত্ৰ, জীবনের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় বিবিধ দ্রব্য, নানা বিলাসদ্রব্য, সোনা, গো-ধন, রথ, ভূমি, দাস এবং নারী–এগুলি যদি প্রচুর পরিমাণে দান করা হয় তবে ইহলোক-পরলোকে বহুগুণ ফল লাভ করা যায়। কুমারী, শিশু সন্তানসহ বিবাহিতা নারী এবং সন্তানহীনা বিবাহিতা তরুণীর এদের বিশাল সংখ্যায় উল্লেখ আমাদের বোধকে আহত করে। এই সব নারীদের নিয়ে ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা কী করতেন সে আর এক প্রশ্ন। এই ভার্গব অংশেই আমরা প্রথম শুনতে পাই জন্মসূত্রে ব্রাহ্মণ— ব্ৰাহ্মণ জাতির কথা। জপতপ অধ্যয়ন ছাড়াও তাকে ব্রাহ্মণ আখ্যা দেওয়া হয়েছে।(৪৮) এবং এই ব্রাহ্মণও পূজনীয়।(৪৯)

মহাকাব্যে ক্ষত্ৰিয় হল যোদ্ধা, কিন্তু স্থল-বাণিজ্যে ক্ষত্ৰিয়েরা প্রহরী রূপে পণ্যবাহীর সঙ্গে যেতেন। সমকালীন বৌদ্ধ সাহিত্যে ক্ষত্রিয়কে সমৃদ্ধ ভূস্বামী শ্রেণিরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। বৈশ্যের জীবিকা ছিল দুটি–কৃষি ও বাণিজ্য।

বণিকেরা প্রায়ই ধনী হতেন, ব্ৰাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও ধনী বৈশ্যরা একটি বিশেষ সামাজিক শ্রেণিরূপে গণ্য হতেন। প্রাচীন জৈন শাস্ত্ৰ–অঙ্গবিজ-তে দুটি শ্রেণির কথা বলা হয়েছে। ‘অজ্জ’ এবং ‘পেসস’।(৫০) স্পষ্ট ভাবেই এটি অর্থনৈতিক বিচারে সরল শ্রেণিবিভাগ: ক্ষমতাবান, সমৃদ্ধ শ্রেণি ছিল আৰ্য বা অজ, অবশিষ্টেরা ছিল ভৃত্য, প্ৰেষ্য বা পেসস।

অর্বাচীন যুগের বৈদিক সাহিত্য থেকেই দেখা যায় শূদ্র হল ভৃত্য, প্রায়ই সে দাস’ যে অপর তিন বর্ণকে সেবা করে। মহাকাব্যের আলোচ্য অংশে বলা হয়েছে প্রজাপতি শূদ্রকে সৃষ্টি করেছেন অপর তিন বর্ণের ভৃত্যরূপে।(৫১) শূদ্রের উচিত বিগতদ্বেষ হয়ে উচ্চ তিন বর্ণের সেবা করা।(৫২) ছত্র, প্রলেপন, জুতা, পাখা এবং পরিচ্ছদ যখন জীর্ণ হয়ে ব্যবহারের অযোগ্য হবে তখন শূদ্র দাসকে দিয়ে দেবে।(৫৩) প্ৰভু স্বচ্ছন্দে তার ভূত্যের ধন ব্যবহার করতে পারে।(৫৪)

কিন্তু এমনকী এই প্রেক্ষাপটেও কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছিল। লৌহ লাঙ্গলের ব্যবহার প্রবর্তন হওয়াতে কর্ষণযোগ্য ভূমির বিস্তার হচ্ছিল। এক বৈশ্যের পক্ষে এত পরিমাণ ভূমিতে কৃষিকাজ করা সম্ভব হচ্ছিল না, সুতরাং কিছু শূদ্ৰও কৃষিকাজ করছিল, খুব সম্ভব ভাগীদার চাষি হয়ে। দ্বিতীয়ত খ্রিস্টিয় প্রথম শতাব্দী থেকেই মৌসুমী বায়ুর পূর্বজ্ঞান পাওয়া সম্ভব হয়েছিল এবং মাস ও বৎসরের গণনা পঞ্জিকাও প্রচলিত ছিল। ফলত, অতএব সামুদ্রিক বাণিজ্যও অপেক্ষাকৃত নিরাপদ হয়েছিল, এবং কিছু কিছু বৈশ্য, যাদের বিনিয়োগ করার মতো সচ্ছলতা ছিল, তারা এই পরিশ্রমসাধ্য কৃষিকাজ শূদ্রের হাতে ছেড়ে নিজেরা বাণিজ্য শুরু করে। যারা সামাজিক মর্যাদার গণ্ডির বহির্ভূত ছিল যেমন স্লেচ্ছ, চণ্ডাল, পুলকস, স্বপাক, শবর ও নিষাদ–এরা সকলেই সমৃদ্ধিশালী বৈশ্য ও শূদ্রের অধীনে কাজ করত। ভার্গব সামাজিক মূল্যবোধের অন্যতম প্রবক্তা মনু বলেন –এরা হল ‘স্বনির্ভর শূদ্র’।(৫৫) যে সব ব্রাহ্মণের শূদ্ৰযাজী বা শূদ্র প্রতিগ্রাহী ছিলেন না, সমাজে তাদের স্থান ছিল অধিকতর মর্যাদার।(৫৬) তবুও শূদ্রের অনুষ্ঠানে যাজকবৃত্তি লোভনীয়। চাতুর্যের সঙ্গে এই উভয় সংকটের সমাধান করা হয়েছিল, কারণ মনু বলেন ন্যায়াবতীর্ণ শূদ্রের জন্য ধর্মানুষ্ঠানে যাজন করা যেতে পারে। আর কে সেই ন্যায়াবতী শূদ্র? মনুর ভাষ্যকার মেধাতিথি বলেন ‘যে পঞ্চ মহাযজ্ঞের অনুষ্ঠান করে সে ন্যায়বর্তী।’(৫৭) এই ন্যায়াবর্তী শূদ্রের পরিবারে কারও মৃত্যু হলে ধর্মীয় অশৌচের কাল-সীমা এক মাস ছিল না, ছিল মাত্র পনেরো দিন। স্পষ্ট ভাবেই, আর্থিক সমৃদ্ধির বিচারে এই সব সুবিধা দেওয়া হত; এখন এই ধনীশূদ্ররা সমাজে উন্নতির সোপানে ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছিল। অবশ্য সাধারণ শূদ্র অর্থাৎ শূদ্র জনসমাজের অধিকাংশই পড়ে ছিল দরিদ্র ও অবদমিত স্তরে। তাই আমরা দেখি যারা অর্থ দিয়ে কর দিতে পারে না তারা ‘বিষ্টি’ অৰ্থাৎ বাধ্যতামূলক শ্রম দিয়ে তা শোধ করতে পারে। বৃহস্পতি ধর্মসূত্র-তে(৫৮) বলা হয়েছে। শূদ্র বণিককে সর্বোচ্চ হারে কর দিতে হবে। অতএব কোনও কোনও শূদ্র যথেচ্চ হারে এবং অর্থমূল্যে কর দেওয়ার মতো যথেষ্ট ধনী ছিল এবং তা হলেই সমাজে তারা সম্মান পেত। কিন্তু দরিদ্র শূদ্রর অবস্থান ছিল। জঞ্জাল-তুল্য।(৫৯) ব্ৰহ্মাণ্ড পুরাণ বলছে, যে রাজার অধীনে বহু শূদ্র প্রজা রয়েছে তারা রাজ্যের বহু অংশেই অ-বৈদিক ধর্মাচরণ হয়।’ ঐতরেয় ব্রাহ্মণ বলে শবর, মুর্তিব পুণ্ড এবং অন্ধ এরা হল বিশ্বামিত্রের অবাধ্য সন্তান অর্থাৎ পতিত ক্ষত্ৰিয়। এই ভাবে বিদেশি আগস্তুকদের সমাজে মিশিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং তাদের স্থান হয়েছিল মেচ্ছদের ওপরে; তারা ব্রাত্যস্তোম যজ্ঞানুষ্ঠানের মাধ্যমে যথাযথ ক্ষত্ৰিয় হতে পারত। সুতরাং ব্রাত্যস্তোমের মাধ্যমে বহুবিবাহের মাধ্যমে এবং স্বাধীন সচ্ছল বৃত্তির মাধ্যমে কোনও কোনও শূদ্র সমাজে উচ্চতর স্থান অধিকার করত।

প্রাগোর্যরা কারুশিল্প এবং বহু কুটির শিল্পে অধিকতর দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত ছিলেন; সেই জন্য তাঁরা প্ৰাচীনকাল থেকেই এই সব কারুশিল্পের ধারা নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। ধীরে ধীরে এই কায়িক শ্রমকে হীন দৃষ্টিতে দেখা শুরু হয়েছিল। ভার্গব অংশে বলা হয়েছে যে, যদি কোনও ব্ৰাহ্মণ এই সব কারুশিল্প ও বাণিজ্যে যোগ দেয়। তবে তাকে শূদ্র বলে মনে করা হবে। মনুরও একই মত।(৬১) সমাজ বিদেশি আগন্তুকদের মধ্যে অভিজাতবর্গকে ব্রাত্যক্ষত্ৰিয় আখ্যা দিয়েছিল এবং বিদেশিদের এই সম্প্রদায় রাজনৈতিক ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। অতএব, এই সমস্যার সমাধান করতে আইন-নির্ধারকরা তাদের মদদণ্ড পরিবর্তিত করেছিলেন; তারা এই সব বিদেশিদের যথাযথ ক্ষত্ৰিয়ের মর্যাদা দিলেন এবং তাঁদের রাজা ও অভিজাত বলে। সম্মান করলেন। বশিষ্ঠের কামধেনুর উপাখ্যানে, কামধেনু তার প্রভুর বিপদে বিদেশি সৈন্যদল সৃষ্টি করেছিল। এর থেকে বোঝা যায় যে ব্ৰাহ্মণের বিদেশিদের নিজেদের বন্ধু হিসাবেই গ্ৰহণ করেছিলেন।

ভার্গব অংশে বর্ণ সংমিশ্রণকে অসন্দিগ্ধ ভাষায় নিষিদ্ধি করা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে বৰ্ণসংকর বিনাশ ডেকে আনে এবং এটি কলিযুগের এক বিশিষ্ট, অব্যৰ্থ লক্ষণ। ভার্গব অংশে কলির পীড়াদায়ক অবস্থা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ভাবে আলোচিত হয়েছে। কলিযুগে শূদ্র ধর্মীয় নির্দেশ দেবে। আর ব্রাহ্মণ হবে ভৃত্য,(৬২) এবং শূদ্র ব্রাহ্মণকে সেবা করতে অস্বীকার করবে।(৬৩) কলিযুগের আর একটি স্বভাব বৈশিষ্ট্য হল যে স্ত্রী স্বামীকে মান্য করবে না।(৬৪) মার্কণ্ডেয় যুধিষ্ঠিরকে উপদেশ দেন: একজন ক্রুদ্ধ ব্রাহ্মণ এক বককে অভিশাপে দগ্ধ করে; তারপর সে এক গৃহে যায় যেখানে ব্রাহ্মণ অতিথিকে সেবা করার আগে স্ত্রী তার স্বামীকে খাবার পরিবেশন করে। ব্রাহ্মণ যখন তাকে শাপ দিতে উদ্যত হয়, তখন সে বিদ্রদিপ করে। বলে, ‘আমি কি বক’; বিস্মিত ব্ৰাহ্মণকে তার পরে বলা হয় সমস্ত পতিব্ৰতা স্ত্রীদেরই দৈব অন্তর্দৃষ্টি থাকে। মার্কণ্ডেয় বলেন পতিব্ৰতা রমণী সর্বদাই তার স্বামীর ভোজন পাত্রের অবশিষ্ট খেয়ে থাকেন।(৬৫) দ্ৰৌপদী স্ত্রীর কর্তব্য সম্পর্কে সত্যভামাকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, আমি সভয়ে আমার স্বামীদের সেবা করি, যেন তারা ক্রুদ্ধ সর্প।(৬৬) আমি কখনও আমার স্বামীদের সঙ্গে কথা কাটাকাটি করি না, কখনও তাদের ছড়িয়ে যাই না, কখনও আমার শাশুড়ির বিরোধিতা করি না।(৬৭) আমি পাণ্ডবদের সঙ্গে সঙ্গে তাদের পত্নীদেরও সেবা করি।(৬৮) এই হল সাধবী স্ত্রীর, ‘সতী’ স্ত্রীর কর্তব্য। প্রসঙ্গত, ‘সতী’ এবং ‘পতিব্ৰতা’ এই শব্দ দুটির অর্থগত দিক থেকে কোনও পুংলিঙ্গ প্রতিশব্দ নেই। সুতরাং বিবাহিত জীবনের কর্তব্য সম্পূর্ণ ভাবেই একপক্ষের।

নারীর পক্ষে দ্বিতীয়বার বিবাহ করা অপরাধ, কিন্তু পুরুষের বহুবিবাহ কোনও অন্যায় নয়।(৭০) অপ্সরা পঞ্চচুড়া নারদকে বলে–পুরুষ অপেক্ষা নারীই বেশি যৌন আনন্দ উপভোগ করে। আমরা লক্ষ্য করি এ কথা বলানো হয়েছে। একজন নারীর মুখ দিয়েই, যাতে বক্তব্যটির বিশ্বাসযোগ্যতা অধিক হয়। শরশয্যায় মৃত্যুমুখে পতিত ভীষ্ম, যুধিষ্ঠিরকে দু’বার বলেন, নারীর চেয়ে পাপিষ্ঠ কেউ নয়।(৭১) তিনি বলেন–অন্তক, শমন, মৃত্যু, পাতাল, বাড়বানল, ক্ষুরের ধার, বিষ, সৰ্প, অগ্নি–এই সব কিছু একত্রে একটি নারীর সমান।(৭২) তরুণী রাজকন্যা মাধবীর উপাখ্যান আমাদের চোখ খুলে দেয়। গুরুদক্ষিণা দিতে অপারগ গালিব রাজা যযাতির কাছে প্রার্থ হয়েছিলেন। কিন্তু রাজার রাজকোষ তখন নিঃশেষিত অর্থের পরিবর্তে তিনি তাই নিজের সুন্দরী কন্যা মাধবীকে গালিবের হাতে দিলেন যাতে গালিব একে একে তিন রাজার কাছে মাধবীকে এক এক বছরের জন্য গচ্ছিত রেখে তার বিনিময়ে প্রয়োজনীয় অর্থ নিতে পারেন। গালিব এতে কোনও অন্যায় দেখলেন না। তিনি তা-ই করলেন।(৭৩) নারীর কাছে শিক্ষা হয়েছিল নিষিদ্ধ।(৭৪) নারীকে বিবাহ করতেই হবে; পুরুষ নাও করতে পারে। তাই স্বৰ্গপ্রবেশের অধিকার লাভের জন্য কুণিগর্গের কন্যা, বর্ষীয়সী তপস্বিনীকেও বিবাহ করে এক রাত্রের জন্য হলেও স্বামীসঙ্গ করতে হয়।(৭৫) কৃষ্ণ নিজেই তাঁর উদ্ধারযোগ্য পাপীদের তালিকায় নারীকে অন্তর্ভুক্ত করেন।(৭৬)

মূল মহাকাব্যে স্বামীর চিতায় সহমরণ এক বিরল ঘটনা; বিধবাদের বাঁচার অধিকার সেখানে আছে। কিন্তু ভার্গব অংশে দুই একটি ব্যতিক্রম আছে; বসুদেবের মৃত্যুতে দেবকী, ভদ্রা, রোহিণী ও মদিরা স্বামীর চিতায় সহমৃতা হন; কৃষ্ণের মৃত্যুতে সত্যভামা, রুক্মিণী এবং তার অন্যান্য পত্নীরা সহমরণে যান। শান্তি পর্বের উপাখ্যানে ঘুঘুপাখির পত্নীও স্বামীর সঙ্গে পুড়ে মরে।(৭৭) কিন্তু গান্ধারী, কুন্তী, সত্যবতী এবং আরও অনেক বিধবা ও যুদ্ধবিধবারা কোনও সামাজিক কলঙ্ক ব্যতীতই বেঁচে থাকেন। হেরোডোটাস বলেছেন সিথিয়ানদের মধ্যে ‘সতী’ প্ৰথা প্রচলিত ছিল। এরাণ স্তম্ভ লিপিতে আমরা পাই যে রাজা গোপবর্ধনের পত্নী তার স্বামীর চিতায় আরোহণ করেন।

ভার্গব অংশের মুখ্য বৈশিষ্ট্যগুলির অন্যতম হল নারীর সামাজিক অবনমন। ১৪০ খ্রিস্টাব্দে জনৈক সিরিয়ান লেখক বৰ্দোসনেস বিভিন্ন দেশের আইন সম্পর্কে একটি গ্রন্থ রচনা করেনবুক অব দ্য লজ অব দ্য কাস্ট্রিজ। সেখানে তিনি বলেছেন যে, কুষাণরা তাদের পত্নীদের সঙ্গে উপপত্নীর মতো ব্যবহার করত এবং তাদের কাছে যৌন আনুগত্য আশা করত না। তাদের স্ত্রীরা এমনকী ভূত্যের সঙ্গেও প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন করত। সম্ভাবনা আছে যে, এই ধরনের প্রবণতাকে বাধা দেওয়ার জন্যই আইন প্রণয়নকারীরা নারীর উপর বেশি করে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিলেন। কিন্তু ভাগবি অংশে বারংবার নারীকে নিন্দা করা হয়েছে এবং তাদের অবদমিত রাখার জন্য বিধি তৈরি করা হয়েছে। তবুও কিন্তু পূর্বতন মূল মহাকাব্যে বেশ কিছু স্বাধীনচেতা নারীর কথা বলা হয়েছে। যাঁরা ছিলেন শ্রদ্ধার পাত্রী। ভার্গব অংশে অবশ্য প্রয়োজন ছিল নারীর বশ্যতা স্বীকারের কথা প্রচার করা, সেই জন্যই এই বিষয়বস্তু নিয়ে অসংখ্য উপাখ্যান ও নীতিমূলক অংশ রচিত হয়েছে। সমসাময়িক একটি অর্বাচীন গুপ্তযুগের ভাস্কর্যে আমরা প্রথম বারের জন্য দেখতে পাই লক্ষ্মী নারায়ণের পদসেবা করছেন।

খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ এবং তৃতীয় শতাব্দী থেকে সমাজে এবং ধর্মবিশ্বাস ও আচার আচরণে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছিল। এই সবের জন্য কোনও শাস্ত্র তখনও পর্যন্ত তৈরি হয়নি। এই প্রাক-পৌরাণিক ভাগবি সংযোজনই সেই শাস্ত্র রচনা করেছিল। মূল জয়সংহিতা রচনা শুরু হয়েছিল মোটামুটি ভাবে খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে এবং শেষ হয়েছিল খুব সম্ভব দ্বিতীয়/প্রথম খ্রিস্টিয় শতকে, এই সময়েই সংযোজনের প্রথম পর্যায় রূপে চিরন্তন মূল্যবোধের উপাখ্যানগুলি যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। অল্পদিন পরেই ভার্গব সংযোজন শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং মোটামুটি খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে শেষ হয়েছিল। এই সংযোজন ছিল সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন পুরোহিত গোষ্ঠীর রচিত, মূল মহাকাব্যের চেয়ে গঠনভঙ্গিতে অনেক নিম্নস্তরের অলকৃত, অতিরঞ্জিত, বাহুল্যযুক্ত এবং পুনরাবৃত্তি দোষে দুষ্ট।

বৌদ্ধ, জৈন, আজীবিক এবং উপনিষদীয় প্রভাব মুছে যাওয়ার পর অথবা যথেষ্ট কমে আসার পর মানুষ যাগযজ্ঞে বিশ্বাস হারিয়েছিল এবং উপনিষদের দুর্বোধ্য দর্শন সাধারণ মানুষের বোধক্ষমতার সীমানায় ছিল না। সুতরাং দেশজ মানুষেরা খুব সম্ভব সমাজের সীমারেখায় বসবাসকারী অ-বৈদিক আৰ্যদের বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানে পুনরুজজীবিত হয়ে উঠেছিল এবং ধীরে ধীরে অথচ নিশ্চিত ভাবেই সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কৃতিতে অনুপ্রবিষ্ট হচ্ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। আগন্তুক গোষ্ঠীগুলির বিশ্বাস এবং রীতিনীতি, যার ফলে তৎকালীন সামাজিক ধ্যানধাণাতে ইতিপূর্বেই যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছিল তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছিল। যজ্ঞবিহীন যে জনগোষ্ঠীর রীতিনীতি ও বিশ্বাস এর আগে অবদমিত ও বিতাড়িত হয়েছিল বর্তমানে তা পুনরুজ্জীবিত হল এবং মহাকাব্যের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজনের স্তরে তা আবার দৃষ্টিগোচর হল। রাজার উপর ঐশ্বরিকত্ব আরোপ, সম্প্রদায়নিষ্ঠ ধর্মের তত্ত্বনির্মাণ এবং পুরোহিত গোষ্ঠীর সামাজিক রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার ক্রমিক বৃদ্ধি এই সময়েই শুরু হয়। এর পর এই নূতন পূজাভিত্তিক ধর্মের নূতন নূতন দিক আবিষ্কার হতে থাকে–মন্দির, বিগ্রহ, ব্রত, তীর্থযাত্রা এবং ব্রাহ্মণের প্রতি দান ও আনুষ্ঠানিক দক্ষিণার নিয়ত বৃদ্ধি সব কিছু ক্রমেই গুরুত্ব পেতে থাকে। কয়েক শতাব্দী ধরেই জন্মান্তরবাদ ও কর্মফলবাদের তত্ত্ব প্রচলিত ছিল। ইতিপূর্বে উপনিষদীয় যুগেই এই সব ধর্মতত্ত্বের উদ্ভব হয়েছিল এবং এই নিগুঢ়-রহস্যময় জ্ঞানই ছিল ঋষিদের মূল তত্ত্ব। এখন এই সব তত্ত্বকে কাজে লাগানোর জন্য পুরোহিতগোষ্ঠী উপাখ্যানের পর উপাখ্যান রচনা করতে লাগলেন। স্বৰ্গ-নরক-প্ৰেতকথা-জ্যোতিষ-দুর্লক্ষণ চিহ্ন–এই সব কিছুই এই নব্য ধর্মীয় দার্শনিক আদর্শের মূলভিত্তি যে নিয়তিবাদ তার সহায়কের কাজ করতে লাগল। এর ফলে জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি এক রহস্যময়তায় আবৃত হয়ে হয়ে পড়েছিল, যে আবরণ ভেদ করতে পারতেন কেবলমাত্র পুরোহিতরা।

কুষাণ, শক, মুরুদ, পহুব, হ্রণ এবং পারদ-দের বারংবার আক্রমণের ফলে নিরাপত্তাবোধ ব্যাহত হয়েছিল, অন্তত সাময়িক ভাবেও সমাজে কিছুটা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছিল। এই গোলযোগের ফলে রক্ষণশীল মনোভাব জেগে উঠেছিল এবং এই সব নূতন মূল্যবোধের সৃষ্টিকর্তা পুরোহিত গোষ্ঠীর মূল লক্ষ্য ছিল দরিদ্র, শূদ্ৰ, দাস এবং নারীরা। স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর ভারতের এক বিশাল অংশে অন্তর্বিবাহ দ্রুত বিস্তার লাভ করেছিল। নারীর সতীত্ব এবং শূদ্রের আনুগ৩{ স্বীকার–উভয়কে অক্ষুন্ন রাখার জন্য আইনরক্ষকেরা অত্যন্ত সরব হয়ে পড়লেন। রক্ষণশীল মূল্যবোধ, বিশেষ করে বর্ণাশ্রমের নিয়ম বর্ণধর্ম ছিল শূদ্র ও নারীর প্রতি অবদমনমূলক। যে কলিযুগের তাঁরা বর্ণনা দিয়েছেন সে বর্ণনা প্রকৃতপক্ষে ছিল তাঁদেরই সমকালের সমাজের; এই সময় গ্রিস, রোম এবং মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে জলপথের বাণিজ্য ক্রমশ সঙ্কুচিত হয়ে আসছিল। দূরপ্রাচ্যের সঙ্গে বাণিজ্য কিন্তু বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু এই দ্বিতীয় বাণিজ্য সম্পর্কটি কোনও নূতন ধ্যানধারণার সৃষ্টিধর্মী অভিঘাত বা নূতন চিন্তার উল্লেখযোগ্য প্রভাব হয়ে আসেনি। অতএব এক প্রকার সংকীর্ণ মনোভাব দেখা দিল। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে উৎপাদন ব্যবস্থা ও উৎপাদনের সম্বন্ধ ও শ্রেণিবিন্যাসকিছুটা স্থিতাবস্থায় এসেছিল। বৰ্ণসংকরের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল এবং নিশ্চিত ভাবেই এই সরলীকরণ ধীরে ধীরে অপরিবর্তনীয় হয়ে উঠল। আৰ্য অভিজাত সমাজ ছিল ব্রাহ্মণ, ধনী ক্ষত্রিয় ও ধনী বৈশ্যদের নিয়ে গঠিত আর দরিদ্র ক্ষত্রিয়, দরিদ্র বৈশ্য, শূদ্র, স্লেচ্ছ এবং অন্ত্যজ অশুচিব্দের সমাহারে গঠিত হয়েছিল দাসবর্ণ। এই শ্রেণি ও বর্ণবিভাগে ক্লিষ্ট সমাজ শাসন করতেন ব্রাহ্মণ পুরোহিত ও নীতি নির্ধারকেরাই। জন্মান্তরবাদ ও কর্মফলবাদের তত্ত্বের দ্বারা লালিত কুসংস্কারে মানুষকে অন্ধ করে রাখা হত, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নিয়তিবাদ, শ্ৰাদ্ধ ও পারলৌকিক ক্রিয়া এবং প্ৰায়শ্চিত্তের প্রতি বিশ্বাস। এই সব বিষয়ে শাস্ত্রগ্রন্থের সংখ্যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। কিন্তু মহাকাব্যের ভার্গব সংযোজন অংশেই এগুলির প্রথম সূচনা হয়। এই সব তত্ত্বের বিস্তারিত চর্চা দেখা যায় পুরাণসমূহ, স্মৃতি, ধর্মশাস্ত্র এবং নিবন্ধগুলিতে। মহাভারত-এ ভার্গব সংযোজনে যার প্রথম অন্ধুরোদগম পরবর্তী কালে তারই পরিণতরূপ দেখা যায় হিন্দুত্বে। এবং সেখানেই এই সংযোজনের প্রকৃত গুরুত্ব।

সূত্রাবলি
(অসম্পুর্ণ)

নারী সমাজের উপর হিংসাত্মক উপদ্রব

কনসাইজ অক্সফোর্ড ডিকসনারি অনুসারে ‘হিংসাত্মক উপদ্রব’ হল কোনও ব্যক্তি বা সম্পত্তির ওপর আঘাত বা ক্ষতিসাধন। প্রাচীন ভারতে মেয়েদের সম্পত্তির অধিকার তো ছিলই না, বরং তারা নিজেরাই (অন্যের) সম্পত্তি গণ্য হত। তাই তাদের প্রসঙ্গে হিংসা বলতে তাঁদের ওপর শারীরিক-মানসিক নির্যাতনই বোঝাত। অধুনাতন ইংরেজি ভাষায় person শব্দটি শুধু শরীর বোঝায় বটে, তবে আলোচ্য প্রসঙ্গে তা শরীর ছড়িয়ে মনকেও বোঝাবে।

নারীবাদী পরিস্থিতিতেও যদি ধরে নেওয়া যায় যে, উপদ্রবকারী অবশ্যই কোনও পুরুষ, কিন্তু আমরা জানি, অন্য কোনও নারীও প্রায়শ তেমন করতে পারে, সে কথায় পরে আসছি। আক্রমণকারী যেই হোক, আঞগন্ত মহিলাটির দুর্দশা ঘটবেই এবং আরও সরাসরি ও শোচনীয় ভাবে সে পাশবিকতার শিকার হবেনাই।

বেদে এ কথা স্পষ্ট আছে যে, নারীর শরীর তার নিজস্ব নয় এবং এতটুকু ওজার-আপত্তি না করে পতির কাছে আত্মসমর্পণ করা তার বিধেয়। মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য বলেছেন, কোনও স্ত্রী যদি তার পতির শয্যায় আসতে অসম্মতি জানায়, (প্রথমে) মিষ্টি কথায় তাকে আদর ও অনুনয় করা যেতে পারে; তাতে কাজ না হলে গয়নাপত্রের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে ‘কিনে নেওয়া’ও যেতে পারে; আর তার পরও যদি রাজি না হয় তাহলে পতির উচিত লাঠ্যৌষধি কিংবা চড় থাপ্পড় প্রয়োগ।(১) মৈত্রায়নী সংহিতা-য় অনেক বার বলা আছে, নারীশরীর নারীর নিজের নয়, তাই যৌন নিপীড়ন থেকে তার নিজেকে বাঁচানোর সুযোগ নেই।(২) কোনও নারী পরপুরুষের শয্যাসঙ্গী হলে তার নির্দিষ্ট অঙ্গে কাঁকড়াবিছে ঢুকিয়ে শাস্তি দেওয়া হবে।(৩) তার ওই প্রেমিককে মারবার জন্য অভিচারমন্ত্র ও আচরক্রিয়া তো আছেই, যা নিঃসন্দেহে মানসিক নির্যাতন বৈকি।

নারীমত্রই অশুভ প্রতীক গণ্য হতেন, যেমনটা ছিল কুকুর, শকুনির মতো অশুভ পাখি, বেজি। ইদুরের মতো প্রাণী ও শূদ্রের বেলায়। এদের মধ্যে যে কোনও একটির হত্যাজনিত পাপের প্রায়শ্চিত্ত ছিল সমান।(৪) তৈত্তিরীয় সংহিতা স্পষ্ট ভাষায় লিখেছে, নারী কেবলমাত্র যৌনসম্ভোগের বিষয়;(৫) গরু, জমি এবং নারীকে অতিমাত্রায় ব্যবহার করা ঠিক নয়অন্যথায় তারা হয় মরবে নয়তো রুগ্ন হয়ে পড়বে।(৬) অগ্নি পত্নীবৎ অনুষ্ঠানে একটা লাঠি দিয়ে ঘিয়ের ওপর আঘাত করা হত। নির্মম স্পষ্টতায় এই প্রতীক ব্যাখ্যা করে জানানো হচ্ছে–স্ত্রীকেও এই ভাবে মারা দরকার, যাতে তার শরীর কিংবা সম্পত্তির ওপর তার কোনও অধিকার না বার্তায়।(৭)

মানসিক নির্যাতনও অবশ্যই ছিল এবং তা সেই বৈদিক যুগেও। প্রায় সব বেদগ্ৰন্থই দেখিয়েছে, নারী শুধু অধম জীব তাই নয়, অকল্যাণকরও বটে। সমাজে তার একমাত্র পরিচয় কর্তব্যনিষ্ঠ স্ত্রী, গৃহিণী ও ছেলেদের মা হিসেবে। বারো বছর ধরে পুত্র প্রসব করতে না। পারলে সে স্ত্রীকে পরিত্যাগ করা শাস্ত্রসম্মত, ঠিক যেমন মৃত্যুবৎসা হলে পনেরো বছর আর বন্ধ্যা হলে দশ বছর পর তাকে ত্যাগ করা যায়।(৮) এমনকী নববিবাহিত দম্পতি যখন তাদের নতুন ঘরে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, তখন বর নববধূর সামনে প্রার্থনা করত–‘এস, আমরা সঙ্গত হই, যাতে আমরা (অনেক) পুত্র, পৌত্র, দাস, বস্ত্ৰ, কম্বল, ধাতুরাজি, সুশাসক, শিষ্যকুল, প্রচুর খাদ্য ও বহু স্ত্রী পেতে পারি।(৯) শিক্ষিত নারী পুরুষ বৈ তো নয়।(১০) যাবতীয় বড় ধরনের দানের অন্যতম উপকরণ ছিল নারী, মাদি ঘোড়ার সঙ্গে নারী ও শিশু (দেয়বস্তু) হিসেবে থাকা উচিত।(১১) কোনও অশুভ পাখি, শকুনি, বেজি, ইদুর, কুকুর ও শূদ্রের হত্যা ও নারীহত্যার প্রায়শ্চিত্ত ব্যবস্থা যে অভিন্ন তাতেই নারীর সামাজিক মর্যাদা বোঝা যায়।(১২) পত্নীকে স্বামীর উচ্ছিষ্ট গ্রহণ করতে হত।(১৩) খ্রিস্টপূর্ব নবম-অষ্টম শতাব্দীতে লেখা একটি প্রাচীন গ্ৰন্থ জানাচ্ছে, সর্বগুণান্বিত শ্রেষ্ঠ মহিলাও সব দিক দিয়ে অপদার্থ কোনও পুরুষের অধম।(১৪) নারী ও শূদ্র (বলতে গেলে) অশুভ ও অসত্য-র মূর্তি। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকেদের দীনহীন ভাবে সেবা করবেন মেয়েরা, এটাই ধরে নেওয়া হত। একটি গ্রন্থে তার পক্ষে যুক্তি দেখানো হয়েছে–মেয়েকে (বিয়ে) দেওয়া হয় (বরের) পরিবারে।(১৫)

বরুণপ্রঘাস অনুষ্ঠানে সমবেত জনসমাজের মধ্যেই যজমানের পত্নীকে পুরোহিত জিজ্ঞাসা করতেন–কার সঙ্গে তোমার অবৈধ যৌন সম্পর্ক আছে?(১৬) কোনও পুরুষকে কিন্তু কোনও অনুষ্ঠানে কদাচ এ কথা জিজ্ঞাসা করা হত না। সামাজিক নির্বাসন ও মানসিক নির্যাতনের আর এক দৃষ্টান্ত হল, কঠোর বাক্য ব্যবহার করলে তৎক্ষণাৎ কোনও নারীকে পরিত্যাগ করা হত।(১৭)

এ সব থেকে ধরা যায় যে, হয় সমাজ বুঝে ছিল মেয়েদের মন বলে কিছু নেই, নয়তো বা তা ছিল পুরুষের উদ্ধত নিয়ন্ত্রণে; পুরুষ সচেতন ভাবে নারীবিদ্বেষী ও ধর্ষকাম।

জাতক-এর গল্পগুলোতে এমন একটি সমাজের ছবি আঁকা হয়েছে যা মূলত মেয়েদের প্রতি নির্মম। এর বেশির ভাগ গল্পেই আছে শারীরিক নির্যাতনের দৃষ্টাস্ত; কয়েকটিতে মানসিক নিপীড়নের ছবিও আছে। যেমন, একটি তরুণীকে প্রেমে পড়ার অপরাধে অগ্নিপরীক্ষায় বাধ্য করা হয়েছিল। সে যে একটা কৌশলে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছে তা একজন ব্রাহ্মণ দেখে ফেলে এবং তাকে ধাক্কা মেরে প্রেমিকের কাছ থেকে সরিয়ে আগুনে ফেলে দেয়।(৬২) এক বণিকের এক বদমেজাজী কন্যা ছিল। তার দাসেন্দের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করায় তারা তাকে কুয়োর মধ্যে ফেলে দেয়। বুদ্ধ তাকে উদ্ধার করে তার সঙ্গে বাস করেছিলেন। একদিন চোরের দল তাকে তাদের সর্দারের বউ করবে বলে চুরি করে নিয়ে যায়। বুদ্ধ উপস্থিত হলে চোরেদের সর্দার তাকে আঘাত করে। বুদ্ধ তাকে নারীহরণের অপরাধের কথা শোনান। সর্দার তখন মেয়েটিকে দু’টুকরো করে কেটে ফেলে। (৬৩)

এক রাজা রানিকে খেতে দিতেন না। বুদ্ধ তাকে ভিক্ষা করতে বলেন, তিনিও সব কথা রাজাকে জানান। বুদ্ধ তখন তাকে সমস্ত ব্যাপারটা রাজসভায় পুনরাবৃত্তি করতে বলেন। অতঃপর বুদ্ধ তাকে স্বামীকে ত্যাগ করার পরামর্শ দেন। ততদিনে রাজা কিন্তু উচিত শিক্ষা পেয়েছেন।(২২৩)

কোনও এক জন্মে বুদ্ধ চোর হয়েছিলেন। শ্যামা তাঁর প্রেমে পড়েন। তাঁর আর একজন প্রেমিক বুদ্ধের জন্য নিজের জীবন দেয়। তিনি তার বিশ্বাসঘাতকতার কথা জানতে পেরে তাঁকে হত্যা করতে চেষ্টা করেন, কিন্তু তিনি বেঁচে যান। বুদ্ধের কাছে ভৃত্যদের মাধ্যমে তিনি বলে পাঠান–‘শ্যামা তোমার জন্য কাতর হয়ে প্রতীক্ষায় রত।’ কিন্তু বুদ্ধ আর আসেননি (৩১৮)

বিপন্ন অবস্থায় এক রাজদম্পতি ঘরে ফিরছিলেন, ব্যাধের দল তাঁদের একটা পোড়া গিরগিটি দিলে রাজা তাই খেয়ে ফেলেন। রাজার বিদূষক বুদ্ধ ভিক্ষাদানে নারীর কুণ্ঠার অভিযোগ করলে তিনি তার কারণ বুঝিয়ে বলেন। বুদ্ধ বলেন—তাকে ত্যাগ করুন; তখন রাজার অনুশোচনা জন্মায় (৩৩৩) এক ক্রীতদাসকন্যা দেখে ফেলে যে রাজপুত্র তার পিতাকে হত্যা করতে উদ্যত। (রাজপুত্র) তখন তাকে দুটুকরো করে কেটে পুকুরের জলে ফেলে দেয়। রাজা (স্বয়ং) তা খুঁজে পান। তবে রাজপুত্র অনুশোচনা করায় তাকে ক্ষমা করা হয়।(৩৭৩)

নাগরাজ তাঁর রানিকে এক জলচর সাপের সঙ্গে খেলা করতে দেখে বাঁশের লাঠি দিয়ে তাঁকে পেটান। শারীরিক নিপীড়নের আর একটা দৃষ্টান্ত–রানি একটি মন্ত্র লিখতে চাইছিলেন, যার মূল্য একশো ঘা বেত (সহ্য করা)। তিন নম্বর ঘা পড়তেই রানি চেচিয়ে ওঠেন। আর তখনই তাঁকে মারধর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়।(৩৮৬) বিখ্যাত বেশান্তির গল্পে আছে কী ভাবে নির্বাসিত রাজা স্ত্রীপুত্রদের নিয়ে গিয়ে ইন্দ্রের ছদ্মবেশে মারধর করেছিলেন। মানসিক নির্যাতনের একটা আশ্চর্য গল্প দেখি সুজাত জাতকে। সেখানে এক রাজা ফলের পসারিণী সুন্দরী কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। একদিন রাজা যখন সোনার পাত্রে ফল খাচ্ছেন, তখন সরল মনে মেয়েটি জিজ্ঞাসা করে রাজা কী ফল খাচ্ছেন। তাতেই চটে গিয়ে রাজা তাকে কাটুবাক্য বলে উপহাস করেন এবং তাড়িয়ে দেন। এমন অনেক উদাহরণই দেওয়া যায়। তবে একটা জিনিস স্পষ্ট–মেয়েরা তখন সম্পূর্ণভাবে পুরুষের দয়ায় বেঁচে থাকত। তাকে মারধর করা, হত্যা করা, অপমান করা এবং কোনও তোয়াক্কা না করে তাড়িয়ে দেওয়া যেত। রামায়ণ-এ অহল্যার সঙ্গে গৌতমের দুর্ব্যবহার আমরা দেখেছি। যৌন অসংযমের জন্য কদাচি কোনও পুরুষকে শাস্তি পেতে হয়নি। বালী মৃত ভেবে সুগ্ৰীব বালীর পত্নী তারাকে গ্রহণ করেছিলেন। বালী সশরীরে ফিরে এলে তার সঙ্গেই তারা ঘর করতে যান এবং তার মৃত্যুর পর আবার সুগ্ৰীবের ঘরণী হন। এ সব ক্ষেত্রে বাস্তব হিংসা ছিল না বটে, তবে সমাজ অনুমোদিত মানসিক নিষ্ঠুরতা তো ছিলই, যাতে করে পুরুষের হাতে ফেলার সামগ্ৰী হিসেবে কোনও নারীকে এ-হাত থেকে ও-হাতে ফিরতে হয়েছে।

সীতাকে তো অন্যায় ভাবে সন্দেহ করা হয়েছে এবং প্রকাশ্যে কঠোর বাক্য বলে অপমান পর্যন্ত করা হয়েছে। প্রতিবাদ না করে রামের সে ক্ষেত্রে নীরবতা পালন সীতাকে অগ্নিদাহের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। অযোধ্যায়। তাকে নির্দয় ভাবে প্রবঞ্চিত করে অরণ্যে নির্বাসন দেওয়া হয়। অথচ তিনি গৰ্ভিনী হিসেবে একবার অরণ্যভ্রমণের ইচ্ছা প্ৰকাশ করেছিলেন মাত্র। (রাজসভায় সীতার) যমজ পুত্ৰ (লব ও কুশ)। বাল্মীকির শেখানো গান গাইবার পর সীতাকে রাজসভায় এসে নিজের সতীত্ব প্রমাণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয় এবং সীতা যে নির্দোষ তা বোঝাতে বাল্মীকি তাঁর হাজার হাজার বছরের তপস্যাবলে সঞ্চিত পুণ্যফল ত্যাগ করার বাজি রাখার পরও এমন ঘটনা ঘটে। এ বার অবশ্য সীতা কার্যকর ভাবে প্রতিবাদ করে অন্তর্ধন করেন। একজন সম্পূর্ণ সতীসাধবী ও আন্তরিক ভাবে অনুগত পত্নীর সঙ্গে রামের এই ব্যবহার মানসিক নিপীড়নের ঊর্ধ্বসীমা স্পর্শ করেছে সন্দেহ নেই।

নারী সমাজের ওপরে পুরুষের শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে নির্দয় আচরণ মহাভারতে এত বেশি সংখ্যায় আছে যে বলে শেষ করা যাবে না। আমি তার অল্প কয়েকটি এখানে উল্লেখ করতে চাই। ধৃতরাষ্ট্রের রাজসভায় দ্ৰৌপদীর প্রকাশ লাঞ্ছনা তার মধ্যে সবচেয়ে সাংঘাতিক ঘটনা এবং মূল গল্পের নির্ধারক বৃত্তান্ত। এ ঘটনায় যে শারীরিক ও মানসিক নির্দয়তা প্ৰকাশ পেয়েছে, তা দেখিয়ে দিচ্ছে মেয়েরা কতটা দীনহীন অসহায় যার জন্য তারা নিষ্ঠুরতার শিকার হলেও সমাজ সে অত্যাচার ক্ষমা করে দিচ্ছে, এমনকী অনুমোদন করছে। সারাটা মহাকাব্য জুড়ে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে মেয়েদের উপর বলাৎকারের নানা বৃত্তান্ত ছড়ানো। ধর্ষণকারীকে অপরাধী হিসেবে ঘৃণা করা দূরে থাক, বিজয়ী বীরের মর্যাদা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে। মেয়েদের উপর উপদ্রব করার জন্য কেউ গর্ববোধ করলেও তাকে সংযত করার দৃষ্টান্ত বিরল। পুরাণ গ্রন্থগুলো তো ধর্ষণ, অত্যাচার, মানসিক নিপীড়নের গল্পে পরিপূর্ণ।

এই যে নিজের মনে শুধু অৰ্জ্জুনকে কামনা করলেও পাঁচ পাঁচটি ভাইকে বিয়ে করতে বাধ্য হন দ্ৰৌপদী, তাতে খুব সূক্ষ্ম ভাবে তাঁর মনের ওপর নিষ্ঠুর অত্যাচার ঘটেছিল বৈকি। স্ত্রীকে দেওয়া প্ৰতিশ্রুতি ভঙ্গ করে যযাতি কৌশলে দেবযানীতে উপগত হয়েছিলেন। আচার্য গালিবকে গুরুদক্ষিণা হিসেবে তিনি তাঁর নিজের তরুণী কন্যাকে দান করেন। প্রতি বছর। একজন হিসেবে তিনজন রাজার কাছে ওই রাজকন্যাকে ভাড়া দেওয়া হয়, যতদিন না। তাদের জন্য এক একটি পুত্রসন্তান তিনি প্রসব করেন। তাঁর ইচ্ছা, সম্মতি, পছন্দ সম্পূর্ণ ভাবে উপেক্ষিত থেকেছে। এ গল্পটির একটি উপযুক্ত চূড়ান্ত পর্যায় আছে। রাজকন্যা কঠোর কৃচ্ছসাধন ও তপস্যাবলে যে পুণ্য অর্জন করেছিলেন, তার বাবা তার দখল নেন, কেননা তার নিজের পুণ্য স্বৰ্গলাভের থেকে কিঞ্চিৎ ন্যূন ছিল।

শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের আরও দৃষ্টান্ত: কুনিগর্গের তরুণী কন্যা সুদীর্ঘকাল তপস্যা করেছিলেন। বৃদ্ধ বয়সে জরাগ্রস্ত অবস্থায় যখন তাঁর মৃত্যু আসন্ন এবং বহু প্রচেষ্টায় অর্জিত স্বৰ্গসুখ লাভও প্রায় নিশ্চিত, নারদ তখন তাকে জানালেন যে কোনও নারী কদাচ স্বৰ্গে যেতে পারেন না! চন্দ্ৰ বৃহস্পতির পত্নী তারাকে অপহরণ করেছিলেন। এই চন্দ্রের ঔরসে তারার গর্ভে বুধের জন্ম। পরে বৃহস্পতি ওই স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনেন। আরও একবার দেখা গেল। যার মন বলে কিছু নেই নারী এমন এক জড়বস্তু ও হাতফেরতযোগ্য খেলার সামগ্ৰী ছাড়া আর কিছু নয়।

এই গল্পে এবং আরও নানা গল্পে যে সূক্ষ্ম ভাবে নারী নির্যাতন সম্ভব হয়েছে তার একমাত্র কারণ নারীকে ভাগ্যবস্তু হিসেবে মনে করার মধ্যে নিহিত। সুতরাং নির্বিচারে তার ওপর অত্যাচার করা যায়! সমাজ নারীকে এমন এক ভাবে দেখতে চেয়েছে যাতে অন্য ভাবে তার সামাজিক প্রয়োজন প্রমাণ করতে না পারায় পিতা, স্বামী বা পুত্র কোনও এক পুরুষের উপরেই ওঁকে নিতান্ত দীন ভাবে নির্ভর করে থাকতে হয়। এমনটা হওয়ার কারণ হল, দুঃখের সঙ্গে তাকে সচেতন থাকতে হত যে তার ভূমিকা পরনির্ভর অস্তিত্ব পদানত এবং তা কমাবস্তু হিসেবে নিজের স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের অনুগ্ৰহে। তাঁরাও জানতেন স্বামীর সম্পত্তির আইনসঙ্গত উত্তরাধিকারী হিসেবে পুত্র উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে মেয়েটির পরনির্ভরতার কথা।

এই ভূমিকা সম্বন্ধে নারী যে শুধু সচেতনই ছিল তাই নয়, তা অন্তরেও বুঝেছিল। ফলে তার উপর দৈহিক ও মানসিক নিপীড়ন চিরস্থায়ী করা সম্ভব হয়েছিল। বস্তুত আরিস্তোফানিস, ডোরেন্স ও প্লাউতুস-এ বর্ণিত নারীদের অবস্থার কথা আমাদের ভাবা উচিত যাতে হেলেনীয় গ্রিসে ও রোম সাম্রাজ্যে মেয়েদের অগ্রগামী পুন্যমূল্যায়ন ও আইন সংশোধন দেখে পার্থক্যটা ধরা যায়।

এ রকম স্বনির্ভর অবস্থা ভারতীয় সমাজেও লালিত হওয়া সম্ভব ছিল, কিন্তু এখানে মেয়েদের একত্র হয়ে নিজেদের দূরবস্থা আলোচনা করার কোনও মঞ্চ ছিল না। সুতরাং প্রতিটি ঘটনাই বিচ্ছিন্ন ভাবে একক ঘটনা বলে গণ্য হত। বেশ্যাদের বাদ দিলে মেয়েদের ঘটনা নিয়ে কোনও ব্যবস্থারীতিও ছিল না। সুতরাং পুরুষের অত্যাচারজনিত দুঃখ-কষ্ট মাঝে মধ্যেই সৰ্ব্ব এ ঘট ৩ এবং ৩। নিন্দনীয়ও ছিল না, শাস্তিযোগ্যও ছিল না। হাজার বছরের পুরোনো এই কদাচারের অবসান ঘটতে পারে কেবলমাত্র মেয়েদের সংঘবদ্ধ চেষ্টায়, আর যদি তাঁর পিছনে থাকে দ্ব্যর্থহীন স্পষ্ট নীতি ও স্বচ্ছ ভাবে নির্ধারিত আইন।

কুন্তী, গান্ধারী, দ্রৌপদীর মতো নারীব্যক্তিত্ব কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করেছিলেন সত্য, তবে সমাজ মোটামুটি ভাবে সে প্রতিবাদ উপেক্ষা করার সুযোগ পেয়েছে। সুতরাং মেয়েদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন কোনও শাস্তি ভয় ছাড়াই চলে এসেছে।

মেয়েদের নাগরিকত্বের কোনও আইন ছিল না, আইনের চোখে তাদের মর্যাদা ছিল। নিচের দিকে। উচ্চ তিন বর্ণের পুরুষরা শূদ্র ও নারীদের ওপর ধর্ষণ, অপহরণ, নিপীড়ন, ইত্যাদি অত্যাচার চালিয়ে যেত, অথচ তার জন্য কোনও শাস্তি পেতে হত না। শুধু বারাঙ্গনার কিছুটা অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতা ছিল এবং বিনা শাস্তিতে তার উপর অত্যাচার কিংবা তার শারীরিক বিকৃতি ঘটানো সম্ভব হত না। মর্যাদাপুরুষোত্তম অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ মানব বলে কথিত রামচন্দ্রের নির্দেশে তাঁরই অনুগত ভাইয়ের হাতে শূৰ্পণখার শারীরিক বিকৃতি সংঘটিত হওয়ার কথা আমরা জানি। রীতিনীতি এমনই ছিল: সামাজিক ভাবে দুর্বল মানুষ, বিশেষত স্ত্রীলোকও শূদ্ৰদের ওপর অত্যাচার অনুমোদিত আচরণবিধির মধ্যেই পড়ত এবং তা সম্ভব ছিল এই জন্যই যে পুরুষ ও নারী উভয়পক্ষই তা মেনে নিয়েছিল।

খ্রিস্টপূর্ব নবম শতাব্দীর লেখা তৈত্তিরীয় সংহিতা জানাচ্ছে, নারীর শরীর তার নিজস্ব অধিকারে নয়; সুতরাং চিরটা কাল ধরে নারীদেহ স্বচ্ছন্দে ভোগ করা চলে, ইচ্ছেমতো তার ওপর অত্যাচার করা চলে এবং পুরুষ খুশিমতো তাকে ত্যাগ করতেও পারে। খুব প্রাচীনকাল থেকেই মেয়েদের মন ও অনুভূতির কথা সমাজ গ্রাহ্য করেনি। সুতরাং পুরুষের ধর্ষকামিতা যতক্ষণ না কিছুটা পরিতৃপ্ত হচ্ছে, ততক্ষণ মানসিক নিপীড়ন মেনে নেওয়া হয়েছে। যেটা আরও খারাপ এ ক্ষেত্রে পুরুষদের সচেতনতার ব্যাপারে সার্বিক ঔদাসীন্য কাজ করেছে। এই জন্যই নববিবাহিত স্ত্রীর সামনে বহু পত্নীর প্রার্থনা সম্ভব। এই জন্যই সম্পূর্ণ নির্দোষ স্ত্রী হলেও রামের হাতে সীতার অপমান ও নিষ্ঠুর আচরণের পুনরাবৃত্তি।

প্রাচীন ও মধ্যযুগের ভারতে সামাজিক সত্তা হিসেবে মেয়েদের কোনও রাজনৈতিক আইনগত মর্যাদা ছিল না। নারীব ওপর শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের ব্যাপারটা সমাজের উচ্চকোটির লোকেদের পক্ষে তাই সহজতর হয়েছিল। নারী ও স্ত্রী হিসেবে তার কর্তব্যকর্ম আগেই নির্ধারিত ছিল; সে কাজে ব্যর্থতা বা ত্রুটি হলে তৎক্ষণাৎ নির্যাতন ছিল অবধাবিত। এমনকী কর্তব্যহানি হয়নি এমন ক্ষেত্রেও বলাৎকার, যৌন নির্যাতন এবং দুর্ব্যবহার ঘটতে পারত। উদারচেতা ব্যক্তিবিশেষের নৈমিত্তিক মহানুভবতা ছাড়া প্ৰতিকারের প্রার্থনা করার কোনও জায়গা ছিল না। তার প্রার্থনায় কান না দেওয়াও তাদের পক্ষে অসম্ভব ছিল না। যেমনটা দ্রৌপদীর আবেদনে কুরুবৃদ্ধদের ক্ষেত্রে দেখেছি।

মেয়েদের ওপর বলাৎকার ও নিপীড়নের ঘটনা প্রায়শ তাদের সমাজের পুরুষদের কোনও কাজের প্রতিশোধ হিসেবে সংঘটিত হত। বলতে গেলে, পুরুষদের কোনও বাস্তব বা কাল্পনিক অপরাধের মূল্য দিতে হত সম্পূর্ণ নিরাপরাধ মেয়েদের এবং অন্যান্য দুর্বলদের। এটাকে বাধা দেওয়াও সমাজনীতির অংশবিশেষের বিরুদ্ধাচারণ করা বোঝাত। মেয়েদের পরিকল্পি৩ ভাবে অসহায় ও পরাশ্রিত হিসেবে ধরে নিয়ে পালন ও রক্ষা করা হত। আর ৩রাও এই মূল্যবোধ অন্তরে গ্রহণ করে আত্মসমর্পণ করত। একমাএ কার্যকর প্রতিবাদের মধ্য দিয়েই অত্যাচারের এই কাহিনিগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব ছিল। আজকের দিনেও এই প্রতিবাদ সমান জরুরি।

সূত্রাবলি
(অসম্পূর্ণ)

সতী

দেওরালার ভয়াবহ ঘটনা আমাদের সত্য সত্যই বিচলিত করে তুলেছে–আমরা আমাদের ধর্ম-সামাজিক পরম্পরার বিভিন্ন ধারা আলোচনা করতে শুরু করেছি। এ কী কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা? না কি ইতিহাসে ঐতিহ্যে এর শিকড় সুদূর প্রসারিত? এই ঘটনা কি স্বেচ্ছায় আত্মহত্যা না কি তার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়রা, প্রতিবেশীরা প্রয়োজনীয় ইন্ধন জুগিয়েছিল অথবা কোনও নির্মম চক্রান্তের শিকার হয়ে তাকে অনিচ্ছায় প্রাণ দিতে হল? নিহতের অথবা তার স্বজনবর্গের মানসিক অবস্থা যাই হোক না কেন, যে তথ্য আমাদের প্রকৃত ভাবে আহত এবং বিস্মিতও করে তা হল এই যে, বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এই ঘটনা সত্যই ঘটেছে। এ কথাই আমাদের বিভ্রান্ত করে, এক প্রতিস্পর্ধার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়; এই হত্যা কেবল ঘটেইনি, বহু দৃষ্টিকোণ থেকেই এই ঘটনার প্রশংসা এবং অভিনন্দন জানানো হয়েছে। সে কি কোনও ধর্মীয় প্রেরণার বশবর্তী হয়ে না কি অন্য কোনও আবেগের ফলে? ভবিষ্যতে আরও অনেক মৃত্যুকে প্রতিহত করার জন্য কেমন করে এই প্রেরণাকে বিনষ্ট করা যায়?

রূপ কানোয়ার ‘সতী’ হয়েছেন। ‘সতী’ শব্দের অর্থ কি? আমাদের ভুললে চলবে না যে ভারতীয় ভাষাগুলির ক্ষেত্রে ‘সতীর কোনও পুংলিঙ্গ প্রতিশব্দ নেই। অর্থাৎ সম্পূর্ণভাবে এবং বিশেষ ভাবে শব্দটির নৈতিক তাৎপর্য কেবল কোনও নারীর প্রতিই প্রযোজ্য। কী এই তাৎপর্য? সদ্যবিধবা নারী তার মৃত স্বামীর চিতায় আরোহণ করে এবং নিজেকে উৎসর্গ করে, প্রথমত পরলোকে তার স্বামীর স্বচ্ছন্দ অবস্থানের জন্য, দ্বিতীয়ত স্বর্গে চিরকাল স্বামী সঙ্গ সুখের আশায়। আলোচ্য বিশেষ ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা জানতে পারি যে রূপ কানোয়ারের স্বামী ছিল নিবীৰ্য, তাই তার মৃত্যুর কিছুদিন আগেই সে স্বামীকে ত্যাগ করেছিল অপর এক পুরুষের জন্য।. তাই সঙ্গত ভাবেই প্রশ্ন ওঠে অনন্তকালের জন্য সেই স্বামীর সঙ্গলাভের আশায় কি সে সত্যই ব্যাকুল ছিল? হয়তো এ সম্ভাবনা তার কাছে ভয়াবহ হয়েই দেখা দিয়েছিল।

রূপ-এর আত্মোৎসর্গের বিভিন্ন ব্যাখ্যা, অন্তত যুক্তি ও মানবতার বিচারে যে তথ্য তাৎপর্যপূর্ণ, তা হল বহু শাস্ত্রগ্রন্থ এবং সমাজের একটি বৃহৎ অংশের মিলিত সিদ্ধান্ত এই যে স্বামীর চিতায় আত্মহননই সদ্যবিধবার উচিত কাজ। এখানে আমাদের মনে রাখতে হবে, স্বামীর মৃত্যু ছিল স্বাভাবিক। কোনও সচেতন আত্মহত্যার পিছনে যে বাড়তি যন্ত্রণা, সে দুভোগ তাকে সহ্য করতে হয়নি। মৃত্যু যখন উপস্থিত হল, তখন তার সামনে কোনও বিকল্প ছিল না, কিন্তু তার বিধবা পত্নীর ক্ষেত্রে ছিল। তবু কোন অমানবিক পারিপার্শ্বিক ওই বিধবাকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিল?

সম্ভবত সহমরণ প্রথার শিকড় বহু দূরে প্রসারিত। অথর্ববেদ-এ আমরা দেখি আমরা মৃতের বধু হওয়ার জন্য জীবিত নারীকে নীত হতে দেখেছি অথবা এই নারী প্রাচীন প্ৰাথারই অনুগমন করছে। (অথর্ববেদ ১৮:৩:১,৩)। এই প্ৰথা কত প্রাচীন? এটি কী প্ৰাগাৰ্য যুগের? সম্ভবত তাই। কারণ, গ্রিক, রোমান, জার্মান অথবা কেন্টিক প্রাচীন সাহিত্যে অর্থাৎ অন্যান্য সমগোত্রীয় ইন্দো-ইউরোপীয় সাহিত্যে স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীকে দাহ করার কোনও সাক্ষ্য পাওয়া যায় না। যেখানে অথবা যখনই এর সূচনা হয়ে থাকুক, প্রমাণ রয়েছে যে আর্য ও প্রাগাৰ্যদের মিশ্র জনগোষ্ঠী অন্তত আংশিক ভাবে, সাময়িক ভাবে হলেও অথবা আঞ্চলিক ভাবে এই প্রথাকে গ্ৰহণ করেছিল, যদিও কখনওই প্রথাটি বহুল প্রচলিত হতে পারেনি। মহাভারত-এ পাণ্ডুর মৃত্যুর পরও কুন্তী বেঁচে থাকেন। মাদ্রীর স্বেচ্ছায় মৃত্যু কোনও সহমরণের ঘটনা নয় বরং অপরাধবোধে আত্মোৎসর্গ। মনে হয় যে ওই সময়ে এই প্রকার সহমরণ ছিল বিকল্প প্রথা। মূল কাব্যে মাদ্রীর মৃত্যু একক ব্যতিক্রম মাত্র। উভয় মহাকাব্যেই অধিকাংশ বিধবা জীবিত থেকেছেন; স্বর্গে অনন্তকাল স্বামীসঙ্গে বাস করার প্রলোভনে কেউ তাদের আত্মহননে প্রলুব্ধ করেনি। যখন হর্ষচরিত রচিত হয়েছিল সেই সময় উত্তর ভারতীয় সমাজ এক অনুদার সংরক্ষণশীল পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। তবুও যখন যশোবতী, তার স্বামীর মৃত্যুর পর চিন্তারোহণে উদ্যত হলেন, কেউ তাকে উৎসাহিত করেননি; বরং যাদের কাছে তিনি বিদায় নিতে গেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই তাকে নিরস্ত করেছেন। এরও পূর্ববতী সাহিত্যে কালিদাসের কুমারসম্ভব কাব্যে দেখা যাচ্ছে স্বামীর বিয়োগে কাতর রতি আত্মহত্যায় উদ্যত বলে কবি বর্ণনা করছেন, এর খুব সম্ভাব্য কারণ, বাস্তবে তা ঘটবে না। রঘুবংশে একাধিক রাজার মৃত্যুর উল্লেখ আছে কিন্তু স্বামীর সঙ্গে সহমৃতা একটি বিধবার কথাও নেই। পরবর্তী যুগের সাহিতে বিশেষ করে রাজতরঙ্গিনীর মতো প্রাচীন মধ্য যুগের সাহিত্যে, স্বামীর সহমরণে যাওয়ার ঘটনা বহুবার উল্লেখিত হয়েছে, সমাজের প্রশংসাও পেয়েছে।

মহাভারত-এ দক্ষযজ্ঞের একাধিক বিবরণ রয়েছে কিন্তু শিব-নিন্দার কারণে দক্ষযজ্ঞ ধ্বংসের উল্লেখ নেই। অতঃপর শিব ক্ৰোধে যজ্ঞ পণ্ড করেন। পরবর্তী পুরাণগুলিতে, বায়ু পুরাণ (৩০:৪০-৪৫) স্কন্দ পুরাণ ও বামন পুরাণ-এ কাহিনিটির উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এই পরিচিত কাহিনির একটি বিশদ সংস্করণ পাওয়া যায় অর্বাচীন, গৌণ শিব পুরাণ-এ (১৭:২৫-২৯)। এখানে পতিব্ৰতা স্ত্রী সতী, তাঁর স্বামীর নিন্দা সহ্য করতে না পেরে স্বেচ্ছায় প্রাণত্যাগ করেছেন। কিন্তু অগ্নিদগ্ধ হয়ে নয়। এই কাহিনিতে সতী বিশেষণটি (প্রকৃতপক্ষে তাঁর নাম) একটি নূতন মাত্রা পেয়েছে: যখন স্বামীর অপমান হয় তখন স্ত্রীর জীবন সম্পূর্ণ অর্থহীন, তাই তিনি স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে বেছে নিয়েছেন। দক্ষের কন্যা পুনর্জন্ম নিলেন হিমালয় দুহিতা পার্বতী রূপে এবং আবার শিবকেই বিবাহ করলেন। সতী-র ভাবমূর্তিতে এবার নূতন একটি সংজ্ঞা যুক্ত হল: স্বামীর সম্মান রক্ষার জন্য তিনি স্বেচ্ছায় মৃত্যু বরণ করলেন। এ কথা বলা নিম্প্রয়োজন যে সমস্ত সাহিত্যের কোথাও স্ত্রীর সম্মান বা মর্যাদা রক্ষার জন্য স্বামীর পক্ষে কোনও প্রকার দুশ্চিন্তার অবকাশ রাখা হয়নি। কারণ খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়, কখনওই মানুষ হিসাবে সামাজিক সম্মান মেয়েদের প্রাপ্য ছিল না। তাই ধৃতরাষ্ট্রের সভায় কুরু বৃদ্ধদের মতো প্ৰত্যেকেই বিনা প্ৰতিবাদে নারীর নিগ্রহ এবং অপমান প্রত্যক্ষ করেছে।

সতীদাহের সূত্রপাতে দেখা যায় ধর্মশাস্ত্রে ও পুরাণগুলির চিন্তাধারায় যেখানে একে পবিত্র, কর্মের আখ্যা দেওয়া হয়েছে। বাসস্থতি-র নিদান অনুসারে কেবলমাত্ৰ ব্রাহ্মণ-নারীর ,অন্য কোনও বর্ণের নয়–অধিকার আছে নিজের স্বামীর চিতায় দগ্ধ হওয়ার। ‘এবং যদি সে জীবিত থাকে, তবে উত্তম বস্ত্র ও গহনা পরিত্যাগ করবে, এবং তপস্যার দ্বারা শরীরকে শুদ্ধ করবে।’ (২:৫৩) এখানে একটি বিকল্প রয়েছে: বিধবা নারী তপস্বিনী হয়ে বেঁচে থাকতে পারতেন; পরাশরের ধর্মসূত্ৰ-তেও বিকল্প ব্যবস্থার স্বীকৃতি রয়েছে: যে নারী স্বামীর মৃত্যুর পর তপস্যাচরণ করে থাকেন। তিনি তপস্বীদের মতোই স্বৰ্গলাভ করেন। (৪:২৭) কিন্তু তার একটু পরেই বলা হয়েছে মানুষের শরীরে সাড়ে তিন কোটি লোম থেকে, যে নারী মৃত্যুতেও তার স্বামীকে অনুগমন করে, সে স্বামীর সঙ্গে ৩৩ বৎসরই স্বৰ্গবাস করে।’ (৪:২৮) এখানে অন্তর্নিহিত বক্তব্য এই যে জীবিত থাকার বিকল্প নিকৃষ্ট নারীর জন্যই প্রযোজ্য; সতী নারী সহমরণের পথ বেছে নেন এবং স্বৰ্গে চিরকাল স্বামীসঙ্গ লাভ করেন। সদ্যবিধবাকে তার দুর্বল, বিহ্বলতর মুহুর্তে এই কথা বলা হত। দক্ষ সংহিতা-তে বলা হচ্ছে, যে সতী নারী স্বামীর মৃত্যুর পর অগ্নিতে প্ৰবেশ করে সে স্বৰ্গে পূজা পায়। যেমন করে সাপুড়ে সাপকে তার গর্ত থেকে টেনে বার করে তেমন ভাবে সতী তার স্বামীকে নরক থেকে আকর্ষণ করে এবং তার সঙ্গে সুখে থাকে। হরীত সংহিতা-য় বলা হয়েছে ‘যে নারী স্বামীর চিতায় আত্মোৎসর্গ করে সে তার, পিতৃকুল, স্বামীকুল উভয়কেই পবিত্র করে।’ (৫:১৬০) যাজ্ঞবল্ক্য অবশ্য সহমরণকে অনুমোদন করেন না; সেখানে বলা হয়েছে স্বামীহারা পত্নীর দায়িত্ব নেবেন তাঁর পিতা-মাতা, শ্বশুর-শাশুড়ি, এমনকী ভাইরাও মাতুল। অন্যথায় তার নামে নিন্দা হবে। (১:৮৬) বৃদ্ধ হরীত সংহিতা বলে কোনও বিধবা রমণী দিনে দুইবার মাত্ৰ আহার করবে এবং সুগন্ধি ফুল, অলংকার, রঙিন পোশাক ও কাজল পরিত্যাগ করবেন।’ (১১:২০৫-২১০)

যাজ্ঞবন্ধ্যের মতোই বিষ্ণুধর্মসূত্র-এর লেখকও বলেন বিধবা নারী আজীবন কঠোর সংযম অভ্যাস করবেন। (২:৫:১৪) যদিও তিনি তার স্বামীর চিতায় মৃত্যুও সমর্থন করেন। মাদ্রী পাণ্ডুর চিতাতেই অনুমৃত্যু হয়েছিলেন, কিন্তু এ ঘটনা সহমরণের উদাহরণ নয়। পাণ্ডুর প্রতি অভিশাপের শর্ত অবমাননার জন্য প্ৰায়শ্চিত্তের চেষ্টামাত্র। মহাভারত-এর অর্বাচীন সংযোজিত অংশ মৌষল পর্বে কৃষ্ণের চার স্ত্রী রুক্মিণী, রোহিণী, ভদ্রা এবং মদিরা তাঁর চিতায় সহমৃতা হয়েছিলেন। এমনকী বসুদেবের আট পত্নীও তাঁর মৃত্যুর পরে সহমরণে গিয়েছিলেন। মনে হয় বৃষ্ণি ও সাত্বতদের মধ্যে এই প্রথা প্রচলিত ছিল। কোনও কোনও নারী তাদের স্বামীর মৃত্যুর পরে অথবা শীঘ্রই অগ্নিপ্রবেশ করেন, কারণ স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ তাদের কাছে অসহনীয় ছিল; যদিও কখনওই কোনও স্বামী বিচ্ছেদ বা মৃত্যুর দুঃখে নিজে মৃত্যুকে বরণ করেননি। ভারতীয় সাহিত্যে স্ত্রীর মৃত্যুতে স্বামীর আত্মোৎসর্গের কথা কোথাও পাওয়া যায় না।

যাজ্ঞবল্ক্য স্বামীর মৃত্যুতে স্ত্রীর সহমরণের বিধান না দিলেও তার ভাষ্যকারেরা নিজেদের মতের সমর্থনে যাজ্ঞবল্ক্যের বক্তব্যকে ব্যাখ্যা করেছেন। তার একটি বিধিকে উদ্ধৃত করে মিতাক্ষরাটীকা বলে কোনও অন্তঃস্বত্ত্ব বা সদ্যোজাত শিশুর জননী ভিন্ন অব্রাহ্মণ চণ্ডাল সব নারীর জন্যই সহমরণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু যাজ্ঞবল্ক্যের নিজের শাস্ত্রে বলা হয়েছে বিধবা তার পিতামাতা অথবা স্বামীর পিতামাতার পরিবারে অন্তর্ভুক্ত থাকবে সুতরাং সে জীবিতই থাকবে। কিন্তু যজ্ঞবল্ক্যের মানবিকতাবোধ তাঁর টীকাকারেরা কল্পনা করেননি। বরং পরিবর্তনশীল সামাজিক বিধির স্রোত অনুযায়ী তাঁর শাস্ত্রবিধানকে পরিবর্তিত করেছেন। এমনকী স্বভাবত সংরক্ষণশীল মনুও কিন্তু বিধবার জন্য সংযত নিয়ন্ত্রিত জীবনের বিধান দিয়েছেন, স্বামীর সঙ্গে সহমরণের বিধান নয়। তিনি বলেছেন ‘বিধবার ভক্ষ্য হবে শুধু ফলমূল এবং ফুল, সে শীর্ণ হবে, কোনও অসম্পর্কিত পুরুষকে এমনকী নাম ধরেও সম্বোধন করবে না। (৫:১৫৭) এখানে শীর্ণ’ হওয়ার যে বিধান তার অন্তর্নিহিত অর্থ হল ‘আয়ুক্ষয়, কিন্তু সদ্য বৈধব্যের পরই মৃত্যুর সঙ্গে এর পার্থক্য আছে। ভাষ্যকার মেধাতিথি এই শ্লোকের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন ‘পুরুষের পক্ষে যেমন, স্ত্রী লোকের পক্ষেও তেমন, আত্মহত্যা সমর্থন যোগ্য নয়।’ যদিও অঙ্গিরস বলেন স্বামীর চিতায় মৃত্যুই নারীর পক্ষে বাধ্যতামূলক, কিন্তু এ ক্ষেত্রে মৌলিক বিধিকেই (নিত্যবিধি–এক্ষেত্রে আত্মহনন উচিত নয়) অনুসরণ করতে হবে। যদি কোনও বিধবা ফললাভের তীব্র (অন্যায্য, উদগ্র) আশায় প্রলুব্ধ হয়ে আত্মহত্যা করে তবে শাস্ত্রানুসারে কাজ করা হল না। বৌধায়ন ধর্মসূত্র বলে যে, বিধবা এক বছরের জন্য মধু, মাংস, মদ্য এবং লবণযুক্ত আহার্য ত্যাগ করবেন।’ (২:২:৬৬-৬৪) এখানে লক্ষণীয় এই যে বিধবাদের জন্য মাংস ভোজন ও মদ্যপানের পরোক্ষ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

সাধারণত সকল শাস্ত্রকারই আত্মহত্যাকে হীন অপরাধ বলেছেন। কিন্তু মিতাক্ষরা এবং অপরার্ক ভাষ্যে বলা হয়েছে ‘সতী’র ক্ষেত্রে অর্থাৎ সহমরণের ক্ষেত্রে আত্মহত্যা কোনও অপরাধ নয়। অপরার্ক, আপস্তম্বকে উদ্ধৃত করে বলছেন, যে নারী মায়াবশে ভ্ৰান্ত হয়ে চিতা থেকে নেমে আসে সে ‘প্রাজাপত্য’ প্ৰায়শ্চিত্তের মাধ্যমে নিজেকে শুদ্ধ করতে পারে। এখানে লক্ষ্য করা উচিত যে, সমস্ত পৃথিবীতেই আত্মহত্যা নিজের প্রতি একটি হিংসাত্মক অপরাধ বলে গণ্য হয়। তবুও যদি ও সব যুগেই এই সত্য পুরুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, নারীর ক্ষেত্রে কিন্তু সতীর মতো আত্মহত্যার ঘটনা কোনও পাপ বা অপরাধ তো নয়ই, বরং পুণ্যকর্ম।

আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি বিশ্বজনীন এবং সমর্থনযোগ্য (তুল্য বহুল প্রচারিত উক্তি: আত্মানং সততং রক্ষেৎ–নিজেকে সর্বদা রক্ষা করবে)। কিন্তু যখন কোনও নারী চিতা থেকে নেমে এসে নিজেকে রক্ষা করতে যায়। তখন সে কাজ পাপ হয়ে দাঁড়ায়। অঙ্গিরসকে উদ্ধৃত করে বলা হয়। ‘সতী নারীর চিতায় আত্মোৎসগের কোনও বিকল্প নেই।’ ‘সতীর প্রতিশব্দ হল ‘সাধবী’ এবং ‘সতী’ শব্দের মতো এরও কোনও পুংলিঙ্গ’ শব্দ নেই। সৎ-অর্থ ভাল। যদি কোনও নারী সারা জীবন পবিত্র এবং ভাল থেকে থাকে, তবু মৃত স্বামীর জন্য আত্মহনে অস্বীকৃত হলেই সে হয়ে যায় মন্দ-অসতী, অসাধ্বী।

স্মৃতিশাস্ত্রের নব্য মধ্যযুগীয় পণ্ডিত রঘুনন্দন। তিনি অঙ্গিরসকে উদ্ধৃত করে বলেন ‘সেই নারী যে চিতারোহণ করে, এর অর্থ থেকে বোঝায় অন্যান্য যে সব নারী সতী হতে চাইতই না তাদের জন্য বিকল্প পথ খোলা ছিল। রঘুনন্দন অনুমোদন করেন যে বিধবার পক্ষে শ্রেষ্ঠ পন্থা হল মৃত স্বামীর চিতায় আরোহণ করা, কিন্তু তিনিও যারা স্বামীর মৃত্যুর পরে বেঁচে থাকতেই চায় তাদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা রেখেছেন। তাঁর মতে, যে সতী হয় সে হল শ্রেষ্ঠ কিন্তু, অন্যরাও থাকতে পারে; যারা শ্রেষ্ঠ না হলেও বাঁচতে চায়, সে জন্য তাদের পাপী মনে করা উচিত নয়। বিষ্ণু ধর্মশাস্ত্র-তেও এই দুটি বিকল্পকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। স্বামীর মৃত্যুর পর (নারী) সংযত তপস্বিনীর জীবনযাপন করবে অথবা স্বামীর চিতায় আরোহণ করবে। এখানে লক্ষণীয় এই যে প্রথম বিকল্পটি বেঁচে থাকাকেই সমর্থন করে।

কী এই সংযম? যৌন জীবন থেকে বিরতি— তাম্বুল, প্রভৃতি পরিত্যাগ ইত্যাদি। ইত্যাদি শব্দটির ব্যাখ্যায় টীকাকার উল্লেখ করেছেন কীসা, প্রভৃতি ধাতুর পাত্রে আহার এবং প্রসাধন দ্রব্যাদি বর্জনের কথা। এই প্রসাধন দ্রব্যাদি কী? রঘুনন্দন বলেন, ‘এই অভ্যঞ্জন একটি চিকিৎসা শাস্ত্রের ব্যবহারিক প্রয়োগ, এর অর্থ হল সেই পরিমাণ কেশ-তৈল যা মাথা থেকে দুই কঁধ এবং বাহু পর্যন্ত লিপ্ত হতে পারে আর অল্প পরিমাণকে বলা হয় মাষ্টি।’ অনেক অর্বাচীন শাস্ত্র গ্রন্থে বিধবার জন্য দিনে একবার আহারের বিধান দিয়েছে, এবং তাকে পালঙ্কে শোবার অনুমতিও দেওয়া হয়নি–অন্যথায় তার স্বামী পরলোকে দুৰ্গতি ভোগ করবে। স্কন্দপুরাণ  বলে,  বিধবা যদি কবরী রচনা করে তাহলে স্বামীর পক্ষে তা পাপ হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণ আরও দেওয়া যায়; কিন্তু শাস্ত্রীয় এই সব বিধিনিষেধের অন্তর্নিহিত চিন্তা খুবই স্পষ্ট। এই সব হীনবুদ্ধি শাস্ত্র গ্রন্থগুলির উদ্দেশ্য হল ন্যূনতম মানবিক সুখ সুবিধা থেকেও বিধবাদের বঞ্চিত করা। এই প্রসঙ্গে স্মরণীয় যে বিগতদার ব্যক্তির জন্য শোকপালনের সীমা মাত্র একদিন, যার পরে সে কেবল পুনর্বিবাহ করতেই পারে না, তার জন্য পুনর্বিবাহ করার বিধানই দেওয়া হয়েছে।

হারীত সাধবী’ নারীর সংজ্ঞা দিয়েছেন ‘স্বামী যখন দুঃখ পায় তখন সে দুঃখ পায়; স্বামীর সুখ ভোগে সে সুখ পায়, স্বামী গৃহ ছেড়ে গেলে তাকে দেখে মনে হয় ভেঙে পড়েছে এবং সে ব্যাকুল হয় এবং স্বামীর মৃত্যুতে প্রাণ ত্যাগ করে।’ এই প্রকার নারীই পতিব্ৰতা। এই গ্রন্থটিকে বলা হয় অর্বাচীন বৈদিক সাহিত্য। মহাভারত-এ বলা হয়েছে যথাযথ সময়ে (অর্থাৎ স্বামীর মৃত্যুর পরে) যদি নারীরা তাদের (মৃত্যুতেও) অনুসরণ করে, এমনকী অনুরাগ, ক্রোধ ভয় অথবা ভ্রান্তির বশে, তবুও সেই সব নারীরা পবিত্র হয়ে ওঠেন (মতান্তরে এই সব প্রবৃত্তি থেকে নারীরা সহমরণের মাধ্যমে পবিত্র হয়ে ওঠেন)। ব্ৰহ্মপুরাণ বলে যদি স্বামীর প্রবাসে মৃত্যু হয়ে থাকে। তবে স্ত্রীর কর্তব্য স্বামীর পাদুকা বুকে ধরে অগ্নিপ্রবেশ করা। আমরা লক্ষ্য করি যে, সমস্ত পরবর্তী শাস্ত্রগুলিই ক্ৰমান্বয়ে এমন এক পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে চলেছে। যেখানে বিধবা নারীর বেঁচে থাকার অধিকার হারিয়ে যাচ্ছে।

ঋগ্বেদ-এর একটি অর্বাচীন অংশের উদ্ধৃতি দিয়ে রঘুনন্দন বলেন নারীর আত্মহত্যা করা উচিত নয়। বিভিন্ন মত আলোচনা করে তিনি বলেছেন ব্রাহ্মণ-বিধবা কেবলমাত্র স্বামীর চিতায়, পৃথক কোনও চিতায় নয়, মৃত্যুকে বেছে নিতে পারেন। এই ভাবে তিনি ব্ৰাহ্মণ বিধবার জীবনের সম্ভাবনাকে আংশিক ভাবে হলেও সম্ভাব্য করেছেন। ব্যাস ধর্ম শাস্ত্র বলে, যদি স্বামী এমন দূরত্বে মারা যায় যে, পথ এক দিনের, তবে যতক্ষণ না স্ত্রী সহমরণের জন্য উপস্থিত হচ্ছে ততক্ষণ দাহ করা উচিত নয় এবং যে অগ্নিকর্তা সে উভয়েরই পারলৌকিক ক্রিয়া করবে।’ ভারতের মতো উষ্ণ দেশে মৃতদেহের একদিন অপেক্ষা করার ফলাফল সহজেই অনুমান করা যায়, তবে এই বিধিনিষেধ কেন? এর ফলে বিধবার জীবিত থাকার আশা ক্ষীণতর হয়। বিভিন্ন শাস্ত্রগ্রন্থের মূল প্রতিপাদ্য সংক্ষেপে এই কথাই বলে: হয় তাকে স্বামীর সঙ্গেই দাহ করা অথবা তার জীবৎকালকে করে তোল জীবিতমৃত্যু।

ব্ৰহ্মপুরাণ বলে, যে নারী স্বামীর বংশরক্ষার জন্য স্বামীর চিতায় আরোহণ করতে উদ্যত, তার জন্য উপস্থিত সকলে তাকে চিতারোহনে সাহায্য করবে; এই আবৃত্তি করে এই সব পবিত্র সুসজ্জিত নারীরা পতিব্রতা; তাঁরা স্বামীর দেহের সঙ্গে সঙ্গে চিতায় প্রবেশ করুন; এই কথা শুনে পতিব্ৰতা বিশ্বস্তা স্ত্রী পিতৃমেধ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে স্বৰ্গলাভ করবেন। রঘুনন্দন তার ভাষ্যে বলেছেন পিতৃমেধ অনুষ্ঠান হল চিতায় আরোহণ করা। এ কথা বলার প্রয়োজন নেই যে, স্বর্গের এই পথ খোলা আছে শুধু বিধবার জন্য, বিপত্নীকের জন্য নয়।

বিষ্ণু ধর্মশাস্ত্র একটি সঙ্গত প্রশ্ন তুলেছে: এই ভাবে আত্মহননের কাজ নারীর পক্ষে পাপজনক কিনা–এ বিতর্কের সিদ্ধান্ত এই যে, যেহেতু তার স্বামীর চিতারোহন করছে সে হেতু এই মৃত্যু আত্মহত্যা নয়। স্বামী এমনই এক পূত পবিত্র বস্তু যার ফলে তার চিতায় আত্মহত্যাও আর আত্মহত্যা থাকে না, পুণ্যকর্ম হয়ে দাঁড়ায়। সংক্ষেপে, বিধবার মৃত্যুই ভাল, সুতরাং বিভিন্ন কথায় সহমরণকে পুণ্যকর্ম বলে ঘোষণা করে তাকে উৎসাহ দেওয়া হয়। এরপরে রঘুনন্দন অনুত্তেজিত সুচিন্তিত ভাবে সতীর অন্ত্যেষ্টি ও শ্ৰাদ্ধক্রিয়া সম্পর্কে মতামত দিয়েছেন।

বাসস্মৃতি বলছে চিতায় বিধবা নারী তার স্বামীর মৃতদেহে আলিঙ্গন করবেন; অথবা তার মস্তকামুণ্ডন করতে হবে। (২:৫৫) অন্যান্য শাস্ত্ৰেও এই প্রকার সব নির্দেশ পাওয়া যায়। যে যুক্তিতে তাকে প্রসাধন, সুগন্ধি, ফুল, ইত্যাদি ব্যবহার থেকে বিরত করা হয়। সেই একই যুক্তিতে এই মুণ্ডনকে উচিত মনে করা হয়, যাতে তার চেহারায় নারী সুলভ আকর্ষণ না থাকে, সে কোনও পুরুষকে প্রলুব্ধ করতে না পারে। কিন্তু এই সমস্ত সাবধানতামূলক বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও পুরুষের প্রলোভন বাধা পেত না এবং যুগে যুগে পুরুষের যৌন আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য বিধবাই হয়েছে সহজলভ্য শিকার। আশ্চর্যের কিছু নেই যে, স্কন্দপুরাণ বলে, সমস্ত রকম অশুভ দ্রব্যের মধ্যে বিধবা হল অশুভতম। (৩:৭:৫০-৫১) ষষ্ঠ শতকে বরাহমিহির, তার বৃহৎসংহিতা-য় বলেন, ‘অহো নারীর প্রেম কি সুদৃঢ়, তারা স্বামীর দেহ ক্ৰোড়ে নিয়ে অগ্নিতে প্ৰবেশ করে।’ (৭৪:২৩)

নারদ স্মৃতিতে সাত প্রকার নারীর কথা বলা হয়েছে: (১) যার পূর্বে একজনের সঙ্গে বিবাহ হয়েছে; (২) কুমারী; (৩) যে বিধবাকে তার শ্বশুরকুল তার স্বামীর বংশে অন্য কাউকে সমর্পণ করেছে; (৪) নিঃসন্তানা বিধবা; (৫) যে বিধবা তার দেবরকে বিবাহ করতে অস্বীকার করে এবং নিজের পছন্দ মতো কাউকে বিবাহ করে; (৬) যে বিধবা যাকে কিনে আনা হয়েছিল অথবা যে বিদেশি এবং নিজে ইচ্ছা মতো যে অন্য কাউকে বিবাহ করে; এবং (৭) যে বিধবাকে তার গুরুজনেরা কোনও অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির হাতে দান করেন। এর মধ্যে শেষের চার শ্রেণিকে বলা হয় বহিমুখী বা স্বেচ্ছাচারিণী অর্থাৎ বারাঙ্গনা, যদিও শেষোক্ত জন তার গুরুজনদেরই আজ্ঞা পালন করে। শাস্ত্রগ্রন্থ এই সাতজনকে বলেছে ‘পুনর্ভু’ অথবা অন্যপূর্ব’ অর্থাৎ যে নারীর পূর্বে অন্য পুরুষ ছিল। যাজ্ঞবল্ক্য ধর্মশাস্ত্ৰ বলে পুনর্ভু দুই প্রকার–কুমারী এবং অ-কুমারী; মনু (৯:১৭৬), বিষ্ণু ধর্মসূত্র (১৫:৮, ৯), বশিষ্ঠ ধর্মসূত্র (১৭:১৮) ‘পুনর্ভুর কথা বলেছে। গ্রন্থগুলিতে সতীদাহের বিকল্পের অবকাশ আছে।

বিধবার জীবিত থাকার সামাজিক অধিকার বিষয়ে এই বিতর্ক শুরু হয়েছে, ঋগ্বেদ-এর অর্বাচীন অংশের একটিমাত্ৰ মন্ত্রের বিষয়ে বিভিন্ন ভাষ্য থেকে। প্রসঙ্গত ঋগ্বেদ-এর এই অংশটি দেশজ অধিবাসীদের সঙ্গে বহিরাগত জনগণের সংমিশ্রণ এবং উভয়ের সাংস্কৃতিক একীভবনের পরবর্তীকালে রচিত। এই মন্ত্রে কোনও সদ্যবিধবাকে সম্বোধন করা হয়েছে, যে চিতায় তার স্বামীর মৃতদেহের পাশে শুয়ে রয়েছে আত্মহননের সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে: ওঠ, হে নারী, যে শুয়ে আছে মৃতকে আলিঙ্গন করে, তুমি জীবিতের রাজ্যে এসো, যে পুরুষ তোমার হাত ধরে আছে তার স্ত্রীর অধিকার স্বীকার কর। (১০:১৮:৮)। কে তার হাত ধরে জীবিতের রাজ্যে নিয়ে যেতে চায়? অশ্বালায়ণ গৃহ্যসূত্র বলে এই পুরুষ হল তার দেবর, মৃত স্বামীর শিষ্য অথবা পুরাতন ভৃত্য। (৪:২:১৮) এখানে বহু বিষয়ে আমরা প্রশ্ন করতে পারি: তবে কী ওই বিধবা সতীর ভূমিকাটি অভিনয় করছে? অতঃপর দেবর অথবা অন্য কেউ তাকে চিতা থেকে হাত ধরে তুলে আনে (সম্ভবত দেবর শব্দটির উৎপত্তি দ্বি-দুই বর’ এই ভাবে। এমনকী এখনও ওড়িশা এবং অন্যান্য রাজ্যের কোনও কোনও স্থানে কনিষ্ঠ দেবরের সঙ্গে বিধবা ভ্ৰাতৃবধুর পুনর্বিবাহ প্রথা চালু আছে। তৃতীয়ত, সহমরণে বাধা দেওয়ার কারণ বলা হয়েছে বংশ রক্ষার কাজ অব্যাহত রাখা, প্রজনন। ভাবী জননীর অকাল মৃত্যুকে প্রতিহত করা হয়েছে, কারণ নারীর প্রসবিনী শক্তি এবং সন্তানলাভ করা সমাজের প্রয়োজন ছিল। কোষগ্রন্থ শব্দকল্পদ্রুম-তে বলা হয়েছে দিদিষু শব্দের অর্থ ‘পুনর্ভু’; সেই জন্যই তাকে পুনর্বিবাহের প্রেরণা দেওয়া হয়েছে। মনে হয় স্বামীর চিতায় বিধবার আত্মাহুতি দেওয়ার প্রথা কোনও প্রাগার্য প্রথা, সম্ভবত সিন্ধু সভ্যতায় এই প্রথার প্রচলন ছিল, ইন্দো ইওরোপীয় সভ্যতায় এর কোনও সমর্থন পাওয়া যায় না। সুতরাং এই প্রথা অনুসরণে উদ্যত কোনও নারীকে (আর্য পুরুষদের অনার্য পত্নীরা নিজেদের প্রথা পালনে উদ্যোগী হতেই পারেন) অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী আৰ্য প্রথা মানতে বাধ্য করা হতেই পারে; সেই ঘটনাই আলোচ্য ঋগ্বেদের মন্ত্রে বর্ণনা করা হয়েছে। বিধবা নারীর পুনর্বিবাহের কিছু কিছু ঘটনা গ্রিক, লাতিন ও জার্মান সাহিত্যে দেখা যায়।

ঋগ্বেদ পরবর্তী ভারতীয় সাহিত্যে ক্ৰমান্বয়ে বিধবাকে দেখানো হয়েছে অশুচি ও অশুভ রূপে, তাঁর বেঁচে থাকার অধিকার হয়ে উঠেছে বিতর্কের বিষয়। তারপর বিভিন্ন উদ্দেশ্যমূলক পরিস্থিতির চাপে ওই ঋগ্বেদীয় মন্ত্রটির অর্থকে, সমাজপতিদের অনুকুলে পরিবর্তিত করে নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী শাস্ত্ৰ  বলে, কেবল মাত্র নিঃসন্তান বিধবাকেই জীবিতের রাজ্যে ফিরিয়ে আনা চলে। (৩:৮:৪) অর্থাৎ মৃতের পারলৌকিক কাজ করার জন্য একজন যথাযথ অধিকারী চাই। কোনও কোনও শাস্ত্ৰে দেখা যায় দেবরের সঙ্গে বিধবার বিবাহ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। কিন্তু ঋগ্বেদ-এর আর একটি মন্ত্রের অর্থ বিষয়ে কোনও সংশয় থাকে না। অশ্বিনীদ্বয়কে সম্বোধন করে বলা হয়েছে–অন্য কে তোমাদের (সূক্ত দ্বারা) স্তুতি করেছে, যেমন করে কোনও বিধবা শয্যায় তার দেবরকে সস্তুষ্ট করে। (১০:৪০:২) অতএব, ঋগ্বেদ-এর যুগে বিধবারা বেঁচেই থাকত এবং দেবরকে বিবাহও করত। এই প্রথা সে যুগে অবশ্যই বহুপ্রচলিত ছিল, অন্যথায় উপমা হিসাবে ব্যবহৃত হত না। অথর্ববেদ-এ এক নারীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে যে একাধিক বিবাহ করেছিল। (৯:৫:২৭) এমনকী দশজন স্বামী গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে। (৫:১৭:১৯) এখানে অন্তত দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বিধবার পুনর্বিবাহ যে প্রচলিত ছিল তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। অথর্ববেদ-এ অবশ্য দু’বার সহমরণেরও উল্লেখ আছে। এই ভাবে এই প্রথার উদ্ভব ও প্রয়োগ যে প্ৰাগাৰ্যদের মধ্যে ছিল না বোঝা যায়। হয়তো এটি সিন্ধু সভ্যতার প্রথার একটি স্মৃতিচিহ্ন। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ-এ প্রার্থনা করা হয়েছে, আমি যেন ইন্দ্রাণীর মতো অবিধবা হই। (৩:৭:৫:৫১) এখানেও স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবার বেঁচে থাকার পরোক্ষ ইঙ্গিত পাচ্ছি, কারণ বৈধব্যের দুঃখ যন্ত্রণার ভোগ সতীর কাছে অজানা।

রামায়ণ ও মহাভারত-এর মূল অংশে কোনও সতীদাহের ঘটনা নেই; মাদ্রী অনুতাপে আত্মহনন করেন। কারণ তিনি পাণ্ডুর কামনার বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন। আর্য বসতিগুলির চারপাশের সমাজে এই প্রাগার্য প্রথার প্রচলন ছিল, সুতরাং স্বাভাবিক ভাবেই আর্যদের উপরেও এই প্রথার সক্রিয় প্রভাব পড়েছিল। কিন্তু রামায়ণে দশরথের তিন পত্নী; তারা, মন্দোদরী; ইন্দ্ৰজিৎ অথবা কুম্ভকর্ণের পত্নীরা কেউই স্বামীর সঙ্গে চিতা আরোহণ করেননি। মহাভারতেও সত্যবতী, কুন্তী, অম্বিকা, অম্বালিকা, দুঃশলা এবং দ্ৰৌপদী–তার চার স্বামীর মৃত্যুর পরও বেঁচেছিলেন।

খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে খ্রিস্টিয় দ্বিতীয় শতক পর্যন্ত সময়ে উত্তর ভারতে বিদেশি অভিযানের মিছিল চলেছিল। এর ফলে সামাজিক পরিমণ্ডলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছিল। ভগবদগীতা প্রথম থেকে দ্বিতীয় শতকে রচিত। এই গ্রন্থে কৃষ্ণ অৰ্জ্জুনকে যুদ্ধের কুফল সম্পর্কে উপদেশ দিচ্ছেন–এতে বংশক্রম বিনষ্ট হয় এবং এর ফলে পরম্পরাগত ধর্মক্ষয় পায়। এইরূপ ঘটনা ঘটলে সমস্ত পরিবার অপবিত্র হয়, অভিজাত কুলনারীরাও দুষ্ট ব্যবহার করেন এবং বর্ণসংকর ঘটে থাকে। (১:৩৯:৪০) এই সব দুষ্টা কুলনারীদের মধ্যে যুদ্ধ-বিধবাদের দেখা যেতে পারে কারণ অৰ্জ্জুন। এখানে যুদ্ধ ও তার ফলাফল বিষয়েই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। অন্য ভাবে বলতে গেলে, যদি স্বামীর মৃত্যুর পরও বিধবা জীবিত থাকে, সে অন্য স্বামী বরণ করতে পারে এবং তারই ফলে ঘটে যাবে সর্বাধিক ভয়াবহ বিপদ–বৰ্ণসংকর। তখন পরিবার এবং তার ধ্বংসকারী উভয়েরই গতি হয় নরকে, পিতৃপুরুষের সংকর সঠিক ভাবে হয় না এবং তারা নরকে পতিত হয়। (১:৪২) এ কথা সহজবোধ্য এবং এ জন্যই সতী প্রথা উজজীবিত হয়, অংশত এই ভাবে ব্যাপক সামাজিক অবক্ষয় রোধের জন্য।

গুপ্তযুগে মনুর নির্ধারিত নীতিই প্রচলিত ছিল। (তুলনীয় রঘুনন্দন ১:১৭)। যদিও মনু বিধবার জন্য স্বামীর চিতায় মৃত্যুর বিধান দেননি, তবু তিনি কঠোর সংযমবিধি নির্দেশ দিয়েছেন। এই যুগে পুরাণগুলি রচিত হতে শুরু করেছিল এবং সেগুলির মাধ্যমে নারী ও শূদ্রের প্রতি অবদমনের এক ক্রমবর্ধমান চিত্র পাওয়া যায়। সম্প্রদায়গত পুরোহিতগণ কয়েক শতক ধরে পুরাণ রচনা করে আসছিলেন; তাঁদের ধর্ম ও দর্শনগত মতবাদ ছিল ভিন্ন, কিন্তু নারী ও শূদ্রের প্রতি নিপীড়ন করতে তাঁরা প্রকৃতপক্ষে একমত ছিলেন।

বেদ-পরবর্তী যুগ থেকে পৌরাণিক যুগ পর্যন্ত কুড়িজন শাস্ত্রকার তাদের গ্রন্থ রচনা করেছেন: বহু বিষয়ে তাদের মতভেদও আছে। কেউ কেউ বিধান দিয়েছেন স্বামীর সঙ্গে বা তারপরে সতীদাহ করতে, কেউ বলেছেন শুধু ব্রাহ্মণ বিধবারাই এই ভাবে মারা যেতে পারেন; অন্যরা শুধু কঠোর নিয়ম পালন করবেন। কেউ কেউ বলেন যে সব বিধবা এই ভাবে মৃত্যুবরণ করেন তারা পিতৃকুল ও পতিকুল উভয়েরই পূর্বপুরুষদের মুক্তি দেন। অন্যরা বলেন সাপুড়ে যেমন গর্ত থেকে সাপকে টেনে বার করে তেমন করেই একজন সহমৃতা সতী তার স্বামীকে নরক থেকে উদ্ধার করে। এই ভাবে বিষয়টি অনুমান করা হয় যে, যে স্বামী কোনও গুরুতর অপরাধ করে নরক ভোগ করছে, তাকে উদ্ধার করার একমাত্র উপায় হল পত্নীর আত্মহত্যা। যে স্বামী তার নিজের পাপের জন্য নরকবাসের যোগ্য, সে উদ্ধার পেতে পারে একটি নিরপরাধিনী মেয়ের মৃত্যুতে–এই বিধানের অন্তর্নিহিত অবিচারে কোনও সংশয় নেই; ঠিক যেমন যে নারী পাপ করছে তাঁকে বাঁচাবার জন্যও কোনও দুশ্চিন্তা দেখা যায় না। সারা জীবন নীরবে স্বামীর সেবা করে যাওয়া আর তার মৃত্যুতে আত্মহত্যা করা, নারীর জন্য এই বিধান দেওয়া হয়েছে। কোনও কোনও শাস্ত্র আর একটু অগ্রসর হয়েছে; সে স্বৰ্গে তার স্বামীর সঙ্গে বাস করবে ত্ৰিশ কোটি বছর কিংবা তার শরীরে যত লোম আছে তত বছর, যখন স্ত্রীর মৃত্যু হয় স্বামীর আগে, তখন কিন্তু স্বামীর জন্য এমন কোনও নিষ্ঠুর বিধান নেই যাতে সে চিরদিন তার স্ত্রীর সঙ্গে বাস করবে। প্রচলিত প্ৰবাদ হল, ভাগ্যবানের বউ মরে, অভাগার গরু। শাস্ত্ৰ বিধান দেয় স্ত্রীর মৃত্যুতে স্বামীর শোক পালন এবং অশৌচ মাত্র এক দিনের। তারপরে তার পুনরায় বিবাহ করাই উচিত।

কানে-র আট খণ্ডে রচিত ধর্মশাস্ত্ৰ বিষয়ক ইতিহাসে ‘সতী’ বিষয়ক কয়েকটি অধ্যায় আছে। তার দেওয়া পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে, উনবিংশ শতকের বাংলায় (যা তখন বারাণসী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল) সতীর সংখ্যা সর্বনিম্ন ৩৭৮ (১৮১৫ খ্রি.) সর্বোচ্চ ৮৩৯ (১৮১৮ খ্রি.)। এবং, ১৮১৫ থেকে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কেবলমাত্র বাংলাতেই সংখ্যাটি ২৩৬৬, যার মধ্যে শুধু কলকাতাতেই সতীদাহের সংখ্যা ১৮৪৫। কনে-র মতে এর মুখ্য কারণ হল শুধু বাংলাতেই দায়ভাগ স্মৃতির অনুসরণ করা হয়, (বাকি ভারতবর্ষ মিতাক্ষরকে অনুসরণ করে), এবং এই স্মৃতি অনুযায়ী বিধবাই স্বামীর সম্পত্তির অধিকারিণী। জনৈক জিতেন্দ্ৰিয় পরবর্তীকালে সংযোজন করছেন, ‘নিঃসন্তানা বিধবা তার স্বামীর সমস্ত সম্পত্তির নিঃশর্ত অধিকার পাবেন।’ কানে যথার্থই অনুমান করেছেন যে, পাছে বিধবা তার স্বামীর সম্পত্তির অধিকার চেয়ে বসে সেই ভয়ে তাকে সক্রিয় প্রেরণা দিয়ে এবং প্রচ্ছন্ন ভাবে ভয় দেখিয়ে স্বামীর চিতায় মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য করা হয়। ব্যবসায়ী আর উদ্যোগপতিরা যেহেতু বেশির ভাগই ছিলেন কলকাতাবাসী, তাই এখানে সতীর সংখ্যা এত নির্মম ভাবে বেশি–যাতে আইনানুযায়ী বিধবারা বিশাল সম্পত্তির অধিকারিণী হয়ে বসতে না পারে।

সমস্যা দুটি: পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্টই বোঝা যায় যে, বিধবাদের স্বামীর চিতায় উঠতে প্রেরণা দেওয়া হত, জোর করে নিয়ে যাওয়া হত। তা যদি না হত তাহলে স্বামীর মৃত্যুতে যে বিধবা যথেষ্ট সম্পত্তি পেয়ে অর্থনৈতিক ভাবে স্বাধীন হচ্ছে সে কেন সহমরণে যাবে? সুতরাং নিকটবতী আত্মীয় এবং অর্থলোভী অন্যান্য উত্তরাধিকারীরা মেয়েটিকে সতী হওয়ার জন্য ভয় দেখায়, মিষ্টি কথায় ভোলায়। কিন্তু সেই সব বিধবারা যাঁরা এই সব প্রেরণাকে জয় করেও বেঁচে ছিলেন ও স্বামীর সম্পত্তির অধিকার নিয়েছিলেন–পরিসংখ্যান বলে সতীদের চেয়েও তাদের সংখ্যাই বেশি। কিন্তু এই সব জীবিত বিধবাদের পরিণতি কি হয়েছিল? ব্ৰহ্মচর্য–সংযমের জীবন। অন্যান্য কিছু তপস্বী সম্প্রদায় যাঁরা ব্ৰহ্মচর্য অভ্যাস করতেন তাদের মাথা মুড়িয়ে, দিনে একবার মাত্ৰ আহার করে বেঁচে থাকতে হত। ব্ৰহ্মচারী ছাত্রের সংযম-চর্য শেষ হত তার স্নাতক হওয়ার পর। তারপর সে দিনে দু’বার আমিষ আহার করতে পারত, সুগন্ধ, প্রসাধন, অলংকার ব্যবহার করতে পারত। কোনও ব্রহ্মচারীকে কখনও অশুভ, অমঙ্গলকারী বলা হয় না। সুতরাং বিধবার ব্ৰহ্মচর্য এক অদ্ভুত প্রকারের, যার লক্ষ্য হল বিধবাকে বঞ্চিত ও নিপীড়িত করে তাঁর মৃত স্বামীর আত্মার উপকার করা।

দায়ভাগ-এর প্রাধান্য সত্ত্বেও, তার স্বামীর সমস্ত সম্পত্তিতে তত্ত্বগত ভাবে অধিকার থাকা সত্ত্বেও, অশিক্ষিত বঞ্চিত সন্তানহীন বিধবার পক্ষে তার মৃত স্বামীর শক্তিমান পুরুষ আত্মজনের নিরাবরণ অর্থলোভের বিরুদ্ধে কী করা সম্ভব? এ সত্ত্বেও যদি সে পিতৃপরিবারের সাহায্যে নিজের দাবী প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, কেবলমাত্র সেই সম্ভাবনার ভয়েই সম্ভাব্য অধিকারিণীদের পুড়িয়ে মারা হত। বহু নারীর কাছে স্বামীর সম্পত্তির তত্ত্বগত অধিকার যে কেবল মরীচিকা ছিল, সে সত্য প্রমাণিত হয় সামান্য সাহায্যের ভরসায় বেঁচে থাকা কাশীবাসিনী বাঙালি বিধবার বিপুল সংখ্যা থেকে। বৃহত্তর সংখ্যায় বিধবারা তাদের আত্মীয়দের নিপুণ ছলচাতুরীর ফলে আইনসঙ্গত অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এরা বেঁচেছিল–বেঁচে থাকে আত্মীয়দের বাড়িতে গলগ্রহ, বিনা বেতনের ঝি-এর মতন।

দ্বিতীয় সমস্যা হল, মিতাক্ষরা অনুসারী রাজ্যগুলিতে, যেখানে সন্তানহীনা বিধবা কেবল আশ্রয় আর খাদ্যের অধিকারী, এবং স্বামীর সম্পত্তিতে তার কোনও অধিকারের আশা নেই, সেখানে কী কোনও সতী ছিল না? মিতাক্ষরা-র শাসন মেনে চলা এমনই একটি অঞ্চল হল রাজস্থান। তবে কেন সেখানে জহরব্রতের (স্বামীর মৃত্যুতে নারীর স্বেচ্ছামৃত্যু) এত ব্যাপক প্রচলন? এ তো আক্ষরিক অর্থে গণ-আত্মহত্যা। এই সমাজ অনুমোদিত গণহত্যার ব্যাখ্যা কী? এখানেই একটি বাস্তব সমস্যা দেখা যায়।

হিন্দু সমাজ কোনও দিনই নারীর স্বতন্ত্র স্বাধীন পরিচয়কে মেনে নেয়নি। বরং বারবার ঘোষণা করেছে যে, নারী স্বাধীনতা পাওয়ার যোগ্য নয়। তার উচিত স্বামীর পদাঙ্ক ছায়ার মতো অনুসরণ করা। যে সব অধিকার মানুষকে স্বাধীনতা দিতে পারে–শিক্ষণ, সঙ্গী নির্বাচনের অধিকার, স্বাধীন বৃত্তি, সম্পত্তির অধিকার, নিজের দেহের ওপর অধিকার, সন্তান ধারণের সিদ্ধান্ত বজায় রাখার অধিকার, সমাজ শাসনে অথবা রাষ্ট্র শাসনে অংশ নেওয়া বা নিজের মত প্ৰকাশের অধিকার, নারী কখনওই এগুলি ভোগ করেনি। অবশ্যই কোথাও কোথাও কোনওখানে এর ব্যতিক্রম থাকতে পারে। কিন্তু এগুলি শুধুই ব্যতিক্রম, নিয়মকেই কেবল প্রতিষ্ঠা করেছে। সমাজ কোনও কুমারী বা বিধবার সামাজিক সত্তাকে স্বীকৃতি দেয়নি; এখানে তার একটাই পরিচয়–সে কারও পত্নী। স্ত্রী রূপে তার আদর্শ কী? সতী হওয়া, পতিব্ৰতা হওয়া। স্বামীর প্রতি নিবেদিত প্ৰাণ হওয়া শব্দটির একটি তির্যক অর্থ আছে–স্বৈব স্বামী। আমাদের মনে রাখতে হবে এই অর্থে ‘সতীর কোনও পুংলিঙ্গ শব্দ নেই, যেটা হতে পারত ‘পত্নীব্ৰত’, কিন্তু হয়নি। আবার পতিব্ৰতা শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এটা উচ্চ আদর্শ।

মহাভারত-এ বনপর্বে (এই অংশটি মহাকাব্যে ভার্গব প্ৰক্ষেপণের শেষতম অংশ এবং চরিত্রগত ভাবে প্ৰাক পৌরাণিক) সত্যভামা দ্ৰৌপদীকে প্রশ্ন করেছেন, তুমি কেমন করে তোমার পাঁচ স্বামীকে সন্তুষ্ট রাখ? উত্তরে দ্ৰৌপদী পতিব্ৰতার আদর্শ সম্পর্কে দীর্ঘ ভাষণ দিয়েছেন, যেটি সম্ভবত ভারতীয় সাহিত্যে পতিব্ৰতার সর্বপ্রথম পূৰ্ণ দৈর্ঘ্য সংজ্ঞা। (৩:২২২-২২৩) এর শুরুতেই দেখা যাচ্ছে–‘অহংকার, কামনা, ক্ৰোধ ত্যাগ করে আমি সন্ত্রীক পাণ্ডবদের সেবা করি।’ (২২৮-১৮১) প্রত্যেক পাণ্ডবেরই দ্ৰৌপদী ছাড়া অন্য পত্নী ছিল। পতিব্ৰতা নারী প্ৰথম যে বস্তু ত্যাগ করবেন তা হল অহংকার, ব্যক্তির আত্মমর্যাদা। এরপর দ্ৰৌপদী, স্বামীর কাছ থেকে নারীর প্রাপ্য বিষয়ে একটি তালিকা দিয়েছেন–সন্তান, সুখভোগের নানা বস্তু, শয্যা, সুখাসন, পোশাক, মালা, সুগন্ধি, স্বর্ণ এবং নানা দুর্লভ দ্রব্য। (২২৩:৩) এর আগে তিনি বলেছেন স্বামী সন্তুষ্ট হলে তিনি এগুলি দিয়ে থাকেন, অন্যথায় নয়। বলা নিম্প্রয়োজন যে এই তালিকায় ভালবাসা বা শ্রদ্ধার কোনও স্থান নেই। আর এ কথাও সুস্পষ্ট যে, এই সব উপহারের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ক কিন্তু জৈবিক স্বাচ্ছন্দ্য বা বস্তুগত সুখকে ছাপিয়ে যেতে পারে না। দ্ৰৌপদীর আলোচনা থেকে ধারণা পাওয়া যায় যে, পতিব্ৰতার আদর্শ হল স্বামী ও তার সংসারের প্রতি নিরবচ্ছিন্ন অক্লান্ত সেবা। আর সম্পূর্ণ আত্মবিলোপ। শেষেরটিই পতিব্ৰত্যের ধারণার কেন্দ্ৰবিন্দু।. পতিব্ৰতা তার নিজের পরিচয় সম্পূর্ণ লোপ করে স্বামীর স্বার্থসাধন করে যাবে। তবেই তার বিশেষণ হবে পতিব্ৰতা’।

মানবিক মর্যাদার পক্ষে যা কিছু অতি গুরুত্বপূর্ণ তার সব কিছু থেকেই আমাদের সমাজ নারীকে বঞ্চিত করেছে; সুদূর বৈদিক যুগেই সে তার শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিল, চিরকাল স্বাধীন জীবিকার অধিকার থেকে সে বঞ্চিত, জীবনের জন্য তার পাথেয় হল দৈহিক সৌন্দর্য, যৌবন, কর্মক্ষমতা, সন্তানধারণের যোগ্যতা; তার মনকে কখনও স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি, তাই সে নিজেকে কখনও স্বাতন্ত্র্যের সঙ্গে সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। স্বাধীন অস্তিত্বের আস্থা ও যোগ্যতা ছাড়া তার অস্তিত্ব কেবল প্রাণীরূপে, শূদ্রের মতোই সে-ও কেবল প্রভুর সম্পত্তি। এই পরিস্থিতিতে, শাস্ত্ৰ নারীর জন্য একটিই ভূমিকার নির্দেশ দিয়েছে ,পতিব্ৰতার ভূমিকা। কেবল এই কাজটিতে সফল হলেই একজন নারী জনগণের মনোযোগ পেতে পারে। সার্থকতার উপায় হল স্বামী ও শ্বশুরকুলের সেবায় তাদের প্রসন্নতার জন্য নিঃশব্দ আত্মসমর্পণ।

যদি সে পাদ-প্ৰদীপের আলোয় আরও বেশি করে আসতে চায়। তবে সেই ভাবে গুরুত্ব পাওয়ার উপায় হল সতী হওয়া, যা পতিব্ৰতার জীবনের চূড়ান্ত পর্যায়। সমস্ত পুরাণগুলি এবং পরবর্তী সাহিত্যের অধিকাংশই সতীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ভারতীয় নারীর অন্তর্নিহিত মূল্যবোধের মধ্যে এই ধারণা কাজ করে যে, একজন সতী তার স্বামীর সঙ্গে চিরকাল স্বর্গে বাস করে। একজন সুখী বিবাহিত রমণীর কাছে এ এক লোভনীয় প্রস্তাব। কিন্তু অন্য দিকে যে নারী তার স্বামীর দ্বারা নিপীড়িত, অবহেলিতা— তার কাছে এই চিন্তা বিতৃষ্ণাই সৃষ্টি করে। এর পরেও যদি ‘সতী’র প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা তার কাছে কোনও ভাবে অর্থবহ হয় তবে তার কারণ হল সতীদাহের পটচিত্রের মতো প্রেক্ষাপট, এর চোখ ধাঁধানো নাটকীয় অস্তিম দৃশ্য, যেখানে শাঁখ বাজে, ঢাক ঢোল বাজে, জনতা জয়ধ্বনি করে আর সামাজিক উত্তেজনা ও ধর্মের বাতাবরণ তৈরি হয়। এই দৃশ্যপটের মধ্যে নায়িকা, সদ্যবিধবা নারী নববধূর মতো সাজে, তার শ্রেষ্ঠ পোশাক পরে, সিঁদুর কাজল ফুলমালা চন্দন আলতায় সুসজ্জিত হয়ে ধীরে ধীরে সে চিতায় ওঠে; তার স্বামীর পা দুটি বুকে আঁকড়ে ধরে কিংবা মৃতদেহকে দুই বাহুতে আলিঙ্গন করে; এই ভাবে যতক্ষণ না আগুন জ্বলে সে বিভ্ৰান্তির সঙ্গে অপেক্ষা করে। শেষ মুহুর্তে সে যাতে বিচলিত না হয়, এবং নীতিগত, দৃশ্যগত ভাবে ছন্দপতন না ঘটে, সে জন্য শুভাকাঙ্খীরা তাকে উত্তেজক পানীয় পান করায়। এমনকী পরে যখন আগুনের লেলিহান শিখা অসহনীয় হয়ে ওঠে; পানীয়ের নেশা কেটে যায়; তখন যদি সেই বিধবা বিচলিত হয়ে পড়ে; ‘সতীর মহিমা ক্ষুন্ন হওয়ার ভয় দেখা দেয়; যদি সে চিতা থেকে নেমে আসতে চায়–তখন সেই শুভাকাঙ্ক্ষীরাই তাকে বাঁশের লাঠি দিয়ে চেপে ধরে; প্রতিবেশী, পুরোহিত, সমাজকর্তা সকলেই অনুষ্ঠানের সাফল্যের জন্য অতিমাত্রায় সাহায্য করতে চায়। তারা গান করে, ঢাক বাজায়, এত উচ্চ জয়ধ্বনি দেয় যে, সতী যা কিছু বলতে চায় সবই উচ্চনাদে ঢেকে যায়।

যেখানে বিধবা স্বেচ্ছায় সতী হতে চেয়েছেন সেই রকম কয়েকটি মাত্র ব্যতিক্রমী উদাহরণ ছাড়া, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আত্মরক্ষার সহজাত প্রবৃত্তি কাজ করে এবং দীর্ঘকালীন সামাজিক শিক্ষাকে বিনষ্ট করে তার সেই প্রবৃত্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু একবার যখন ধাৰ্মিক প্রতিবেশী আর সমাজের নৈতিক রক্ষাকর্তারা সিদ্ধান্ত নেন যে মেয়েটিকে সতী হতেই হবে এবং যদি কোনও দুর্বল মুহুর্তে সে সম্মতি দিয়ে থাকে–বা না দিয়ে থাকে–তবু সে ভাগ্যের হাত থেকে অব্যাহতি পায় না। আমাদের মনে পড়ে সেই অধ্যাক্ষের কথা, যিনি জয় সম্পর্কে সুনিশ্চিত ছিলেন, কারণ, তিনি বিশ্বাস করতেন ঈশ্বর তাদের জয়ে সাহায্য করবেন তাই অধস্তনদের উপদেশ দিতেন ঈশ্বরে সর্বতো ভাবে বিশ্বাস রাখ। কিন্তু বারুদ শুকনো রাখতে ভুল কোর না।’ ঠিক তেমনই, সম্ভাব্য সতীর উদ্দেশের দৃঢ়তা আর ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি পুরোপুরি ভরসা না রেখে লোকেরা প্রয়োজনীয় নৈতিক ও দৈহিক সাহায্য নিয়েই উপস্থিত থাকে, যাতে জীবিত বিধবাদের বিশ্বাস সতীদাহের উপর থেকে টলে না যায়। এও সত্য হতে পারে যে, সমাজে বিধবাদের দুর্বিষহ সামাজিক ও দৈহিক দুৰ্দশা কোনও কোনও নারীকে প্রেরণা দিয়েছিল সব দুৰ্গতির একবারেই শেষ করতে। তাই শুভানুধ্যায়ীদের অনুপ্রেরণা, ঘটনার তাৎক্ষণিক গরিমার মোহ আর পরলোকের দুর্দশার ভয় কিংবা স্বর্গের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ছবি এই সব কিছু মিলেই মেয়েটিকে এই সিদ্ধান্ত নিতে উদ্যোগ জোগায়। আর তারপর সমাজ তাকে সেই সিদ্ধান্তে অবিচলিত থাকতে সাহায্য করে। পৌরাণিক কাহিনিতে পতিব্ৰতার কর্তব্যের মহিমাকীর্তন করা হয়েছে: এক পতিব্ৰতা সতী তার লম্পট কুণ্ঠরোগী স্বামীকে প্রতি সন্ধ্যায়। পিঠে বয়ে গণিকাগৃহে নিয়ে যায়। আর সকালে ফিরিয়ে আনে–সমাজের এই মূল্যবোধই বিধবা হত্যার প্রেরণা জোগায় আর তারপর তাকে সতীর সম্মান দেয়। এমনকী পুরুষ পুরোহিতদের নির্ধারিত নিয়মে বাঁধা এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজেও কিন্তু সতীপ্ৰথা টিকে থাকত না, যদি নারী নিজেই পরলোকের উজজুল ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর না হত, যদি তার আত্মীয়স্বজনদের প্রলোভনে মন্ত্রণায় বিচলিত না হত।

নারী নির্যাতনের অন্যান্য উপাদানের মতোই এই সতীদাহের মূলও তারই অবচেতনের গভীরে প্রোথিত এবং কুসংস্কারে লালিত অজ্ঞানে আচ্ছন্ন এই নারীর জন্য সমাজ পালানোর কোনও রাস্তা খুলে রাখেনি। মাঝে মাঝে যদি দু-একজন নারী সহমরণে না যান। তবে তো সতীত্বের গৌরবময় স্মৃতি জনচেতনায় মলিন হয়ে যাবে। এবং যদি মাঝে মাঝে সতীর স্মৃতিতে মন্দির, প্রার্থনাকক্ষ গড়া হয় তবে তো পুরোহিতদেরই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়। আর যুগ যুগ ধরে যে অতিকথা সরবে ঘোষিত হয়ে আসছে যে, কেবলমাত্র কোনও হিন্দু নারীই তার স্বামীর জন্য জীবন দিতে পারে (অন্যান্য ধর্ম ও সংস্কৃতিতে অনুরূপ উদাহরণগুলি অগ্রাহ্য করে এবং এই সব নারীদের ‘সতী’ আখ্যাও দেওয়া হয় না) সেই দাবি ও যুগে যুগে প্রমাণিত করা যায়। সুতরাং মাঝেমাঝে কোনও অভাগিনীকে পুড়িয়ে মেরে যদি সতীত্বের গৌরব শিখা অম্লান থাকে। তবে সমাজের, বিশেষ করে পুরোহিত ও নীতিবাগীশদের স্বার্থ রক্ষিত হয়। বৃহৎসংহিতা-র যুগ থেকেই সমাজ এই অতিকথা ঘোষণা করে আসছে যে, নারী তার স্বামীর প্রতি ভালবাসার জন্যই সহমরণে যায়। এই মিথ্যার অবসান হওয়া উচিত। যদি স্বামীর প্রতি প্রেমে এক নারী আত্মহত্যা করে তবে কেন আজ পর্যন্ত কোনও স্বামী তার স্ত্রীর চিতায় আত্মহত্যা করেনি? এতো হতে পারে না যে, আজ পর্যন্ত কোনও স্বামী তার স্ত্রীকে ভালবাসেনি। যদি সতীদাহের ভিত্তি হত প্ৰেম, তবে আমরা অবশ্যই কিছু কিছু ঘটনা দেখতে পেতাম যেখানে মৃত স্ত্রীর সঙ্গে স্বামীও সহমরণে গেছেন। কিন্তু তা হয়নি, এ বিষয়ে কোনও শাস্ত্রীয় বিধিও নেই। সুতরাং মূল ব্যাপার হল, স্বামীর স্বার্থে স্ত্রীর সম্পূর্ণ আত্মবিসর্জন; আর সতীদাহ এই আজীবন নাটকেরই পঞ্চমাংশের শেষ দৃশ্য। আজ একুশ শতকের দরজায় দাঁড়িয়ে আমরা এই সতীদাহের সগর্ব প্রশংসা শুনছি। আর সমাজ এই ভাবে কৌশলে নারীহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে, কারণ, ভারতবর্ষে পুরুষহত্যা অপরাধ, কিন্তু নারীহত্যা তা নয়। পরিবর্তে ধর্মের নামে পবিত্ৰতার নামে নারীহত্যা করতে পারা সমাজের কাছে সর্বদাই গৌরবের বস্তু। হিন্দু সমাজ ভয় দেখাচ্ছে যে, এই পবিত্র হত্যাকার্যের অধিকারে তারা কোনও হস্তক্ষেপ সহ্য করবে না। আত্মহত্যা যে অপরাধ, সেখানে লিঙ্গভেদ থাকা উচিত নয়, সে কথা সরিয়ে রেখে সেই আত্মহত্যাকে করে তোলা হয়েছে পুণ্যকর্ম–পুণ্য অগ্নিকে উজ্জীবিত রাখার জন্য সেই আত্মহত্যার স্থলে মন্দির তোলা হচ্ছে। যতদিন শিক্ষা, প্রগতি, যুক্তিনির্ভর বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে এই জঘন্য ধর্মীয় অন্যায় নরনারীর চেতনা থেকে উৎপাটিত না হয়, সমাজ সচেতনভাবে এই সব ঘটনাকে প্রতিরোধ না করে, এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি না দেয়, ততদিন শুধু রূপ কানোয়ারের সঙ্গে সঙ্গেই সতী প্রথার শেষ হবে না।

প্রাচীন ভারতবর্ষে শান্তি-র সংজ্ঞা

‘শান্তি’ কাকে বলে? নঞর্থক ব্যাখ্যার সাহায্যে এ প্রশ্নের সমাধান সূত্র পেতে পারি। ‘শান্তি’র অভাবে দেখা যায় অনৈক্য, অস্থিরতা এবং দ্বন্দ্ব; সুতরাং শান্তি নির্ভর করে সঙ্গতিবোধ, নিরুপদ্রবতা ও সৌহার্দপুর্ণতার উপর। এর বিভিন্ন প্রকারভেদ দেখা যায়: ব্যক্তিগত, পারিবারিক, কৌমগত, সমাজগত এবং রাজনৈতিক। বর্তমান সময়ে বিশ্বযুদ্ধের পথে পৃথিবী এক সামগ্রিক অবলুপ্তির সম্ভাবনার সামনে দাঁড়িয়েছে; তাই, আজ মানবজাতির ভবিষ্যৎ কর্মপন্থায় অত্যন্ত প্রাধান্যের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে শান্তি। একবার পুনর্বিচার করে দেখা যেতে পারে প্রাচীন ভারতে ‘শান্তির সংজ্ঞা কী ভাবে নির্ধারিত হয়েছে।

ভারতবর্ষে প্রাচীনতম গ্রন্থ ঋগবেদ-এ পারিবারিক শাস্তির জন্য কয়েকটি প্রার্থনা দেখা যায়। ৩:৬ সূক্তে দেখা যায় অসঙ্গতিপূর্ণ যে সব সম্পর্ক সেখানে বিবাদ ভঞ্জনের জন্য প্রার্থনা করা হয়েছে। শেষতম সূক্ত (১০:১৯১)-তে বলা হয়েছে:

‘সমবেত হও সকলে সমসূরে, কথা বল; তোমাদের মন ঐক্যবদ্ধ হোক; যেমন করে পূর্বকালে দেবতারা সুষম ভাবে তীদের অর্ঘ্যের ধর্মীয় অংশগ্রহণ করতেন। তোমাদের মতামত এক হোক; তোমাদের সভা এক হোক তোমাদের সংকল্প, হৃদয় এক হোক; যেন তোমরা একত্রে দীর্ঘকাল বাস কর–ঐক্যে ও সংহতিতে।’(১)

অপেক্ষাকৃত পরবর্তীকালে রচিত বৈদিক সংহিতা অথর্ববেদ এ কয়েকটি সমভাববিষয়ক সুক্তের দেখা পাওয়া যায়। এর মধ্যে সবচেয়ে যেটি বিখ্যাত (৩:৩০), সেখানে বলা হয়েছে:

‘আমি তোমাদের ঐক্যবদ্ধ হৃদয়ে ও মনে বিদ্বেষ রহিত করি; একে অপরকে ভালবাস, যেমন গাভী ভালবাসে তার বৎসকে, যাকে সে জন্ম দিয়েছে; পুত্র পিতার অনুগামী হোক, মাতার সমমনস্ক হোক… পত্নী স্বামীর প্রতি নম্র এবং মধুর ভাষিণী হোক ভ্রাতা যেন কখনও ভ্ৰাতার প্রতি দ্বেষ না করে; অথবা ভগ্নী ভগ্নীকে আঘাত না করে; হৃদয়ে এবং কার্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একত্রে গ্ৰীতিপূর্ণভাবে সমান আচরণ কর…নম্র ভাবে সর্বকার্যে পরিকল্পনায় ঐক্যবদ্ধ হও… মধুর বাক্যে এক চিত্তে, সংঘবদ্ধ ভাবে সমমনস্কতায়।’(২)

একই ভাব প্রতিফলিত হয়েছে অন্য সূক্তগুলিতেও k(১-৩, ৬, ৭৪:২; ৬:৯8:১-৩)।(৩) মানুষ সমগ্র প্রকৃতির কাছে প্রার্থনা করেছে শান্তিপূর্ণভাবে মানুষের প্রতি সদয় আচরণ করার জন্য। বন্ধুর সঙ্গে ঐক্য রেখে বাস করা কঠিন নয়; কিন্তু প্রাচীন ভারত উপলব্ধি করেছিল অপরিচিতদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হওয়া কত কঠিন। কিন্তু এ কথাও সে বুঝেছিল, যতই কঠিন হোক এই কাজ সাধন করতেই হবে। তাই এই প্রার্থনা:

হে আমার অন্তরাত্মা, ভয় কোর না, যেহেতু আকাশ ও পৃথিবী ভীত হয় না; যেমন দিন এবং রাত্রি…সূর্য এবং চন্দ্ৰ… ব্রাহ্মণ আর ক্ষত্রিয়…সত্য আর অসত্য…অতীত আর বর্তমান ভীত হয় না।’(৪)

শাস্তির জন্য যে প্রার্থনা করে তার পক্ষে কঠিনতম কাজ হল ‘যারা আমাদের আপনি তাদের সঙ্গে যেন এক হতে পারি এবং যারা আমাদের থেকে ভিন্ন তাদের সঙ্গেও যেন এক হতে পারি।(৫)

একটি সূক্তে প্রার্থনা করা হয়েছে:

‘প্রশান্ত দৌ, প্রশান্ত পৃথিবী, প্রশান্ত অন্তরীক্ষ ও ভূমি, জলাধারের জলভার প্রশস্ত, আমাদের জল প্ৰশান্ত, আমাদের ওষধি প্রশান্ত হোক…যা কিছু ঘোর, যা কিছু ক্রুদ্র, যা পাপ সব কিছু হোক প্রশমিত, শুভা; সব কিছু প্ৰশান্ত হোক।’ (অথর্বসংহিতা ১৯.৯)

প্রাচীন মানুষ অন্তরীক্ষবাসী এক শক্তির অস্তিত্ব কল্পনা করেছিল এবং বারংবার সেই শক্তির কাছে প্রার্থনা করেছিল সহৃদয় বিদ্যান্যতা।(৭) বিবাহে, দম্পতির মধ্যেও পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ, সুসামঞ্জস্য ঐক্যের প্রার্থনা করা হয়েছে।(৮)

যখন কোনও বিদ্যাখী তার গুরুর কাছে আনুষ্ঠানিক দীক্ষণ প্রাপ্ত হয় তখন শুরু শিষ্য উভয়েই শিক্ষাকালীন দীর্ঘ সময়ের জন্য পারস্পরিক সম্পর্কের সামঞ্জস্যের জন্য প্রার্থনা করেন। এই সময়টুকুতে এবং তাদের জীবৎকালের জন্যও শিক্ষক ছাত্রের পিতৃতুল্য। এই ভাবে প্রার্থনার মধ্যে তাদের সামাজিক সম্পর্কের সমগ্র সময়টুকুই সুচিত হয়। গোষ্ঠীগত জীবনে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ঘৃণা ও প্রতিযোগিতা সহজেই দেখা যেত। এমনকী যখন যাযাবর আর্যরা দেশীয় জনগোষ্ঠীকে পরাজিত করে কৃষিজীবীর জীবনধারায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে পড়ল তখন আন্তঃগোষ্ঠী দ্বন্দ্বের অসংযত উচ্ছাস বহু দেখা যেত্ব। তবু তারা ধীরে ধীরে উপলব্ধি করে, সমৃদ্ধির মূল শর্ত হল শান্তি। তাই শান্তি রক্ষার প্রচেষ্টা দেখা গেল। যুদ্ধের এমনকী জয়ের অভিজ্ঞতা ছিল তিক্ত।

বিখ্যাত সম্রাট অশোক। তাঁর কলিঙ্গ যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী করুণ অভিজ্ঞতার পরে এ রকমই তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন।(৯) ফলত যুদ্ধ ত্যাগ করে তিনি বৌদ্ধ ধর্ম গ্ৰহণ করেন, প্রজাদের মধ্যে অহিংসা প্রচার করেন এবং নির্মম বিচারকের পরিবর্তে স্নেহময় পিতার মতো শাসন পরিচালনা করতে থাকেন। তক্ষশিলা স্তম্ভে তার আরামায়িক শিলালিপিতে বলা হয়েছে: ধর্ম হচ্ছে সৃষ্টির জন্য, প্রাণীদের জন্যে অন্যাঘাত যা কিছু অহিংসা তারই জন্যে।(১০) গ্রিক ভাষায় রচিত তাঁর কন্দাহার লিপিতে আছে: ‘যারা এখানে বসবাস করতেন তারা ভালবাসতেন এবং বন্ধু ও স্বজনদেরকে পরস্পরকে প্রতারণা থেকে বিরত থাকতেন, ক্রীতদাস ও ভৃত্যদের প্রতি যথাসম্ভব কোমল ব্যবহার করতেন— যদি এদের মধ্যে কারও মৃত্যু হত বা দেশান্তরিত হতে হত। তবে সে ঘটনা অন্যদের কাছে ব্যক্তিগত বেদনার মতোই অনুভূত হত।’ তার প্রস্তর লিপি ৪ (কালসি) বলে, ‘সম্রাট প্রিয়াদশী নির্মিত দয়ার বিধি. সর্ব জীবনে হিংসা পরিহার।’ নবম প্রস্তর লিপি বলে, ‘ক্রীতদাস ও ভূত্যের প্রতি ন্যায্য ব্যবহার, গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা, জীবিত প্রাণীর প্রতি (হিংসায়) সংযম।’ ত্ৰয়োদশ শিলালিপি ঘোষণা করে, ‘দেবগণের প্রিয়’ আকাঙ্ক্ষা করেন সর্বজীবের হিংসা হতে মুক্তি, আত্মসংযম, যথাযথ আচরণ ও মৃদুতা।

প্রকৃতপক্ষে এ ঘটনা উল্লেখযোগ্য যে, ভারতবর্ষের ইতিহাসে যে প্রথম সম্রাট এক বিশাল ভূখণ্ডের অধীশ্বর ছিলেন এবং যিনি এক অশুভ-রক্তমানের মাধ্যমে প্রতিবেশী রাজ্য কলিঙ্গকে পরাজিত করে নিজের রাজ্যসীমা বাড়িয়েছিলেন, তিনিই যুদ্ধলোভী, রাজ্যখণ্ডপিপাসু সম্রাটদের গতানুগতিক পথকে পরিত্যাগ করেছিলেন। অশোকের পক্ষে এই রকম একটি যুদ্ধের রক্তক্ষয়ী অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট ছিল; তিনি তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় দিগ্বিজয়ী চক্রবর্তী সম্রাটের পথ পরিত্যাগ করলেন এবং অহিংসা, সাম্য ও শাস্তির পথ অবলম্বন করলেন।

জীবনে অমঙ্গলের মূলোচ্ছেদ করার জন্য বুদ্ধদেব যে মার্গ নির্দেশ করেছিলেন সেই পথই অশোক বেছে নিলেন: অমঙ্গলের এই উৎস ছিল আকাঙ্ক্ষা, তিনহা’ (তৃষ্ণা)–যার প্রেরণায় মানুষ নূতন থেকে নূতনতর বস্তু প্ৰাপ্তির জন্য চেষ্টা করে। যখন সহজে এই আকাঙ্ক্ষার নিবৃত্তি হয় না, তখন সংঘর্ষ হয়ে পড়ে অনিবার্য। উচ্চাশার মূলে আছে আকাঙ্ক্ষা, আকাঙ্ক্ষা আত্মকেন্দ্ৰিক এবং এই আত্মবোধের পুষ্টি হতে পারে কেবল প্রতিদ্বন্দীর স্বার্থকে আঘাত করে, বিনষ্ট করে। যখন নিজের আত্মস্বার্থের সন্ধানে প্রণোদিত মানুষ ধাক্কা খায় তখন প্রতিদ্বন্দীর বিনিময়েও মানুষকে নিজের স্বর্থ সন্ধানে প্ৰবৃত্ত করে তার অহংকার এবং এই অহংকারের ভিত্তি হল। তার নিজের মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করার নির্মম উচ্চাশা।

কারণ, ব্যক্তিগত মর্যাদাকে অতিক্রম করে যে সমষ্টিগত মর্যাদাবোধের মহত্তর প্রতিষ্ঠা, মানুষকে সে কথা শেখানো হয়নি। তার নিজের সংগ্রাম শুধু সংকীর্ণ, নিষ্ঠুর, নিরন্তর। এই আত্মপ্রতিষ্ঠার তাড়না যত বেশি, বিপর্যয় আর বিনাশ ততই বৃহত্তর। দুটি বিশ্বযুদ্ধ আমাদের সামনে সুস্পষ্ট করে দিয়েছে যে, জাতীয় আত্মম্ভরিতার সংঘর্ষ মানবতার কত সুদূরপ্রসারী বিনাশ করতে পারে। যুদ্ধ শেষ হয়, সই হয় শাস্তির সন্ধি, ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। কিন্তু ক্ষতস্থান কখনও নিরাময় হয় না, তার চিহ্ন থেকে যায়। তবু এখনও কোনও কোনও মহাশক্তি, অদ্ভুত সাবলীলতায় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিকল্পনা করতে থাকে; নির্লজ্জ স্পর্ধায় তারা বিশ্বজনীন ধ্বংসের পথে দ্রুত ধাবমান হতে চায়।

ধ্রুপদী সংস্কৃত নাটকে কোনও চরিত্রের মুখে একটি অন্ত-শ্লোক উচ্চারণের প্রথা আছে, তাকে বলা হয় ‘ভারতবাক্য’। মঞ্চস্থ অন্যান্য কুশীলবের প্রতি, সেই সঙ্গে অন্যান্য দর্শকদের প্রতি এটি প্রযোজ্য। অন্য ভাবে বলা যায়, এই প্রার্থনাগুলি সমগ্ৰ গোষ্ঠীর মনোবাসনাকে রূপায়িত করে। প্রায়ই দেখা যায়। এই সব ‘ভারতবাক্য’-তে সমষ্টির শান্তি ও নিপাপত্তা প্রার্থনা করা হয়েছে। প্রাচীন নাট্যকার ভাস, তার অবিমারক নাটকের শেষে বলেছেন, ‘যেন পৃথিবীর সমস্ত প্ৰজা সুখে থাকে।’(১১) তার কর্ণভার নাটকের সমাপ্তিতে বলছেন তোমরা সকলে সুখে সমৃদ্ধিতে থাক, সর্ব বিঘ্ন বিনাশ হোক, রাজ্যোচিত গুণসম্পন্ন রাজা পৃথিবী শাসন করুন। মহাবীর চরিতের সমাপ্তি অংশটি গুরুত্বপূর্ণ যেন জ্ঞানী ব্যক্তিগণ তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বীর কার্যকলাপে আনন্দ খুঁজে পান।

কালিদাস, তাঁর বিক্রমোর্বিশীয় এবং অভিজ্ঞান শকুন্তলম্ নাটক শেষ করছেন এই প্রার্থনা জন্য সুশাসন করেন। তার মালবিকাগ্নিমিত্ৰ নাটক সমাপ্তিতে বলা হয়:

‘সমগ্র জগৎ সুখী হোক; সর্ব প্ৰাণীকুল অপরের কল্যাণে নিজেদের উৎসর্গ করুক, অমঙ্গল বিনষ্ট হোক, সর্বত্ৰ সকলে আনন্দিত হোক।’

বৌদ্ধ বিষয়বস্তু নিয়ে রচিত শ্ৰীহৰ্যের নাগানন্দ নাটকের সমাপ্তি হচ্ছে এই বাক্য দিয়ে: যেন সকল প্রাণী (প্রজাগণ), সর্ব বিপন্মুক্ত হয়ে সৎকর্মেরত থাকে এবং বিদ্বেষশূন্য চিত্তে, ঘনিষ্ঠ বন্ধুমণ্ডলীর মধ্যে আনন্দ উপভোগ করে।

এখানে নাট্যকার আনন্দের মূল সুরটির সন্ধান পেয়েছেন। বিদ্বেষশূন্য চিত্তে’ এবং সৎকর্মে আত্মনিয়োগ করা’–কেবলমাত্র এগুলির মাধ্যমেই সামগ্রিক শান্তি ও সুখলাভ নিশ্চিত হতে পারে। আর এই পথেই আনা যায় সমষ্টির শান্তি।

ভারতবর্ষে যুদ্ধ ও শান্তির শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য গ্ৰন্থ এ দেশের, সম্ভবত পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য–মহাভারত। এখানে কুরুসিংহাসনের অধিকার নিয়ে দুটি প্রতিদ্বন্দী ভ্রাতৃসম্পর্কিত বংশধারার মধ্যে নিষ্ঠুর, রক্তক্ষয়ী সংগ্ৰাম হয়েছিল। যখন বিপুল ধ্বংসের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শেষ হল, তখন স্বজনের রক্তমাখা পথে হেঁটে যে সিংহাসন তারা জয় করেছেন সেই সিংহাসনে বসতে বিজয়ীরা বিতৃষ্ণা অনুভব করলেন। বিজয় তার গৌরব হারাল। তাদের অভিজ্ঞতার অভিব্যক্তি এই:

‘যেমন কোনও ব্যক্তি কূপখনন করার পর দেখে সেখানে জল নেই, তাকে কৰ্দমাক্ত, ক্লিন্ন অবস্থায় ফিরে আসতে হয় আমাদের এই প্রচেষ্টার ফলও অনুরূপ হয়েছে।(১২)

যে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার প্রাপ্য এই সিংহাসন, অথচ যিনি বৈরাগ্য ও তীব্ৰ আত্মিক ক্ষোভে বিচলিত, তাকে মধ্যম ভ্ৰাতা বলেন:

‘যে যুদ্ধে তীর কার্যকরী হয় না, যেখানে শত্রু মিত্র কারও কোনও উপকারিতা নেই। হে রাজন। আজ সেই যুদ্ধ তোমার সম্মুখে উপস্থিত, যে যুদ্ধ, নিজের অন্তলোকে একাকী করতে হয়।’(১৩)

তিনি অগ্রজকে প্রায়শ্চিত্তের পরামর্শ দেন, ক্ষত্ৰিয় বংশে জাত ব্যক্তির পক্ষে যুদ্ধ অবশ্য কর্তব্য এবং প্রশংসনীয় কর্তব্য এই যুক্তিতে সাত্মনা দিতে থাকেন।

উত্তরে অগ্রজ বলেন:

‘যে সম্রাট এই সমগ্ৰ পৃথিবী শাসন করবেন, এমনকী তাঁরও কেবল একটিই উদর; তবে কেমন করে তুমি যুদ্ধের প্রশংসা করা?… তুমি (যুদ্ধে বিজিত) ভোগ্যবস্তু সমূহের ভোগ সুখের প্রশংসা করছ, কিন্তু যারা এগুলি ভোগ করেন না, যাঁরা দুর্বল, তারাও উচ্চ। (আত্মিক) স্তর প্রাপ্ত হয়ে থাকেন।’

মিথিলাপতি জনক বলেন:

‘আমি কিছুরই অধিকারী নই, তবু আমার সম্পদ অসীম; মিথিলা দগ্ধ হয় তবু আমার কোনও কিছুই দগ্ধ হয় না।’(১৪)

যে চিরন্তন আভ্যন্তরীণ অস্থিরতা মানুষকে অধিকার বোধের প্রশ্নে তড়িত করে, প্রাচীন ভারতের প্রজ্ঞা এখানে সামগ্রিক ভাবে তার গভীর মূলে অনুসন্ধান করেছে। মানুষ যখন এমন একটি সীমায় পৌঁছায় যেখানে ব্যক্তি, সম্প্রদায় বা জাতিগত ভাবে অধিকার প্রাপ্তির যুক্তিহীন তাড়না কোনও বাহ্যিক শক্তির মাধ্যমে বাধা পায় তখন শান্তি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। যখন জনক বলেন যে তার রাজধানী মিথিলা অগ্নিদগ্ধ হলেও তাঁর কিছু দগ্ধ হচ্ছে না, তখন তিনি সমস্ত পার্থিব অধিকারবোধ থেকে নিজেকে বিযুক্ত করেন এবং এর ফল অন্তরের শান্তি, সমস্ত জগৎকে অধিকার করার এক উল্লসিত বোধ। ঈশোপনিষদের প্রারম্ভিক শ্লোকেও এই প্রকার একটি উপলব্ধি দেখতে পাই:

‘সমগ্র জগৎ ঈশ্বরের দ্বারা আচ্ছাদিত, তার দ্বারা যা পরিত্যক্ত তাই-ই ভোগ কর। অপরের ধনে লোভ করে না।’

ধনে লোভ করে না। যখন ব্যক্তি হয় আত্মকেন্দ্রিক, সংকীর্ণতায় আচ্ছন্ন, তখন তুচ্ছ কণাটির বিয়োগও অসহ্য হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ বলেন: অল্প লইয়া থাকি, তাই মোর যাহা যায় তাহা যায়। অন্য ভাবে বলা যায়, কোনও কিছু হারাবার উপায় হল অল্পের অধিকার মদে মত্ত না হওয়া, ব্যক্তিগত অধিকারবোধের উদ্ধৰ্ব চেতনাকে প্রসারিত করা। অধিকারের আকাঙ্ক্ষায়, ব্যক্তিগত ভাবে নিঃশেষে অধিকার করার তাড়নায় অস্থির মানসিকতা থেকেই সৃষ্টি হয় দ্বন্দ্ব, অসাম্য। আর সংঘর্ষের আকাঙ্ক্ষা। এর পরে তা মানুষকে নিয়ে যায় প্রভুত্বের অধিকারের পথে, যার সঙ্গে ঘটনার প্রবাহে সংঘর্ষ হয় প্রতিদ্বন্দী আকাঙ্ক্ষার। এর ফলে পারস্পরিক দ্বন্দ্বে। এই আকাঙ্ক্ষা মানুষের শান্তিহরণ করে, নিদ্ৰাহরণ করে। আর্ত, ক্ৰোধী এবং প্রেমিকের জন্য নিদ্রা কোথায়?(১৫) যখন শেষতম কৌরব রাজপুত্ৰ মৃত্যুমুখে পতিত, তখন তাঁর বিজয়ী জ্ঞাতিভ্রাতাদের একজন বলেছিলেন: ‘অনুশোচনা কোর না, আমরা যারা অবশিষ্ট রইলাম তারাই করুণার পাত্র।’(১৬) দীর্ঘ এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পরে বিজয়ীর কাছে জয়ের উপলব্ধি কেমন করে ধরা দিয়েছে, এই তার উপলব্ধি। এ শুধু সস্তুষ্টির লেশশূন্যতা নয়, উপরন্তু এক নিশ্চিত দুঃখের ইঙ্গিতবাহী, কারণ এই প্রক্রিয়াতে সকল সঙ্গী এমনকী ভ্রাতারাও নিহত হয়েছেন।(১৭) মৃত্যুপথযাত্রী মহাকাব্যের নায়ক তার জীবিত জ্ঞাতি ভ্রাতাদের কাছে আবেদন জানিয়েছেন–‘আমার সঙ্গে সঙ্গে যেন এই যুদ্ধেরও অবসান হয়, যেন এই পৃথিবীর রাজগণ পুনরায় সুস্থ থাকেন।’(১৮)

তাহলে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা একপ্রকার অসুস্থতা! গান্ধারী, পরাজিত বিধ্বস্ত এবং মৃত রাজপুত্রদের অন্ধ বৃদ্ধা জননী যুদ্ধের প্রেরণাদাতা কৃষ্ণকে অভিশাপ দিয়েছিলেন: কৃষ্ণের মৃত্যু হবে বড় নির্মম, কারণ যুদ্ধে তাঁর কোনও প্রত্যক্ষ লাভ ছিল না; তিনি এই অযথা রক্তপাত বন্ধ করতে পারতেন–কারণ উভয়পক্ষই তার কথা শুনন্ত–তবু তিনি তা করেননি।(১৯) মহাকাব্যের কবি গান্ধারীর বাক্যগুলিকে সত্য প্রমাণিত করেছেন। তার অভিশাপ অনুযায়ীই কৃষ্ণের মৃত্যু ঘটেছিল। অন্য ভাবে বলা যায়, মহাকবির মতে রক্তক্ষয়ের প্রতিরোধ না করা ছিল প্রথম পর্যায়ের অপরাধ। যুদ্ধের অবসানে, যখন লোভী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী রাজপুত্রদের শবদেহে ভূমি আকীর্ণ তখন সেই দৃশ্যের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এই ভাবে–‘এই পৃথিবীর অধীশ্বরগণ, সর্বাঙ্গ দিয়ে ভূমিকে আলিঙ্গন করে, ভূমির জন্যই ভূ-শয্যায় শুয়ে আছেন।’ যুদ্ধে কার লাভ হয়? মহাকাব্যের কবি বলেন: শুকর আর কুকুরের মধ্যে যখন সংঘর্ষ হয়, তখন লাভবান হয়। কেবল শ্মশানরক্ষক।(২০) পরে আমরা এই রূপকল্প বিষয়ে আবার আলোচনা করব।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে একজন আচাৰ্য যুদ্ধের বিরুদ্ধে উপদেশ দিয়েছিলেন: ভ্ৰাতাদের সঙ্গে ভাগ করে পৃথিবী (রাজ্য) উপভোগ কর, হয়তো তোমার পীড়া আরোগ্য হবে।(২১) যখন কেউ তার স্বজনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তখন আভ্যন্তরীণ শান্তি ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে ভেঙে পড়ে; এই অস্থির বিবেক যন্ত্রণার সঙ্গেই পীড়ার তুলনা করা হচ্ছে। প্রকৃত অর্থে যুদ্ধারম্ভের পূর্ব মুহূর্তে ধর্মনিষ্ঠ জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা তাই ছুটে গেলেন বিপক্ষ শিবিরে, বয়োজ্যেষ্ঠ ও শুরুজনদের পায়ে ধরে, আকুল আবেদন জানালেন যুদ্ধ না করার জন্য, আসন্ন হত্যালীলাকে রোধ করার জন্য। উত্তর পেলেন:

‘মানুষ বিত্তের দাস, বিত্ত কারো ভৃত্য নয়; হে রাজন, জেনে রাখ, এই-ই প্রকৃত সত্য। বিত্তের পরিবর্তে আমরা স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়েছি; তাই আমরা নপুংসকের মতো কথা বলছি।’(২২)

এই মহাকাব্যে একটি ছোট রূপক আছে: প্ৰজাপতি ব্ৰহ্মা লোকসংখ্যার আধিক্যে চিন্তিত হয়ে পড়লেন: তাঁর দুশ্চিন্তা উদ্বেগ থেকে এক নারীর উদ্ভব হল: ব্ৰহ্মা তাকে সৃষ্টি ধ্বংসের নির্দেশ দিলেন। নারী ক্ৰন্দন করে উঠল, তার সেই অশ্রু ব্ৰহ্মা অঞ্জলি বদ্ধ করে ধারণ করলেন; সেই অশ্রু হল ব্যাধিসমূহ। তারপরে আবার ব্ৰহ্মা আদেশ দিলেন সৃষ্টি ধ্বংসের; নারী এক অনুগ্রহ প্রার্থনা করল–মানুষের নিজের দোেষই যেন তাঁর মৃত্যুর কারণ হয়। বিধাতা বললেন ‘তথাস্তু’।(২৩) যে কারণে বহুসংখ্যক মানুষের বিনাশ ঘটে, মানুষের অভিজ্ঞতায়, তার মধ্যে তীব্রতম, ব্যাপকতম হল যুদ্ধ। রূপক কাহিনির মতে এই সব মৃত্যুর কারণ হল মানুষের নিজেরই দোষ। কার দোষ? তা কিন্তু যে ভুক্তিভোগী তারই দোষ আবশ্যিক ভাবে নয়, দোষ সেই শক্তির, সেই গোষ্ঠীর এমনকী সেই ব্যাক্টর যে বা যারা স্থির শীতল বুদ্ধিতে এই সব তাণ্ডবের পরিকল্পনা করে এবং মৃত্যুর ফসল। ঘরে তোলে। শূকর এবং কুকুর ঝগড়া করে, মারা যায়। যে শ্মশানরক্ষক–তাদের চামড়া বিক্রি করে আনুষঙ্গিক আয় করে–সে তাদের বিদ্বেষের সুযোগ নিয়ে নিজে লাভবান হয়। স্পষ্টদশী মহাকবি যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ভাগ্যের পরিহাস অনুভব করেছেন। তিনি মহাকাব্যের মহাযুদ্ধ, ব্যাপক ধ্বংস কাণ্ডের বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন, আর মানব জাতি যে সব শিক্ষা নিতে অসম্মত হয়, সেই সব তত্ত্বকথা নিরাবেগ কঠিন ভাবে বর্ণনা করেছেন।

সমাপ্তিসূচক আখ্যান রূপে আমরা একাদশ শতকের একটি নাটক, বাঙালি নাট্যকার ভট্টনারায়ণ বিরচিত বেণী সংহার(২৪)-এর গর্ভাঙ্ক দৃশ্যের দিকে তাকাতে পারি। মহাভারত যুদ্ধের শেষাংশের ঘটনা অবলম্বনে নাটকটি রচিত। ঘটনার শেষ ভাগে যখন আঠারো দিন ধরে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে ভ্ৰাতৃরক্তপাত চলেছে তখন আমরা একটি গর্ভ-দৃশ্যে(২৫) দেখতে পাই রাক্ষস রুধিরপ্রিয়(২৬) র তার রাক্ষসী সঙ্গিনী বাসাগন্ধার(২৭) সংলাপ। রাক্ষসীর স্বগতোক্তিতে বোঝানো হয়েছে, তাদের ভাণ্ডার পরিপূর্ণ, দীর্ঘদিন চলার মতো যথেষ্টরিক্ত,মাংস, হাড়,চৰ্বি, ইত্যাদি সেমৃতবীরদের দেহ থেকে সংগ্রহ করে রেখেছে। তাই স্বামীকে সে ভোজনে আপ্যায়ন করতে চায়। রাক্ষস তার গৃহিণী প্রবৃত্তির প্রশংসা করে বলে যে, সে নিজে তৃষ্ণার্তা, ঈষদুষ্ণ (অর্থাৎ টাটকা) রক্ত পান করতে চায়; রাক্ষসী সেইরূপ পানীয়ই দেয়, রাক্ষস তৃপ্ত হয়। সানন্দে তারা এই আত্মক্ষয়ী যুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ স্মৃতিচারণার মাধ্যমে বর্ণনা করে; বলে শবদেহের স্তুপের কথা যা, তাদের কাছে প্রচুর সুস্বাদু খাদ্যভাণ্ডার স্বরূপ। রাক্ষসী দেখায় তার পুরাতন সম্ভার আর নূতনতর সংগৃহীত খাদ্যভাণ্ডার। সে বলে, যুদ্ধ যদি এই ভাবে চলতে থাকে তবে তার আর খাদ্যচিন্তা থাকবে না। সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের মনে পড়ে পূর্বোক্ত শূকর আর কুকুরের দ্বন্দ্বের কথা। যাদের মৃত্যুতে লাভবান হয়েছিল অপর এক তৃতীয় পক্ষ। রাক্ষস দম্পতির সংলাপে একটি রূপক অর্থ আছে: যতদিন মানুষ তাঁর ভ্রাতার বিরুদ্ধে অর্থাৎ অপর মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে, ততদিন যুদ্ধ ব্যবসায়ীরা–অর্থাৎ অস্ত্ৰবণিক বা যুদ্ধের অধিপতিরাসমৃদ্ধ, বর্ধিষ্ণু হতে থাকবে। যুদ্ধ কেবল রাক্ষসদেরই সমৃদ্ধির জন্য। শান্তি তাদের স্বার্থের পরিপন্থী। তাই বিশ্বশাস্তির যে কোনও সম্ভাবনার বিরুদ্ধে তারা দৃঢ়প্ৰতিজ্ঞ এবং স্বস্ব রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারকদের আড়ালে থেকে তারা শান্তির বিরূপ পদক্ষেপ পরিকল্পনা করে যায়। যাঁরা শান্তি ভালবাসেন, যাঁরা জীবনকে ভালবাসেন তাদের ঐক্যবদ্ধ ভাবে এই যুদ্ধ ব্যবসায়ীদের কার্যকলাপ অনুমান করতে হবে, বুঝে নিতে হবে, তার দৃঢ় প্রতিবাদ করতে হবে।

পরিবারগত ভাবে, দাম্পত্য সম্পর্কে, পিতামাতা ও সন্তানদের মধ্যে অথবা শুরু শিষ্যের মধ্যে, প্রতিবেশীদের মধ্যে–যেখানেই হোক না কেন, দ্বন্দ্বের মূল কিন্তু এক। লোভ, দম্ভ, অহংকার, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অসহিষ্ণুতা এবং প্রতিযোগিতামূলক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বুদ্ধদেব যথাযথ ভাবেই নির্ণয় করেছিলেন; তানহা–‘তৃষ্ণা’ আকাঙ্ক্ষাই এই সামগ্রিক বিষচক্রকে আবর্তনে প্ৰবৃত্ত করে। তবু আকাঙ্গিক্ষণ নিজে জীবনের এক অনুষঙ্গ স্বরূপ। কখন তবে আকাঙ্ক্ষার মধ্যে বিষ সঞ্চারিত হয়? যখন অপরের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে ভ্ৰষ্ট আকাঙ্ক্ষা হতাশায় প্রত্যাঘাত করে।

যেহেতু আমরা নিজেদের নিয়েশান্তিতে থাকার শিক্ষা পাই না। তাই আমরা সেই আকাঙ্ক্ষা পোষণ করি যা অপরের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বিরোধ বাধায়। বৌদ্ধগ্রন্থ ললিত বিস্তার-এ আমরা একটি নূতনতর সামাজিক সুস্থভাবনার পরিচায়কসুর শুনতে পাই: বহুজনহিতায়, বহুজনস্খায়, লোকানুকমন্স্পয়ৈ মহতোজনকায়স্যঅর্থায়–‘অনেকের মঙ্গলের জন্য, অনেকের আনন্দের জন্য, মানবজাতির প্রতি সহানুভূতিতে, সর্বাপেক্ষা অধিক সংখ্যক লোকের প্রয়োজনে।’ এই প্রকার লক্ষ্যের একটি স্বাভাবিক পরিণাম আছে: যখন গোষ্ঠীর বৃহত্তর স্বার্থের সঙ্গে সংঘাত বাধে, তখন ব্যক্তি তার নিজস্ব অবাধ আত্মস্বর্থকে রূপান্তরিত করতে বাধ্য হয়।

এই প্রকার শিক্ষা ফলপ্রসূ ভাবে কার্যকর হওয়ার পূর্বে, অবশ্যই গোষ্ঠীগুলির আর্থিক এবং রাজনৈতিক গঠন আমূল পরিবর্তিত হওয়া উচিত। বর্তমানে অধিকাংশ সমাজব্যবস্থাই পুজিবাদী। অন্যান্য প্রতিবেশীকে বঞ্চিত করে আত্মসমৃদ্ধি সাধনের জন্য কোনও সম্প্রদায়বিশেষের উদগ্র আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে এই সব সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এমনকী এই সব সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরেও কেবল মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগী ব্যক্তিই জনগণের পরিশ্রমের ফল নিজেরা ভোগ করে থাকে। শোষণ যে ভাবেই করা হোক, তার মূলে থাকে লোভ এবং অনৈতিক, দ্বন্দ্বমূলক আকাঙ্ক্ষা। সমাজবাদের ভিত্তি হল প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহযোগিতা, মুষ্টিমেয়ের দ্বারা বহুজনকে শোষণ করার পরিবর্তে সকলের জন্য করুণা ও সহানুভূতি। এর প্রচলনের মাধ্যমে সর্ব প্রকার সামাজিক ও বিশ্বনৈতিক অমঙ্গল দূরীভূত হতে পারে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, রাতারাতি অথবা আপনা হতেই সর্বপ্রকার অমঙ্গল অন্তর্হিত হবে, কারণ আমাদের মানবিক পরম্পরার অধিগঠন গড়ে উঠেছে বহু সহস্রাব্দ ধরে এবং একে উন্মুল করতে সময় লাগবে। কিন্তু একবার যখন সামগ্রিক ভাবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা থেকে অপরকে শোষণ করা, পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অপরকে আঘাত করা বা অপ্ৰতিভ করার প্রবণতা মুছে যাবে, তখনই পৃথিবীতে প্রকৃত শান্তির বাতাবরণ আসবে, পারিবারিক সাম্প্রদায়িক এবং রাষ্ট্রগত শান্তি দেখা দেবে।

যুদ্ধের আশঙ্কা যেহেতু অতি স্পষ্ট এবং নিষ্ঠুর বাস্তব, সেহেতু যাঁরা বিশ্বশাস্তির স্বপ্ন দেখেন সেই সব মানুষের সক্রিয়তা আশু প্রয়োজন। কারণ, রক্তপিপাসু দানবেরা ক্রিয়াশীল, তাদের মূলধন হল পারস্পরিক ঘৃণা, উচ্চাশার সংঘাত, মানুষের অন্তর্নিহিত নিষ্ঠুরতা-বিলাস এবং তার বোধহীন আত্মঘাতী মনোবৃত্তি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এইসব অত্যাচারী তাদের তাণ্ডব চালিয়ে এসেছে। আশা করতে পারি।–শান্তিকামীরা তাদের উদ্দেশ্যকে সকল করার জন্য সচেষ্ট হবেন, দানবের অ-শিব চক্রস্তকে বিনষ্ট করবেন। অন্ত্র ব্যবসায়ীরা সুকৌশলে প্রচারমাধ্যম, বিজ্ঞাপন, সাহিত্য এমনকী জ্ঞানের অন্যান্য শাখার মাধ্যমেও অতি সূক্ষ্ম ভাবে আবার কখনও কখনও অনতি সূক্ষ্মভাবেও এই যুদ্ধোন্নাদনাকে উচ্চকিত করে চলেছে। শান্তি জীবনকে নিশ্চিত করে, সুতরাং শেষ কথা বলার অধিকার শাস্তিরই থাকা উচিত। কিন্তু আণবিক অস্ত্ৰযোগে বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে শাস্তির সম্ভাবনা বিলীয়মান মনে হয়। যুদ্ধকারীদের সংকেতকে বিনষ্ট করে আমাদের তাদের প্রচেষ্টা ব্যৰ্থ করতে হবে। জনগণকে তাদের সমষ্টিগত স্বার্থে জাগ্রত করতে হবে। ওই সব অমঙ্গলকামী স্বার্থন্বেষীদের লক্ষ হল। সাধারণ মানুষের স্বার্থবিনষ্ট করা, পৃথিবী থেকে প্রাণকে মুছে ফেলা। মানুষ যখন এই আসন্ন বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে এক বিশ্বব্যাপী ধ্বংসের তাণ্ডবের সম্ভাবনা বুঝবে তখন মানুষের এই শক্ৰদের অ-শিব শক্তিকে বিনষ্ট করার জন্য তারা প্ৰাণপণ চেষ্টা করবে।

শাস্তির প্রতীক বড় মনোরম কিন্তু সে দুর্বল, তবু মানুষের মধ্যে যা কিছু মহৎ এই শাস্তির আশা তাকে অনুপ্রাণিত করে; মানুষ যদি তার পিছনে সঙ্ঘবদ্ধ হয় তবে শান্তির রূপক এই পবিত্র কপোত সিংহ বা সাপের বিরোধিতা করে অবশ্যই জয়ী হবে। যে পদ্ম সুৰ্যকিরণের স্পর্শে বিকশিত হয়, যার কোনও চোখ ধাঁধানো চমৎকারিত্ব নেই, আছে। নীরব শান্ত সৌন্দর্য আর স্নিগ্ধ সুবাস তাকেই প্রাচীন ভারতবর্ষবরণ করেছিল শান্তি আর সমৃদ্ধির প্রতীক রূপে। পদ্ম বিকশিত হয়। প্ৰভাতে আর সন্ধ্যায় সে সলিল। তবু এর মধ্যে আছে অমরত্বের ইঙ্গিত, কারণ প্রতিদিনই সে একটু করে ফুটে ওঠে, এ ফুল আকাশ-মাটি-জলের মধ্যে মালিন্য আর পবিত্রতার মধ্যে বিচরণশীল; এ ফুল নিজে এক শান্তিপূর্ণ মর্যাদাময় তৃপ্ত জীবনবোধের পবিত্র প্রতীকস্বরূপ। তাই প্রাচীন ভারতবর্ষ একে সম্পর্কিত করেছিল। কেবল সমৃদ্ধির দেবী লক্ষ্মীর সঙ্গেই নয়, সৃষ্টিকর্তা ব্ৰহ্মার সঙ্গে, বাগদেবী সরস্বতীর সঙ্গে, শান্তির দূত বুদ্ধের সঙ্গে— যাঁর চরণপাতে ফুটে উঠত শান্তিকমল। জীবনের জন্যই শাস্তিকে কামনা করা হয়, সেখানেই পদ্মের পেলাব প্রতীক তার শক্তিলাভ করে থাকে।

সূত্রাবলি
(অসম্পূর্ণ)

লেখিকাঃ সুকুমারী ভট্টাচার্য

2 thoughts on “প্রাচীন ভারতে নারী ও সমাজ

  • June 1, 2020 at 12:02 PM
    Permalink

    ছোট করে লিখলে ভালো হত।
    বেদের বৈজ্ঞানিক ভুলগুলো তুলে ধরলে তর্ক করতে /বুঝতে সুবিধা হবে।

    Reply
  • June 1, 2020 at 5:22 PM
    Permalink

    এটা একটা বই। একটা বই আর ছোটো করে কিভাবে লিখবে? বেদের বৈজ্ঞানিক ভুল নিয়ে কিন্তু এই বইটি লেখা হয়নি। প্রাচীন ভারতে নারীদের সামাজিক অবস্থান নিয়ে বইটি লেখা হয়েছে ।

    পরবর্তীতে কখনো বেদের বৈজ্ঞানিক ভুল নিয়ে লেখা হবে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *