fbpx

শিব ঠাকুরের কামুকতা

বিভিন্ন দেবতারা তাদের কামুকতা, লাম্পট্য, ধর্ষকামীতা প্রভৃতির জন্য  যখন এই কলিযুগে নানা সমালোচকদের সমালোচনার মুখে পড়ছেন , তখনও শিব সংযমী দেবতা হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছেন।  অনেক অনেক বিখ্যাত লেখকরা বাকি দেবতাদের কামুকতা, অজাচার ইত্যাদি নিয়ে লিখলেও একমাত্র শিবকেই তারা যৌনসংযত বলেছেন। কিন্তু বাকি দেবতাদের তুলনায় কম হোক আর বেশিই হোক শিবচরিত্রটিও যে অত্যন্ত কামুক ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

শিব

হিন্দুদের নানা পুরাণ ও সাহিত্য থেকে শিবের কামুক চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়।

পদ্মপুরাণের সৃষ্টিখণ্ডের ৫৬ অধ্যায় এ  আছে,

“পুরাকালে গন্ধর্ব, কিন্নর এবং মনুষ্যগণের রূপবতী যুবতী স্ত্রীদের সর্বত্র দেখে মন্ত্রের দ্বারা তাদের আকর্ষণ করে সুদূর আকাশে  তপস্যার ছলে তাদের সঙ্গে সঙ্গত হওয়ার উদ্দেশ্যে অতি মনোরম কুটির নির্মাণ করে তাদের সঙ্গে মদনজয়ী শিব ক্রীড়া করেছিলেন।” এসময় শিবের স্ত্রী গৌরীর চিত্তচাঞ্চল্য হয়। তিনি যোগের মাধ্যমে দেখতে পান জগদাধিপতি শিব নারীদের সাথে ক্রীড়া করছেন। শিবের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে গৌরী ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন। এরপর ক্ষেমাংকরির রূপ ধারণ করে তিনি আকাশে গমন করলেন।  তিনি সুদূর আকাশের কোনো এক নির্জন স্থানে কামদেবের মত আকর্ষণীয় মহাদেবকে নারীদের মাঝে দেখতে পেলেন। তিনি কামপীড়িত হয়ে বারবার নারীদের আলিঙ্গন করছিলেন , তাদের সাথে ক্রীড়া করছিলেন, তাদের চুম্বন করছিলেন। এসব দেখার পর ক্ষেমাংকরিরূপী গৌরি তাদের সামনে আবির্ভূত হলেন। শিব তখন তার মুখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে রাখলেন। শিব হয়তো ভাবতে পারেননি যে তিনি এভাবে ধরা পড়ে যাবেন! যে নারীদের সাথে শিব ক্রীড়া করছিলেন গৌরি তাদের চুল ধরে টেনে লাথি মারলেন। সেই নারীদের সকলে আকাশ থেকে মাটিতে পড়ে গেলেন, তাদের চেহারা বিকৃত হয়ে গেল। গৌরির অভিশাপের ফলে তারা চণ্ডাল হয়ে জন্মেছিলেন। (১)

এছাড়া কিছু পুরাণে বর্ণিত শিবলিঙ্গের উৎপত্তিমূলক কাহিনীতেও শিবের কামুক চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়।

লিঙ্গ পুরাণের পূর্বভাগের ঊনত্রিশতম অধ্যায়ে আছে,

বউ, ছেলেমেয়েদের নিয়ে দারুবনে ঋষিরা তপস্যা করছিলেন। মুনিরা শ্রদ্ধাভরে তপস্যা করছেন কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য মহাদেব দিগম্বর অর্থাৎ উলঙ্গ হয়ে দারু বনে প্রবেশ করেন। অতি সুদর্শন মহাদেব ঋষি পত্নীদের আকৃষ্ট করার জন্য কামোদ্দীপক ভ্রুবিলাশ করলেন এবং গান গাইলেন।মহাদেব ঋষি পত্নীদের যতটা সম্ভব উত্তেজিত করলেন। ঋষিপত্নীরাও শিবের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বিবস্ত্র অবস্থায় তাকে অনুসরণ করলেন। কেউ কেউ গান গাইতে লাগলেন, কেউ নাচতে লাগলেন, কেউ মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন , কোনো কোনো রমনীরা একে অপরকে আলিঙ্গন করতে লাগলেন, কেউ আবার মহাদেবকে নানা কৌশল দেখাতে শুরু করলেন, কেউ তার সামনে বসে পড়লেন, কেউ জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কে? আমাদের প্রতি প্রসন্ন হউন।”

মহাদেব ঋষিপত্নীদের এমন আচরণ দেখে কিছু বললেন না। ঋষিরা নগ্ন মহাদেব ও তাদের পত্নীদের দেখে মহাদেবকে গালাগালি করতে লাগলেন। মুনিদের কটু কথা শুনে শিব অন্তর্হিত হলেন। (২)

শিব পুরাণের জ্ঞানসংহিতার ৪২ তম অধ্যায়েও একই কাহিনী আছে,

শিব

“দারুবনে ঋষিরা বাস করতেন। একদিন শিব ঋষিদের কোনোরকমের পরীক্ষা করার জন্য গায়ে ছাই-ভস্ম মেখে নগ্ন হয়ে বনের মধ্যে প্রবেশ করেন ; বিকৃত মনোবৃত্তি নিয়ে হাতে নিজের লিঙ্গ ধারণ করে ঋষিপত্নীদের মোহিত করতে থাকেন। কোনো কোনো ঋষিপত্নী ব্যাকুল হয়ে শিবের সামনে উপস্থিত হন। কেউ কেউ শিবের হাত ধরে তাকে জড়িয়ে ধরেন। ঋষিরা এসব দেখে অত্যন্ত রেগে যান। তারা শিবকে তার এমন আচরণের কারণ জিজ্ঞাসা করেন। তারা শিবকে অভিশাপ দেন- “তোমার লিঙ্গ ভূতলে পতিত হউক।” ঋষিরা অভিশাপ দেওয়ার সাথে সাথেই শিবের লিঙ্গ খসে মাটিতে  পড়ে যায়। (২)

দেবীভাগবত পুরাণে দেখা যায়  শিব কামার্ত ও নগ্ন হয়ে ঋষি ভৃগুর বনে গিয়ে রমণ করছিলেন-

“রাজন! মহাদেব যৎকালে কামার্ত ও নগ্ন হইয়া ভৃগুর বনে গমন পূর্বক রমণ করিতে থাকেন সেই সময় তপোধন ভৃগু তাহাকে তদবস্থ দর্শন করিয়া , তুমি অতিশয় নির্লজ্জ,  অতএব ‘এখনিই তোমার লিঙ্গ পতিত হউক ‘ এই বলিয়া তাহার প্রতি দারুণ অভিসম্পাত করেন। ”( ৪/ ২০/ ৩৬-৩৭) (৮)

পদ্মপুরাণের উত্তরখণ্ডের ২৫৫ তম অধ্যায়ে শিবলিঙ্গের উৎপত্তি সম্বন্ধীয় একটি কাহিনীতে পাওয়া যায়, একবার ঋষি ভৃগু শিবের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন কিন্তু শিব সেই সময় তার স্ত্রী পার্বতীর সাথে সম্ভোগে লিপ্ত ছিলেন। তাই ভৃগু অনেকদিন অপেক্ষা করেন শিবের সাক্ষাতের জন্য কিন্তু এতদিন পরও শিব সম্ভোগেই লিপ্ত ছিলেন। তাই ভৃগু রেগে গিয়ে শিবকে অভিশাপ দিয়েছিলেন, “ স্ত্রী সংসর্গে মত্ত হয়ে মহাদেব আমাকে অবজ্ঞা করছে। অতএব তাদের উভয়ের শরীর লিঙ্গ ও যোনিরূপ হবে। আমি ব্রাহ্মণ, শিব পাপাচ্ছন্ন হয়ে আমাকে জানতে পারল না। অতএব সে অব্রাহ্মণ হয়ে দ্বিজদের অপূজ্য হবে। আর যারা শিবভক্ত হয়ে অস্থিভস্ম, লিঙ্গমূর্তি ধারণ করবে তারা পাষণ্ড হয়ে বৈদিক ধর্ম হতে বহিষ্কৃত হবে।“ (৩)

নারদ পঞ্চরাত্র নামক গ্রন্থে ছদ্মবেশী মহাদেবকে পার্বতীকে শাখা পরাতে দেখা যায়। ছদ্মবেশী শিব পার্বতীর হাতে শাখা পরিয়ে মূল্য হিসাবে প্রার্থনা করেছিলেন –

পীড়িতঃ কামবাণেন ত্বয়া সার্ধং বরাননে ।

শীঘ্রং বরয় মাং ভদ্রে নান্যৎ পণ্যং মমেপ্সিতম্।।

অর্থাৎ, আমি তোমার সাহচর্যে কামবানে পীড়িত,আমাকে শীঘ্র বরণ কর, আমি অন্য কোন মূল্য চাই না। (৪)  

শ্রীমদ্ভাগত পুরাণে  অসুর ও দেবতাদের অমৃত আহরণের জন্য সমুদ্র মন্থনের জনপ্রিয় কাহিনীটি পাওয়া যায়। বিষ্ণু মোহিনী রূপ ধারণ করে অসুরদের কাছ থেকে অমৃত অপহরণ করে দেবতাদের তা প্রদান করেছিলেন। এই সময় বিষ্ণুর মোহিনী রূপ দেখে কামার্ত হয়ে শিব মোহিনীর অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন এবং এ সময় শিবের বীর্যও পতিত হয়েছিল।

শিব

সম্পূর্ণ ঘটনাটি সকলের জন্য তুলে ধরা হল।

শিব বিষ্ণুর মোহিনী রূপ দেখতে চাইলে বিষ্ণু শিবকে বলেন, “অসুরেরা যখন অমৃতভাণ্ড অপহরণ করেছিল তখন আমি এক সুন্দরী রমণীর রূপ ধারণ পূর্বক তাদের মোহিত করে দেবতাদের কার্যোদ্ধার করেছিলাম। হে সুরসত্তম! যেহেতু আপনি ইচ্ছা করেছেন , তাই আমি আপনাকে কামার্ত ব্যক্তিদের অত্যন্ত আদরণীয় আমার সেই রূপ দেখাব। ” “এই কথা বলতে বলতে ভগবান শ্রীবিষ্ণু তৎক্ষণাৎ সেখান থেকে অন্তর্হিত হয়েছিলেন এবং মহাদেব উমা সহ চতুর্দিকে তার চক্ষু সঞ্চালন করে তাকে খুঁজতে লাগলেন।তারপর নানাবিধ ফুল এবং অরুণবর্ণ পল্লবযুক্ত বৃক্ষশোভিত নিকটবর্তী একটি উপবনে মহাদেব এক অপূর্ব সুন্দরী রমণীকে কন্দুক নিয়ে খেলা করতে দেখলেন। তার নিতম্বদেশ উজ্জ্বল বস্ত্রের দ্বারা আচ্ছাদিত এবং মেখলা শোভিত।  সেই কন্দুকের অবক্ষেপণ এবং উৎক্ষেপণ করে সেই রমণীটি যখন খেলছিলেন , তখন তার স্তনদ্বয় কম্পিত হচ্ছিল এবং তার সেই স্তনের ভারে এবং ভারী ফুলমালার ভারে মনে হচ্ছিল তার দেহের মধ্যভাগ যেন প্রতি পদক্ষেপে ভগ্ন হয়ে যাবে, এইভাবে তিনি তার প্রবালতুল্য কোমল চরণ ইতস্ততঃ সঞ্চালন করছিলেন। সেই রমণীর মুখমণ্ডল আয়ত, সুন্দর, চঞ্চল চক্ষুর দ্বারা সুশোভিত ছিল এবং তার সেই নয়নযুগল কন্দুকের উৎক্ষেপণ এবং অবক্ষেপণের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছিল। দুটি অতি উজ্জ্বল কর্ণকুণ্ডল তার উজ্জ্বল গণ্ডদেশকে নীলাভ প্রতিবিম্বের দ্বারা সুশোভিত করেছিল এবং তার এলোমেলো কেশরাশি তার মুখমণ্ডলকে আরও দর্শনীয় করে তুলেছিল। সেই কন্দুক নিয়ে খেলতে খেলতে তার গায়ের শাড়ি শ্লথ হয়েছিল এবং তার কেশ স্খলিত হয়েছিল । তিনি তারা সুন্দর বাম হস্তের দ্বারা তার কেশ বন্ধনের চেষ্টা করছিলেন এবং সেই সঙ্গে তিনি তার ডান হাত দিয়ে কন্দুকে আঘাত করে সেই কন্দুকটি নিয়ে খেলা করছিলেন। এইভাবে ভগবান তার আত্মমায়ার দ্বারা সারা জগৎ বিমোহিত করেছিলেন। মহাদেব যখন সুন্দরী রমণীটিকে কন্দুক নিয়ে খেলা করতে দেখেছিলেন, তখন সেই রমণীও তার প্রতি কখনও কখনও দৃষ্টিপাত করেছিলেন এবং লজ্জায় ঈষৎ হেসেছিলেন। সেই সুন্দরী রমণীকে নিরীক্ষণ করে এবং সেই রমণীকে প্রতিনিরীক্ষণ করতে দেখে মহাদেব তার পরমা সুন্দরী পত্নী উমা এবং নিকটস্থ তার পার্ষদদের বিস্মৃত হয়েছিলেন। তার হাত থেকে কন্দুকটি যখন দূরে পতিত হল , তখন সেই রমণী তার পশ্চাদ্ধাবন করেছিলেন । তখন মহাদেবের সমক্ষেই বায়ু হঠাৎ কাঞ্চি সহ তার কটিদেশের সূক্ষ্ম বস্ত্র উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল। মহাদেব দেখলেন, সেই রমণীর দেহের প্রতিটি অঙ্গ অত্যন্ত সুন্দর , এবং সেই সুন্দরী রমণীও তাকে নিরীক্ষণ করতে লাগলেন। তাই সেই রমণী তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন বলে মনে করে , মহাদেব তার প্রতি অত্যন্ত আসক্ত হয়েছিলেন। সেই রমণীর সঙ্গে রমণ করার বাসনায় শিব তাঁর জ্ঞান হারিয়ে তাকে পাবার জন্য এমনই উন্মত্ত হয়েছিলেন যে , ভবানীর সমক্ষেই তিনি নির্লজ্জভাবে সেই সুন্দরীর কাছে গিয়েছিলেন। সেই সুন্দরী রমণী ইতিমধ্যেই বিবসনা হয়ে পড়েছিলেন এবং তিনি যখন দেখলেন শিব তাঁর দিকে এগিয়ে আসছেন , তখন তিনি অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে হাসতে হাসতে বৃক্ষের অন্তরালে লুকিয়েছিলেন ; তিনি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেননি। মহাদেবের ইন্দ্রিয় তখন অত্যন্ত বিচলিত হয়েছিল। কামান্ধ হস্তী যেভাবে হস্তিনীর প্রতি ধাবিত হয় , মহাদেবও ঠিক সেইভাবে সেই সুন্দরীর প্রতি ধাবিত হয়েছিলেন। অত্যন্ত দ্রুতবেগে তাঁর পশ্চাতে ধাবিত হয়ে , মহাদেব সেই সুন্দরীর চুলের বেণী ধরে তাকে কাছে টেনে এনেছিলেন এবং অনিচ্ছুক হলেও তাকে তাঁর বাহুর দ্বারা আলিঙ্গন করেছিলেন। … হস্তির দ্বারা আলিঙ্গিত হস্তিনীর মত সেই ভগবানের যোগমায়া নির্মিতা স্থূল নিতম্বিনী সুন্দরী মহাদেবের দ্বারা আলিঙ্গিতা হয়ে , আলুলায়িত কেশে মহাদেবের বাহুপাশ থেকে নিজেকে মুক্ত করে দ্রুতবেগে পলায়ন করলেন। মত্ত হস্তী যেমন ঋতুমতী হস্তিনীর অনুগমন করে , অমোঘবীর্য মহাদেবও তেমন সেই সুন্দরীর অনুসরণ করতে লাগলেন এবং তখন তাঁর বীর্য স্খলিত হয়েছিল। … পৃথিবীর যে যে স্থানের মহাত্মা শিবের বীর্য পতিত হয়েছিল , সেই সেই স্থান স্বর্ণ ও রৌপ্য খনিতে পরিণত হয়েছিল। মোহিনীকে অনুসরণ করতে করতে শিব নদী, সরোবর , পর্বত, বন ও উপবনে এবং যেখানে ঋষিগণ অবস্থান করতেন , সেই সমস্ত স্থানে গিয়েছিলেন। … মহাদেবের বীর্য সম্পূর্ণরূপে স্খলিত হলে তিনি দেখেছিলেন কিভাবে তিনি ভগবানের মায়ায় বশীভূত হয়েছেন। তখন তিনি সেই মোহ থেকে নিবৃত্ত হয়েছিলেন।” ( ৮/১২/১৪-৩৫ ) (৫)

শিবের এমন স্বভাবের জন্য শিবের স্ত্রী পার্বতী তাকে লম্পট বলে গালিও দিয়েছিলেন। পার্বতী কোথাও যাওয়ার সময় পুত্র বীরককে সবসময় দরজায় পাহাড়া দিতে রেখে যেতেন যাতে শিবের কাছে কোনো নারী আসতে না পারে- (৬)

” এষ স্ত্রী লম্পটো দেবো যাতায়াং ময্যস্তরম।

দ্বাররক্ষা ত্বয়া কার্য্যা নিত্যরুন্ধ্র্যান্ববেক্ষিণা।।

[ পদ্মপুরাণ, সৃষ্টিখন্ড ৪৪/৩০]

শিবপুরাণেও একই ধরণের ব্যাপার দেখা যায় । দেবী তপস্যা করতে যাওয়ার সময় তাঁর সখীকে তাঁর স্বামী শিবকে পাহাড়া দিয়ে রাখতে বলেছিলেন-

রক্ষিতব্যা লম্পটোহয়ং যথান্যাং মদ্গৃহে স্ত্রীয়ম্।

প্রবেশ্য নোপভোক্তা স্যাৎ পতির্মে জাহ্নবী প্রিয়ঃ ।।

অর্থাৎ,  এই লম্পটকে রক্ষা করবে যাতে আমার জাহ্নবীপ্রিয় পতি অন্য নারীকে প্রবেশ করিয়ে উপভোগ করতে না পারে। (৪)

[শিবপুরাণ, ধর্ম সংহিতা ১০/৩৪]

পুরাণের অনুসরণে বাঙ্গালী কবিরাও শিবকে কামুক হিসাবেই দেখিয়েছেন। ভরত চন্দ্রের  অন্নদামঙ্গলে  শিব  কামদেবকে ভস্ম করেই কামবাণে পীড়িত হয়ে নারী খুঁজে বেড়ান-

“মরিল মদন                তবু পঞ্চানন

মোহিত তাহার বাণে।

বিকল হইয়া       নারী তলাসিয়া

ফিরে সকল স্থানে।

[অন্নদামঙ্গল কাব্য]

মঙ্গল কাব্যের শিবকে  কোচনী ডোমিনীর সাথে ঘুরে বেড়াতেও দেখা যায় । শিবপার্বতীর প্রেমপর্ব শেষে শিব যখন পার্বতীকে নিজের অর্ধাঙ্গ করে নিতে চেয়েছিলেন, তখন পার্বতী তাকে  বিদ্রুপ করে  বলেছিলেন-

নিজ অঙ্গ যদি মোর অঙ্গে মিলাইবা

কুচনীর বাড়ি তবে কেমনে যাইবা।।

[অন্নদামঙ্গল কাব্য]
শিব

মুকুন্দ রামের চন্ডীমঙ্গলে  আবার শিবকে  কোচরমণীদের নাগর হিসাবে দেখানো হয়েছে। ভিক্ষুক শিবকে কোচরমণীরা তাদের পুরাতন নাগর বলে চিনতে পেরে আহ্লাদে আটখানা হয়ে উঠেছিলেন-

যতেক কোচের মেয়্যা            হরের বারতা পেয়্যা

ভিক্ষা দিতে আইল তখন।

পুরাতন দেখি হরে       কাচলি অসম্বরে

কুচযুগে না দেই বসন।

দশ পাঁচ সখি মেলি,        শিবের বসন ধরি

কেহ বা টানয়ে পরিহাসে।

বসি কুচনীর পাশে      শিব নিরানন্দে ভাসে

যুবতী বুঢারে নাঈ বাসে।।

[চণ্ডীমঙ্গল কাব্য]

রামেশ্বরের শিবায়নে দেখা যায়,  শিব ভিক্ষা করার জন্য সুন্দর বেশ ধরে কোচের নগরে প্রবেশ করেন। তিনি কোচ যুবতীদের শিঙ্গা বাজিয়ে মন্ত্রোচ্চারণ করে  আকর্ষণ করে নিয়ে আসেন এবং শিব  কোচনীদের সঙ্গে মদন-রঙ্গে মেতে ওঠেন-

গায় শিঙ্গা দ্রুত আয় আয় কোচবধূ ।

আকর্ষণহেতু মন হরি করি করি ধ্যান।

জপে মন্ত্র যুবতী জীবনে পড়ে টান।।

বিকল হইয়া টুটে সকল কোচিনী

শিব আইল আইল হইল মহাধ্বনি।।

ধাইল কোচিনী শুনি বিশাল ঘোষণা

মুকুন্দ মুরলী রবে যেন গোপাঙ্গনা।।

শুধু কোচিনী নয়, বাগদী নারীদের প্রতিও শিবের আকর্ষণ কম নয়। বাগদিনীর ছদ্মবেশিনী গৌরীর জন্য ভিক্ষুক শিবের ব্যাকুলতা বেশ হাস্যরসের সৃষ্টি করে-

হাস্যা হাস্যা ঘেস্যা ঘেস্যা ছুতে যায় অঙ্গ

বাগদিনী বলে আই মা এ আর কি রঙ্গ।।

বুড়া মুড়া মনুষ্যা হয়্যা  কেমন কর সয়্যা।

মন মজিল পারা মাঠে পায়্যা পরের মায়্যা।।

দেব দেব বলে মোরে দয়া কর সই।

বাগদিনী বলে আমি তেমন মায়্যা নই।।

এমন চরিত্রের জন্যই পার্বতী শিবকে  লম্পট বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।  এই বিদ্রূপ শুধুমাত্র পার্বতী পর্যন্ত থেমে থাকেনি। অন্নদামঙ্গল কাব্যে বাচ্চাদেরও  শিবকে বিদ্রুপ করতে এবং ধুলো ছুড়তে দেখা যায়-

কেহ বলে ওই এল শিব বুড়া বাপ।

কেহ বলে বুড়াটি খেলাও দেখি সাপ।।

কেহ বলে জটা হৈতে বার কর জল।

কেহ বলে জ্বাল দেখি কপালে অনল।।

কেহ বলে ভালো করে শিঙ্গাটি বাজাও।

কেহ বলে নাচ দেখি গলা বাজাইয়া।

ছাই মাটি কেহ গায় দেয় ফেলাইয়া।।

কেহ আনি দেয় ধুতুরার ফুলফল।

কেহ দেয় ভাঙ পোস্ত আফিংগ গরল।।

[শিবের ভিক্ষাযাত্রা অন্নদামঙ্গল]

শুধু যে কাব্যেই শিব অপমানিত হয়েছেন তা নয়, পুরাণেও শিবকে অপমানিত হতে দেখা যায়। পদ্মপুরাণের সৃষ্টিখণ্ডে আছে-

প্রহসন্তি চ কেহপ্যেনং কেচ্চিনর্ভৎসয়ন্তি চ।

অপরে পাংশুভিঃ সিঞ্চন্ত্যুন্মত্তন্তং তথা দ্বিজাঃ। ।

লোষ্টৈশ্চ লগুড়ৈশ্চান্যে শুশ্মিনো বলগর্বিতাঃ ।

প্রহরন্তি স্মোপহাসং কুর্বাণা হস্তসংবিদম্।।

ততোহন্যে বটবস্তত্র জটাস্বাগৃহ্য চান্তিকম্।

পৃচ্ছন্তি ব্রতচর্য্যান্তং কেনৈষাতে নিরদেশিতা।।

অত্র বামাঃ স্ত্রিয়ঃ সন্তি তাসামর্থে ত্বমাগতাঃ ।

কেনৈষা দর্শিতা চর্য্যা গুরুণা পাপদর্শিনা।।

অর্থাৎ-  কেউ কেউ তাকে উপহাস করলো, কেউ ভর্ৎসনা করলো, কোনো কোনো উন্মত্ত দ্বিজ তার গায়ে ধূলো ছুড়লো, অপর বলগর্বিত ব্যক্তি উপহাস করতে করতে ইষ্টক ও লগুর দ্বারা প্রহার করতে লাগলো। অন্য ব্রাহ্মণ বালকগণ জটা ধরে কাছে টেনে এনে জিজ্ঞাসা করলো- ব্রত সমাপন তোমাকে কে শিখিয়েছে- এখানে অনেক স্ত্রীলোক আছে তাদের জন্যই তুমি এসেছ। কোন পাপী গুরু তোমাকে এই পথ দেখিয়েছে? ( ১৭/৫৯-৬০) ( ৪) (৭)

** ড. হংস নারায়ণ ভট্টাচার্যের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা রইলো। তাঁর হিন্দুদের দেবদেবীঃ উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ বইটির সাহায্য নিয়ে এই লেখাটি লেখা হয়েছে। এটি আমার সম্পূর্ণ মৌলিক কোনো লেখা নয়।

তথ্যসূত্র-

১)

1- 2. Formerly, Sarva (i.e. Sarikara) , having seen youthful
and beautiful women of Gandharvas, Kinnaras and human beings, and with his mind set on them, pretended to be intent on practising penance, and with a spell dragged them far away into the sky.

3. Then the great lord, the conqueror of the god of love,
having fashioned a very delightful cottage, sported (there) with them.

4. In the meanwhile, Gauri’s mind became excited. By
means of meditation she saw the lord of the world, sporting with women.

5-7. Knowing his intention she became angry. Then taking
the form of Ksemarikari1, she entered (the sky), and saw, far away in a lonely region of the sky, Hara (i.e. Siva) , whose lustre was like that of the god of love, who was in the midst of beautiful women, who, the best man, was bright, who, having again and again embraced the women, was sporting with them, who was kissing them excessively, and who was tormented by the passion of love.

8- 10. Seeing this, Ksemailkari, came down there in front of them. Sarva (i .e. Sankara) ,with his face turned away (from Uma). Dragging them (by seizing) their hair, she angrily kicked them by her foot. All the women reached (i.e. fell on ) the ground, and suddenly their faces were disfigured. With their bodies scorched by Uma’s, curse they came under the sway of Mlecchas.

[ padma puran/ srishtikhanda/ chapter 56/ 1-10 ; Translated by Dr. N.A. Deshpande ; Edited by Dr. G.P. Bhatt ]

২)  অনুবাদক- শ্রী পঞ্চানন তর্করত্ন

৩)  publishers:- MOTILAL BANARSIDASS PUBLISHERS PRIVATE LIMITED

৪)  উৎসঃ হিন্দুদের দেবদেবী উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ, ড. হংস নারায়ণ ভট্টাচার্য

৫) মূল ইংরেজি অনুবাদক- কৃষ্ণকৃপাশ্রীমূর্তি শ্রীল অভয়াচরণারবিন্দ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ ; বাংলা অনুবাদক- শ্রীমদ ভক্তিচারু স্বামী ; ভক্তিবেদান্ত বুক ট্রাস্ট

৬) Translated by Dr. N.A. Deshpande ; Edited by Dr. G.P. Bhatt

৭) আরও দেখুন  Dr. N.A. Deshpande এর পদ্মপুরাণের ইংরেজি  অনুবাদ

৮) শ্রী হরিচরণ বসু কর্তৃক সম্পাদিত

অজিত কেশকম্বলী II

"মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি, মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।"

2 thoughts on “শিব ঠাকুরের কামুকতা

  • April 17, 2020 at 11:47 PM
    Permalink

    Lekhata pore valo laglo. Informative. Tobe amai biswas kori hindu somaj ager theke onek evolve hoyeche.

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *