সভ্যতা ও বিজ্ঞানের শক্তি – মেঘনাদ সাহা

আমরা যাহা কিছু করি বা ভাবি, একটা বদ্ধমূল ধারণা হইতে তাহার উদ্ভব হয়। দুর্ভাগ্যবশতঃ অতীত সম্বন্ধে কতগুলি মিথ্যা ধারণা এদেশের লোকের মনে বদ্ধমূল হইয়াছে। তাহারা মনে করে, অতীতের যাহা কিছু সবই ভাল- বর্তমানের সবকিছুই খারাপ। আমাদের প্রাচীন সভ্যতার অভ্যুদয়কালে সত্যযুগের অতিমানুষিক উৎকর্ষ সাধিত হইয়াছিল, এ ধারণা অনেকের মনে বদ্ধমূল আছে। সত্যযুগ হইতে জগতের আরম্ভ হইয়াছে এবং ক্রমে ক্রমে দুঃখ ও অশান্তিপূর্ণ কলিযুগের সূত্রপাত হইয়াছে, ইহা অনেকে বিশ্বাস করে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা দ্বারা জানা যায়, অতীত সম্বন্ধে আমাদের এই ধারণার মূলে কোনো সত্য নিহিত নাই। ক্রমবিকাশের নিয়মানুসারে বংশপরম্পরায় বহুযুগের সাধনার ফলে বানর হইতে ক্রমোন্বতি লাভ করিয়া মানুষ বর্তমান সভ্যতা গড়িয়া তুলিয়াছে। এই সত্যকে এদেশে স্বীকার করা হয় না।অতীতের স্বর্গরাজ্যের উপর আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ। কিন্তু জাতি হিসাবে জগতের মধ্যে সম্মানের আসন গ্রহণ করিয়া যদি আমাদিগকে বাঁচিয়া থাকিতে হয়, তাহা হইলে বিজ্ঞানাবিষ্কৃত যন্ত্রের সাহায্যে  আমাদিগকে কলকারখানা গড়িয়া তুলিতে হইবে এবং সংঘবদ্ধভাবে আমাদের অবস্থার উন্নতি সাধন করিতে হইবে।

প্রথমে সরল, পরে জটিল যন্ত্রসমূহের সাহায্যে মানবসভ্যতা ক্রমোন্বতি লাভ করিয়াছে।চল্লিশ হাজার বৎসর পূর্বে পৃথিবীতে প্রস্তরের যুগ ছিল মাত্র, পাঁচ হাজার বৎসর পূর্বে মানুষ তামা ও লোহার ব্যবহার শিখিয়াছে। কেহ কেহ বলেন, আমাদিগকে সেই প্রাচীন অর্বাচীন যুগে ফিরিয়া যাইতে হইবে। তাহা কি সম্ভব ও যুক্তিসঙ্গত? মানুষের মনোবৃত্তি বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে যন্ত্রেরও ক্রমোন্নতি সাধিত হইয়াছে। মুদ্রন যন্ত্রের আবিষ্কারের ফলে এক নতুন যুগের মানুষ পরবর্তী যুগের মানুষের নিকট তাহাদের মনোভাব ব্যক্ত করিবার সুযোগ পাইয়াছে। খ্রিস্ট পূর্ব ১২০০ অব্দে যানবাহনের কার্যে মানুষ ঘোড়ার ব্যবহার করিতে শিখিয়াছে। তাহারও আগে ঐ কাজে মানুষ গাধা ব্যবহার করিত। পশু ও ক্রীতদাসকে মানুষ শক্তি বৃদ্ধির যন্ত্ররূপে ব্যবহার করিত। মুসলমানের যে ভারতবর্ষ জয় করিয়াছে তাহার একমাত্র কারণ, তাহারা ঘোড়ার ব্যবহারে বিশেষ দক্ষ ছিল। দক্ষিণ আমেরিকা ও অন্যান্য স্থানের অসভ্যেরা আগ্নেয়াস্ত্র ও ঘোড়ার ব্যবহার জানিত না। সেইজন্য ইউরোপের জাতিসমূহ তাহাদিগকে অনায়াসে পরাজিত করিতে সমর্থ হইয়াছে। ভারতের সিন্ধুপ্রদেশে এক বিশেষ সভ্যতা বিস্তারলাভ করিয়াছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে এদেশে মস্তিষ্কের শক্তিকে উচ্চ আসন দেওয়া হইত এবং যে সকল শিল্পি হাতে কলমে কাজ করিয়া শিল্পের উন্নতি সাধন করিত , তাহাদিগকে সমাজে নিম্ন আসন দেওয়া হইত, ইহার ফলে ভারতের অবনতির সূত্রপাত হইয়াছে। ইউরোপে প্রাকৃতিক শক্তিকে সুনিয়ন্ত্রিত ও বশীভূত করিবার জন্য মস্তিষ্কের সাহায্য লওয়া হইত। গ্রীস দেশে প্রথম স্টীম ইঞ্জিনের ব্যবহার দেখা যায়। তারপর ১৭০৫ খ্রিস্টাব্দে ইংলণ্ডে তাহার সূচনা হয়। জেমস ওয়াট তাহার উৎকর্ষ সাধন করেন। ১৭৩৭ খ্রিষ্টাব্দের পর ইংলণ্ড ও পাশ্চাত্য দেশসমূহে যন্ত্রশিল্পের যুগান্তর উপস্থিত হয়। কলকারখানার প্রতিষ্ঠা ও তড়িৎ শক্তির প্রচলনের ফলে মানুষের জীবনধারার আমূল পরিবর্তন হয়। প্রথমতঃ কোম্পানিগুলি ইহার বিপুল লভ্যাংশ নিজেরা আত্মসাৎ করিতে থাকে। পরে গভর্নমেন্ট উহাদের কর্তৃত্বভার গ্রহণ করায় জাতি অধিকতর উন্নতির পথে অগ্রসর হয়।

এদেশের জলপ্রবাহ ও কয়লার শক্তিকে যদি সুনিয়ন্ত্রিত করা যায়, তবে তাহা দ্বারা বেকার সমস্যার সমাধান হইতে পারে। এক্ষেত্রে জাতির সেবায় বিজ্ঞান নিযুক্ত হইতে পারে। কিন্তু জাতিকে তাহার বদ্ধমূল ধারণা পরিবর্তন করিয়া নূতন আদর্শ গ্রহণ করিতে হইবে। হস্তের সাহয্যে যেখানে একজন মানুষ এক ইউনিট কাজ করিতে পারে সেখানে যন্ত্রের সাহায্যে সে তাহার ১০/১২ গুণ বেশি কাজ করিতে পারে।এখানে হাতের শক্তি নিরুপায়। এই শক্তি এদেশকে দারিদ্রতার হাত হইতে উদ্ধার করিতে পারিবে না। ভারতবাসীদের মত চীনারাও জীবনের একটি মিথ্যা আদর্শ দ্বারা বিপথগামী হইয়াছে। ভারতবাসীদের মত তাহারাও নিজেদের সভ্যতার গর্ব করিত এবং ইউরোপের অনুকরণ করিতে চাহিত না। তাহারা খদ্দর ও চরকার উপর নির্ভর করিত। ফল কি হইয়াছে? পাশ্চাত্য জাতিসমূহ তাহাদিগকে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করিয়াছে। নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা না থাকিলে পাশ্চাত্য জাতিরা অনায়াসে চীন জয় করিয়া ফেলিত। আজ জাপান তাহাই করিতেছে, সুতরাং ধ্বংসের হস্ত হইতে যদি আমাদিগকে রক্ষা পাইতে হয়, তাহা হইলে নূতন আদর্শ গ্রহণ করিয়া এদেশের প্রাকৃতিক শক্তিসমূহকে সুনিয়ন্ত্রিত ও করায়ত্ত করিতে হইবে। কংগ্রেস সভাপতি শ্রীযুক্ত সুভাষচন্দ্র বসু এই নূতন আদর্শের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হইয়াছেন এবং সেই দিকে প্রায় ষোল আনা ঢলিয়া পড়িয়াছেন। জগতের সভ্য জাতিসমূহের মধ্যে যদি ভারতকে আসন গ্রহণ করিতে হয় তাহা হইলে কংগ্রেস সভাপতির প্রদর্শিত পথই তাহার প্রকৃষ্ট উপায়। প্রতিক্রিয়াপন্থীরা কর্তৃত্ব লাভ করিয়া বিজ্ঞানের সাহায্যে যন্ত্রশিল্পের প্রতিষ্ঠা ও উন্নতিকে যদি ব্যর্থ করিতে সমর্থ হয়, তবে যথার্থই দেশের দুর্দিন সমাগত হইয়াছে বুঝিতে হইবে।  [রূপ-শ্রীঃ আশ্বীন ১৩৪৫]

লিখেছেনঃ ডঃ মেঘনাদ সাহা
[ উৎসঃ মেঘনাদ সাহা জীবন ও সাধনা – সূর্যেন্দুবিকাশ করমহাপাত্র]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *